ঢাকা | বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সোনাদিয়ায় অবৈধ কটেজ উচ্ছেদে মহেশখালী উপজেলা প্রশাসনসহ যৌথ অভিযান

author
মহেশখালী (কক্সবাজার) প্রতিনিধি

প্রকাশিত : ৯ মে, ২০২৬ বিকেল ৫:০৩
ad003
কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলার মহেশখালীর পরিবেশ সংকটাপন্ন (ইসিএ) এলাকা সোনাদিয়া দ্বীপের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় অবশেষে কঠোর অবস্থানে গেছে প্রশাসন। ম্যানগ্রোভ প্যারাবন ও প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা ঝাউবন উজাড় করে গড়ে তোলা অবৈধ কটেজ ও পর্যটন স্থাপনা উচ্ছেদে বড় ধরনের অভিযান শুরু হয়েছে। 

৯ এপ্রিল (শনিবার) সকাল থেকে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবু জাফর মজুমদারের নেতৃত্বে যৌথ বাহিনীর সমন্বয়ে এই সাঁড়াশি অভিযান শুরু হয় এবং বিকেল পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।

মাঠ প্রশাসন সূত্র জানা যায়, সোনাদিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে কোনো ধরনের লিজ বা বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই বন বিভাগের খাসজমি দখল করে অবৈধভাবে কটেজ ব্যবসা চলছিল। শনিবার সকাল থেকে শুরু হওয়া এই অভিযানে উপজেলা প্রশাসনের সাথে বাংলাদেশ নৌবাহিনী , মহেশখালী থানা পুলিশ, বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, বন বিভাগ এবং পরিবেশ অধিদপ্তর, কক্সবাজারের প্রতিনিধিবৃন্দ অংশগ্রহণ ও সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করেন। প্রথম দিনের অভিযানে বন কেটে তৈরি করা একাধিক কটেজ, বাঁশ-কাঠের শেড এবং টিনশেড স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে বিচ্ছিন্ন করা হয় পর্যটকদের জন্য তৈরি অস্থায়ী কটেজগুলোর বৈদ্যুতিক সংযোগ।

পরিবেশ অধিদপ্তরের আপত্তি ও আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকার পরও দখলদাররা স্থাপনা না সরানোয় এই যৌথ অভিযান চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।

অভিযানের বিষয়ে মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমরান মাহমুদ ডালিম বলেন, “সোনাদিয়া দ্বীপ দেশের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা। এখানে যেকোনো ধরনের স্থায়ী বা অস্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ সম্পূর্ণ বেআইনি। আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও একটি চক্র এখানে অবৈধভাবে স্থাপনা নির্মাণ করে বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালাচ্ছিল। দ্বীপের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এসব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের কোনো বিকল্প নেই। সোনাদিয়াকে তার আপন রূপে ফেরাতে প্রশাসনের এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।”

মাঠ পর্যায়ে অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবু জাফর মজুমদার বলেন, “দ্বীপের পরিবেশ ও সরকারি খাসজমি রক্ষায় আমরা জিরো টলারেন্স নীতিতে এগোচ্ছি। কোনো অবৈধ কটেজ, ঘের বা স্থাপনা এখানে রাখা হবে না। প্রথম ধাপে আমরা কটেজগুলো উচ্ছেদ করছি। দূর থেকে জমি কিনে স্থানীয় দালালের মাধ্যমে কাঠামো তুলে যারা এখানে অবৈধ ব্যবসা করছেন, তাদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

উল্লেখ্য, সোনাদিয়া দ্বীপ সামুদ্রিক কাছিমের ডিম পাড়ার অন্যতম প্রধান স্থান। এছাড়া এখানে রয়েছে সমৃদ্ধ উপকূলীয় বনভূমি, ম্যানগ্রোভ বন এবং শীতের মৌসুমে আসা অসংখ্য পরিযায়ী ও বিলুপ্তপ্রায় পাখির নিরাপদ আশ্রয়স্থল। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে অপরিকল্পিত অবৈধ কটেজ, চিংড়ি ও কাঁকড়া ঘের এবং পর্যটকদের অবাধ বিচরণের কারণে এই জীববৈচিত্র্য চরম হুমকির মুখে পড়ে। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো দীর্ঘ দিন ধরে দ্বীপ থেকে সব ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের দাবি জানিয়ে আসছিল।

এদিকে প্রশাসনের এই সাঁড়াশি অভিযানের খবরে সোনাদিয়া দ্বীপের অবৈধ কটেজ মালিক ও দখলদারদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। শনিবার সকাল থেকেই অনেককে তড়িঘড়ি করে আসবাবপত্র ও ভাঙার মতো মালামাল সরিয়ে নিতে দেখা গেছে। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কটেজ মালিকদের একাংশ দাবি করেছেন, যথাযথ বিকল্প ব্যবস্থা বা পুনর্বাসনের সুযোগ না দিয়েই একতরফাভাবে তাদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে।

অন্যদিকে প্রশাসনের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন স্থানীয় পরিবেশকর্মীরা। তারা বলছেন, শুধু একদিনের উচ্ছেদ অভিযান দিয়ে সোনাদিয়ার প্রকৃতি রক্ষা করা সম্ভব নয়। উচ্ছেদ করা জায়গাগুলো যেন পুনরায় দখল না হয়, সেজন্য দীর্ঘমেয়াদি নজরদারি ও নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন। সোনাদিয়াকে প্রকৃতি-নির্ভর টেকসই পর্যটন বা সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে গড়ে তোলার দীর্ঘদিনের দাবি বাস্তবায়নের এখনই উপযুক্ত সময় বলে মনে করেন সচেতন মহল।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে, প্রথম ধাপের এই অভিযান শেষে তালিকাভুক্ত সব অবৈধ কটেজ ও ঘের পর্যায়ক্রমে উচ্ছেদ করা হবে। পরিবেশ সংরক্ষণ, সরকারি খাস জমি রক্ষা এবং জনস্বার্থ নিশ্চিতকল্পে এ ধরনের অভিযান ক্রমান্বয়ে অব্যাহত থাকবে।
সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SH.AL

SH.AL

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT