বাঙালি মনন, সমাজ ও সাহিত্যের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম এক অবিনাশী ও যুগান্তকারী বিস্ময়। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ, কুসংস্কারে আচ্ছন্ন এবং শ্রেণী-বৈষম্যে জর্জরিত বাঙালি সমাজ যখন এক চরম অবক্ষয় ও জড়তার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছিল, ঠিক তখনই ধূমকেতুর মতো দীপ্ত আলো ছড়িয়ে বাংলা সাহিত্যে তাঁর আবির্ভাব ঘটে। এ বছর কবির ১২৭তম জন্মবার্ষিকী উদযাপিত হচ্ছে, যা আমাদের আবার নতুন করে তাঁর কালজয়ী সৃষ্টির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। নজরুল কেবল একজন আবেগপ্রবণ কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন দ্রোহী সমাজ পর্যবেক্ষক এবং গণমানুষের কণ্ঠস্বর। তাঁর সাহিত্যিক সত্তার মূল ভিত্তিই ছিল সমাজসচেতনতা এবং সব ধরনের সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক আপসহীন বলিষ্ঠ বয়ান। বাংলা সাহিত্যে প্রেমের ও সৌন্দর্যের কবি অনেকেই এসেছেন, কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে এমন অগ্নিগর্ভ বিদ্রোহের সুর নজরুলের আগে আর কারও লেখনীতে এভাবে প্রস্ফুটিত হয়নি। তিনি তাঁর ক্ষুরধার লেখনী দিয়ে বাঙালি জাতিকে জাগিয়ে তুলেছিলেন। শিখিয়েছিলেন মাথা উঁচু করে বাঁচার মন্ত্র।
নজরুলের কবিমানস ও সামাজিক সচেতনতা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, তাঁর সৃষ্টির প্রধান চালিকাশক্তি ছিল মানুষের প্রতি অগাধ ভালোবাসা এবং সমাজের নিপীড়িত শ্রেণীর প্রতি গভীর সহমর্মিতা। তিনি সমাজকে কেবল দূর থেকে দেখেননি, সমাজের একেবারে নিচুতলার মানুষের সাথে মিশে তাদের দুঃখ-কষ্টকে নিজের অস্তিত্বে ধারণ করেছিলেন। লেটো দলের গান থেকে শুরু করে রুটির দোকানের শ্রমিক জীবন এবং পরবর্তীতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগদান—এসব বিচিত্র অভিজ্ঞতা তাঁর চেতনার জগৎকে সমৃদ্ধ ও বাস্তবমুখী করেছিল। সমাজসচেতন এই কবি খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছিলেন যে, রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের চেয়েও বড় প্রয়োজন হলো সমাজের অভ্যন্তরীণ গলদ ও বৈষম্য দূর করা। সমাজে বিদ্যমান শ্রেণীবিভেদ, পুঁজিবাদের নিষ্ঠুর শোষণ এবং সাধারণ মানুষের অসহায়ত্ব তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছিল। তাই তিনি কলমকে বানিয়েছিলেন শোষকের বিরুদ্ধে এক অব্যর্থ হাতিয়ার। তাঁর ‘সাম্যবাদী’ কাব্যের কবিতাগুলো এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি অবলীলায় বলতে পেরেছিলেন, মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান। জাত-পাত, ধর্ম বা আভিজাত্যের চেয়ে মানুষের মানবিক পরিচয়ই যে সমাজের শ্রেষ্ঠ সত্য, এই চরম বাস্তববাণী তিনি উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন। শ্রমজীবী মানুষ—যাদের ঘামে ও রক্তে সভ্যতার চাকা ঘোরে, অথচ যারা সমাজে সবচেয়ে বেশি অবহেলিত, সেই কুলি-মজুর, কিষাণ-মজুরদের পক্ষে তিনি খাড়া করেছিলেন তাঁর অপরাজেয় সাহিত্যিক ইশতেহার। ‘কুলি-মজুর’ কবিতায় তিনি শোষক শ্রেণীকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করে বলেছেন যে, দিন আসছে যখন এই অবহেলিত মানুষেরাই সমস্ত হিসাব চুকিয়ে নেবে। এই যে শ্রেণীসচেতনতা এবং সর্বহারা মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াই, তা নজরুল সাহিত্যের সমাজচেতনার এক অনন্য দিক।
নজরুল সাহিত্যের আরেকটি অবিচ্ছেদ্য এবং সবচেয়ে পরিচিত উপাদান হলো বিদ্রোহের সুর। এই বিদ্রোহ কোনো অন্ধ বা ধ্বংসাত্মক বিশৃঙ্খলা ছিল না, বরং তা ছিল জরাজীর্ণ, স্থবির এবং অন্যায় সমাজব্যবস্থাকে ভেঙে এক নতুন ও সুন্দর সাম্যবাদী সমাজ গড়ার প্রত্যয়। তাঁর বিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবিতা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। এই কবিতায় তিনি নিজেকে বীর এবং বিদ্রোহী হিসেবে ঘোষণা করে সমস্ত অত্যাচারী ও শোষকের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছিলেন যে, উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল যতদিন আকাশে-বাতাসে ধ্বনিত হবে, ততদিন তাঁর এই বিদ্রোহী সত্তা শান্ত হবে না। নজরুলের এই বিদ্রোহ কেবল তৎকালীন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধেই ছিল না, তা ছিল সামন্তবাদ, ধর্মীয় গোঁড়ামি, কুসংস্কার এবং ভণ্ডামির বিরুদ্ধে এক সর্বাত্মক যুদ্ধ। তিনি দেখেছিলেন কীভাবে ধর্মের নামে সাধারণ মানুষকে শোষণ করা হচ্ছে, কীভাবে ধর্মের মূল বাণীকে বিকৃত করে সমাজে বিভেদ সৃষ্টি করা হচ্ছে। তাই তিনি ধর্মের এই বাহ্যিক আচার ও ভণ্ডামির ওপর তীব্র আঘাত হেনেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের হৃদয়ই হলো স্রষ্টার আসল উপাসনালয়, যেখানে কোনো কৃত্রিমতা বা ভেদাভেদ নেই। মন্দিরে বা মসজিদে নয়, মানুষের মাঝেই ঈশ্বরের সন্ধান করা উচিত—এই প্রগতিশীল ও বৈপ্লবিক চিন্তা সেকালের রক্ষণশীল সমাজে এক বিশাল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। নজরুলের বিদ্রোহ ছিল মূলত মানবতার পক্ষে এবং সমস্ত আমিত্ব ও জড়তার বিরুদ্ধে এক চিরন্তন যৌবনের ডাক।
নারীর অধিকার এবং সমাজে নারীর অবস্থান নিয়েও নজরুলের সমাজসচেতনতা ছিল অত্যন্ত প্রগতিশীল ও যুগোপযোগী। যে সমাজে নারীকে কেবল চার দেয়ালের মাঝে বন্দী রেখে অবদমিত করে রাখা হতো, সেই সমাজে নজরুল গেয়েছেন নারীর সমঅধিকারের জয়গান। ‘নারী’ কবিতায় তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন যে, বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি, তার অর্ধেক করেছে নারী আর অর্ধেক করেছে নর। তিনি পুরুষতান্ত্রিক সমাজের সেই স্বার্থপর মানসিকতাকে তীব্রভাবে আঘাত করেছেন, যা নারীকে কেবল ভোগের বস্তু বা পুরুষ অপেক্ষা হীন মনে করে। নজরুল বিশ্বাস করতেন, সমাজ বা রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন ততক্ষণ সম্ভব নয়, যতক্ষণ না জনসংখ্যার অর্ধেক অংশ তথা নারীরা পুরুষের পাশাপাশি সমান সুযোগ ও সম্মান নিয়ে দাঁড়াতে পারছে। এই আধুনিক ও বৈপ্লবিক দৃষ্টিভঙ্গি নজরুলকে তাঁর সমসাময়িক কবিদের চেয়ে এক আলাদা ও অনন্য উচ্চতায় আসীন করেছে। তিনি সমাজকে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, সাম্য ও প্রগতির পথে নারী-পুরুষের সম্মিলিত যাত্রাই পারে একটি সুন্দর ও শোষণমুক্ত সমাজ বিনির্মাণ করতে।
কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যে গণজাগরণের যে সুর ধ্বনিত হয়েছে, তা ছিল এক অভূতপূর্ব জাগরণী গান। পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ বাঙালি জাতিকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন এবং স্বাধীনতার মন্ত্রে দীক্ষিত করার ক্ষেত্রে তাঁর গান ও কবিতার ভূমিকা ছিল অতুলনীয়। ‘অগ্নি-বীণা’, ‘বিষের বাঁশী’, ‘ভাঙার গান’ প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থে তিনি তরুণ সমাজকে বিপ্লবের পথে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। তাঁর গান শুনলে ভীরু ও কাপুরুষের বুকেও সাহসের সঞ্চার হতো, ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার আগেও বিপ্লবীরা তাঁর গান গেয়ে উদ্বেলিত হতেন। ব্রিটিশ রাজশক্তি তাঁর এই গণজাগরণী শক্তির তীব্রতা অনুভব করতে পেরেছিল বলেই তাঁর একাধিক গ্রন্থ বাজেয়াপ্ত করেছিল এবং তাঁকে কারারুদ্ধ করেছিল। কিন্তু কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠও তাঁর ভেতরের সেই মুক্ত ও বিদ্রোহী চেতনাকে দমন করতে পারেনি। ‘কারার ওই লৌহ-কপাট’ ভেঙে ফেলার যে আহ্বান তিনি জানিয়েছিলেন, তা আজও যেকোনো স্বৈরাচারী ও অন্যায্য ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মূল অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে। নজরুলের গণজাগরণের মূল লক্ষ্য ছিল সাধারণ মানুষকে তাদের নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা এবং তাদের মনের ভেতরের ভয়কে দূর করা। তিনি চেয়েছিলেন সমাজ থেকে দাসত্বের মনোভাব সম্পূর্ণভাবে মুছে যাক এবং প্রতিটি মানুষ যেন পূর্ণ আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার লাভ করে।
বর্তমান একবিংশ শতাব্দীর বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে যখন আমরা নজরুলের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন করছি, তখন তাঁর সমাজসচেতনতা ও বিদ্রোহের প্রাসঙ্গিকতা একটুও কমেনি, বরং আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। আজ বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক বৈষম্য, ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা, বর্ণবাদ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের যে ভয়াবহ চিত্র আমরা দেখতে পাই, তার সঠিক প্রতিষেধক রয়েছে নজরুল সাহিত্যে। আজ যখন সমাজে মানবতার চেয়ে মুনাফা বড় হয়ে ওঠে, যখন ধর্মের দোহাই দিয়ে মানুষকে বিভক্ত করার চেষ্টা করা হয়, তখন নজরুলের সাম্যবাদী চেতনা আমাদের পথ দেখায়। তাঁর সাহিত্য আমাদের শেখায় কীভাবে সব ধরনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হয় এবং কীভাবে নিজের ক্ষোভকে সৃজনশীল ও বৈপ্লবিক রূপ দিয়ে সমাজের কল্যাণে নিয়োজিত করা যায়। নজরুল কেবল একটি নির্দিষ্ট যুগের বা দেশের কবি ছিলেন না; তিনি ছিলেন বিশ্বমানবতার কবি, চিরকালের চিরবিদ্রোহী ও চিরসুন্দর এক সত্তা।
শেষে বলা যায়, কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য আলোর মশাল, যা যুগ যুগ ধরে সমাজকে পথ দেখিয়ে আসছে। তাঁর সমাজসচেতনতা কোনো তত্ত্বের গভীরে বন্দী ছিল না, তা ছিল সাধারণ মানুষের জীবনের রক্ত-মাংসের বাস্তবতার সাথে যুক্ত। আর তাঁর বিদ্রোহের সুর ছিল এক নতুন, সুন্দর এবং বৈষম্যহীন পৃথিবী গড়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। তিনি তাঁর লেখনীর মাধ্যমে যে গণজাগরণের সূত্রপাত করেছিলেন, তা আজও আমাদের হৃদয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার উদ্দীপনা জোগায়। নজরুল সাহিত্যের এই গভীর সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং দ্রোহের বাণী বাঙালি জাতির এক অমূল্য সম্পদ। যতদিন সমাজে অন্যায়, অত্যাচার, শোষণ এবং বৈষম্য থাকবে, ততদিন নজরুল আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন তাঁর রণতূর্য নিয়ে, তাঁর বিদ্রোহী চেতনা নিয়ে এবং আমাদের অনুপ্রাণিত করবেন এক মুক্ত, সুন্দর ও মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে।
লেখক:

আলমগীর মোহাম্মদ
সহকারী অধ্যাপক
বাংলাদেশ আর্মি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, কুমিল্লা।
সদস্য, জাতীয় কবির সাহিত্যকর্ম ইংরেজি অনুবাদ ও রিভিউ কমিটি।