সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুরে যাদুকাটা নদীর উপর নির্মাণাধীন শাহ আরেফিন (রা.)-অদ্বৈত মহাপ্রভু মৈত্রী সেতুর ৫টি গার্ডার নদীতে পড়ে গেছে। এতে প্রায় দুই কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে এলজিইডি। গার্ডার ভাঙা প্রসঙ্গে স্থানীয় গণমাধ্যম কর্মীদের এলজিইডির দুই কর্মকর্তা দুই ধরণের বক্তব্য দিয়েছেন।
তাহিরপুরের প্রকৌশলী বলেছেন, ঘুর্ণিঝড়ের কবলে পড়েছে সেতু। সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী বাতাসে বা ঝড়ে নয়, এক গার্ডার আরেক গার্ডারের উপর পড়ে এমন হয়েছে।

অবশ্য এই ক্ষতির দায় ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকেই নিতে হবে বলে দাবি করেছে স্থানীয় এলজিইডি। কেন সেতুর গার্ডার এভাবে ভেঙে গেল দেখার জন্য মঙ্গলবার (১৯ মে) সেতু নির্মাণ প্রকল্পের ডিজাইন ইউনিটের প্রকৌশলীদের একটি টিম সরেজমিনে আসবেন বলে এলজিইডির দায়িত্বশীলরা জানিয়েছেন।
জানা যায়, ২০১৮ সালে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর কর্তৃক ৮৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭৫০ মিটার গার্ডার সেতুর নির্মাণ কাজ পায় ঢাকার ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান তমা কন্সট্রাকসন। ৮ বছর পেরিয়ে গেলেও সেতু নির্মাণ কাজ শেষ না হওয়ায় ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ও তাহিরপুর এলজিইডি অফিসের বিরুদ্ধে নানা দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ আলোচনায় ছিল।
যাদুকাটা নদী তীরবর্তী বিন্নাকুলি গ্রামের বাসিন্দা মইনুল ইসলাম ফয়সল চৌধুরী জানান, রবিবার রাত ১০টার দিকে যাদুকাটা নদী তীরবর্তী এলাকায় আকস্মিক ঘুর্ণিঝড় হয়েছিল। ধারনা করা হচ্ছে ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়ে হয়তো এমন ঘটনা ঘটতে পারে। তিনি আরও জানান, নির্মাণ ত্রুটির কারণেই হয়তো এমন দুর্ঘটনা ঘটেছে।
তাহিরপুর উপজেলা প্রকৌশলী জাহিদুল ইসলাম জানান, ঘুর্ণিঝড়ের কবলে পড়ে সেতুর ৫টি গার্ডার যাদুকাটা নদীতে পড়ে গেছে।
ঝড়ের কবলে পড়ে যাদুকাটা নদী তীরবর্তী এলাকার কোন গাছপালা বাড়িঘর কিছুই ক্ষতি হলো না, অথচ সেতুর গার্ডার পড়ে গেলো, এমন পশ্নের উত্তরে তিনি জানান- শুনেছি কিছু গাছপালাও ক্ষতি হয়েছে। সেতুটির নির্মাণ কাজের প্রতিষ্ঠান তমা কন্সট্রাকসনকে বাতিল করা হয়েছে অনেক আগেই, নতুন করে নির্মাণ কাজের টেন্ডার প্রক্রিয়া চলছে।
বাাদাঘাট ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন বললেন, যাদুকাটা নদীর উপর সেতু নির্মাণ করা এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল। নির্মাণাধীন প্রতিষ্ঠান তমা কন্সট্রাকসনের গাফিলতির কারণে এই সেতুটি দীর্ঘ আট বছর পেরিয়ে গেলেও সমাপ্ত হয় নি। তিনি দ্রুততম সময়ের মধ্যে যাদুকাটা সেতুর অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করে জনগণের চলাচলের জন্য উপযুক্ত করে তোলার দাবি জানান।
প্রসঙ্গত, তাহিরপুর উপজেলার সীমান্ত এলাকায় মানুষের যাতায়াতের সুবিধা, পর্যটন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারের লক্ষে যাদুকাটা নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে। কিন্তু কাজ চলছে ডিমেতালে। সময় বাড়ানো হয়েছে চারবার। এরপরও আড়াই বছরের কাজ শেষ হয়নি আট বছরেও।
উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়নের বিন্নাকুলি বাজার এলাকায় পাহাড়ী নদী যাদুকাটার ওপর নির্মাণাধীন এই সেতুর নাম দেওয়া হয় ‘শাহ আরেফিন (রা.)-অদ্বৈত মহাপ্রভু মৈত্রী সেতু’। ৭৫০মিটার দৈর্ঘ্যের এই সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ হলে এটি হবে জেলার সবেচেয় দীর্ঘতম সেতু। তবে কাজে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের অবহেলা ও ঢিলেমি রয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ধীরগতির কাজ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) 'পল্লী সড়কে গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণ’ প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৮৬ কোটি ব্যয়ে এই সেতুটি নির্মাণ হচ্ছে। তমা কনস্ট্রাকশন নামের একটি ঠিকাদারি এই কাজটি করছে। ২০১৮ সালের ৪ ডিসেম্বর সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হয়। সেতুর কাজের সময়সীমা ছিল ৩০ মাস। সে অনুয়ায়ী ২০২১ সালের জুন মাসে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল।
এর আগে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, কাজ শুরুর বছরখানেক পরই শুরু হয় করোনা, এরপর বছর বছর বন্যার কারণে কাজে বিলম্ব হয়েছে। আবার সীমান্ত এলাকায় নির্মাণসামগ্রী আনাও সমস্যা। এসব কারণে কাজে বিলম্ব হচ্ছে। তবে কাজের দেখভালে থাকা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা বলছেন, কাজে গাফিলতি আছে। তাই সময় মতো কাজ শেষ করা যায়নি।
স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই সেতু হলে জেলা সদর থেকে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা হয়ে তাহিরপুর উপজেলার সীমান্ত এলাকায় যাতায়াত সহজ হবে। সীমান্ত এলাকা হয়ে সহজে যাওয়া-আসা করা যাবে মধ্যনগর ও ধর্মপাশা উপজেলায়। সেতু এলাকার পাশেই রয়েছে একটি সীমান্ত হাট। নদের পশ্চিম তীরে দেশের সবচেয়ে বড় শিমুল বাগান ও নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের বারিক টিলা। এর পাশে টাঙ্গুয়ার হাওর, লাকমাছড়া, শহীদ সিরাজ লেক (নিলাদ্রী লেক), টেকেরঘাট। এসব স্থানে প্রতিদিন হাজারো পর্যটক আসেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে। এ ছাড়া সীমান্ত এলাকায় থাকা বড়ছড়া, চারাগাঁও ও বাগলী শুল্কস্টেশনেও সুনামগঞ্জ শহর থেকে ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন ওই এলাকায় যাতায়াত করেন।
সুনামগঞ্জ এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন বললেন, বাতাসের কারণে এমন হবার কথা নয়। একটা গার্ডার, আরেকটা গার্ডারের উপর পড়েছে। এভাবে একে একে পাঁচটি গার্ডার ভেঙেছে। একেকটি গার্ডার নির্মাণ করতে ৩৮ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। তাতে প্রায় দুই কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি বাতিল হলেও তাদের চূড়ান্ত বিল পাওনা রয়েছে। ওখান থেকে এই খরচ কর্তন করা হবে। এলজিইডি এর দায় নেবে না বলে জানালেন তিনি। ##