যাযাদি রিপোর্ট
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন বিএডিসি। বিএডিসিতে কেনা-কাটা ও প্রকল্পের নামে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন কর্মকর্তারা। বিএডিসি এখন দুর্নীতির আখড়া হয়ে ওঠেছে। বীজ, সার ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ কেনায় ব্যাপক লুটপাট হচ্ছে। অনেকটা প্রকাশ্যেই লেনদেন হচ্ছে ঘুষের টাকা। প্রকল্প বাগিয়ে শত কোটি টাকার বাণিজ্য হচ্ছে। সেচ প্রকল্পের বরাদ্দকৃত অর্থের নয়-ছয় করছেন। বিএডিসির মাঠ পর্যায়ে কার্যক্রম চোখে না পড়লেও প্রকল্পের নামে টাকা তছরূপ হচ্ছে। সরকার পরিবর্তন হলেও নুরুল ইসলামের দাপট কমেনি, বরং এখন তার হাতে আলাদিনের চেরাগ।
বিএডিসির দুর্নীতি আর অনিয়মের সিন্ডিকেটের মূল হতো হলেন পরিচালক নুরুল ইসলাম। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারজেলার ভূ-উপরিস্থ পানির মাধ্যমে সেচ উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক নুরুল ইসলাম রাতারাতি হয়েছেন শত শত কোটি টাকার মালিক । তার নামে-বেনামে রয়েছে বিশাল সম্পদ। আত্বীয়-স্বজনের নামে গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়। অর্থ পাচার করেছেন বলেও অভিয়োগ রয়েছে। তার গ্রামের বাড়ি ফেনীতে রয়েছে এগ্রো ফার্ম। ঢাকার মিরপুর পল্লবীতে বি ব্লকের তিন নম্বার রোডের ২১৮ নম্বর বাড়ি, একই এলাকার ২ নম্বর রোডের ১৬ নম্বর বাড়ির মালিক তিনি। মিরপুর ডিইউএইচ-এ রয়েছে ফ্ল্যাট, বসুন্ধরা জে ব্লকে একটি প্লট রয়েছে তার নামে, উত্তরা ও বনানীতে আছে ফ্ল্যাট। এ ছাড়াও তার নামে-বেনামে ৫০টির বেশি ফ্ল্যাট রয়েছে। অবৈধভাবে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন নুরুল ইসলাম। বিএডিসির প্রকল্প পরিচালক নুরুল ইসলামের হাতে এখন আলাদিনের চেরাগ। আওয়ামী সরকারের আমলে দাপটে এই কর্মকর্তা রাতারাতি বিএনপি হয়ে ওঠেছেন। ঠিকাদারদের কাছ থেকে ঘুষের বদলে ফ্ল্যাটও লিখে নেন তিনি। এছাড়াও ঠিকাদাররা বিলের টাকা নিতে গেলে সেখানেও ১০ পার্সেন্ট কমিশন নিতেন নুরুল ইসলাম । কমিশনের টাকা দিতে না চাইলে বিল আটকে দিতেন তিনি । নূরুল ইসলাম অধিকাংশ সময় অফিসে উপস্থিত থাকে না। প্রকল্প পরিচালক নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত চলমান আছে। সরকার পরিবর্তন হলেও নুরুল ইসলামের দাপট কমেনি। বরং সে প্রকাশ্যে বিএডিসিতে দুর্নীতির রাজ্য গড়ে তুলেছেন। প্রতিষ্ঠানটি কর্মীদের প্রশ্ন, নুরুল ইসলামের ক্ষমতার উৎস্য কি।
নুরুল ইসলাম ২০২১ সালে মুজিবনগর সেচ উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পান। তবে মাত্র চার মাসের মাথায় একই বছরের ২০ জুন দুর্নীতির দায়ে অপসারিত হন। ওই সময় তার বিরুদ্ধে কাজ দেওয়ার জন্য মোটা অঙ্কের উৎকোচ গ্রহণ ও প্রকল্প পরিচালক নিজেই প্রকল্পে গাড়ি সরবরাহ কাজে জড়িত থাকার অভিযোগ প্রামানিত হয়। এরপর তাকে হবিগঞ্জ অঞ্চলে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়। তবে সেখানেও অনিয়মে জড়ান নুরুল ইসলাম। হবিগঞ্জ অফিস ভবনের কাজ চলমান ছিল। সেখানে ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশে নিম্নমানের কাজ করেন। বিষয়টি ঊর্ধ্বতনদের নজরে এলে পুরো কাজটি খতিয়ে দেখা হয়। তিনি যেখানেই বদলি হন, সেখানেই দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন।
জানা যায়, হবিগঞ্জ অফিস ভবনের নির্মাণ কাজের অনিয়ম নিয়ে বিএডিসি অভ্যন্তরীণ একটি তদন্ত হয়। তদন্তে ভবন নির্মাণে ৩৬টি খাতে অনিয়ম ধরা পড়ে। তদন্ত বলা হয়েছে, পুরো ভবনের বিভিন্ন জায়গায় নির্মাণ শেষ হতে না হতেই ফাটল ও প্লাস্টার খসে পড়ছে। বাইরে লাগানো সিরামিক খসে পড়ছে। অনিয়মের আশ্রয় নিয়ে নিম্নমানের রং লাগানো হয়েছে। এ ছাড়া নিম্নমানের ইলেকট্রিক পণ্য ব্যবহার করা হয়েছে ভবনে। অনেক কাজ সমাপ্ত না করেই খাতা-কলমে সমাপ্ত দেখানো হয়েছে বলে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তদন্তে দোষী হলে তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী ডা. আব্দুর রাজ্জাকের সয়তায় নুরুল ইসলাম রক্ষা পায়।
তারপর নুরুল ইসলাম ৫০ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে চট্টগ্রামে বদলি নেন। চট্টগ্রামে যাওয়ার পর সাবেক মেয়র আ.জ.ম নাসিরের ছত্রছায়ায় বেপরোয়া হয়ে ওঠেন নুরুল ইসলাম। প্রতিটি কাজে ১০ শতাংশ হারে কমিশন নিয়ে ঠিকাদারদের কাজ দিতেন। পাইপ ক্রয়ের টেন্ডারের জন্য নিতেন ১৫শতাংশ কমিশন। পাইপ ক্রয়ে কয়েক বছর যাবত বিনা অভিজ্ঞতা সম্পূর্ন প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিতেন। এর মধ্যে চট্রগ্রামে এন. এম প্ল্যাষ্টিক কোম্পানিটি এস আলম গ্রুপের মালিকের এক আত্বীয়। এন. এম প্ল্যাষ্টিক কোম্পানির সিইও আসাদুজ্জামান মাসুদকে দিয়ে নুরুল ইসলাম তার সকল সন্ত্রাসী কার্যকলাপ, লুটপাট ও ঠিকাদারকে ভয়-ভীতি ও হুমকি দিয়ে নিজের সুবিধা বুঝে নিতেন। তিনি এন. এম প্ল্যাষ্টিক কোম্পানিকে এক তরফাভাবে কাজ দিতেন।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় ভূ-উপরিস্থ পানির মাধ্যমে সেচ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় একসঙ্গে প্রায় ২৫০টি উন্নয়ন কাজের দরপত্র আহ্বান করা হয়। বিএডিসির বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, সাধারণত যে কোনো প্রকল্পের উন্নয়ন কাজ ধারাবাহিকভাবে দরপত্র আহ্বান করে। জনবল সংকটসহ নানা কারণে একসঙ্গে এত কাজ শুরু হলে ঠিকমতো দেখভাল করা সম্ভব হয় না। এতে কাজের মান খারাপ হওয়ার সুযোগ থাকে। চট্টগ্রাম একসঙ্গে ২৫০টি কাজের দরপত্র আহ্বান করে একটি রেকর্ড করেছেন প্রকল্প পরিচালক নুরুল ইসলাম । তিনি তার পছন্দের ঠিকাদারদের নিয়ে একটি সিন্ডিকেট গঠন করেছেন। তার সিন্ডিকেটের বাইরে কউ দরপত্রে অংশগ্রহণ করলেও কাজ পায় না। নতুন এই প্রকল্পেও তিনি একই পথে হাঁটছেন। তার পছন্দের ঠিকাদাররা যাতে দরপত্রে অংশ নিয়ে কাজ পান, সে জন্যই তিনি দ্রুত একসঙ্গে সব দরপত্র আহ্বান করেছেন। নুরুল ইসলাম দরপত্রের গোপন কোড নম্বর সিন্ডিকেটের ঠিকাদারদের আগেই জানিয়ে দেন। যাতে অন্যরা কাজ না পায়।
জি. কে পলিমারের মালিক গোপালগঞ্জের যুবলীগ নেতা এবং এ.ওয়ান প্ল্যাষ্টিক এর আইন উপেদেষ্টা ব্যারিষ্টার ফজলে নূর তাপসকে খুশি করার জন্য বিনা অভিজ্ঞতাহীন, জালিয়াতি করে সার্টিফিকেট বানিয়ে গড়ে ওঠা কোম্পানিকে ১৫ শতাংশ হারে কমিশন নিয়ে নুরুল ইসলাম চট্টগ্রাম প্রকল্পের কাজ দেয়। এতে করে নিম্নমানের পাইপ ব্যবহার করার কারনে পাইপগুলো ভেঙ্গে হয়ে যায়। তার শ্যালক বিপ্লবের প্রতিষ্ঠান এম.আর.এস বিল্পবে সে বিনিয়েগ করে এবং সেই প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিয়ে থাকে।
নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতির কথা বলায় বিএডিসির এক্সএন ফাতেমা আক্তার জেনিকে ঢাকায় বদলি করা হয়। তখন তিনি সন্তান সম্ভাবনাময ছিলেন। এ নিয়ে টেলিভিশনসহ বিভিন্ন গনমাধ্যমে খবরটি প্রকাশিত হয়। তখন বিএডিসির বর্তমান চেয়াম্যান নুরুল ইসলাম তার নামে তদন্ত কমিটি গঠন করেন। এখনও সেই তদন্ত কমিটির সুপারিশ প্রকাশ হয়নি।
এ বিষয়ে নুরুল ইসলাম বলেন, তার বিরুদ্ধে একটি চক্র লেগেছে। তারা প্রকল্প পরিচালক হতে না পেরে এখন আমার পিছনে লেগেছে। এই সব তদন্ত কমিটি তার কিছু করেতে পারবে না। নুরুল ইসলাম বর্তমান বিএডিসি চেয়ারম্যান এর আত্নীয়দের কাজ দিয়ে চেয়ারম্যানকে খুশি রাখে। এর আগে দূনীতি দমন কমিশন তার বিরুদ্বে অভিযোগ আনে। তখন সে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে সাজা থেকে মুক্তি পান।
বিএডিসি চিফ ইঞ্জিনিয়র বদিউল আলম সরকার দৈনিক যায়যায়দিনকে জানান, প্রকল্প পরিচালক নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ রয়েছে। তার দুর্নীতির প্রমাণ আমাদের হাতে আছে। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত চলছে। দুদক তার বিরুদ্ধে তদন্তে নেমেছে।
বিএডিসি চেয়ারম্যান রুহুল আমিন খানকে একাধিকবার তা ফোন করলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরে জানা যায়, তিনি বিদেশ সফরে রয়েছেন।