ঢাকা | শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

একজন মা, একজন নেত্রী, একটি সংগ্রামের ইতিহাস

author
আহসান হাবিব বরুন

প্রকাশিত : ১৪ আগস্ট, ২০২৬ বিকেল ৪:১০
ad003
বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের রাজনীতি—দুটি শব্দই যেন এক উত্তাল তরঙ্গের নাম। বহু ঘাত-প্রতিঘাত, রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, সামরিক শাসন, গণঅভ্যুত্থান এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের অজস্র অধ্যায় পেরিয়ে আজকের বাংলাদেশ। আর এই ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য, উজ্জ্বল ও মহীয়সী বাতিঘরের নাম বেগম খালেদা জিয়া। ১৫ আগস্ট, বাংলাদেশের তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, দেশনেত্রী, আপোষহীন নেতৃত্বের প্রতীক বেগম খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মদিন। তবে এবার তিনি শারীরিকভাবে আমাদের মাঝে নেই। ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫-এ তাঁর জীবনাবসানের পর এটি তাঁর প্রথম জন্মবার্ষিকী। কোনো রাজনৈতিক নেতার মূল্যায়ন শুধু তাঁর দলীয় পরিচয় দিয়ে হয় না। ইতিহাসের বিচারে একজন নেতার গুরুত্ব নির্ধারিত হয় তিনি তাঁর সময়কে কতটা প্রভাবিত করেছেন, সংকটের মুহূর্তে কী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় কী রেখে গেছেন এবং মানুষের রাজনৈতিক চেতনায় তাঁর উপস্থিতি কতটা স্থায়ী হয়েছে—তার ওপর। সেই মানদণ্ডে বেগম খালেদা জিয়া নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের রাজনীতির এক অনিবার্য অধ্যায়।

সুতরাং আজকের এই বিশেষ ক্ষণে দাঁড়িয়ে কেবল একজন ব্যক্তির জীবনকে নয়, বরং একজন মা, একজন রাজনৈতিক নেত্রী এবং একটি দেশের সমগ্র রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাসকে আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা আবশ্যক।
 
উইনস্টন চার্চিল একবার বলেছিলেন, "The price of greatness is responsibility."(মহত্ত্বের মূল্য হলো দায়িত্ব)। বেগম খালেদা জিয়ার পুরো রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত জীবন পর্যালোচনার সময় চার্চিলের এই উক্তিটি অমলিন হয়ে ভেসে ওঠে। তিনি ছিলেন এমন একজন নারী, যিনি সাধারণ গৃহবধূ থেকে শুরু করে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়কে পরিণত হয়েছিলেন। ক্ষমতা, জেল-জুলুম, শোক ও বিজয়ের মধ্য দিয়ে নির্মিত তার এই দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন বিশ্বরাজনীতির ইতিহাসেও এক বিরল ও অনন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।
 
১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুর শহরের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া বেগম খালেদা জিয়া (ডাকনাম 'পুতুল') খুব কম বয়সেই বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হন তৎকালিন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তরুণ ও প্রখর মেধাবী কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে। স্বাধীনতার পর যিনি স্বাধীন বাংলাদেশের সেনাপ্রধান এবং পরবর্তীতে সফল প্রেসিডেন্ট ও আধুনিক বাংলাদেশের স্থপতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
 
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে এক মর্মান্তিক সেনা অভ্যুত্থানে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান শহীদ হন। স্বামীহারা এক মা, দুটি ছোট সন্তান—তারেক রহমান ও প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোকে নিয়ে জীবনের এক অনিশ্চিত ও যন্ত্রণাদায়ক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছিলেন খালেদা জিয়া। সাধারণ মানুষের চোখে তখন তিনি কেবলই একজন শোকাতুর মা ও বিধবা নারী।
 
কিন্তু ইতিহাস তার জন্য অন্য এক ভাগ্যলিপি লিখে রেখেছিল। জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ দেশের সংবিধান স্থগিত করে ক্ষমতা দখল করেন। দেশে নেমে আসে সামরিক স্বৈরশাসনের অন্ধকার ছায়া। জাতীয়তাবাদী শক্তি তথা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) যখন নেতৃত্বহীনতা ও ভাঙনের মুখে, ঠিক তখনই ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি সাধারণ কর্মী থেকে শুরু করে নীতি নির্ধারকদের দাবির মুখে রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ ঘটে বেগম জিয়ার। প্রথমে সহ-সভাপতি এবং ১৯৮৪ সালে সর্বসম্মতিক্রমে বিএনপির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি। গৃহবধূর শান্ত রূপ ছেড়ে তিনি ধারণ করলেন এক লৌহ কঠিন রাজনৈতিক নেতৃত্ব।
 
৮০-র দশকে সামরিক স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলাদেশে গণতান্ত্রি ভাবমূর্তির নতুন যুগের সূচনা হয়। এই আন্দোলনের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। বিশ্বরাজনীতিতে আমরা অনেক নেতাকেই দেখি—যাঁরা কৌশলগত কারণে ক্ষমতার কাছে নতিস্বীকার করেন, সমঝোতার টেবিলে বসেন। কিন্তু খালেদা জিয়ার অভিধানে 'সমঝোতা' শব্দটি কখনো ছিল না, যখন তা সার্বভৌমত্ব বা গণতন্ত্রের নীতির বিরুদ্ধে গেছে।
 
সামরিক শাসনের আট বছরে তিনি বহুবার গৃহবন্দী হয়েছেন, গ্রেপ্তার হয়েছেন। রাজপথে পুলিশি টিয়ারগ্যাস, লাঠিচার্জ কিংবা সামরিক জান্তার অগণিত রক্তচক্ষুকে তিনি ভয় পাননি। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে যেখানে অন্যান্য রাজনৈতিক দল নানা হিসাব-নিকাশ করে সামরিক সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল, সেখানে বেগম জিয়া সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছিলেন—কোনো সামরিক জান্তার অধীনে জাতীয়তাবাদী দল নির্বাচনে যাবে না। এই অটল নীতিগত অবস্থানের কারণেই তৎকালীন সাধারণ মানুষ এবং রাজনৈতিক মহল তাকে ভালোবেসে ভূষিত করে "আপোষহীন নেত্রী" উপাধিতে।
 
তার এই ধারাবাহিক ও আপোষহীন সংগ্রামের চূড়ান্ত ফল আসে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর। গণঅভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এরশাদ। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার হয়, আর এই জয়ের প্রধান নায়িকা হিসেবে বিশ্বমঞ্চে আত্মপ্রকাশ করেন বেগম খালেদা জিয়া।
 
১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে সরকার গঠন করে। ৩ মার্চ ১৯৯১ সালে বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে তিনি মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী (বেনজীর ভুট্টোর পর) হিসেবে বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
 
রাষ্ট্র পরিচালনায় তিনি কীভাবে সাফল্য অর্জন করেছিলেন, তার একটি নিরপেক্ষ ও গভীর সামাজিক-অর্থনৈতিক মূল্যায়ন প্রয়োজন:
 
১.১৯৯১ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন আনেন। তিনি রাষ্ট্রপতির শাসিত সরকার ব্যবস্থা থেকে দেশকে পুনরায় সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরিয়ে আনেন। সংবিধানে দ্বাদশ সংশোধনী এনে প্রধানমন্ত্রীর হাতে নির্বাহী ক্ষমতা ন্যস্ত করার সিদ্ধান্তটি ছিল বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর এক বিরাট মাইলফলক।
 
২.রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তার সবচেয়ে বড় সাফল্য এসেছিল নারী শিক্ষার প্রসারে। মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা অবৈতনিক করা এবং তাদের জন্য উপবৃত্তি চালু করার তার কালজয়ী সিদ্ধান্তটি বাংলাদেশের সামাজিক মানচিত্র বদলে দেয়। বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা তার এই উপবৃত্তি মডেলকে বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত করে এবং এটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের জন্য মডেল হিসেবে গৃহীত হয়। নারীদের এই শিক্ষামুখী করার ফলেই পরবর্তীতে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প এবং অন্যান্য অর্থনীতিতে নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ সম্ভব হয়েছিল।
 
৩.তার শাসনামলে বাংলাদেশে মুক্তবাজার অর্থনীতির ভিত মজবুত হয়। গার্মেন্টস সেক্টর এবং প্রবাসী আয়ের (রেমিট্যান্স) প্রধান জোয়ার শুরু হয় এই সময়েই। যমুনা বহুমুখী সেতুর কাজ সম্পন্ন করে উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিকে মূলধারার সাথে যুক্ত করা, যাতায়াত ব্যবস্থার অভাবনীয় পরিবর্তন, আধুনিক ব্যাংক ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে সবল করতে 'ডাল ভাত কর্মসূচি' সহ নানাবিধ সংস্কার মূলক নীতি বাস্তবায়ন করা হয়েছিল।
 
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বেগম জিয়া ছিলেন প্রখর বাস্তববাদী ও স্বাতন্ত্র্যবোধসম্পন্ন। ভারতের সাথে অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন, নিরাপত্তা সম্পর্কিত সমস্যা কিংবা দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক জোট 'সার্ক' (SAARC)-কে গতিশীল করতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। চীন, মধ্যপ্রাচ্য এবং পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে তিনি সমতার ভিত্তিতে এবং বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করেছেন। আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশকে কোনো বিশেষ শক্তির কাছে নতজানু হতে না দেওয়া ছিল তার অন্যতম প্রধান কৌশল।
 
রাজনীতির কাঠগড়া এবং ক্ষমতার অলিন্দের বাইরে খালেদা জিয়ার যে রূপটি বিশ্ববাসীকে সবচেয়ে বেশি আলোড়িত করে, তা হলো—একজন মা। একজন রাজনীতিক যখন একই সাথে দেশের কোটি কোটি মানুষের অভিভাবক এবং নিজ সন্তানদের জন্মদাত্রী মা হন, তখন তার ওপর দিয়ে যে ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যায়, বেগম জিয়া তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন।
 
২০০৭ সালের এক এগারোর (১/১১) অসাংবিধানিক মঈন-ফখরুদ্দীন সরকারের সময় তার ওপর চালানো হয় এক নির্মম মনস্তাত্ত্বিক নির্যাতন। তার দুই ছেলে—তারেক রহমান এবং আরাফাত রহমান কোকোকে গ্রেপ্তার করে নির্মম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। দেশ ত্যাগের জন্য খালেদা জিয়ার ওপর পাহাড়সম চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। তাকে বলা হয়েছিল, তিনি যদি বিদেশে চলে যান, তবে তার ছেলেদের ছেড়ে দেওয়া হবে।
 
কিন্তু সাধারণ কোনো মা যেখানে সন্তানের নিরাপত্তার জন্য রাজনৈতিক অবস্থান বিসর্জন দিতেন, সেখানে খালেদা জিয়া দেখিয়েছিলেন এক মহাকাব্যিক দৃঢ়তা। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, *"বিদেশে আমার কোনো ঠিকানা নেই। এ দেশের মানুষই আমার পরিবার, এ দেশই আমার ঘর।"
 
২০১৫ সালে মালয়েশিয়ায় নির্বাসিত অবস্থায় ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর অকাল মৃত্যু হয়। দেশের তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির দরুন তিনি অবরুদ্ধ ছিলেন গুলশানের কার্যালয়ে। সন্তানহারা এক মায়ের কান্নায় বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল, কিন্তু দেশের রাজনীতি এবং তার সমর্থকদের জন্য তিনি নিজেকে সামলে রেখেছিলেন। এই যে আত্মত্যাগ, এই যে নিজের ব্যক্তিগত শোককে জাতির কল্যাণে বিলীন করে দেওয়া—তা তাকে কেবল একজন রাজনৈতিক নেতাই বানায়নি, বানিয়েছে দেশমাতা বা 'মাদার অব দ্য নেশন'। 
 
বিগত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার যে রূপ প্রকাশ পেয়েছে, তার সবচেয়ে বড় শিকার ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। ভুয়া ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় ২০১৮ সালে ৭৩ বছর বয়সে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। নির্জন, পরিত্যক্ত ও স্যাঁতসেঁতে পুরনো ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে তাকে বন্দী রেখে বছরের পর বছর ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল।
 
তার শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি হওয়া সত্ত্বেও তাকে বিদেশে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ দেওয়া হয়নি। কিন্তু চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাসপাতালের চার দেয়ালে বন্দী থেকেও তিনি কখনো মাথানত করেননি। তার নীরব প্রতিরোধ, তার ধৈর্য এবং তার সাহসিকতা সাধারণ কর্মীদের মাঝে এক ঐশ্বরিক শক্তির সঞ্চার করেছিল।
 
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী শাসনের পতনের পর মুক্ত আকাশে ফিরেছেন দেশনেত্রী। তার মুক্তি কেবল একজন ব্যক্তির কারাগার থেকে বের হওয়া নয়; এটি ছিল বাংলাদেশের মূলধারার সার্বভৌমত্ব ও সততার জয়। দীর্ঘ রাজনৈতিক নির্যাতন সত্ত্বেও তিনি যেভাবে হাসিমুখে, প্রতিহিংসাহীন দৃষ্টিতে দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য কথা বলেছেন, তা তার রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত ঔদার্যের চরম বহিঃপ্রকাশ।
 
বিশ্ব রাজনীতিতে মার্গারেট থ্যাচারকে বলা হতো 'আয়রন লেডি' (Iron Lady)। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে যদি কোনো নারীকে সত্যিকারের 'আয়রন লেডি' বা লৌহ কঠিন ব্যক্তিত্ব বলা যায়, তবে তিনি বেগম খালেদা জিয়া।
 
তবে থ্যাচারের মতো খালেদা জিয়ার ব্যক্তিত্ব কেবল কঠোরতার ফ্রেমেই বন্দী নয়। তার এই লৌহ দৃঢ়তার পেছনে রয়েছে এক অপরিসীম মমতা, সহমর্মিতা এবং জনগণের প্রতি গভীর ভালোবাসা। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষের কাছে 'ম্যাডাম' বা 'দেশনেত্রী' শুধু একটি সম্মানীয় সম্বোধন নয়, তা এক নির্ভরতার নাম। কারণ জনগণ দেখেছে, তিনি ক্ষমতার লালসায় দেশকে বিক্রি করেননি, ব্যক্তিগত সুখের জন্য দেশ ছেড়ে যাননি। তিনি সংকটকালে দেশের ভেতরেই থেকেছেন, রাজপথে নেমেছেন, কারাবরণ করেছেন।
 
এই কারণেই বেগম খালেদা জিয়ার জন্মদিন ১৫ আগস্ট কেবল একটি সাধারণ পঞ্জিকার তারিখ নয়; এটি এক অবরুদ্ধ গণতন্ত্রের পুনর্জন্মের প্রতীকী দলিল। ৮২ বছরের এই জীবন পরিক্রমায় তিনি ব্যক্তিগত জীবনে যা হারিয়েছেন, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি অর্জিত হয়েছে এ দেশের মানুষের অন্তরে তার জন্য তৈরি হওয়া অক্ষয় ভালোবাসা।
 
পরিশেষে বলা যায়, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দক্ষিণ এশিয়া একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও জটিল অঞ্চল। এই অঞ্চলের রাজনৈতিক গোলকধাঁধায় বেগম খালেদা জিয়া নিজের যোগ্যতা, সাহসিকতা এবং সুদূরপ্রসারী দূরদর্শিতা দিয়ে নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে খোদাই করেছেন।
তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে একটি দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হয়, কীভাবে সংকটকালে ধৈর্য ধরতে হয়, এবং কীভাবে কোটি কোটি মানুষের ভালোবাসাকে শক্তিতে রূপান্তর করতে হয়। একজন মা হিসেবে তিনি সহ্য করেছেন সীমাহীন শোক, একজন নেত্রী হিসেবে তিনি ধারণ করেছেন একটি পতাকাকে, আর একজন বীর হিসেবে তিনি রচনা করেছেন বাংলাদেশের ৫০ বছরের পূর্ণাঙ্গ সংগ্রামের ইতিহাস। সুতরাং বেগম খালেদা জিয়া কেবল একটি রাজনৈতিক দলের নেতা নন; তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের গণতন্ত্র, সার্বভৌমত্ব ও আপোষহীনতার প্রতীক। ইতিহাস তার অবদানকে সর্বদা এক শ্রদ্ধেয়, অপরাজিত রাষ্ট্রনায়ক হিসেবেই স্মরণ রাখবে।
 
লেখক:সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক 
ই-মেইল: [email protected] 

সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SH.AL

SH.AL

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT