সমুদ্রের বিশাল নীল জলরাশি আছে,ফেনিল ঢেউয়ের গর্জনও আছে।নেই শুধু সেই চিরচেনা মানুষের মেলা।রমজানের শুরুতেই পর্যটন নগরী কক্সবাজার যেন এক অচেনা নিস্তব্ধতায় ডুবে গেছে।কোলাহলহীন বালুচরে খাঁ খাঁ রোদ,বাতাসে ঝাউবনের মৃদু শব্দ,বালুচরে নেই পায়ের ছাপ,নেই বিচ বাইকের শব্দ,নেই ফটোগ্রাফারের ডাক শুধু জনশূন্য কক্সবাজার সৈকতে যেন নীরবতার রাজত্ব।
অথচ যে সৈকত কয়েক সপ্তাহ আগেও হাজারো পর্যটকের পদচারণায় মুখর ছিল হোটেল, রেস্তোরাঁ, সর্ফিং ও বিক্রেতাদের ব্যস্ততা আজ সেই চেনা দৃশ্য নেই। সুগন্ধা, কলাতলী কিংবা লাবণী সব পয়েন্টেই একই চিত্র। সেখানে এখন গোনা কয়েকজন মানুষ।
সৈকতের সুগন্ধা, কলাতলী কিংবা লাবণী পয়েন্ট প্রতিটি মোড় এখন জনমানবহীন। পর্যটক না থাকায় হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ, গেস্টহাউস, ঝিনুক ও হস্তশিল্পের দোকান অধিকাংশই বন্ধ। শহরের পাঁচ শতাধিক হোটেল-মোটেল ও গেস্ট হাউসের ৯০ শতাংশ কক্ষই এখন ফাঁকা। শহরের অভিজাত হোটেলগুলোর চিত্রও একই। যদিও তারা ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বিশাল ছাড় ঘোষণা করেছে, তবুও পর্যটকের দেখা নেই।
সি গাল, ওশান প্যারাডাইস বা সায়মান বিচ রিসোর্টের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এখন পর্যটকের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। বুকিংয়ের খাতাটা যেন মরুভূমির মতো শুষ্ক। গত সাড়ে চার মাস জমজমাট ব্যবসা হওয়ার পর রমজানের শুরুতেই আকস্মিক এই মন্দা যেন বজ্রপাতের মতো এসেছে পর্যটন সংশ্লিষ্টদের জীবনে।
পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা মনে করেন, রোজার আগে যেখানে পাঁচ শতাধিক হোটেল-মোটেলে প্রতিদিন প্রায় ৩০ হাজার অতিথি ছিলেন, রমজান এর পর তা মাত্র কয়েক শতাধিকে নেমে এসেছে। পর্যটক ব্যবসার সাথে সংশ্লিষ্ট অন্তত তিন হাজার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান স্থবির হয়ে পড়েছে। কয়েক শ ভ্রাম্যমাণ আলোকচিত্রী, ৩৫টি ঘোড়া, অর্ধশতাধিক বিচ-বাইক এবং শামুক-ঝিনুকের দেড় শতাধিকের বেশী দোকানে কোনো ক্রেতা নেই। যার কারনে পর্যটন শিল্পে এখন ব্যবসায়ীরা মারাত্মক লোকসানের মুখে পড়েছে। হোটেল মালিক সুত্র জানায়, রমজান মাসজুড়ে কক্সবাজারের পর্যটন শিল্পে কয়েকশত কোটি টাকার ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন।
সরজমিনে কক্সবাজার শহরের সৈকতসহ বিভিন্ন পর্যটন স্পটঘুরে দেখা গেছে, কক্সবাজাওে পর্যটক না থাকায় সৈকত কেন্দ্রিক কয়েক হাজার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। ঝিনুক মার্কেট, আচারের দোকান আর রঙিন কাপড়ের দোকানগুলোতে এখন কেবলই ধুলোর আস্তর। প্রাণের স্পন্দন নেই, জনশূন্য সৈকতে কেবলই নীরবতার রাজত্ব। বালুচরে দৌড়াদৌড়ি করছে ঘোড়া,আর ঘোড়ার পিঠে বসে অলস সময় কাটাচ্ছেন ঘোড়াওয়ালারা।
বিচ বাইকগুলো সারি করে দাঁড়িয়ে চালকেরা অপেক্ষায়, যদি কোনো পর্যটক এসে ওঠেন। এদিক-ওদিক ঘুরছেন ফটোগ্রাফাররা, হাতে ক্যামেরা কিন্তু নেই ছবি তোলার মানুষ। তাদের ক্যামেরায় এখন পর্যটকদের হাসিমুখের বদলে ধরা পড়ছে শূন্য সৈকতের হাহাকার। তবে সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে কর্মচারীদের ওপর।
পর্যটকশূন্যতার অজুহাতে অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাই শুরু করেছে। আসন্ন ঈদের খুশি এখন তাদের কাছে অনিশ্চয়তার মেঘে ঢাকা। তবে এই সুনসান সৈকতে নিভৃত আলাপের মাঝেও এক চিলতে আশা জিইয়ে রেখেছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের বিশ্বাস এই নীরবতা চিরস্থায়ী নয়। ঈদের চাঁদ উঠলে আবারও ঢেউয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাঁটবে মানুষ, আলো ঝলমল করবে হোটেল-মোটেল, কোলাহলে ভরে উঠবে সৈকতের বালুচর,বদলে যাবে উচ্ছ্বাসে।
এদিকে কলাতলী ফ্ল্যাট ব্যবসায়ী তৌহিদুর ইসলাম হতাশ কণ্ঠে বলেন, রমজান শুরু হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত মাত্র দুইদিন কয়েকটি কক্ষও ভাড়া দিয়েছি। এখন পুরো হোটেল ফাঁকা।
লাইফ গার্ড সংস্থার কর্মী মোহাম্মদ আলী বলেন, রমজানের আগে প্রতিদিনই লাখো পর্যটক আসত। এখন একদম নেই বললেই চলে। তবুও নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছি। পর্যটকের চাপ না থাকায় সময়টা খুবই অলস যাচ্ছে।
ঘোড়াওয়ালা কাসেম হতাশা কণ্ঠে জানান, রমজান আসার পর সৈকতে পর্যটক নেই। ব্যবসা খারাপ। এখন ঘোড়ার খাবারের টাকাও উঠছে না।
বিচ বাইক চালক জাহেদ জানান,এখন পর্যটক খুবই কম। লাবণি, সুগন্ধা ও কলাতলি পয়েন্ট মিলিয়ে ১০০ জনের চেয়ে পর্যটক দেখা যায়।
সৈকতের ফটোগ্রাফার তমিজ উদ্দিন বলেন, রমজানের আগে লাবনী পয়েন্টে প্রতিদিন শতাধিকেরও বেশী ফটোগ্রাফার থাকত। এখন মাত্র ১০-২০জন। স্থানীয়রা ঘুরতে আসলে আয় কিছু হয় তবে অনেক সময় দিনে ১০০টাকা আয় হয়না, হোটেল-মোটেল ও গেস্ট হাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, এবার পর্যটকশূন্যতা বেশি দেখা যাচ্ছে। সব ধরনের হোটেলে বুকিং শূন্য। তবে ঈদের দিন থেকেই পর্যটক আসতে শুরু করবে। এক মাসের লোকসান ঈদের ছুটিতে পুষিয়ে নিতে হবে বলে জানান তিনি।
ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার রিজিয়নের প্রধান অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদ বলেন, সৈকতে যারা এই শান্ত পরিবেশ উপভোগ করতে আসছেন, তাদের নিরাপত্তার জন্য আমাদের নজরদারি জোরদার রয়েছে। নির্জন সৈকতেও পর্যটকরা যেন নির্ভয়ে ঘুরতে পারেন, আমরা তা নিশ্চিত করছি। পর্যটক কম হলেও নিরাপত্তায় কোনো শিথিলতা নেই।