বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতিতে নতুন নেতৃত্বের প্রশ্নটি সাধারণ জনগণের নিকট অত্যন্ত আলোচিত বিষয়ে পরিনত হয়েছে। গ্রাম থেকে শহর-সর্বত্র এ আলোচনা হরহামেশাই শোনা যায়। এটি কেবল ভবিষ্যৎ বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদলে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তা, সামাজিক সংহতি এবং উন্নয়নের জন্যও সমভাবে অন্তর্ভুক্ত করে। বাংলাদেশের ভবিষ্যত রাজনীতির গতি-প্রকৃতি নির্মাণেও তা তাৎপর্যপূর্ণ ভাষা নির্মাণ করছে। সাম্প্রতিক ব্যারিস্টার জাইমা রহমানের এক ফেসবুক পোস্ট সেই নতুন রাজনৈতিক ভাষারই এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে। তিনি তার পোস্টে দেশের নারী ক্রিকেট দল, কাবাডি দল, হকি দল এবং তরুণ ক্রীড়াবিদদের অর্জনকে অভিনন্দন জানানোর মাধ্যমে ক্রীড়াঙ্গনে তার উপস্তিতি উপস্তিতি জানান দিয়েছেন। তার এ উপস্থিতি কেবল শুভেচ্ছা বিনিময় নয়, বরং এর ভেতরে লুকিয়ে আছে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নির্মাণের এক রাজনৈতিক দর্শন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রিয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হল অবকাঠামো নির্মাণ, নির্বাচন কিংবা ক্ষমতার সমীকরণ। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রে রাজনীতিবিদদের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো সমাজের বিভিন্ন শক্তিকে একত্রিত করা। সকল শ্রেণীর মানুষের সমন্বয়ে একটা সম্মিলিত শক্তি তৈরি করা। ক্রীড়াঙ্গনে জাইমা রহমানের উপস্থিতি মূলত সেই সামাজিক শক্তি ও সংহতিরই সুস্পষ্ট ইঙ্গিত প্রদান করে।
তিনি একটা বিষয় স্পষ্ট করেছেন যে, খেলাধুলা শুধু বিনোদন বা প্রতিযোগিতার বিষয় নয়, বরং এটি সামাজিক ঐক্য, আন্তর্জাতিক বন্ধুত্ব এবং তরুণ প্রজন্মের বিকাশের একটি শক্তিশালী মাধ্যম।
তার এই দৃষ্টিভঙ্গি একটি সমন্বিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিচয় বহন করে যা আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণের বলিষ্ঠ নেতৃত্বের ইঙ্গিতবাহী। এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, তিনি নারী ক্রীড়াবিদদের অর্জন, বিশেষ করে-নারী কাবাডি দলের এশিয়ান বিচ গেমসে ব্রোঞ্জ পদক বিজয় কিংবা নারী হকি দলের ইতিহাস গড়ার ঘটনাকে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিকভাবে সামনে এনেছেন। তিনি একটা শক্তিশালী জাতি নির্মানে নারীর কার্যকর অংশগ্রহণের অপরিহার্যতাকে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, বাংলাদেশের পরিপূর্ণ উন্নয়নমুখী যাত্রা শুরু করতে হলে প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর গতিশীল অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
আগামীর বিশ্বে নারীর ক্ষমতায়ন শুধু সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন নয়; এটি অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় অগ্রগতির অন্যতম শর্ত। পৃথিবীর অনেক দেশ জনসংখ্যা সংকোচনের কারণে শ্রমবাজারের ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও ক্রম-হ্রাসমান যোগানের সন্মুখীন হচ্ছে। ফলে শ্রম বাজারের অস্থিতিশীল অবস্থা স্বাভাবিকীকরণের লক্ষ্যে কর্মক্ষেত্রে নারীদের গতিশীল উপস্থিতি উৎসাহিত করছে।
এ লক্ষ্যে তারা নানাবিধ প্রোগ্রাম বাস্তবায়ন করছে। তাই, জাইমা রহমান বাংলাদেশের শ্রমবাজারের সম্ভাব্য যোগানের উপর আলোকপাত করেছেন।
তাঁর এই অবস্থান আধুনিক ও বাস্তবমুখী ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। কারণ, ক্রীড়াক্ষেত্রে নারীদের উপস্থিতি প্রতীকী। বরং সামষ্টিক উৎপাদন কৌশলে নারীদের প্রধান ও শক্তিশালী প্রভাবক হিসেবে আবির্ভাবই হবে জাতি গঠনে মূল পাতেয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিনি তরুণদের জন্য নিরাপদ, কাঠামোবদ্ধ ও প্রতিযোগিতামূলক ক্রীড়া পরিবেশ তৈরির কথা বলেছেন। এটি নিছক ক্রীড়ার অবকাঠামোর আলোচনা নয়; বরং একটি প্রজন্মকে সুশৃঙ্খল, দক্ষ এবং আত্মবিশ্বাসী নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার রূপরেখা। বর্তমান বিশ্বে যে রাষ্ট্র তরুণদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য বিনিয়োগ করছে, তারাই ভবিষ্যতের নেতৃত্বে এগিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশের জনগণের গড় বয়স ২৬.৩ বছর। এ সংখ্যাটি নির্দেশ করে যে দেশের অর্ধেক মানুষের বয়স ২৬.৩ বছর বা তার চেয়ে কম। বিপুল এ তরুণ জনগোষ্ঠীর সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারলেই আমরা উন্নত ও আধুনিক বাংলাদেশে পদার্পণ করতে পারব। তাই, জাইমা রহমান তরুণদের পাশে দাঁড়িয়ে সমৃদ্ধির পথে তার অদম্য যাত্রার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
একটি দেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে সময়ের প্রয়োজনকে কতটা সঠিকভাবে উপলব্ধি করা যায়, তার উপর। জাইমা রহমানের এ উপলব্ধি অত্যন্ত পরিষ্কার ও সময়োপযোগী। তিনি আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণকে কেবল প্রশাসনিক কার্যক্রম হিসেবে দেখছেন না; বরং মানবসম্পদ, সংস্কৃতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও সামাজিক শক্তিকে একত্রিত করার একটি বৃহৎ প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করেন।
আগামী দশকে বাংলাদেশের জনগণ এমন নেতৃত্বই খুঁজবে, যারা বিভাজন নয়, সম্ভাবনার ভাষায় কথা বলবে। যারা উন্নয়নকে শুধু অবকাঠামোগত প্রপঞ্চ নয়, বরং মানুষের স্বপ্ন ও সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত করবে। সেই বিবেচনায় বলা যায়, ক্রীড়া নিয়ে জাইমা রহমানের সাম্প্রতিক অবস্থান ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার প্রাসঙ্গিকতার পক্ষে একটি তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা প্রদান করে।
মো: রায়হান উদ্দিন
শিক্ষক ও লেখক