ঢাকা | বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সাগরের উত্তাল ঢেউয়ে নতুন রোমাঞ্চ এবার কক্সবাজারে বডি সার্ফিংয়ে নতুন স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ

author
কক্সবাজার প্রতিনিধি

প্রকাশিত : ১৩ মে, ২০২৬ সকাল ১১:৫৫
ad003
কোনো বোর্ড বা নৌকা ছাড়া, শুধু শরীরের ভারসাম্য আর কৌশল ব্যবহার করে সমুদ্রের ভাঙা ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করে তীরের দিকে ছুটে চলার নাম ‘বডি সার্ফিং’। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারে এবার আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু হলো ৩২৬ বছরের পুরোনো এই ঐতিহ্যবাহী জলক্রীড়ার। সমুদ্রে উত্তাল ঢেউ এখন আর কেবল গর্জনের প্রতীক নয়,স্থানীয় তরুণ-তরুণীদের অদম্য সাহস ও রেকর্ড গড়ার মঞ্চ। কোনো বিশেষ সার্ফিং বোর্ড ছাড়াই কেবল শারীরিক কৌশল আর ঢেউয়ের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ‘বডি সার্ফিংয়ে’ মেতে উঠেছে স্থানীয় কিশোর-কিশোরীরা।

মুলত উত্তাল ঢেউয়ের ওপর ভেসে থাকার এই কৌশলটি এখন সমুদ্রতীরে আসা পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। নীল জলরাশির ফেনিল ঢেউয়ের বুকে বুক ভাসিয়ে এগিয়ে যাওয়ার রোমাঞ্চকর এই অভিজ্ঞতা পর্যটন নগরীতে যোগ করেছে এক অনন্য মাত্রা। এটি শুধু বিনোদন নয় সমুদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে দেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নেমেছেন একদল তরুণ সার্ফার। গত রোববার সকালে লাবণী পয়েন্টে ৩০ জন দক্ষ বডি সার্ফার নিয়ে এই কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।  

বিশাল সমুদ্রে ঢেউয়ের বুক চিরে এগিয়ে চলার এই রোমাঞ্চ এখন কক্সবাজারের নতুন পরিচয়। এবার বডি সাফিংয়ের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে, বিশেষ করে লাবণী পয়েন্ট ও কলাতলী বীচের আশেপাশের এলাকায়। স্থানীয়দের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি পর্যটকরাও এখন কক্সবাজারে এসে বডি সার্ফিং শিখতে ও করতে আসছেন। সকাল ৯টা থেকে ১০টা পর্যন্ত বিনাম‚ল্যে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। স্থানীয় তরুণ-তরুণীদের পাশাপাশি পর্যটকদেরও এতে অংশ নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ বডি সার্ফিংয়ের প্রতিষ্ঠাতা জয়নাল আবেদীন বলেন, প্রায় ৩২৬ বছর আগে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে এর যাত্রা শুরু হয়। গভীর সমুদ্রের ঢেউয়ের সঙ্গে খেলে ডলফিন যেভাবে তীরে ফিরে আসতো, সেই দৃশ্য থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে মানুষ এই বডি সাফিং শুরু করে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রচলিত বিভিন্ন ধরনের সার্ফিংয়ের ম‚ল ভিত্তিতেই রয়েছে বডি সার্ফিংয়ের উপাদান। আন্তর্জাতিকভাবে এটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। 
তিনি আরো বলেন, অলিম্পিকেও সার্ফিং অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তাই বাংলাদেশ থেকেও দক্ষ বডি সার্ফার তৈরি করে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার স্বপ্ন দেখছি। যথাযথ প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতা পেলে একদিন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা উড়বে বডি সার্ফিংয়ের মাধ্যমে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্বের দীর্ঘতম এই সমুদ্রসৈকত একদিন আন্তর্জাতিক বডি সার্ফিংয়ের অন্যতম গুরুত্বপ‚র্ণ গন্তব্য হয়ে উঠবে। সমুদ্রকে ভয় না পেয়ে সঠিকভাবে জানার মধ্য দিয়েই নিরাপদ সমুদ্র সংস্কৃতি গড়ে উঠবে। বডি সাফিং পর্যটন শিল্প এবং আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে বাংলাদেশের সম্ভাবনার নতুন দরজাও খুলে দিতে পারে। বিশেষ করে বডি সার্ফিংয়ের মৌলিক কৌশল জানা থাকলে সমুদ্রের অনেক দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সার্ফিং ও বডি সার্ফিং ঘিরে গড়ে উঠেছে বিশাল পর্যটন শিল্প। কক্সবাজারেও সেই সম্ভাবনা দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
সকালে সৈকতের কলাতলী বীচে গিয়ে দেখা গেছে, ১০-১৫ জন সৈকতের বালুচরে বডি সার্ফিং প্রশিক্ষণ গ্রহন করছেন কোচ সাইফুল্লাহ কাছ থেকে। তাদেরকে সাঁতার, সার্ফবোর্ড পরিচালনা, ফিজিক্যাল ফিটনেস, লাইফসেভিং এর বিভিন্ন কৌশল তালিম দিতে দেখা গেছে। যেখানে সার্ফবোর্ড বা অন্য কোনো সরঞ্জামের সাহায্য না নিয়ে, শুধুমাত্র নিজের শরীরকে ব্যবহার করে সমুদ্রের ঢেউয়ের ওপর ভেসে থাকা হয় বা সামনে এগিয়ে যাওয়া হয়। সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হচ্ছে নারীদের অংশগ্রহণ। কক্সবাজারের কয়েকজন তরুণী ইতোমধ্যে সাহসিকতার সঙ্গে বডি সার্ফিংয়ে অংশ নিচ্ছেন। সাধারণ সার্ফিংয়ে বোর্ড, লেশ, ওয়েটস্যুটসহ নানা ধরনের দামী সরঞ্জাম প্রয়োজন হয়, যা অনেকের পক্ষে কেনা সম্ভব হয় না। কিন্তু বডি সার্ফিংয়ে এই বাধা নেই। এখানে দরকার শুধু সাহস, কৌশল এবং শারীরিক সক্ষমতা। এই সাশ্রয়ী বৈশিষ্ট্যই পর্যটক ও স্থানীয় উভয় শ্রেণির কাছে এটিকে দ্রæত জনপ্রিয় করে তুলছে। 
কক্সবাজারে বডি সার্ফিংয়ের জন্য সবচেয়ে আদর্শ সময় হলো জুন থেকে আগস্ট মাস, যখন দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বঙ্গোপসাগরে শক্তিশালী ঢেউ তৈরি করে। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসেও মাঝারি মাত্রার ঢেউ থাকায় এই সময়টিও উপযোগী বলে বিবেচনা করা হয়। বর্ষা মৌসুমে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ এই খেলাটিকে আরও রোমাঞ্চকর করে তোলে। কক্সবাজারের সৈকত লাবণী বিচ, কলাতলী বিচ এবং সুগন্ধা বিচ বডি সার্ফিংয়ের জন্য আদর্শ স্থান হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে কলাতলী বিচে তুলনাম‚লকভাবে বেশি ঢেউ পাওয়া যায়, যা অভিজ্ঞ সার্ফারদের জন্য বেশি উপযুক্ত। লাবণী ও সুগন্ধা বিচ নতুনদের জন্য অনুক‚ল, কারণ সেখানে ঢেউয়ের তীব্রতা কিছুটা কম থাকে।
এব্যাপারে স্থানীয় পর্যটন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারে নতুন মাত্রা যোগ করেছে “বডি সার্ফিং। কম খরচে সহজে অংশ নেওয়া যায় বলেই বডি সার্ফিং দ্রæত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ও ছবি ছড়িয়ে পড়ায় নতুন প্রজন্মের মধ্যে আগ্রহ বেড়েছে কয়েকগুণ। প্রতিদিন বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে ভিড় জমায় দর্শনার্থীরা। পর্যটন ব্যবসায়ীরাও মনে করছেন, বডি সার্ফিং কক্সবাজারের পর্যটনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলছে। প্রচলিত ভ্রমণ অভিজ্ঞতার বাইরে গিয়ে অ্যাডভেঞ্চারভিত্তিক পর্যটন গড়ে উঠলে বিদেশি পর্যটক আকর্ষণেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বাংলাদেশ বডি সার্ফিংয়ের আরেক প্রতিষ্ঠাতা মো. ওসমান গণি বলেন, কক্সবাজারে ভ্রমনে এসে অনেক পর্যটক জোয়ারভাটা সম্বন্ধে না জেনে উত্তাল সমুর্দের কোমরসমান পানিতেও নেমে ¯œান করতে গিয়ে ঢেউয়ের তোড়ে বিপদে পড়েন। এই বডি সার্ফিং শেখার মাধ্যমে ঢেউকে কাজে লাগিয়ে দ্রæত তীরে ফিরে আসার কৌশল জানা যায়। এটি লাইফ সেভিংয়ের ক্ষেত্রেও কার্যকর। তার মতে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জনপ্রিয় হলেও বাংলাদেশে এতদিন এ খেলার কোনো আনুষ্ঠানিক প্রচলন ছিল না। কক্সবাজার থেকেই এর যাত্রা শুরু হওয়ায় নতুন প্রজন্মের মধ্যে আগ্রহ বাড়ছে।
স্থানীয় বডি সার্ফার সেলিম জানান, বিদেশি সরঞ্জাম দেখে নিজ উদ্যোগে স্বল্প খরচে হ্যান্ড প্যøান তৈরি করেছেন তিনি। ঢেউয়ের সঠিক গতি ও দিক বুঝে শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে খুব দ্রæত তীরে ফেরা সম্ভব। এটি যেমন আনন্দের, তেমনি সমুদ্র নিরাপত্তার জন্যও কার্যকর। 
তিনি আরো বলেন,২০১২ সাল থেকে সার্ফিং এবং ২০১৪ সাল থেকে লাইফগার্ডিংয়ের সঙ্গে যুক্ত আছি। অনেক আগে থেকেই আমরা বডি সার্ফিং অনুশীলন করতাম, কিন্তু কোনো সংগঠিত উদ্যোগ ছিল না। এখন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়ায় এটি পর্যটন ও সমুদ্র নিরাপত্তায় বড় ভ‚মিকা রাখতে পারে। বডি সার্ফিংয়ের কৌশল জানা থাকলে মাত্র ৩০ থেকে ৪০ সেকেন্ডের মধ্যেই ঢেউ ব্যবহার করে তীরে ফেরা সম্ভব। কক্সবাজারে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা কমিয়ে আনার লক্ষ্যেই বডি সার্ফিংকে জনপ্রিয় করার এই উদ্যোগ।
বাংলাদেশ বডি সার্ফিংয়ের উপদেষ্টা ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে বডি সার্ফিংয়ের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। বডি সার্ফিং সার্ফিংয়ের প্রতিদ্বন্দ্বী নয় বরং এটি নতুন একটি অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টস। স্থানীয় তরুণ-তরুণী ও পর্যটকেরা সহজেই এটি শিখতে পারবেন। এটি অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসে এটি নতুন মাত্রা যোগ করবে।
তিনি আরো জানান, বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার শুধু সার্ফিং নয়, বিভিন্ন জলক্রীড়ার আন্তর্জাতিক কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। 
স্পন্সর পেলে শিগগিরই বডি সার্ফিং প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হবে। সবাই আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করলে একদিন বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের পতাকা উড়বেই বডি সার্ফিংয়ের মাধ্যমেই। 

।

সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SH.AL

SH.AL

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT