এক সময় শহর ও গ্রামের অলিগলিতে মানুষের যাতায়াতের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বাহন ছিল প্যাডেল চালিত রিকশা। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে রিকশাচালকরা ঘুরিয়ে যেতেন জীবনের চাকা, আর তাদের ঘণ্টির “ক্রিং ক্রিং” শব্দে মুখর থাকত পথঘাট। এই রিকশাই ছিল নিম্নআয়ের অসংখ্য পরিবারের জীবিকার উৎস। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়ায় আজ সেই প্যাডেল রিকশা হারিয়ে যাচ্ছে ব্যাটারিচালিত অটোর দখলে। নিঃশব্দে বিলীন হচ্ছে এক সময়ের প্রাণচঞ্চল ঐতিহ্য, রেখে যাচ্ছে কেবল স্মৃতির শব্দ-“ক্রিং... ক্রিং...
জয়পুরহাটের আক্কেলপুরে অলিগলিতে প্রতিদিন ভেসে আসত প্যাডেল চালিত রিকশার পরিচিত ক্রিং ক্রিং আর টুং টুং বেলের শব্দ। সেই রিকশার চাকা ঘুরে চলত শত শত পরিবারের জীবনযাপন। কিন্তু সময়ের পালাবদলে সেই ঐতিহ্য প্রায় বিলুপ্তির পথে।
আধুনিকতার ছোঁয়ায় ও লাভজনক আয়ের আশায় শহরের প্রায় সব রিকশাচালকই এখন ঝুঁকছেন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দিকে।
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার প্রতি ঝুঁকছে চালকরা প্যাডেল রিকশায় পরিশ্রম বেশি হলেও আয় কম। পক্ষান্তরে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালিয়ে কম শ্রমে বেশি আয়ের সুযোগ থাকায় অনেকেই বদলে ফেলেছেন পেশার ধরন। ফলে শহর ও গ্রামাঞ্চলে অটোরিকশার সংখ্যা বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে।
রহিম উদ্দিন (৬৫)। বয়সের ভারে প্যাডেল ঘোরানো কঠিন হলেও অভ্যাস আর জীবিকার তাগিদে এখনও চালিয়ে যাচ্ছেন রিকশা। প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত তিনি আইসক্রিম বিক্রি করেন পাড়ায় পাড়ায়, স্কুলের সামনে, বাজারের পাশে। তিনি বলেন
“বাবা, অটো কিনতে টাকা লাগে, আমি গরিব মানুষ। এই রিকশাটাই আমার ভরসা। আগে রিকশায় যাত্রী তুলতাম, এখন আইসক্রিম বেচে খাই। দিনে যা পাই, তা দিয়ে কোনোমতে চালাই সংসার। কিন্তু এখন মানুষ হাঁটতেও চায় না, সবাই অটোতে ওঠে।” “এই রিকশার ঘণ্টির শব্দেই কেটেছে আমার জীবন। এখন সবাই বলে, ‘দাদু, এইটা চালাও কেন?’ কিন্তু আমি পারি না ফেলে দিতে, এটা তো আমার সঙ্গী।”
প্যাডেল রিকশার চালক আজিজার রহমান বলেন, মানুষ এখন আর প্যাডেলের রিকশায় উঠতে চায় না। তাই বেশির ভাগ সময় অলস বসে থাকতে হয়। আগে দিনে ২০০-৩০০ টাকা আয় হতো, এখন সেটা ৮০-১০০ টাকায় নেমে এসেছে। এত অল্প আয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে গেছে।
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালক মোহন জানান, রিকশায় খাটুনি বেশি, অথচ আয় কম। অটোরিকশা চালিয়ে দিনে ৫০০-৭০০ টাকা পর্যন্ত আয় করা যায়। কিস্তিতে কেনা যায় বলেও অনেকের পক্ষে এটি সহজলভ্য।
উৎপাদন বাড়ছে, ব্যয়ও বাড়ছে: জয়পুরহাটে বর্তমানে প্রায় ২৩ টি কারখানায় প্রতি মাসে গড়ে ৮৮টি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা তৈরি হচ্ছে। তবে কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে অনেক গুণ। রড ও শিটের দাম বিগত দুই বছরে বেড়েছে ৩৫-৪৫ শতাংশ।
আল-আমিন নামের একজন কারখানা মালিক জানান, একটি অটোরিকশার ফ্রেম বা বডি তৈরিতে খরচ পড়ে অন্তত ৮০ হাজার টাকা। ব্যাটারি সহ পুরো অটোরিকশার খরচ দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা। অনেক সময় এনজিও থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে কাজ করতে হয়, কারণ ব্যাংক ঋণ পেতে হলে জমি বা ঘরের কাগজ লাগে, যা সবার পক্ষে সম্ভব হয় না।
এ বিষয়ে জয়পুরহাট বিসিক শিল্প নগরীর উপ-ব্যবস্থাপক লিটন চন্দ্র ঘোষ বলেন, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চাহিদা বাড়ায় নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। কারখানার সংখ্যাও বেড়েছে। শিল্প সম্ভাবনা আরও বাড়াতে কারিগরি প্রশিক্ষণসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে বিসিক।
যেখানে এক সময় অভ্যন্তরীণ যাতায়াতে একমাত্র ভরসা ছিল প্যাডেল চালিত রিকশা, সেখানে এখন তা অতীত হতে চলেছে। শহরে বর্তমানে হাতে গোনা মাত্র ৩টি প্যাডেল রিকশা দেখা যায়, যার চালকরাও অধিকাংশই বয়সে প্রবীণ। একসময় যে রিকশাগুলোর নির্মাণে ব্যস্ত ছিল ৫০টিরও বেশি কারখানা, যার মাসিক উৎপাদন ব্যয় প্রায় ২ কোটি টাকা। এখন সেগুলোও ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে স্মৃতিতে।
এক সময়ের অপরিহার্য বাহন হয়তো আগামী প্রজন্মের কাছে রয়ে যাবে কেবল ইতিহাসের পাতায় কিংবা জাদুঘরের প্রদর্শনীতে।