আগামী জুন থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ঢাকা-টোকিও (নারিতা) রুট পুনরায় চালুর উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন সাউথ কোরিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশিরা। একই সঙ্গে তারা এই রুটে সাউথ কোরিয়ার ইনচন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে স্বল্প সময়ের ট্রানজিট বা স্টপওভার সুবিধা চালুর দাবি জানিয়েছেন।
কোরিয়া প্রবাসী বাংলাদেশিদের মতে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে শুধু প্রবাসীরাই উপকৃত হবেন না; বরং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সও নতুন যাত্রী বাজার পেতে পারে। বিশেষ করে অতীতে যাত্রীসংখ্যা কম থাকায় টোকিও রুটটি বাণিজ্যিক চাপে পড়ার কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। তবে ইনচন ট্রানজিট চালু হলে যাত্রীসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাউথ কোরিয়ায় নব্বইয়ের দশক থেকে বাংলাদেশিদের যাওয়া বাড়তে শুরু করে। প্রতি বছরই সেখানে বাংলাদেশিদের উপস্থিতি বাড়ছে। সাউথ কোরিয়ার এমপ্লয়মেন্ট পারমিট সিস্টেম (ইপিএস)-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮-২০২৩ সাল পর্যন্ত ৩১ হাজারের বেশি বাংলাদেশি কর্মী দেশটিতে গেছেন। এছাড়া সেখানে রয়েছেন শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, গবেষক ও বিভিন্ন পেশাজীবী। তাদের আত্মীয়-স্বজন ও পরিবারের সদস্যদের একটি অংশও নিয়মিত সাউথ কোরিয়ায় যাতায়াত করেন। ফলে দুই দেশের মধ্যে যাত্রী চলাচলও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।
এছাড়া ২০২৪ সালে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য সাউথ কোরিয়া ১১ হাজার ৫০০ জনের কর্মী কোটার ঘোষণা দিয়েছে। ফলে আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশ ও সাউথ কোরিয়ার মধ্যে যাত্রী চলাচল আরো বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে এখনো বাংলাদেশ ও সাউথ কোরিয়ার মধ্যে সরাসরি কোনো ফ্লাইট নেই। ফলে অধিকাংশ যাত্রীকে ব্যাংকক, কুয়ালালামপুর, সিঙ্গাপুর, হংকং বা চায়নার বিভিন্ন শহর হয়ে যাতায়াত করতে হয়। এতে সময় ও খরচ দুটোই বাড়ে। বিশেষ করে পরিবারসহ ভ্রমণকারী, বয়স্ক যাত্রী, শিক্ষার্থী ও নতুন কর্মীদের জন্য এ ধরনের যাত্রা অনেক সময় কষ্টকর হয়ে দাড়ায়।
বর্তমানে ঢাকা-কোরিয়া রুটে যাতায়াতকারী বাংলাদেশি যাত্রীদের বড় একটি অংশ চায়নার বিভিন্ন এয়ারলাইন্স, সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স, থাই এয়ারওয়েজ, ক্যাথে প্যাসিফিক ও মালয়শিয়ান এয়ারলাইন্সসহ বিভিন্ন ট্রানজিটভিত্তিক ফ্লাইট ব্যবহার করেন। তবে এসব রুটে যাত্রীদের বাড়তি সময়, খরচ ও ভোগান্তির মুখোমুখি হতে হয় বলে জানিয়েছেন প্রবাসীরা।
কোরিয়া প্রবাসী বাংলাদেশিদের মতে, তুলনামূলক কম ভাড়ার কারণে অনেকে চায়না এয়ারলাইন্স ব্যবহার করলেও এসব রুটে অনেক সময় একাধিক ট্রানজিট, দীর্ঘ অপেক্ষা, ফ্লাইট পরিবর্তন এবং দুই থেকে তিন ধাপের যাত্রা সম্পন্ন করতে হয়। এতে বয়স্ক যাত্রী, নারী, শিশু, শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও প্রথমবার বিদেশগামী যাত্রীদের জন্য যাত্রা জটিল হয়ে পড়ে। পাশাপাশি দীর্ঘ ট্রানজিট, বারবার নিরাপত্তা তল্লাশি এবং কানেক্টিং ফ্লাইট মিস হওয়ার ঝুকিও থাকে। কম-বেশি একই অবস্থা সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স, ক্যাথে প্যাসিফিক বা থাই এয়ারওয়েজে।
প্রবাসীদের দাবি, ঢাকা-টোকিও রুটে ইনচন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে স্বল্প সময়ের ট্রানজিট সুবিধা যুক্ত করা গেলে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যকার যাত্রীদের জন্য একটি তুলনামূলক সহজ, কম ঝামেলাপূর্ণ ও প্রতিযোগিতামূলক বিকল্প তৈরি হতে পারে।
তারা বলছেন, ‘টোকিও রুটকে শুধু জাপানগামী রুট হিসেবে না দেখে পূর্ব এশিয়ায় বাংলাদেশের বৃহত্তর আকাশ যোগাযোগ কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ দক্ষিণ কোরিয়া বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার, প্রযুক্তি সহযোগী ও বিনিয়োগকারী দেশে পরিণত হয়েছে।
দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য এরই মধ্যে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌছেছে বলে বিভিন্ন অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ইপিজেড, অবকাঠামো, জাহাজ নির্মাণ, ইলেকট্রনিকস ও শিল্প খাতে কোরিয়ান বিনিয়োগও বাড়ছে।’
এদিকে দক্ষিণ কোরিয়ায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বাড়ছে। উচ্চশিক্ষা, প্রযুক্তি ও গবেষণার সুযোগ বাড়ায় প্রতি বছর নতুন শিক্ষার্থীরা দেশটিতে যাচ্ছেন।
প্রবাসীদের মতে, শুধু বাংলাদেশি নয়; বাংলাদেশে ব্যবসা, বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা ও বিভিন্ন কাজে আসা দক্ষিণ কোরিয়ার নাগরিকদের জন্যও এই রুট কার্যকর হতে পারে। বর্তমানে তাদেরও অধিকাংশকে তৃতীয় কোনো দেশ হয়ে বাংলাদেশে যাতায়াত করতে হয়।
এই প্রেক্ষাপটে কোরিয়া প্রবাসী বাংলাদেশিরা অনলাইনে একটি মতামত সংগ্রহ ও আবেদনভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল চালু করেছেন। পোর্টালের ঠিকানা: petition2biman.com। এর মাধ্যমে কোরিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশি এবং কোরিয়াগামী সম্ভাব্য যাত্রীরা নিজেদের মতামত ও সমর্থন জানাতে পারছেন।
পোর্টাল নির্মাতাদের ভাষ্য, ‘এটি কোনো ব্যক্তিগত দাবি নয়। এটি কোরিয়া প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির একটি বাস্তব ও সময়োপযোগী দাবি। ইনচন ট্রানজিট চালু হলে হাজারো বাংলাদেশি উপকৃত হবেন। একই সঙ্গে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সও নতুন যাত্রীবাজার পাবে।’
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ইনচন ট্রানজিট নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি। তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, যাত্রীসংখ্যা, শ্রমবাজার, শিক্ষা ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনার দিক বিবেচনা করলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা যেতে পারে।