বিশ্ব রাষ্ট্র-ব্যবস্থা এক অদ্ভুত রাজনৈতিক দর্শনগত সংকটের মধ্যে আটকে যাচ্ছে। একদিকে আমরা মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের জয়গান গাইছি, অন্যদিকে দেশে দেশে বৈষম্য, জনরোষ, অস্থিরতা এবং দুর্নীতির মহোৎসব দেখছি। গণতন্ত্রের নাম ব্যবহার করেও কিছু রাষ্ট্র তার নিজ দেশের ভিন্ন মত, ভিন্ন বিশ্বাস কিংবা ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর নিরেট অন্যায় করে চলেছে। কোন কোন ক্ষেত্রে মানবাধিকারের প্রবক্তা নিজেরাই লুণ্ঠন করে চলেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার। তারা মানবতার মুক্তির কথা বলছে, কিন্তু তারাই আধিপত্য বিস্তারের নেশায় বিভিন্ন কূটকৌশলে যুদ্ধ আর অস্ত্রবাজি করছে। তাহলে প্রশ্ন জাগে, গণতন্ত্র আসলে কেন সৃষ্টি হয়েছিল, কোন প্রয়োজনবোধ থেকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার যাত্রা শুরু হয়েছিল? আর সেই লক্ষ্য কি আধুনিক যুগের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি রক্ষা করতে পারছে?
পাশ্চাত্য গণতন্ত্রের প্রবাদ-প্রতিম সংজ্ঞা হলো 'Of the people, by the people and for the people.' অর্থাৎ, জনগণই তাদের মধ্য থেকে এমন এক জনকে নেতা নির্বাচিত করবেন, যিনি সবার কল্যাণ নিশ্চিত করবেন। মধ্যযুগের রাজতন্ত্র ও গির্জা শাসিত বর্বরতা থেকে মুক্তি পেতে বহু সংগ্রাম, বহু রক্ত, বহু যুগের আন্দোলনের ফসল এই গণতন্ত্র। রাজা আর মহারাজার নৃশংসতা থেকে মুক্তি দিতে ইওরোপ ও আমেরিকার মানুষের কাছে এই কথাগুলো সেই সময় অসাধারণ এক মুক্তি-দর্শন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে দাড়িয়ে এই ব্যবস্থার ভেতরই এমন কিছু কাঠামোগত ও মনস্তাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতা দৃশ্যমান হচ্ছে, যেটা নিয়ে মূলধারার রাজনীতিতে আলোচনা প্রায় নিষিদ্ধ।
প্রচলিত গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো, এখানে নেতা হওয়ার জন্য ব্যক্তিকে নিজে প্রার্থী হতে হয়, প্রচুর অর্থ খরচ করতে হয়, বিলবোর্ড টানাতে হয় এবং চিৎকার করে মানুষকে বোঝাতে হয়, তিনি অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘পপুলিজম’ বা জনপ্রিয়তাবাদ। কিন্তু মানুষের কাছে নিজেকে জনপ্রিয় করার দক্ষতা আর রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে প্রজ্ঞাপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার সক্ষমতা এই দুটি বিষয় যে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
এক জন জনপ্রিয় অভিনেতা, কৃকেটার বা সংগীতশিল্পী লাখো মানুষের তালি কুড়াতে পারেন, কিন্তু রাষ্ট্রের জটিল অর্থনৈতিক সংকট, ভূরাজনৈতিক মারপ্যাচ বা সুদূরপ্রসারী সমাজ সংস্কারে তিনিই কি সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি? বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তেমনটা হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। কারণ, জাতির সামগ্রিক কল্যাণ এমন কিছু শিক্ষা এবং অভিজ্ঞতার সঙ্গে জড়িত, যেটা অন্য কোনো পেশার সঙ্গে মেলে না; রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের বিবেচনায় অনেক সময় এমন কিছু কঠোর ও রূঢ় সিদ্ধান্তের দাবি রাখে, যেটা তাৎক্ষণিকভাবে জনগণের কাছে জনপ্রিয় না-ও হতে পারে। কিন্তু যিনি জনপ্রিয়তার দ্বারা রাষ্ট্র ক্ষমতা পেয়েছেন, তেমন নেতা স্বাভাবিকভাবেই জাতির দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হলেও সস্তা হাততালি পাওয়ার পথটিই বেছে নিতে পারেন।
আবার, প্রচলিত রাজনীতিতে প্রায়ই দেখা যায়, এক জন ব্যক্তি যখন শাসক কিংবা মন্ত্রী হতে মরিয়া হয়ে ওঠেন, মনবিজ্ঞানের ব্যাখ্যায় তার এমন মানসিকতার মূলে থাকে সেই ব্যক্তির অন্তরে এক ধরনের ‘মর্যাদার ঘাটতি’ বা মনস্তাত্ত্বিক অভাববোধ। কোনো কিছু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা সেই জিনিসের অভাববোধের অনুভব থেকেই জন্ম নেয়। এক জন ক্ষুধার্ত আত্মা যেমন খাবারের পেছনে ছোটেন, তেমনি এক জন আত্মিকভাবে অভাবী মানুষ ক্ষমতার পেছনে জীবন দেন। তিনি মনে করেন, বড় একটি পদ বা চেয়ার পেলেই সমাজের চোখে তার মূল্য বাড়বে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যে ব্যক্তি নিজের ভেতর মর্যাদার অভাব পূরণে ব্যস্ত, তিনি কিভাবে একটি জাতির অভাব মোচন করবেন? জগত জুড়ে বিভিন্ন দেশে রাজনীতির ময়দানে যে তীব্র প্রতিযোগিতা, কাদা ছোড়াছুড়ি এবং হানাহানি, সেটটা মূলত এই অভাবী মানুষদের ইগো বা অহমিকার লড়াই। প্রায়ই দেখা যায়, এই লড়াইয়ে এক দল আরেক দলের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে এতই ক্লান্ত হয়ে পড়ে, শেষমেশ জনকল্যাণের বিষয়টি কাগজের ফাইলবন্দি হয়েই থেকে যায়। আবার যদিও কোনো কোনো দেশে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি কিছুটা উন্নত, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জনগণ তাদের স্বাধীন ইচ্ছা দ্বারা নিজেদের জন্য নেতা নির্বাচন করতে পারেন না। সংসদীয় পদ্ধতিতে যে কয়েকজনকে তাদের নিজ নিজ রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে নমিনেশন দেয়া হয় কিংবা যে কয়েকজন স্বতন্ত্রভাবে ইলেকশনে অংশ নেয়, তাদের মধ্য থেকেই জনগণকে তাদের নেতা বেছে নিতে বাধ্য করা হয়।
অবশ্য, নেতৃত্বের এই ‘অভাবী মানসিকতা’ পৃথিবীর সব অঞ্চলে সমান নয়। এমন মানসিকতার পেছনে প্রায়ই গভীর ঐতিহাসিক ও সমাজতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট থাকে। বিশেষ করে, যেসব জাতি দীর্ঘকাল পরাধীনতার শিকলে বন্দি ছিল এবং যাদের জাতীয় সত্তায় আত্মসম্মানবোধের নিয়ামকগুলো পরিকল্পিতভাবে দুর্বল করে রাখা হয়েছে, সেখানে এমন মানসিকতা অত্যন্ত প্রকট। পরাধীনতার উত্তরাধিকার ও ‘কলোনিয়াল হ্যাংওভার’-এর ব্যাখ্যায় দেখা যায়, দীর্ঘদিনের ঔপনিবেশিক শাসন কেবল একটি ভূখণ্ড দখল করে না, বরং সেই জাতির মনস্তত্ত্বকেও পঙ্গু করে দেয়। পরাধীন জাতির মানুষরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে দেখে আসে, ক্ষমতা মানেই হলো দাপট, ক্ষমতা মানেই হলো অন্যকে শাসন করা, প্রভুত্ব করা, আর সম্পদের মালিক হওয়া। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এমন ভূখণ্ডে যখন সেই জাতিগুলো স্বাধীন হয়, তখন তাদের নেতাদের বড় একটা অংশ সেই পুরনো ‘ঔপনিবেশিক প্রভুর’ প্রেতাত্মা হয়ে আবির্ভূত হয়। এ ক্ষেত্রে তাদের কাছে ক্ষমতা কোনো দায়িত্ব নয়, বরং এটি তাদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও হীনমন্যতা দূর করার একটি হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।
আবার যেসব জাতির আত্মসম্মানবোধ দুর্বল, যাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং নৈতিক মূল্যবোধের ওপর বিশ্বাসটুকু নড়বড়ে, তারা বাহ্যিক চাকচিক্য আর পদ-পদবির মাধ্যমে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে ব্যস্ত থাকে। একে মনস্তত্ত্বের ভাষায় বলা হয় ‘Compensatory Behavior’ বা ক্ষতিপূরণমূলক আচরণ। অর্থাৎ, ভেতরে যে শূন্যতা বা হীনমন্যতা রয়েছে, সেটা বাইরে দামি গাড়ি, বড় পদবি আর অনুগত লোকবলের বাহবা দিয়ে ঢাকতে চাওয়া। যদিও একটি আত্মসম্মানী ও স্বাধীনচেতা জাতি জানে, মানুষের প্রকৃত সম্মান থাকে তার চরিত্রে, ক্ষমতায় নয়; কিন্তু যে জাতির সত্তায় আত্মসম্মানবোধের ক্ষতি রয়েছে, সেখানে নেতৃত্ব নেয়ার লড়াই এক ধরনের ‘সারভাইভাল অফ দি ফিটেস্ট’ বা টিকে থাকার লড়াইয়ে পরিণত হয়। দীর্ঘ পরাধীনতা একটি জাতিকে পরনির্ভরশীল করে তোলে। এই পরনির্ভরশীলতা কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং বুদ্ধিবৃত্তিকও। ফলে যখন তারা রাজনীতিতে আসে, তখন জাতীয় কল্যাণের চেয়ে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত আধিপত্য বিস্তার তাদের কাছে বড় হয়ে দাড়ায়। ক্ষমতার এই লড়াই তখন আর দেশের উন্নয়নের লড়াই থাকে না, বরং সেটা হয়ে ওঠে ‘মর্যাদাবোধের লড়াই’। তাদের কাছে গণতন্ত্রের সংজ্ঞা যা কিছুই হোক, মানবাধিকার সনদে যা কিছুই স্বাক্ষর হোক, সেখানে রাজনীতি ঘুরে-ফিরে সেই মধ্যযুগের রাজা, মহারাজা, কিং আর জারদের মানসিকতার মধ্যেই ফিরে আসে। প্রায়ই সেসব আপাতত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এক অঘোষিত রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায় আর দলের নেতৃত্ব জাতীয় কিংবা স্থানীয় সব পর্যায়েই অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিজ নিজ পরিবারের মধ্যেই খেয়া পারাপার হতে দেখা যায়।
তবে প্রচলিত গণতন্ত্রের মাধ্যমে অনৈতিক সরকার, নেতৃত্বে দূরদৃষ্টির অভাব, জনগণের পক্ষ থেকে জাতির সব থেকে উপযুক্ত ব্যক্তিকে নেতা নির্বাচন করার সুযোগ না থাকা, কিংবা গণতন্ত্রের মধ্যেই রাজতন্ত্র সৃষ্টি হয়ে যাওয়া কোনো ব্যক্তি কিংবা পরিবারের দোষ হিসেবে দেখা ন্যায়সঙ্গত নয়, বরং সেটা প্রচলিত গণতন্ত্রের কাঠামোগত দুর্বলতারই প্রমাণ। তাই সঙ্গত কারণেই প্রতিটি রাজনীতি-সচেতন মানুষের কাছে প্রশ্ন, প্রচলিত ডেমক্রেসি কি সত্যিই যথেষ্ট, নাকি প্রয়োজন ‘সুপার ডেমক্রেসি’ যেটা হবে সত্যিকারভাবে শতভাগ জনগণের মতের প্রতিফলন, যেটা একটি প্রজ্ঞানির্ভর জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারবে।
‘সুপার ডেমক্রেসি’ বা ‘উন্নত গণতন্ত্র’ হলো এমন একটি শাসন ব্যবস্থা, যার একমাত্র অভীষ্ট লক্ষ্য হলো 'For the People' বা নিরঙ্কুশ জনকল্যাণ। প্রচলিত গণতন্ত্র যেখানে সংখ্যাতত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে চলে, সুপার ডেমক্রেসি সেখানে গুরুত্ব দিবে গুণগত মানের ওপর। এই পদ্ধতিতে রাষ্ট্রকে কেবল একটি প্রশাসনিক যন্ত্র কিংবা ট্যাক্স দেয়া ও সার্ভিস নেয়ার ব্যবসা হিসেবে নয়, বরং একটি ‘অভিভাবক’ সত্তা হিসেবে দেখা হবে। এ ব্যবস্থার লক্ষ্য হলো জাতির সবচেয়ে প্রজ্ঞাবান, অভিজ্ঞ এবং নৈতিকভাবে দৃঢ় মানুষকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করা।
এই শাসন ব্যবস্থায় নেতৃত্বের প্রধান শর্ত হলো ব্যক্তির মানসিক ও চারিত্রিক উচ্চতা। এই পদ্ধতিতে নেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে দুটি বিষয়কে গুরুত্ব দেয়া হয়। এক : পদের নির্লোভতা; এর অর্থ যিনি নিজে থেকে কোনো পদের আকাক্সক্ষা করেন না, তিনিই হবেন প্রকৃত নেতা। পদের প্রতি মোহহীনতা প্রজ্ঞার সর্বোচ্চ পরিচয় দেয় এবং দুর্নীতির পথ রুদ্ধ করে। দুই : আত্মমর্যাদাবোধ; এর মানে হলো, নেতা হবেন এমন এক ব্যক্তিত্ব, যিনি অন্তরে নৈতিকভাবে মজবুত, যিনি সম্মান বা মর্যাদার জন্য অন্যদের ওপর নির্ভর করেন না। অর্থাৎ, তিনি বাহ্যিক প্রশংসা বা স্বীকৃতির তোয়াক্কা না করে কেবল অর্পিত দায়িত্ব ও নৈতিকতার তাগিদে কাজ করবেন।
সুপার ডেমক্রেসিতে নির্বাচন মানে অর্থ বা পেশীশক্তির লড়াই নয়, বরং এটি শ্রেষ্ঠত্বের সন্ধানে একটি জাতীয় প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ায় কেউ নেতা হতে চাইবেন না, বরং রাষ্ট্র তার সন্তানদের মধ্য থেকে সব চেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তিকে খুজে বের করে নেতৃত্বের দায়িত্ব দেবে। প্রক্রিয়াটি একটি উচ্চ পর্যায়ের নিরপেক্ষ ‘প্রজ্ঞাবান কমিশন’ দ্বারা পরিচালিত হবে। এই নির্বাচন কমিশন কোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর অনুগত হবে না। তারা বছরব্যাপী জনগণের মতামত পর্যবেক্ষণ করবে এবং যোগ্য ব্যক্তিদের জীবন বৃত্তান্ত, কর্মজীবন ও নৈতিক রেকর্ড বিশ্লেষণ করবে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করে ইলেকশনটি হবে অত্যন্ত গতিশীল ও অংশগ্রহণমূলক।
প্রথম পর্যায় (জনমতামত ও সংক্ষিপ্ত তালিকা) : সারা বছর নাগরিকরা ইমেইল, চিঠি বা বিশেষ ওয়েব পোর্টালের মাধ্যমে তাদের পছন্দের যোগ্য ব্যক্তির নাম প্রস্তাব করবে। নাগরিকরা যেকোনো সময় তাদের ভোট পরিবর্তন করার সুযোগ পাবে, যেটা একটি ‘লাইভ’ জনমত প্রতিফলিত করবে।
দ্বিতীয় পর্যায় (কমিশন কর্তৃক যাচাই ও চূড়ান্ত ইলেকশন) : প্রাপ্ত মতামতের ভিত্তিতে কমিশন শ্রেষ্ঠ ও সৎ ব্যক্তিদের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রকাশ করবে। এখানে কোনো ‘ব্যক্তিগত প্রচারণা’ থাকবে না। কমিশনই জনগণের সামনে প্রার্থীদের যোগ্যতা ও অতীত রেকর্ডের নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ তুলে ধরবে।
এ ব্যবস্থার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো, তালিকায় থাকা কোনো ব্যক্তি যদি নেতৃত্ব নেয়ার প্রতি বিন্দুমাত্র আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে বা অতীতে কোনো তদ্বির বা ক্যাম্পেইনের প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে কমিশন তাকে অযোগ্য ঘোষণা করবে। সুপার ডেমক্রেসি এমন এক ব্যবস্থার স্বপ্ন, যেখানে রাষ্ট্র তার পরিচালক খুজে নেবে, পরিচালক রাষ্ট্রকে খুজবে না। এটি ক্ষমতার দম্ভের বিপরীতে সেবার মানসিকতাকে প্রতিষ্ঠিত করবে এবং প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে একটি সত্যিকার কল্যাণকামী রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে।
‘সুপার ডেমক্রেসি’ বাস্তবায়নের পথে জনগণকে একটি মৌলিক প্রশ্নের চূড়ান্ত সমাধান করতে হবে : রাষ্ট্র কি জনগণের জন্য, নাকি জনগণ রাষ্ট্রের জন্য? রাজনীতি কি মানুষের কল্যাণে, নাকি নাগরিকরা কেবল রাজনীতির দাবার ঘুটি?
যদি আমরা মেনে নেই, নাগরিকরাই রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক, তবে ক্ষমতার এই মালিকানা কেবল কাগজ-কলমে বা আংশিক থাকলে চলবে না। মালিকানা হতে হবে শতভাগ এবং নিষ্কণ্টক। বর্তমান গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে জনগণ কেবল পাচ বছর পর ভোটের দিন আংশিক ক্ষমতা পায়, কিন্তু ‘সুপার ডেমক্রেসি’-তে জনগণ পরিপূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করে। তাই, জনগণকে এমন একটি প্ল্যাটফর্ম সৃষ্টি করতে হবে, যেখানে তারা রাষ্ট্রের জন্য সব থেকে উপযুক্ত ও প্রজ্ঞাবান নেতৃত্ব খুজে বের করার প্রক্রিয়ায় সরাসরি অংশ নেবে। যেখানে ‘মালিক’ হিসেবে নাগরিকের অধিকার থাকবে বছরের যেকোনো সময় তার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ভোট পরিবর্তনের সুযোগ জনগণের হাতে সেই ‘শতভাগ ক্ষমতা’ ফিরিয়ে দেয়, যেটা তাদের ভোটার থেকে প্রকৃত ‘নীতিনির্ধারক’ বা ‘তত্ত্বাবধায়কে’ রূপান্তরিত করে।
যখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব রাজনীতির কারবারিদের হাত থেকে প্রকৃত অর্থে প্রজ্ঞাবান ও নির্লোভ মানুষের হাতে অর্পণ করার ক্ষমতা জনগণের কাছে থাকবে, তখনই ‘রাজনীতির জন্য নাগরিক’ নয়, বরং ‘নাগরিকের জন্য রাজনীতি’র ধারণাটি বাস্তবে রূপ নেবে। এই প্রকৃত ক্ষমতায়নই পারে একটি জাতিকে ধ্বংসাত্মক রাজনীতি থেকে উদ্ধার করে গঠনমূলক অভিভাবকত্বের ছায়ায় নিয়ে আসতে।
তবে এখানে একটি যৌক্তিক প্রশ্ন রয়েছে; এত চমৎকার একটি পদ্ধতি, কিন্তু কেন এটিকে অবাস্তব বা বেমানান বলে মনে হচ্ছে? এর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে আমাদের বিদ্যমান আর্থ-সামাজিক ও শিক্ষা কাঠামোর গভীরে। আমাদের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা আজ গোড়া থেকেই কলুষিত। মদের দোকানে যেমন ওজুর পানি পাওয়া অসম্ভব, ঠিক তেমনি আজকের চরম প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষা ব্যবস্থায় বেড়ে ওঠা মানুষের কাছে ‘সুপার ডেমক্রেসি’র মতো নির্লোভ রাজনৈতিক দর্শন বুঝতে পারা প্রায় অসম্ভব। আমরা শৈশব থেকেই শিশুদের শেখাচ্ছি, যেকোনো মূল্যে ‘প্রথম’ হতে হবে; যার যত বেশি অর্থ আর ক্ষমতা, সেই তত বেশি সফল। যেখানে শিক্ষার মূল লক্ষ্যই বানানো হয়েছে ভোগ আর প্রতিপত্তি, সেখানে ন্যায়ের রাজনীতি একটি উদ্ভট ধারণা ছাড়া আর কিছুই বলে মনে হয় না। চারপাশে কেবল বাহ্যিক জৌলুসের প্রদর্শনী; কার গাড়ি কত দামি, কার অট্টালিকা কত বিশাল। এমনকি আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানও যেন এই ভোগবাদী সুরেই তাল মেলাচ্ছে। তারা বলছে, ‘হৃদযন্ত্র বদলে নাও, লিভার প্রতিস্থাপন কর, হাজার বছর বেচে থাক এবং কেবল ভোগ কর।’ যখন চারপাশের পরিবেশ লোভ আর লালসার ড্রামে পরিপূর্ণ, তখন সেই একই আধার থেকে নৈতিকতাসম্পন্ন নেতৃত্ব খুজে পাওয়া এক অবাস্তব কল্পনা।
একটু সময় নিয়ে ভেবে দেখুন, বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক কাঠামোতে যদি এই ‘সুপার ডেমক্রেসি’ বা ন্যায়পরায়ণতার রাজনীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দান করা না যায়, তবে প্রচলিত পদ্ধতিতে সব থেকে ভালো ইলেকশন হলেও সেটা কেবল নেতার পরিবর্তন করবে, কিন্তু সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হবে না।
প্রকৃত মুক্তি তখনই আসবে, যখন নেতৃত্বের ভার তুলে দেয়া হবে এমন মানুষের হাতে, যারা ‘প্রাচুর্যের মানসিকতা সম্পন্ন’, যারা ক্ষমতার জন্য লোভী নয়, বরং যারা প্রজ্ঞার আলোকবর্তিকা। যেদিন সমাজে এই চেতনার জয়গান প্রতিষ্ঠিত হবে, সেদিনই একটি রাষ্ট্র প্রকৃত অর্থে শান্তির পথে যাত্রা শুরু করবে।
কমিশন যেন নিজেই ক্ষমতার কেন্দ্রে পরিণত না হয়, সে জন্য এর নিয়োগ প্রক্রিয়াটি হবে সুনির্দিষ্ট। কমিশনের মেম্বারদের কোনো সরকার নিয়োগ দেবে না। বরং, অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি, শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানী, আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সমাজসেবকদের বড় একটি সমন্বিত প্যানেল হতে লটারির মাধ্যমে বেছে নেয়া হবে তাদের। কমিশনের মেম্বারদের মেয়াদ সীমিত হবে এবং তাদের কার্যক্রম জনগণের কাছে লাইভ স্টৃম করা হবে।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ভোটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। ভোটের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ব্লকচেইন ব্যবহার করা যেতে পারে, যাতে কেউ তথ্য পরিবর্তন করতে না পারে। প্রতিটি নাগরিকের প্রোফাইলে তাদের প্রস্তাবিত নেতার জন্য ‘যুক্তি’ দেয়ার একটি সেকশন থাকবে। এটি কেবল সংখ্যাতত্ত্ব নয়, বরং গুণগত আলোচনার জন্ম দেবে।
নেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে ‘পদের নির্লোভতা’ এবং ‘আত্মমর্যাদা’ পরিমাপ করা কঠিন কাজ। এর জন্য আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক মূল্যায়ন পদ্ধতি যুক্ত করা দরকার হবে। সংক্ষিপ্ত তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ মনস্তাত্ত্বিক মূল্যায়ন থাকবে, যেটা তাদের অবচেতন মনের ক্ষমতার লোভ বা হীনমন্যতা শনাক্ত করতে পারবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে প্রার্থীর গত ২০-৩০ বছরের সামাজিক আচরণ, দানশীলতা এবং সংকটকালীন ভূমিকা বিশ্লেষণ করে তাদের মানসিক গঠন নির্ণয় করা যাবে।
‘সুপার ডেমক্রেসি’তে অর্থ ব্যবস্থা হবে জাতির নৈতিকতা ও স্বচ্ছতার মাপকাঠি। বর্তমানের দুর্নীতিগ্রস্ত অর্থ ব্যবস্থাকে আমূল বদলে দিতে সুপার ডেমক্রেসিতে মূল ভিত্তি হবে দুটি : সম্পূর্ণ ক্যাশলেস সিস্টেম এবং আর্থিক লেনদেনের লাইভ ট্রান্সপারেন্সি। কাগজের নোট বা নগদ টাকাই হলো অন্ধকার জগতের প্রাণশক্তি। কারণ, একে ট্র্যাক করা অসম্ভব। সুপার ডেমক্রেসিতে কোনো শারীরিক মুদ্রার অস্তিত্ব থাকবে না। রাষ্ট্রের প্রতিটি পয়সা হবে ডিজিটাল। হ্যান্ডব্যাগে করে কোটি কোটি টাকা লেনদেন বা বালিশ-বিছানার নিচে লুকিয়ে রাখার সুযোগ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। জাতীয় পরিচয়পত্রের নাম্বারের সঙ্গে মিলিয়ে প্রতিটি নাগরিকের জন্য থাকবে মাত্র একটি ফোন নাম্বার এবং একটিই ব্যাংক একাউন্ট। ফলে বেনামি বা অবৈধ লেনদেনের কোনো চোরাপথ থাকবে না।
সুপার ডেমক্রেসিতে জনগণের ট্যাক্সের পয়সার প্রতিটি হিসাব হবে দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। পিয়ন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অভিভাবক বা মন্ত্রী, সবার ব্যাংক লেনদেনের হিসাব একটি সরকারি লাইভ ওয়েবসাইটে দেখা যাবে। জনগণ সরাসরি জানতে পারবে, কার পকেটে কত টাকা কিভাবে ঢুকছে এবং কোথায় খরচ হচ্ছে। এক জন সৎ নাগরিকের জন্য আর্থিক লেনদেনের গোপনীয়তা রক্ষা করার চেয়ে রাষ্ট্রকে মজবুত করা এবং দুর্নীতি মুক্ত সমাজ গড়া অনেক বেশি জরুরি।
বর্তমানে মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে উৎপাদনকারী কৃষক গরিব হচ্ছে এবং খুচরা বাজারে দাম আকাশচুম্বী হচ্ছে। ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্রেতা ও উৎপাদকের মধ্যে সরাসরি সংযোগ স্থাপিত হবে। এতে কালোবাজারি, মজুতদারি এবং সিন্ডিকেট ‘জাদুমন্ত্রের মতো’ থেমে যাবে এবং প্রতিটি লেনদেন থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাজস্ব আদায় হবে। ধূর্তরা যেন অর্থ পাচার করে দেশের বাইরে সম্পদ গড়তে না পারে, সে জন্য সুপার ডেমক্রেসিতে আইন হবে অত্যন্ত কঠোর। প্রজাতন্ত্রের কোনো বেতনভুক্ত কর্মকর্তা, নীতিনির্ধারক কিংবা তাদের পরিবারের সদস্যদের বিদেশের মাটিতে কোনো সম্পদ বা ‘সেকেন্ড হোম’ থাকতে পারবে না।
কেবল প্রযুক্তি দিয়ে দুর্নীতি পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়, যদি না মানুষের ভেতর নৈতিক পরিবর্তন আসে। সুপার ডেমক্রেসির অর্থ ব্যবস্থার প্রকৃত শক্তি হবে মানুষের ‘মজবুত আত্মসম্মানবোধ’। এক জন ব্যবসায়ী বা ঠিকাদার যখন আত্মসম্মানবোধে শক্তিশালী হবেন, তিনি ঘুষ দিয়ে কাজ নেয়াকে নিজের জন্য চরম অপমানজনক মনে করবেন। মানুষ যখন ক্ষমতা বা সম্পদ অর্জনের চেয়ে নিজের সম্মান হারানোর ভয় বেশি করবে, তখনই রাষ্ট্র সত্যিকারের আর্থিক মুক্তি পাবে। সুপার ডেমক্রেসির অর্থ ব্যবস্থায় ক্যাশলেস সিস্টেম হবে সেই হাতিয়ার, যেটা চুরির পথ বন্ধ করবে, আর আত্মসম্মানবোধ হবে সেই শক্তি, যেটা মানুষকে নৈতিকভাবে স্বাধীন করবে। এই দুইয়ের মিলনেই সৃষ্টি হবে একটি বৈষম্যহীন, স্বচ্ছ এবং সত্যিকার সমৃদ্ধিশালী রাষ্ট্র।
এ ইউ দৌলা : মাইন্ড-ইঞ্জিনিয়ারিং গবেষক