ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার পশ্চিম ইউনিয়নের চরলাপাংয়ে অবৈধ বালু উত্তোলন ঠেকাতে গিয়ে অন্তত ৫০ জন আহত হওয়ার ঘটনা কেবল একটি সংঘর্ষ নয়; এর পেছনে জড়িয়ে আছে প্রভাব, অর্থ আর নিয়ন্ত্রণের দীর্ঘ ছায়া।
গত রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৭টা থেকে ৯টার মধ্যে সংঘটিত এ ঘটনায় গুলিবিদ্ধসহ বহু মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, এটি আকস্মিক উত্তেজনার ফল নয়; বহুদিনের ক্ষোভের বিস্ফোরণ।

ইজারা, শর্ত ও বাস্তবতা:
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নবীনগরের পশ্চিমাঞ্চলে মেঘনা নদী সংলগ্ন নাসিরাবাদ বালু মহাল এক বছরের জন্য ইজারা পান শ্যামগ্রাম ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক নেতা সাখাওয়াত হোসেন পায়েল। ইজারার মেয়াদ আগামী ১৩ এপ্রিল (৩০ চৈত্র) পর্যন্ত।
অভিযোগ উঠেছে, শর্ত উপেক্ষা করে শতাধিক ড্রেজারের মাধ্যমে দিনরাত বালু তোলা হচ্ছে। গ্রামবাসীর দাবি, প্রতিবাদ করলেই অস্ত্রধারীরা এলাকায় ভীতি সৃষ্টি করে। নির্বিচারে বালু উত্তোলনের ফলে চরলাপাংসহ আশপাশের নদীতীরবর্তী এলাকা ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করা হলেও কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি বলে দাবি স্থানীয়দের।
সংঘর্ষের সকাল:
রোববার সকালে গ্রামবাসী সম্মিলিতভাবে অবৈধ উত্তোলন বন্ধের দাবিতে অবস্থান নিলে উত্তেজনা তৈরি হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ইজারাদারের পক্ষে থাকা সশস্ত্র ব্যক্তিরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায় এবং কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়ে। সরাসরি গুলিতে অন্তত ১০ জন আহত হন বলে স্থানীয়দের দাবি। ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় নারীসহ আরও অনেকে আহত হন।
আহতদের নবীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও আশপাশের ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। গুরুতর কয়েকজনকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। চিকিৎসা ব্যয় ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগে রয়েছে পরিবারগুলো। এক কৃষক বলেন, নদীভাঙনে জমি কমে গেছে, এখন প্রতিবাদ করায় হামলার শিকার হতে হয়েছে। তার প্রশ্ন, নদী বাঁচাতে গেলে যদি প্রাণের ঝুঁকি নিতে হয়, তবে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়?
রাজনৈতিক পালাবদল, ইজারার অঙ্ক:
স্থানীয় সূত্র জানায়, পূর্বে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তৎকালীন জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাহাদৎ হোসেন শোভন নাসিরাবাদ বালু মহাল বছরে ৯ কোটি টাকায় ইজারা নেন; পরের বছর তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭২ কোটিতে। ৫ আগস্ট সরকারের পতনের পর একই মহালের ইজারা পান বিএনপির সাবেক নেতা সাখাওয়াত হোসেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বাসিন্দার অভিযোগ, অবৈধ উত্তোলন সচল রাখতে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং বিভিন্ন দলের কিছু নেতাকর্মী নিয়মিত মোটা অঙ্কের অর্থ পান। অভিযুক্ত ইজারাদারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রশাসনের উপস্থিতি ও প্রশ্ন:
সংঘর্ষের পর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (নবীনগর সার্কেল) পিয়াস বসাক ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। পরদিন স্থানীয় সংসদ সদস্য এম এ মান্নান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে হামলায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন। সাথে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্দেশনার কয়েক ঘণ্টা পরই রাত আনুমানিক ১০টার দিকে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে অভিযুক্তরা এলাকায় ফিরে এসে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। চরলাপাং গ্রামের ১ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য জীবন মিয়া দাবি করেন, রাতে সন্ত্রাসীরা ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে এলাকায় মহড়া দেয়। এতে গ্রামবাসী দিশেহারা হয়ে পড়ে এবং তিনি থানায় বিষয়টি জানান।
থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম যায়যায়দিনকে বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে এবং অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু হয়েছে। তবে ঘটনার চার দিনেও কাউকে গ্রেপ্তার না করায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে।
প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া:
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক শারমিন আক্তার জাহান জানান, বর্তমান ইজারার মেয়াদ শেষ হতে এখনও দুই মাস বাকি। তবে ইজারার শর্ত লঙ্ঘনের প্রমাণ মিললে চলমান ইজারাও বাতিল হতে পারে। উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বলেন, অনুমতি ছাড়া উত্তোলন হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কিন্তু স্থানীয়দের প্রশ্ন, আগের অভিযোগগুলোর কী হলো?
পরিবেশ ও নিরাপত্তার ঝুঁকি:
পরিবেশ বিশ্লেষকদের মতে, নদী কেবল প্রাকৃতিক সম্পদ নয়; এটি জীবিকা ও নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত। নদীভাঙনপ্রবণ এলাকায় অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলন পরিবেশের ক্ষতির পাশাপাশি সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়ায়। চরলাপাংয়ের ঘটনা সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে।
অবৈধ উত্তোলন নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে আরও বড় সংঘাতের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে থেকে আইনগত ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমাধানই এখন জরুরি।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই:
ঘোষিত তদন্ত কি আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি সত্যিই বেরিয়ে আসবে কারা লাভবান, কারা নীরব, আর কারা প্রতিবাদ করে রক্ত ঝরিয়েছে। নবীনগরের মানুষ এখন জবাব চায়।