পবিত্র ঈদুল আযহা আর মাত্র হাতে গোনা কয়েকদিন বাকি। আর এই উৎসবকে কেন্দ্র করে দেশের অন্যতম প্রধান শিল্পাঞ্চল সাভার ও আশুলিয়ার পোশাক কারখানার লাখ লাখ শ্রমজীবী মানুষের মনে এখন কেবলই বাড়ি ফেরার আকুলতা। সকল ক্লান্তি ভুলে, নাড়ির টানে নিজ নিজ গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে ইতিমধ্যেই ছুটতে শুরু করেছেন এ অঞ্চলের বিভিন্ন পেশা ও শ্রমজীবী মানুষ। মহাসড়কে ভোগান্তির শঙ্কা ছাপিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে ঈদ উৎসবের আমেজ।
রোববার (২৪ মে) বিকেল থেকেই সাভার বাসস্ট্যান্ড, , নবীনগর, বাইপাইল, বাসস্ট্যান্ড গুলোতে ঘরমুখো মানুষের ভিড় জমতে শুরু করেছে। আর এক দুই দিনের মধ্যে উপচে পড়া ভিড়ে পরিণত হবে এসকল বাস টার্মিনাল গুলো। তবে ঘরমুখো মানুষের ঢাকা-আরিচা এবং নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কে ভোগান্তির শঙ্কা রয়েছে।
মহাসড়কের বর্তমান চিত্র:
কোথাও স্বস্তি, কোথাও ধীরগতি। মহাসড়কে যত্রতত্র গাড়ি থামিয়ে যাত্রী উঠানামা করানো, ব্যাটারি চালিত অটো রিকশা চলাচল, ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের চলমান নির্মাণকাজ এবং সড়কের কিছু স্থানে ইউর্টানে অনিয়ন্ত্রিত যানবাহন চলাচলের কারণে এ ভোগান্তির শঙ্কা করছেন পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও মহাসড়কে চলাচলকারীরা।
আজ রোববার ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক ও নবীনগর থেকে চন্দ্রা মহাসড়কের বেশ কয়েকটি স্থান ঘুরে দেখা যায়, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ড, বলিয়ারপুর বাসস্ট্যান্ড, সাভারের পাকিজা পয়েন্ট, থানা স্ট্যান্ড, সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ড, নবীনগর বাসস্ট্যান্ড এবং নবীনগর থেকে চন্দ্রা মহাসড়কের বাইপাইল, পল্লী বিদ্যুৎ ও বলিভদ্র বাসস্ট্যান্ড এলাকায় মহাসড়কে বেপরোয়াভাবে নিষিদ্ধ ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা চলাচল করছে। সাভার, নবীনগর, রেডিও কলোনি ও বাইপাইল বাসস্ট্যান্ডে যাত্রীপরিবহন বাসগুলোকে মহাসড়কের নিরবিচ্ছিন্নভাবে চলাচলের লেনে আড়াআড়ি করে পেছনের বাসকে আটকে দিয়ে যাত্রী উঠানামা করাতে দেখা যায়। বাসস্ট্যান্ডের নির্দিষ্ট স্থান ছাড়াও এলোমেলোভাবে যত্রতত্র বাস থামিয়ে যাত্রী উঠানামা করাতে দেখা যায়।
আশুলিয়ার বাইপাইল বাসস্ট্যান্ডেও একই চিত্র দেখা যায়। বাইপাইল বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের চলমান নির্মাণকাজের কারণে কিছু অংশে সড়কের পিচঢালা আস্তরণ উঠে গিয়ে ছোট আকৃতির গর্ত তৈরী হয়েছে। ইট দিয়ে কিছু অংশ মেরামত করা হয়েছে।
কুড়িগ্রাম লালমনিরহাট হয়ে রংপুরগামী এস আর ট্রাভেলস এর ড্রাইভার শহীদুল ইসলাম যায়যায়দিনকে বলেন, "আজকে মহাসড়কে তেমন একটা যানজট নাই। বাইপাইল চন্দ্রা মহাসড়কের খানাখন্দে একটু ধীরগতিতে চলতে হয়। তবে অটো রিক্সার ফলে ভোগান্তি বাড়বে আরো, ঈদের আগে প্রচুর চাপ থাকবে তখন সমস্যা হবে। সড়কে পুলিশ ঠিকঠাক দায়িত্ব পালন করলে সমস্যা একটু কম হবে"।
(চড়া ভাড়া ও বাসের সংকট, তবু থেমে নেই যাত্রা)
ঈদুল আযহা ২০২৬ এ আগামীকাল সোমবার (২৫ মে) থেকে সাভার-আশুলিয়ার পোশাক কারখানাগুলো তিনটি ধাপে ছুটি শুরু হবে। প্রথম ধাপে ২৫ মে ৩৭ শতাংশ ও ২৬ মে দ্বিতীয় ধাপে সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ৪৩ শতাংশ এবং ২৭ মে সবশেষ ধাপে ২০ শতাংশ শিল্প কারখানা ছুটি ঘোষণা করা হবে।
রোববার বিকেল থেকেই মহাসড়কগুলোতে ঘরমুখ মানুষের যাত্রা দেখা যায়। প্রতিবছরের মতো এবারও ঘরমুখো মানুষের প্রধান অভিযোগ—টিকিটের অতিরিক্ত মূল্য এবং বাসের কৃত্রিম সংকট।
উত্তরবঙ্গের সিরাজগঞ্জগামী যাত্রী আশরাফুল আলম আশুলিয়ার একটি ফার্নিচার ফ্যাক্টরির কর্মী, তিনি দৈনিক যায়যায়দিনকে বলেন, "ঈদযাত্রায় বিভিন্ন ঝামেলা এড়াতে গার্মেন্টস ছুটি হওয়ার আগেই বাড়িতে যাচ্ছি। সারা বছর হাড়ভাঙা খাটুনি খাটি একটু শান্তিতে মা-বাবার সাথে ঈদ করার জন্য। কিন্তু বাসওয়ালারা আমাদের পকেট কাটার ধান্দায় থাকে। গার্মেন্টস ছুটির আগেই ৪০০ টাকার ভাড়া চাচ্ছে ১০০০ টাকা!"।
ঈদের এই সময়টিতে নিয়মিত বাসের টিকিট না পাওয়া আরেকটি ভোগান্তি যাত্রীদের জন্য। নিয়মিত বাসের টিকিট না পেয়ে অনেকেই গ্রুপিং করে লোকাল বাস, ট্রাক, পিকআপ ভ্যান, এমনকি মিনিবাস পর্যন্ত ভাড়া করে রাখছেন অগ্রিম। ঝুঁকিপূর্ণ হলেও ঈদের ছুটিতে স্বজনদের কাছে যাওয়ার যাত্রাটা যেন নিশ্চিত হয়।
রংপুরের বাসিন্দা হামিদুজ্জামান আশুলিয়ার ফোরস্টার ফ্যাশন নামের একটি জ্যাকার্ড ফ্যাক্টরিতে চাকরি করেন, সপরিবারে যাবেন ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়ি। দশ দিন আগে থেকে বিভিন্ন পরিবহনের কাউন্টারে খোঁজাখুঁজি করেও সংগ্রহ করতে পারেননি টিকিট। তাই গার্মেন্টসের অন্যান্য সহকর্মীদের নিয়ে করেছেন একটি গ্রুপ, যাদের গ্রামের বাড়ি সবার উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায়। ছুটিতে যাত্রা নিশ্চিত করতে একত্রে যাবেন, এই উপলক্ষে অগ্রিম বুকিং দিয়েছেন একটি ট্রাক। ট্রাকটি উত্তরবঙ্গ থেকে বাইপেল কাঁচা বাজারে মালামাল বহন করে নিয়ে আসে, ফিরতি পথে ২৬ মে তাদেরকে নিয়ে যাবে গন্তব্যস্থলে। তিনি বলেন, "নারী ও শিশুদের নিয়ে এই তীব্র গরমে এইধরনের যাত্রায় চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয় আমাদের । তবুও ঈদে স্বপরিবারে গ্রামের বাড়িতে যাবো সে আশা এই কষ্ট মেনে নেই"।
বাইপাইল আড়ংয়ের কাঁচামাল ব্যবসায়ী মাহাবুবুর রহমান দৈনিক যায়যায়দিনকে বলেন, '২৬ মে রাতে আমার পরিবার সহ বিভিন্ন গার্মেন্টসের ৬০ জন শ্রমিক একসাথে রাজশাহী যাওয়ার উদ্দেশ্যে একটি বাস ভাড়া করেছি। আগে ট্রাক ভাড়া করে যেতাম খরচ কম হতো জন প্রতি ৩শ ৪শ করে ৬০/৬৫ জন যেতাম। এতে অনেক কষ্ট হয় তাই এবার বাসে যাবো। ১০০০ টাকা করে মোট ৬০ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হবে। বাসে ৪৫ টি সিট থাকলেও কষ্ট করে ৬০ জনকেই যেতে হবে এই বাসে'।
প্রশাসনের তৎপরতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাঃ
যানজট নিরসন এবং ঘরমুখো মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঢাকা জেলা পুলিশ ও সাভার-আশুলিয়া ট্রাফিক বিভাগ ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। মোড়ে মোড়ে মোতায়েন রয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ ফোর্স। পাশাপাশি নিরাপদ সড়ক চাই এর ভলেন্টিয়াররা কাজ করবেন মহাসড়কে।
ঢাকা জেলা (উত্তর) ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শক (প্রশাসন) রুহুল আমিন সোহেল দৈনিক যায়যায়দিনকে বলেন, "মহাসড়কে ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে সকাল ৮ টা থেকে (আজ রোববার থেকে) নিয়মিত ট্রাফিক পুলিশের পাশাপাশি ঢাকা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত আরো ৬৫০ জন পুলিশ সদস্য মোতায়েন আছে। যারা তিনটি শিফটে ডিউটি করবে। সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২ টা, দুপুর ২ টা থেকে রাত দশটা এবং রাত দশটা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবে। এছাড়াও ঈদে গার্মেন্টস ছুটি হলে লক্ষ লক্ষ গার্মেন্টস কর্মীদের ঈদ যাত্রায় বাইপেল ও নবীনগর মহাসড়কের দুই পাশে দূরপাল্লার বাস দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষমান থাকে। এ বাসগুলোর কারণে যেন মহাসড়কের কোন ভোগান্তির সৃষ্টি না হয় সেজন্য বিশেষ নজরদারি রাখা হবে। এবং বাড়তি ভাড়া আদায় যেন না করতে পারে সেজন্য সার্বক্ষণিক দুইজন ম্যাজিস্ট্রেট কাজ করবেন। এছাড়াও ফিটনেসবিহীন গাড়ি এবং মহাসড়কে উল্টো পথে গাড়ি চালানো বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে"।
নিরাপদ সড়ক চাই আশুলিয়া শাখার সভাপতি জিএম মিন্টু যায়যায়দিনকে জানান, 'আশুলিয়া বাইপাইল ও বাইপাইল চন্দ্রা মহাসড়কে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের চলমান কাজে মহাসড়কে যানজটের সৃষ্টি হয়ে থাকে। এছাড়াও অটো রিক্সার যত্রতত্র চলাচলে ঈদযাত্রায় ভোগান্তির সৃষ্টি হবে। তবে এসকল বিশৃঙ্খলা মোকাবেলায় মহাসড়কে পুলিশের পাশাপাশি নিরাপদ সড়ক চাই আশুলিয়া শাখার কর্মীরা কাজ করবে'।
হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহজাহান মিয়া বলেন, ঈদ যাত্রা শুরু হয়ে গেছে গত বৃহস্পতিবার থেকে। মহাসড়কে ধীরে ধীরে চাপ বাড়ছে। তবে কোরবানির ঈদ তো, গবাদি পশুবাহী ট্রাক গুলো ঢুকছে এতে সামনের দুই একদিনে একটু চাপ থাকবে মহাসড়কে। এছাড়া ওইরকম দীর্ঘস্থায়ী যানজট হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এছাড়াও গার্মেন্টস শিল্প তিন ধাপে ছুটি দিবে ২৫ তারিখ থেকে ছুটি শুরু হবে। আমাদের জনবল খুবই সীমিত, আমাদের থানা পুলিশের সাথে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন ফোর্স পেয়েছি। তাদের সমন্বয়ে আমাদে এরিয়ায় একটা ওয়ার্কিং প্ল্যান করা হয়েছে। আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন। মহাসড়কের বড় বড় পয়েন্টে তিনটা মোবাইল টিম সার্বক্ষণিক কাজ করছে।
বাড়ি ফেরার আনন্দেই সব কষ্ট ম্লানঃ
শত ভোগান্তি, পকেটের বাড়তি টাকা খসে যাওয়া আর তীব্র গরমের ক্লান্তি—কোনো কিছুই দমাতে পারছে না এই খেটে খাওয়া মানুষগুলোকে। কুরবানির ঈদে পরিবারের সাথে এক টুকরো মাংস ভাগ করে খাওয়া আর প্রিয়জনদের হাসিমুখ দেখার আনন্দ যেন সব কষ্টকে ভুলিয়ে দিচ্ছে।
বাইপাইল মোড়ে দাঁড়িয়ে বাসের জন্য অপেক্ষা করা কনস্ট্রাকশন শ্রমিক শিবলু হাসিমুখে দৈনিক যায়যায়দিনকে বলেন, "কষ্ট তো একটু হইবোই ভাই, তয় বাড়ি গিয়া মায়ের মুখ দেখলে আর কোনো কষ্ট মনে থাকবো না।"
এই সরল বিশ্বাস আর ভালোবাসাই সাভার-আশুলিয়ার লাখো শ্রমজীবী মানুষকে প্রতি ঈদে টেনে নিয়ে যায় আপন নীড়ে।