ঢাকা | শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সেমিনারে ধর্মীয় ও জনপ্রতিনিধিদের সম্মিলিত অঙ্গীকার

“বাল্যবিবাহ মুক্ত” ইউনিয়ন গড়ার অঙ্গীকারে কক্সবাজারে সেমিনার

author
কক্সবাজার প্রতিনিধি

প্রকাশিত : ১৯ মে, ২০২৬ দুপুর ২:৩৩
ad003
শিশু সুরক্ষা,সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষা এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে এক অভ‚তপ‚র্ব সম্মিলিত অঙ্গীকারের সাক্ষী হলো কক্সবাজার। সভা কক্ষে সবার মুখে ছিল একটাই প্রত্যয় “বাল্যবিবাহ নয়, শিক্ষাই হোক কন্যা শিশুর ভবিষ্যতের পথ।”এই স্লোগানকে সামনে রেখে কক্সবাজার সদর উপজেলার ভারুয়াখালী, খুরস্কুুল এবং ঝিলংজা ইউনিয়নকে আগামী সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে সম্প‚র্ণ 'বাল্যবিবাহ মুক্ত' ঘোষণার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে ১৯ মে (মঙ্গলবার) সকাল ১১টায় সদর উপজেলা পরিষদের মসজিদ সংলগ্ন সম্মেলন কক্ষে এক বিশেষ সেমিনারের আয়োজন করে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ। উক্ত অনুষ্ঠানে ৩টি ইউনিয়নের শতাধিক ইমাম, মুয়াজ্জিন, মাওলানা, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ধর্মীয় নেতা,সাংবাদিক এবং জনপ্রতিনিধিরা অংশ নেন। 

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কক্সবাজার বড়বাজার জামে মসজিরে ইমাম ও উপজেলা চ্যাট কমিটির প্রেসিডেন্ট মাওলানা কামাল উদ্দিন। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খুরস্কুুল ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নাছির উদ্দিন। অনুষ্টানটি সঞ্চালনা করেন সদর উপজেলা মডেল মসজিদ এর ইমাম ও খতিব ঝিলংজা ইউনিয়নের চ্যাট কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ উল্লাহ।

সেমিনারে উপস্থিত বক্তারা প্রতিটি ইউনিয়নের তৃণম‚ল পর্যায়ে বাল্যবিবাহ নির্ম‚ল করতে সবচেয়ে বড় ভ‚মিকা রাখার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। বিভিন্ন বক্তা তাঁদের বক্তব্যে বলেন, বাল্যবিবাহ একটি সামাজিক অভিশাপ, যা কন্যাশিশুর শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। একটি মেয়ে যখন অল্প বয়সে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হয়, তখন তার স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও আত্মনির্ভরশীল ভবিষ্যৎ অনেকাংশেই থেমে যায়। তাই সমাজের প্রতিটি মানুষকে এ বিষয়ে আরও সচেতন হতে হবে।
তারা আরো বলেন,শুধু আইন প্রয়োগ করলেই বাল্যবিবাহ বন্ধ হবে না। এর জন্য প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা, পারিবারিক দায়িত্ববোধ এবং ধর্মীয় ও সামাজিক নেতাদের সক্রিয় ভ‚মিকা। বিশেষ করে মসজিদ, মন্দির ও বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে বাল্যবিবাহের কুফল নিয়ে নিয়মিত আলোচনা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

অনুষ্টানে ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের মোবিলাইজেশন অ্যান্ড সিস্টেম স্ট্রেন্থেনিং অফিসার পার্থ প্রতিম বাগচী তিনি বক্তব্যে বলেন, বাল্যবিবাহ শুধু একটি সামাজিক সমস্যা নয়, এটি একটি শিশুর স্বপ্ন ও সম্ভাবনাকে থামিয়ে দেয়। ওয়ার্ল্ড ভিশন দীর্ঘমেয়াদি স্বপ্ন নিয়ে কক্সবাজারে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে কাজ করে যাচ্ছে। কক্সবাজার সদরের ভারুয়াখালী, খুরুশকুল ও ঝিলংজা ইউনিয়নকে আগামী সেপ্টেম্বরে বাল্যবিবাহমুক্ত ঘোষণা করতে আমরা সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করেছি। আমাদের লক্ষ্য, কোনো কন্যাশিশু যেন অল্প বয়সে বিয়ের শিকার না হয়।

তিনি আরও বলেন, প্রতিটি শিশুর অধিকার রয়েছে শিক্ষা, নিরাপত্তা ও সুন্দর ভবিষ্যৎ পাওয়ার। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় নেতৃত্ব একসঙ্গে কাজ করলে বাল্যবিবাহ পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব। আমাদের স্বপ্ন, প্রতিটি কন্যাশিশু স্কুলে যাবে, খেলাধুলা করবে, ডাক্তার-শিক্ষক-প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন খেলবে সংসারের বোঝা নয়, ভবিষ্যতের আলো কাঁধে তুলে নেবে। এটি কেবল একটি সংস্থার কাজ নয়, বরং অভিভাবক, শিক্ষক, ইমাম, জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমেই বাল্যবিবাহ সম্প‚র্ণরূপে বন্ধ করা সম্ভব।

প্রধান অতিথি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান খুরুশকুল ইউনিয়ন নাছির উদ্দিন তার বক্তব্যে বলেন, বাল্যবিবাহ একটি সমাজকে পেছনের দিকে টেনে ধরে। একটি মেয়ের শৈশব কেড়ে নেয় এবং তার ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়। এই সামাজিক ব্যাধি বন্ধে জনপ্রতিনিধি, অভিভাবক ও ধর্মীয় নেতাদের একসাথে কাজ করতে হবে। স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে আমরা এই ৩টি ইউনিয়নকে বাল্যবিবাহ মুক্ত করতে মাঠ পর্যায়ে সব ধরনের প্রশাসনিক ও সামাজিক সহযোগিতা প্রদান করার লক্ষে সেপ্টেম্বর মাসের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কঠোর ভ‚মিকা রাখার অঙ্গিকার ব্যক্ত করেন।

অনুষ্টানে সভাপতি মাওলানা কামাল উদ্দিন বলেন, ইসলাম কোনোভাবেই বাল্যবিবাহ সমর্থন করে না। ইসলাম চায় প্রতিটি ছেলে-মেয়ে শিক্ষা গ্রহণ করুক এবং সুস্থভাবে বেড়ে উঠুক। বর্তমান সময়ে নারীশিক্ষার বিস্তারই বাল্যবিবাহ রোধের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। যত বেশি মেয়ে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হবে, আমারে সমাজ তত বেশি আলোকিত হবে।

তিনি আরো বলেন, ইসলাম মানবিকতা, শিক্ষা ও সুস্থ জীবনব্যবস্থার কথা বলে। তাই সমাজ থেকে বাল্যবিবাহ রোধ করতে ধর্মীয় নেতাদের আরও সক্রিয় ভ‚মিকা রাখতে হবে। কন্যাশিশুরে শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে পারলে সমাজের অনেক সমস্যাই কমে আসবে।

সেমিনারের শেষাংশে উপস্থিত সকল ধর্মীয় নেতা, জনপ্রতিনিধি এবং আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে একবাক্যে সমর্থন জানিয়ে একযোগে শপথ পাঠ করেন। তারা অঙ্গীকার করেন যে, নিজ নিজ এলাকায় কোনোভাবেই আর একটি বাল্যবিবাহও হতে দেবেন না এবং বাল্যবিবাহের যেকোনো প্রচেষ্টাকে সামাজিকভাবে প্রতিহত করবেন।সভায় একবাক্যে এই অঙ্গীকার ঘোষিত হয়।
সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SH.AL

SH.AL

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT