চলতি অর্থ বছরে (২০২৫-২৬) যশোরের মণিরামপুর স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সে এম, এস, আর (চিকিৎসা ও শৈল চিকিৎসা সরঞ্জমাদি) সরবরাহে কাগজে-কলমে ঠিক থাকলেও বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বছরের শুরুতে কোটেশনে (দুই গ্রুপে ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৫০০ টাকা) স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ মেরামতে পুকুর চুরির চিত্র উঠে এসেছে। চলতি অর্থ বছরে শুধু ৬ লাখ টাকায় এক হাজার পিচ বিছানা চাদর, প্রায় আড়াই লাখ টাকায় ফোমসহ দেড় লাখ টাকায় বেড সাইড লোকার ক্রয়ের বিষয়টি কাগজে-কলমে উল্লেখ থাকলেও ভর্তি রোগীদের ব্যবহার করতে দেওয়া হচ্ছে সেই জরাজীর্ণ ছেঁড়াবুড়া বিছানা চাদর ও ফোম। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেলে এসব চিত্র উঠে এসেছে।
অনুসন্ধানে জানাযায়, চলতি অর্থ বছরে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সরকারি প্রতিষ্ঠান ইডিসিল (এসেনশিয়াল ড্রাগ কোম্পানি লিমিটিড) থেকে ৩৯ লাখ ৬৩ হাজার ৪৭৭ টাকার ঔষধ এবং দরপত্রের মাধ্যমে ইডিসিল বহির্ভূত আরও ২৬ লাখ ৪ হাজার ৭৬৫ টাকার ঔষুধ সহ ৪৪ লাখ ৭৮ হাজার ৭৬৫ টাকার এম, এস, আর (চিকিৎসা ও শৈল চিকিৎসা সরঞ্জমাদি) দরপত্র আহবানের মাধ্যমে (ই-জিপি) লাকি মেডিসিন সাপ্লাই নামের একটি প্রতিষ্ঠান ৬ গ্রুপের এসব সামগ্রি সরবরাহের জন্য বিবেচিত হয়।
লাকি মেডিসিন নামের এই প্রতিষ্ঠান থেকে ‘ক’ গ্রুপে ২৬ লাখ ৪ হাজার ৭৬৫ টাকার ইডিসিএল বহির্ভূত ঔষুধ, ’খ’ গ্রুপে ১৭ লাখ ৯৩ হাজার ১০০ টাকার সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতি, 'গ’ গ্রুপে ৮ লাখ ৯৬ হাজার ৬২৫ টাকার গজ-ব্যান্ডেজ-তুলা, ’ঘ’ গ্রুপে ৮ লাখ ৯৫ হাজার ৬০০ টাকার লিলেন সামগ্রি, ’ঙ’ গ্রুপে ৫ লাখ ৩৬ হাজার ৪০ টাকার ক্যামিকাল রি-এজেন্ট এবং ’চ’ গ্রুপে ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৪০০ টাকার আসবাবপত্র ও কিচেন সামগ্রি সরবরাহ করা হয়। এসব সামগ্রি বুঝে নেয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স গঠিত ৪ সদস্য’র সার্ভে কমিটি। যার সভাপতি জুনিয়র কনসালটেন্ট (মেডিসিন) ডাঃ মোঃ সুমন কবীর ও সদস্য সচিব আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডাঃ অনুপ কুমার বসু। এসব সামগ্রি সরবরাহের ক্ষেত্রে কাগজে-কলমে ঠিক থাকলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন।
অবশ্য স্টোর কিপার সাইফুল ইসলাম দাবি করেছেন সব কিছুই বুঝে নিয়ে স্টোরে রাখা আছে। ভর্তি রোগীদের নোংরা ও ব্যবহার অযোগ্য বিছানা চাদর'সহ অন্যান্য সামগ্রি কেন দেয়া হচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি (স্টোর কিপার) সাইফুল ইসলাম এ বিষয়ে স্যারের (স্বাস্থ্য ও পরিবার-পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ ফাইয়াজ আহমদ ফয়সল) সাথে কথা বলতে বলেন।
চলতি বছরের শুরুতে কোটেশনে (দুই গ্রুপে) ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৫০০ টাকার বিভিন্ন যন্ত্রাংশ মেরামতে পুকুর চুরির চিত্র উঠে এসেছে। এতে ”ক” গ্রুপে এক লাখ ৮৯ হাজার টাকায় ৬টি এসি ও প্যাথলজি বিভাগের বাইনোকুলার মাইক্রোস্কোপের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ প্রতিস্থাপনে ব্যয় দেখানো হয়েছে। একই কোটেশনে ”খ” গ্রুপে ১ লাখ ৬৮ হাজার টাকায় ডেন্টাল চেয়ার রিপাইয়ার, ফিলিং সিস্টেম, কমপ্রেসর প্রতিস্থাপনসহ পুরুষ-মহিলা ওয়ার্ডের অক্সিজেন কনসেন্ট্রেটর বিভিন্ন যন্ত্রাংশ প্রতিস্থাপনের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে ছিটেফোটা করে সিংহভাগ অর্থ লুটপাট করা হয়েছে।
প্যাথলজি বিভাগের আনিছুজ্জামান জানান, তার বাইনোকুলার মেশিনের নতুন কোন যন্ত্রাংশ সংযোজন করা হয়নি এবং এই বিভাগের এসিটি শুধু পানি দিয়ে ধোঁয়া হয়েছে। অপর দিকে ডেন্টাল ইউনিটের চিকিৎসক ডাঃ ইয়াসিন আরাফাত জানান, ডেন্টাল চেয়ারটি খারাপ হলে তিনি নিজ উদ্যোগে সারিয়ে নিয়েছেন। ডেন্টাল ইউনিটের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ মেরামতের কথা বলা হলেও আজও তা করা হয়নি।
মহিলা ওয়ার্ডের ইনচার্জ হাওয়া বেগম জানান, স্টোর কিপার সাইফুল ইসলাম মিস্ত্রি এনে ৬টি অক্সিজেন কনসেন্ট্রেটরের ৫টি কোন রকমে ঠিক করেছেন। কিন্তু ইসিজি মেশিন ঠিক করেনি।
অভিযোগ উঠেছে লুটপাট করতে অতি গোপনে কোটেশনে দরপত্র আহবান করা হয়। নামে মাত্র মেসার্স এইচ এম ট্রেডার্স, মেসার্স তনুরাজ কনস্ট্রাকশন ও মেসার্স জিম এন্টার প্রাইজ নামের তিন প্রতিষ্ঠানের অংশ গ্রহন দেখানো হয়। এতে জামালপুর জেলার শাহাপুর এলাকার মেসার্স তনুরাজ কনস্ট্রাকশন নামের প্রতিষ্ঠানের নামে কাজ দেখানো হলেও মূলতঃ কাজ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্টোর কিপার সাইফুল ইসলামের তত্ত্বাবধায়নে করা হয়েছে বলে জানা গেছে। অবশ্য বিষয়টি ভিত্তিহীন বলে তিনি দাবি করেছেন সাইফুল ইসলাম।
জানতে চাইলে স্বাস্থ্য ও পরিবার-পরিকল্পনা ডাঃ ফাইয়াজ আহমেদ ফয়সলের দাবি নার্সদের গাফিলতিতে নতুন বিছানা চাদরসহ অন্যান্য জিনিসপত্র রোগীরা ব্যবহার করতে পারছেন না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কোটেশনে কোন মেশিনের যন্ত্রাংশ মেরামতে বাকি থাকলে কয়েক মাস পরে করে দেওয়া হবে।
জেলা সিভিল সার্জন ডাঃ মাসুদ রানা জানান, এসব বিষয়ে অনিয়ম হলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।