ঢাকা | শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
দেশের অন্যতম মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি স্মারক

বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী স্তম্ভ উদ্বোধনের অপেক্ষায়

author
স্টাফ রিপোর্টার,ব্রাহ্মণবাড়িয়া

প্রকাশিত : ১১ এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ৩:২৪
ad003
উদ্বোধনের অপেক্ষায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার কামাউড়ায় নির্মিত মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি স্মারক হিসেবে চিহ্নিত বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী স্তম্ভ ও পার্ক। ইতিমধেই শেষ হয়েছে এর নির্মাণ কাজ। গত বছরের নভেম্বর মাসে মৈত্রী স্তম্ভটির নির্মাণ কাজ শেষ হয়। চলতি এপ্রিল মাসের মধ্যেই দৃষ্টিনন্দন মৈত্রী স্তম্ভটি উদ্বোধন করার পরিকল্পনার কথা জানান, স্থানীয় প্রশাসন। এটি উদ্বোধন হলে নতুন প্রজন্মেও শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষ মুক্তিযুদ্ধেও প্রকৃত ইতিহাস জানতে পারবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

মুক্তিযুদ্ধে আশুগঞ্জের ইতিহাসঃ-
 মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, ১৯৭১ সালে তুমুল যুদ্ধের পর ৬ ডিসেম্বও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া শত্রæমুক্ত হয়। পরে মিত্র বাহিনী ও  মুক্তিযোদ্ধারা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দিকে অগ্রসর হন। পরে কোন ধরনের  প্রতিরোধ ছাড়াই ৮ ডিসেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়া হানাদার মুক্ত হয়। পরে ভারতের ৪র্থ মাউন্টেন ডিভিশনের মিত্র বাহিনীর সদস্যরা ও মুক্তিবাহিনীর এস ফোর্সের প্রধান লে. কর্ণেল কে.এম. সফিউল্লাহর নেতৃত্বে যৌথভাবে আশুগঞ্জের দিকে এগিয়ে যায়। তবে ভুল তথ্যের কারণে ৯ ডিসেম্বর রাতে আশুগঞ্জ সোহাগপুর ও কামাউড়া এলাকায় মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর সদস্যদের উপর পাক বাহিনীর সদস্যরা তীব্র হামলা চালায়। এতে উভয় পক্ষের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হয়। এই  যুদ্ধে ভারতীয় বাহিনীর কর্মকর্তা সহ অন্তত ১৬শত সদস্য  প্রাণ হারান। হতাহত হন অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা। এই যুদ্ধে পাকিস্তানী বাহিনীরও ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়।

মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের এই আত্মত্যাগের স্মরণে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় আশুগঞ্জে 'মৈত্রী স্মারক’ স্মৃতি স্তম্ভ পার্কটি নির্মান করে।
স্থানীয়রা জনান, এই মৈত্রী স্মারকের মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে পারবে।

কি আছে মৈত্রী  স্মৃতি স্তম্ভেঃ-
ভেতরে প্রবেশ করার পূর্বে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে ১০ মিলিঃ প্লাসের দৃষ্টিনন্দন বেষ্টনি। পরে চোখে পড়বে  দেয়ালে আঁকা ১৯৭১ এর অগ্নিঝড়া দিনগুলো ভাস্কর্য। পরিবার-পরিজন নিয়ে উদ্বাস্তু হয়ে ভারতে চলে যাওয়ার দৃশ্য। মুক্তিযুদ্ধে রণাঙ্গনে সম্মুখ যুদ্ধ। পাক বাহিনীর আত্মসমর্পণের দৃশ্য।

এছাড়া সিকান্দার আবু জাফরের কবিতার লাইন, "তুমি আমার বাতাস থেকে মোছো তোমার ধুলো" দেয়ালে স্থান পেয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চিত্রকর্মে দেয়ালটি যেন একখন্ড মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

ভারতীয় বাহিনীর যারা শহীদ হয়েছিলেনঃ-
ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৭৯ জন অফিসার, ৭০জন জেসিও, ভারতীয় সেনাবাহিনীর অন্য র‌্যাঙ্কের ১৪৮২ জন সদস্য, ইস্টার্ণ থিয়েটার থার্টি বিএসএফ এর ২৯ জন সদস্য, ইস্টার্ন থার্টি এয়ার ফোর্সের ১১ জন কর্মকর্তা, ইস্টার্ন থার্টি নেভির ৬ জন সদস্য আশুগঞ্জ যুদ্ধে শহীদ হন অসংখ্য  মুক্তিকামি জনতা। তাদের প্রত্যেকের নামের তালিকা লোহার ভারী শিটে খোদায় করে মৈত্রীস্তম্ভের বেস্টনিতে লেখা রয়েছে।
স্মৃতিস্তম্ভে পার্ক সম্পর্কে যা বললেন যুদ্ধকালীন কমান্ডারঃ-
যুদ্ধকালীন কমান্ডার নুরুল ইসলাম বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে  ১৯৭১ সালে ৯ ডিসেম্বর ভোর রাতে  পাকিস্তানী সেনাদের এম্বোসে আমরা পড়ে গেলাম। এর মধ্যে একজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হলেন। এটার মূল যুদ্ধ হয়েছে সোহাগপুর, বাহাদুরপুর, দুর্গাপুর মিলিয়ে। সেখানে বহু হতাহত হয়েছে। ভারতীয় অনেক সেনা শহীদ হয়েছেন এই যুদ্ধে। পাকিস্তানী বাহিনীর কিছু সদস্যও যুদ্ধে মারা গেছে। তখন আমরা সেখান থেকে বগইর পর্যন্ত আসলাম। তখন ভৈরব থেকে আর্টিলারি মারলো বগইরে। তখন সেখান থেকে আমরা চলে আসলাম বেড়তলা। বেড়তলা থেকে পরের দিন আমরা এগিয়ে গেলাম আশুগঞ্জের দিকে। ওই যুদ্ধে ভারতের তিনটি ট্যাংক ধ্বংস  হয়েছে সোহাগপুর গ্রামে। তিনি আরো বলেন,এই যে মৈত্রী স্তম্ভটি নির্মাণ  করেছে, এতে আমাদের বর্তমান  প্রজন্মের ছেলে মেয়েরা মুক্তিযদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস জানতে পারবে। সেজন্য আমরা বাংলাদেশ সরকার ও ভারত সরকারকে ধন্যবাদ জানাই।

এ ব্যাপারে জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডের আহবায়ক আলহাজ্ব সৈয়দ এমরানুর রেজা বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে যে মৈত্রী স্তম্ভটি নির্মিত হয়েছে এটার একটা  ইতিহাস আছে। বাংলাদেশের সৃষ্টির ইতিহাস, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পনের ইতিহাস, বাংলাদেশের প্রথম ভাগ থেকে শেষ ভাগ পর্যন্ত সমস্ত ইতিহাস আছে মৈত্রী স্তম্ভে¢। পাকিস্তানী লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আব্দুল্লাহ খান নিয়াজী যে আত্মসমর্পণ করেন এই দৃশ্যগুলো চিত্রের মধ্য দিয়ে  ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এগুলো থেকে নতুন প্রজন্ম অনেক কিছু জানতে পারবে।
অগ্নিঝড়া দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, “আশুগঞ্জের যুদ্ধটা ভুলার মতো নয়। এখানে প্রচুর ভারতীয় সেনামারা গেছেন। আমরা ভারতের সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা করি। ভারত আমাদের যে উপকার করেছে, ভারতের জনগণের অবদান ভুলার মতো নয়। তবে আমরা একটা স্বাধীন দেশ। আমরা স্বাধীনভাবে থাকতে চাই। ভারত আমাদেও বন্ধু প্রতিম রাষ্ট্র। ভারতকে আমরা বন্ধু রাষ্ট্রের ভূমিকায় দেখতে চাই।
এ ব্যাপারে আশুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাফে মোহাম্মদ ছড়া বলেন, মৈত্রী স্তম্ভটি আমরা গত নভেম্বর মাসে ঠিকাদারের কাছ থেকে গণপূর্ত বিভাগের মাধ্যমে বুঝে  নিয়েছি। বর্তমানে এটি উপজেলা প্রশাসনের তত্ত¡াবধানে আছে। আমরা মৈত্রী স্তম্ভ ও পার্কটি বেসরকারি খাতে ইজারা দেয়ার জন্য যাবতীয় কার্যক্রম গ্রহণ করেছি। মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় আমাদের নির্দেশনা দিয়েছেন ইজারা সংক্রান্ত যে ধরনের কাগজপত্র প্রয়োজন সে ধরনের কাগজপত্র তৈরি করতে। আমরা ইজারা প্রদানের যাবতীয় কার্যক্রম  গ্রহণ করেছি। দ্রæতই মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় থেকে এই মৈত্রী স্তম্ভটি ইজারা দেয়া হবে। আমরা চেষ্টা করছি, এপ্রিল মাসের মধ্যে এটি ইজারা দেয়ার জন্য।  মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় যেভাবে নির্দেশনা প্রদান করবে, সেই নির্দেশনা অনুযায়ী এটি উদ্বোধন করা হবে এবং জনগণের জন্য উম্মুক্ত করে দেয়া হবে।
উল্লেখ্য, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে  আশুগঞ্জ উপজেলার কামাউড়ায় প্রায় সাড়ে তিন একর জমির উপর মৈত্রী স্তম্ভটি নির্মাণ কাজ বাস্তবায়ন করেন মেসার্স নির্মান বিল্ডার্স নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ৭২ কোটি টাকা ব্যয়ে এটি নির্মান করা হয়েছে।
সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SH.AL

SH.AL

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT