ঢাকা | মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ২১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নিজের জন্য বাঁচুন

author
মো: রায়হান উদ্দিন

প্রকাশিত : ১৬ মে, ২০২৬ সকাল ১১:০২
প্রতীকি ছবি। প্রতীকি ছবি।
ad003
মানুষের মন খুব অদ্ভুত ও বিচিত্র। এখানে রং, মেঘ, রোদ, বজ্র, সুনামি ও ভুমিকম্প একসাথে খেলা করে।  এখানে আছে আকাঙ্ক্ষা, ভয়,  চাপ, স্বপ্ন এবং টানাপোড়েন। এখানে আছে, আনন্দ, গ্লানি। আমরা প্রায়ই এসব কিছু উপেক্ষা করি। আমরা অনেক সময় অন্যকে খুশি রাখতে গিয়ে নিজের ভেতরের কণ্ঠকে উপেক্ষা করি। ফলে জন্ম নেয় হতাশা, আত্মঅবমূল্যায়ন এবং মানসিক ক্লান্তি। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় “people-pleasing tendency”। দীর্ঘমেয়াদে এটি  আপনাকে, আপনার আত্মসম্মানকে খেয়ে ফেলতে পারে। সুস্থ ও প্রশান্তিময় জীবনের জন্য তাই নিজের সীমা জানা জরুরী। সীমার বাইরে গেলে আপনার ক্ষয় অনিবার্য। নিজের  চাহিদাকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং আবেগক নিয়ন্ত্রণে রাখা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রেক্ষাপটে কিছু মৌলিক নীতির চর্চা আমাদের ব্যক্তিত্বকে দৃঢ় ও সুসংহত করতে পারে।

সবার আগে ‘না’ বলতে শিখুন

অনেকেই মনে করেন ‘না’ বলা মানে সম্পর্ক নষ্ট করা।‘না’ বলার কারণে যে সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যেতে পারে, ঝুঁকিতে পরতে পারে, সে সম্পর্ককে নষ্ট হতে দিন।  বাস্তবে এ সম্পর্ক আপনার  ভেতরে অস্থিরতা,  অসমতা ও অশান্তি তৈরি করে আপনাকে তিলে তিলে শেষ করে দিতে পারে। তাই ‘না’ বলার চর্চা শুরু করুন।  আপনি যখন সব কিছুর জন্য ‘হ্যাঁ’ বলেন, তখন অন্যরা আপনার সময়, শক্তি ও আবেগকে স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার করতে শুরু করবে। ‘না’ বলা এক ধরনের সুরক্ষা যা আপনার ব্যক্তিগত পরিসরকে সুরক্ষিত রাখবে। শুরুতে এটি অস্বস্তিকর লাগতে পারে, কিন্তু  ধীরে ধীরে এটি আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং ব্যক্তিকে মানসিকভাবে প্রস্তুত ও শক্তিশালী করবে।

নিজের সম্মান সবার আগে

আত্মসম্মান-এর উপর ভিত্তি করে যেকোন সিদ্ধান্ত নিন। এমন কোন সিদ্ধান্ত নিবেন না যা আপনার আত্মসম্মান নষ্ট করতে পারে। আত্মসম্মান একটি মানসিক ভিত্তি, যার ওপর আমাদের সব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা দরকার। যখন আপনি নিজের সম্মানকে অগ্রাধিকার দেন, তখন কে আপনাকে সম্মান করলো আর কে অবমূল্যায়ন করলো তাতে আপনার কিছু যায় আসে না। সম্পর্ক, কাজ বা সামাজিক অবস্থান-সবকিছুর ঊর্ধ্বে নিজের মর্যাদা। কারণ, আপনি যদি নিজেকে সম্মান না দেন, তাহলে অন্যদের কাছ থেকেও তা আশা করা সমীচীন নয়। আত্মসম্মান মানে অহংকার নয়; এটি নিজের গুরুত্ব ও সক্ষমতা সম্পর্কে সচেতন থাকা।

নিজের পছন্দকে গুরুত্ব দিন

আমরা প্রায়ই পরিবারের ও সমাজের প্রত্যাশা পূরণ করতে গিয়ে নিজের ইচ্ছাকে জলাঞ্জলি দিতে হয়। এটি আপনার অধঃপতনের ও অবক্ষয়ের সূচনা করতে পারে । দীর্ঘমেয়াদে এটি আপনাকে মানসিকভাবে  শেষ করে দিতে পারে। এতএব,  নিজের পছন্দ-অপছন্দকে গুরুত্ব দিতে শুরু করুন। নিজেকে  স্বীকৃতি দিন। আপনি কী করতে চান, কী আপনাকে আনন্দ দেয়-এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে বের করুন । নিজেকে বাঁচিয়ে রাখুন। অন্যের চোখে ‘ভালো’ হওয়ার চেয়ে নিজের কাছে সৎ থাকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এতে জীবনের প্রতি এক ধরনের আন্তরিকতা তৈরি হবে যা আপনাকে ভাল রাখবে। আপনি ভাল থাকলেই কেবল আপনি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য কিছু  করতে পারবেন।  

আবেগ নিয়ন্ত্রণ করুন

আবেগ মানুষের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য।  কিন্তু তা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে আপনাকে ধ্বংসের শেষ প্রান্তে পৌঁছে  দিবে। আপনাকে আবর্জনার মত ছুড়ে ফেলে দিবে। তাই, যেকোন সিদ্ধেন্তের ক্ষেত্রে আবেগ নয়, তাড়াহুড়ো নয়। রাগ, কষ্ট, অতিরিক্ত আনন্দ বা যেকোনো তীব্র আবেগের মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত থাকুন। এটি খুব ঝুকিপূর্ণ। আবেগ নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা অর্জন করুন,  মনোবিজ্ঞানে যাকে বলা হয়, “emotional regulation”। এ  দক্ষতা আপনাকে চাপের মধ্যেও স্থির রাখতে সহযোগিতা করবে। সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে সহযোগিতা করবে। তাই কোনো বিষয় মূল্যায়নের আগে নিজেকে সময় দিন, আবেগ নিয়ন্ত্রণ করুন,  শান্ত থাকতে শিখুন, নীরবতা উপভোগ করুন। যেকোন বিষয় আবেগ নয়, বরং যুক্তি  দিয়ে বিচার করুন।

নিজের মূল্য অনুধাবন করুন

প্রত্যেক মানুষের ভেতরেই কিছু না কিছু অনন্য গুণ থাকে। আপনার আমার ভিতরেও  আছে। কিন্তু আমরা হয়তো এখনো তা উদ্ঘাটন করিনি। তাই নিজেকে আবিষ্কার করুন। নিজের সম্ভাবনা ও মূল্য সম্পর্কে জানুন, নিজের উপর শতভাগ আস্থাশীল হোন।  অন্যের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করার দরকার নাই। আপনি অদ্বিতীয়। নিজের দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও সম্ভাবনাকে স্বীকৃতি দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিজের উপর ভরসা রাখুন। সবার আগে নিজের মূল্য সম্পর্কে জানুন  এবং  তা বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিন। আত্মমূল্যবোধই আত্মবিশ্বাসের মূল চালিকা শক্তি।

অন্যদের বিষয়ে সংযত থাকুন

আমরা প্রায়ই অন্যের জীবন, আচরণ, সিদ্ধান্ত ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরিক্ত ভাবি। এতে নিজের মানসিক শক্তি ক্ষয় হয়। প্রত্যেকের জীবন তার নিজস্ব।  আপনি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না এবং তাঁর কোন দরকারও নাই। বরং নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে তা অন্যের শান্তি নষ্ট করতে পারে। অন্যের আত্মসম্মানের ব্যাপারে সচেতন হোন এবং তাতে কোনরূপ হস্তক্ষেপ করবেন না। সে যেই হোক। কারণ আপনিন চিরদিন তাঁর পাশে থাকবেন না। এটাকে জীবনের একটি নীতি হিসেবে গ্রহণ করেন। তাই অন্যদের বিষয়ে অযথা জড়িত না হয়ে নিজের উন্নয়নে মনোযোগ দিন।নিজেকে সংযত করুন। আগামীর জন্য প্রস্তুত হোন। সংযম মানে উদাসীনতা নয়; বরং মানসিক শান্তি রক্ষার জন্য  সংযম ও দূরত্ব বজায় রাখুন। 

প্রতিদিন কিছু সময় নিজের সঙ্গে কাটান, একাকীত্ব উপভোগ করুন। নিজের অনুভূতি ও চিন্তাকে বোঝার চেষ্টা করুন। ছোট ছোট সীমারেখা নির্ধারণ করুন এবং তা মেনে চলার অভ্যাস গড়ে তুলুন। নিজের সাফল্যগুলোকে স্বীকৃতি দিন-ছোট হলেও তা আপনার আত্মবিশ্বাসকে শক্তিশালী করবে।জীবনকে সহজ ও সুস্থ রাখতে সবচেয়ে বড় কাজটি হলো নিজের পাশে দাঁড়ানো। যখন আপনি নিজেকে বুঝতে শিখবেন, তখন বাইরের জটিলতাগুলোও অনেকটাই সহজ হয়ে যাবে।

লেখক :

মো: রায়হান উদ্দিন
সহকারী অধ্যাপক
অর্থনীতি বিভাগ
বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজ, সিলেট।
ই-মেইল: [email protected]; মোবাইল নাম্বার: ০১৬১৬৬৭৫০৪৯

সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SHA.AZH

SHA.AZH

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT