ঢাকা | রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঈদ যাত্রায় ভোগান্তি কমাতে সরকারের পদক্ষেপে স্বস্তির আশা

author
এ এইচ এম ফারুক

প্রকাশিত : ২৪ মে, ২০২৬ দুপুর ২:০৩
ad003
বাঙালি মুসলমানের ধর্মীয় সংস্কৃতির অন্যতম বড় দুটি উৎসবের একটি হলো পবিত্র ঈদুল আযহা। এই উৎসবকে কেন্দ্র করে প্রতি বছরই রাজধানী ঢাকা ও এর চারপাশের শিল্পাঞ্চল থেকে লাখ লাখ মানুষ নাড়ির টানে, পরম আত্মীয়ের সান্নিধ্য পেতে ছুটে যান গ্রামের বাড়িতে। কোরবানি ঈদ মানেই শুধু মানুষের বাড়ি ফেরা নয়। এর সাথে মহাসড়কে যুক্ত হয় লাখ লাখ পশুবাহী ট্রাক। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাটে পশুর সরবরাহ নিশ্চিত করার এক বিশাল অর্থনৈতিক ও লজিস্টিক কর্মযজ্ঞ। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এই সময়ে দেশের সড়ক, রেল ও নৌপথের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়, যা অতীতে ঘরমুখো মানুষের জন্য চরম ভোগান্তি, দীর্ঘ যানজট এবং অন্তহীন দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। 

তবে কদিন বাদে আসন্ন পবিত্র ঈদুল আযহাকে সামনে রেখে এবারের চিত্রটি ভিন্ন হতে চলেছে বলে আশা করা হচ্ছে। ঈদ যাত্রায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ও দুর্ভোগ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে সরকারের পক্ষ থেকে এবার নেওয়া হয়েছে নজিরবিহীন, সমন্বিত ও অত্যন্ত কার্যকর কিছু পদক্ষেপ। একই সাথে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা এবং পরিবহন খাতের আধুনিকায়নে প্রযুক্তির ব্যবহার যুক্ত হওয়ায় এবারের ঈদ যাত্রায় একটি বড় ধরনের স্বস্তির সুবাতাস বইতে শুরু করেছে।

এবারের ঈদ যাত্রাকে সম্পূর্ণ ভোগান্তিমুক্ত এবং নিরাপদ করার পেছনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে বর্তমান সরকারের দূরদর্শী পরিকল্পনা। বিশেষ করে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেই এই বিশাল কর্মযজ্ঞের সার্বিক নির্দেশনা দিচ্ছেন এবং সামগ্রিক প্রস্তুতি নিবিড়ভাবে তদারকি করছেন। মূলত তাঁর ব্যক্তিগত সদিচ্ছা, জনবান্ধব মানসিকতা এবং কঠোর নজরদারির কারণেই প্রশাসনের প্রতিটি স্তর এবার অত্যন্ত সক্রিয় ও জবাবদিহিতার আওতায় এসেছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন যে, ঈদে ঘরমুখো একজন মানুষকেও যেন রাস্তায় কোনো প্রকার অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ভোগ পোহাতে না হয়। তাঁর এই কঠোর অবস্থান এবং সরাসরি তদারকির ফলেই সড়ক পরিবহন, স্বরাষ্ট্র, রেলওয়ে এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সমন্বিতভাবে একটি মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করেছে। শীর্ষ পর্যায় থেকে নিয়মিত খোঁজ-খবর নেওয়ার কারণে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সাথে দায়িত্ব পালন করছে, যা সাধারণ মানুষের মনে এক বিশাল স্বস্তির ও আস্থার জায়গা তৈরি করেছে।

বিগত বছরগুলোতে ঈদ যাত্রার সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসত দেশের প্রধান প্রধান মহাসড়কগুলোতে। এবার এই ভোগান্তি দূর করতে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, হাইওয়ে পুলিশ এবং বিআরটিএ যৌথভাবে একগুচ্ছ কঠোর ও বৈজ্ঞানিক কৌশল হাতে নিয়েছে। মহাসড়কে যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ হলো ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল এবং মাঝপথে সেগুলোর বিকল হয়ে যাওয়া। এবার যেন কোনোভাবেই ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি নামতে না পারে, সেজন্য ভ্রাম্যমাণ আদালতের কঠোর নজরদারি শুরু হয়েছে। যদি কোনো গাড়ি বিকল হয়েও পড়ে, তা দ্রুত সরিয়ে রাস্তা সচল করতে মহাসড়কের ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে সার্বক্ষণিক রেসকিউ ক্রেন ও শক্তিশালী র‍্যাকার প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

পাশাপাশি, এবার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার করে মহাসড়কের যানজটের রিয়েল-টাইম চিত্র পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এর ফলে যানজট তৈরি হওয়ার আগেই তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী ঈদের আগের ও পরের ৩ দিন মহাসড়কে ভারী পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও লরি চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এবারের ঈদ যাত্রার প্রাক্কালে সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক পরিবর্তনটি দেখা যাচ্ছে ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায়। রাজধানীর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত এলাকায় সম্প্রতি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘এআই ক্যামেরা মামলা পদ্ধতি’ চালু করা হয়েছে। এই স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারী গাড়ি, যত্রতত্র লেন পরিবর্তন এবং অবৈধ পার্কিং নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করে স্বয়ংক্রিয় মামলা ও জরিমানা পৌঁছে দিচ্ছে। হুট করে জরিমানা খাওয়ার ভয়ে চালকদের মাঝে আইন মানার এক ইতিবাচক প্রবণতা তৈরি হয়েছে। রাজধানীর ভেতরের এই ডিজিটাল শৃঙ্খলা ঈদ যাত্রার শুরুতে ঢাকার এক্সিট পয়েন্টগুলোকে যানজটমুক্ত রাখতে বিশাল ভূমিকা রাখছে।

রেলওয়ের ডিজিটাল সংস্কারের ফলে এবারও শতভাগ অগ্রিম টিকিট অনলাইনের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়েছে। টিকিটের কালোবাজারি পুরোপুরি বন্ধ করতে জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই এবং ওটিপি সিস্টেম চালুর মাধ্যমে ‘যার টিকিট তার ভ্রমণ’ নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ সামাল দিতে নিয়মিত ট্রেনের পাশাপাশি যুক্ত করা হয়েছে বিশেষ ‘ঈদ স্পেশাল’ ট্রেন। স্টেশনে যেন টিকিটহীন কোনো যাত্রী প্রবেশ করতে না পারে এবং ট্রেনের ছাদে চড়ে কেউ ভ্রমণ করতে না পারে, সেজন্য তিন স্তরের নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে।

অন্যদিকে, নৌপথের যাত্রা নিরাপদ করতে বিআইডব্লিউটিএ, কোস্টগার্ড এবং নৌ-পুলিশ যৌথভাবে কাজ করছে। সদরঘাটসহ প্রধান প্রধান নদীবন্দরে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে যেন কোনো লঞ্চ বা স্পিডবোট ঘাট ছাড়তে না পারে, সেজন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে সার্বক্ষণিক টাস্কফোর্স দায়িত্ব পালন করছে। ফেরি ঘাটগুলোতে ঈদে ঘরমুখো যাত্রীবাহী বাস এবং কোরবানির পশুবাহী ট্রাক পারাপারের জন্য বিশেষ অগ্রাধিকার বা প্রায়োরিটি লেনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

কোরবানির পশু নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া ট্রাকে পথে পথে চাঁদাবাজি বা জোরপূর্বক নির্দিষ্ট হাটে গাড়ি ঢুকিয়ে দেওয়ার মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা রোধে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রশাসন এবার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে— পশুবাহী কোনো গাড়ি চালকের ইচ্ছা ছাড়া কোথাও থামানো যাবে না। পশুর হাটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি এবার ডিজিটাল লেনদেন বা ক্যাশলেস ব্যাংকিং বুথ স্থাপন করা হয়েছে, যা ক্রেতা-বিক্রেতাদের বড় স্বস্তি দিচ্ছে।

একই সাথে, একশ্রেণীর অসাধু পরিবহন ব্যবসায়ী যেন সাধারণ যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করতে না পারে, সেজন্য প্রতিটি বাস ও লঞ্চ টার্মিনালে বিআরটিএ, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত ভিজিল্যান্স টিম কাজ করছে। প্রতিটি টার্মিনালে যাত্রীদের বসার জন্য আধুনিক ছাউনি, বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের জন্য অস্থায়ী মেডিকেল টিম মোতায়েন করা হয়েছে।

এবারের ঈদুল আযহায় সরকারের নেওয়া দূরদর্শী পদক্ষেপ এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরাসরি তদারকি প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রীয় সদিচ্ছা ও প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার থাকলে জনভোগান্তি চিরতরে দূর করা সম্ভব। ড্রোনের মাধ্যমে মহাসড়ক পর্যবেক্ষণ, রেলের শতভাগ অনলাইন টিকিট এবং ঢাকার এআই ক্যামেরা চালুর মতো আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক উদ্যোগগুলো দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

তবে সরকারের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ তখনই শতভাগ সফল হবে, যখন দেশের সাধারণ নাগরিক, পরিবহন মালিক ও চালকেরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেবেন। ট্রাফিক আইন মেনে চলে এবং ধৈর্যের সাথে বিশৃঙ্খলা এড়িয়ে আমরা সবাই মিলে এবারের ঈদ যাত্রাকে নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক এবং আনন্দময় করে তুলতে পারি।

লেখক: এ এইচ এম ফারুক (A H M Faruk)
সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
ইমেইল: [email protected] 

 

সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SH.AL

SH.AL

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT