গাফফার খান চৌধুরী
সম্প্রতি হরহামেশাই মিলছে অজ্ঞাত লাশ। আগামী দিনগুলোতে অজ্ঞাত লাশের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে। এছাড়া খোদ রাজধানী ঢাকাতেই প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটছে। এমন পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন মানুষ। রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে সক্রিয় হয়ে ওঠছে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসীরা। আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসীদের সক্রিয় হওয়ার পেছনে রাজনৈতিক মদদ থাকতে পারে। আর তারই জেরে যে যার প্রতিপক্ষকে পুর্বশত্রুতার জেরে হত্যার মাধ্যমে সরিয়ে দিচ্ছে। গোয়েন্দা সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
পুলিশ সদর দফতরের পরিসংখ্যান মোতাবেক, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত শুধু ঢাকাতেই ১৩৬ জন খুন হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ফেব্রুয়ারি মাসেই ৩৮ জন খুন হন। সারাদেশে এ সংখ্যা তিন শতাধিক। প্রতি বছর গড়ে অজ্ঞাত হিসেবে অন্তত দেড় হাজার জনের লাশ উদ্ধার হয়। এরমধ্যে শতকরা ৭৫ ভাগই পুরুষ। বাকিরা নারী।
সুত্রটি বলছে, বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০১২ সালে অজ্ঞাত পুরুষের ১ হাজার ৮৭ জন এবং অজ্ঞাত হিসেবে ৫৭৬ জন নারীর লাশ উদ্ধার হয়। পরের বছর মাত্র ৬ মাসেই অজ্ঞাত হিসেবে ৫০৬ জন পুরুষ ও ৩৩৬ জন নারীর লাশ উদ্ধার হয়। এমন লাশ উদ্ধারের পরিসংখ্যান গত বছরের ৫ আগষ্ট পর্যন্ত বহাল ছিল। সে হিসেবে প্রতিদিন গড়ে অজ্ঞাত হিসেবে কমপক্ষে ৩ জনের লাশ উদ্ধার হয়।
মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মর্গ সুত্রে জানা গেছে, এখনো দুই শতাধিক লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে ও সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ মর্গে পড়ে আছে। অধিকাংশ বেওয়ারিশ লাশের দাফন করেছে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম। প্রায় প্রতিদিনই আসছে বেওয়ারিশ লাশ।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য মতে, রাজনৈতিক সহিংসতায় জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত সারা দেশে অন্তত ৪৭ জন নিহত হন। এদের মধ্যে বিএনপির অন্তঃকোন্দলে ২৭ জন, আওয়ামী লীগের অন্তকোন্দলে ৫ জন এবং আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সংঘর্ষে ৮ জন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সংঘর্ষে ২ জন, আওয়ামী লীগ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংঘর্ষে ১ জন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে বাংলাদেশÑভারত সীমান্তে ১৮টি হামলার ঘটনায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে ৫ জন বাংলাদেশী নিহত, ১০ জন আহত ও ১৫ জন গ্রেফতার হয়েছেন।
গত ২৫ মে ঢাকার বাড্ডার গুদারাঘাট এলাকায় রাতে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয় গুলশান থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক কামরুল আহসানকে। নিহত মাহমুদ বাড্ডার রবিন ডালিম মাহবুব গ্রুপের মাহবুবের মামা।
পুলিশের দাবি, গুলশানে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মার্কেটে দোকান বরাদ্দ, বাড্ডা এলাকায় কেবল টিভি সংযোগ, ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবসা ও চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে স্থানীয় দুটি সন্ত্রাসী গ্রুপের দ্বন্দ্বে আধিপত্য বিস্তারের জেরে তাকে হত্যা করা হয়। হত্যাকান্ডের সঙ্গে সন্ত্রাসী মেহেদী গ্রুপ জড়িত থাকতে পারে। আবার দুই গ্রুপের দ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়ে তৃতীয় কোন পক্ষও সুযোগ নিয়ে হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত করতে পারে। এর আগে গত ২২ মে বৃহস্পতিবারও তাঁকে গুলিতে হত্যার চেষ্টা হয়েচিল। বাড্ডা থানার ওসি সাইফুল ইসলাম জানান, সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে দুই আসামিকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
এর আগে গত ২১ মার্চ গুলশান পুলিশ প্লাজা কনকর্ডেও সামনে সুমন মিয়া ওরফে টেলি সুমন (৩৩) নামের এক ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবসায়ীকে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। মামলাটির ছায়া তদন্তকারী সংস্থা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) সূত্রে জানা গেছে, সুমন মিয়া ছিলেন মেহেদী গ্রুপের সদস্য। তাকে হত্যা করে রবিন, ডালিম ও মাহবুব গ্রুপের কিলাররা।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলামের দাবি, ব্যবসা, চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সুমন হত্যার প্রতিশোধ নিতেই বিএনপি নেতা কামরুল হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটতে পারে। তদন্ত শেষে পুরো রহস্য বেরিয়ে আসবে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, কামরুলকে হত্যার সময় পাশে বসে ছিলেন জাকির হোসেন রূপক, আবুল হোসেন ও কামরুল ইসলাম বাবলু নামের তিন ব্যক্তি। ঘটনার দিন পিছন থেকে দুই জন কামরুলকে গুলি চালিয়ে হত্যা করে। এ ঘটনায় কামরুলের স্ত্রী দিলরুবা আক্তার বাদি হয়ে মামলা করেছেন।
গোয়েন্দা সুত্রে জানা গেছে, দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে সক্রিয় হয়ে ওঠেছে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসীরা। অনেকেই বিদেশে বসেই পুরো নিয়ন্ত্রণ করছে। আবার অনেকেই দেশে আসার চেষ্টা করছেন। সম্প্রতি ঢাকার গুলশান ও বাড্ডা এলাকায় সক্রিয় ওঠেছে জিসান গ্রুপ, মেহেদী গ্রুপ ও রবিন-ডালিম-মাহবুব গ্রুপ। জিশান দুবাই বসেই পুরো গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ করছে। বর্তমানে গ্রুপগুলোর ৩৫ জন সর্ম্পকে তথ্য পেয়েছে পুলিশ। যারা মাঠ পর্যায়ে থেকে চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, জমি দখল নিয়ন্ত্রণ করছে। মেহেদী আমেরিকায় বসে গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ করছেন। আর রবিন-ডালিম-মাহবুব গ্রুপের তিন জনই মালয়েশিয়া থেকে পুরো নিয়ন্ত্রণ করছে।
পুলিশ ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য মোতাবেক, এসব সন্ত্রাসী গ্রুপের সঙ্গে বর্তমানে মাঠে সক্রিয় থাকা অনেক রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ আছে। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় তারা সন্ত্রাসীরা একের পর এক হত্যাকাণ্ডসহ নানা অপরাধ সংঘটিত করছে। হত্যার পর লাশ হাতিরঝিল, রূপগঞ্জ, তুরাগ নদ, মোহাম্মদপুরের বছিলা, আশুলিয়া, সাভার, বালু নদীসহ বিভিন্ন নির্জন জায়গায় ফেলে দিচ্ছে। এদের মধ্যে অনেকের লাশ পাওয়া যাচ্ছে। অনেকের লাশের হদিস মিলছে না।
পুলিশ সদর দফতরের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের সহকারি মহাপরিদর্শক ইনামুল হক সাগর বলছেন, দেশের সকল থানাকে মানুষ নিখোঁজ সংক্রান্ত মামলা বা ডায়েরী গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্তঃকোন্দল, ব্যক্তিগত আক্রোশ, পূর্বশত্রুতা বা অন্য কোন কারণে হত্যাকাণ্ডের মত ঘটনা ঘটছে কিনা সে বিষয়ে বাড়তি নজর রাখতে বলা হয়েছে। সেই সঙ্গে দ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়ে তৃতীয় কোন পক্ষ হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে কিনা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করতে কড়া নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। সারাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাতে চলমান অভিযান আরো জোরালো করতে নির্দেশনা দিয়েছেন পুলিশ মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম।
পুলিশ কর্মকর্তা ইনামুল হক সাগর বলছেন, আন্ডারওয়ার্ল্ডের দুই শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন ওরফে ফতেহ আলী ও মোল্লা মাসুদ রিমান্ডে আছে। তাদের থেকে প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক প্রয়োজনীয় পদক্ষেপসহ আসামী ও সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারে নানামুখী অভিযান অব্যাহত আছে। তালিকাভক্ত এক হাজারের বেশী সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সেনাবাহিনী সর্বাত্মক সহযোগীতা করছে। শীর্ষ সন্ত্রাসী বলতে কথা নেই, সন্ত্রাসীর খাতায় নাম থাকলেই তাকে গ্রেফতার করা হবে। সেক্ষেত্রে কে শীর্ষ আর কে ছোট বা মাঝারিমানের সন্ত্রাসী তা দেখা হবে না।