টানা এক সপ্তাহের ছুটিতে পর্যটকে ভরপুর হবার কথা ছিল সুনামগঞ্জের সীমান্ত এলাকা। নতুন পানিতে ভাসছে পর্যটকবাহী দৃষ্টিনন্দন হাউস বোট গুলোও। ৩০ ও ৩১ মে এই দুইদিনের বুকিং ও হয়েছিল আশানুরূপ। তবে ‘পাকা ধানে মই’ দেবার মতো অবস্থা হয়েছে যেন সড়ক জ্যাম।
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের দুর্বিসহ অবস্থায় নাভিশ্বাস উঠছে সকলের। পর্যটন সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, কেবল সুনামগঞ্জ নয়, সড়কের দুর্দশায় শ্রীমঙ্গল থেকে সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়া। সকল পর্যটনস্পটেই এবার পর্যটক কম হবে এমন দুশ্চিন্তায় পড়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সড়কের অসহ্য যন্ত্রণার কথা শুনে অনেকে হোটেল-হাউসবোট এবং কটেজের পুরোনো বুকিং বাতিল করেছেন। নতুন বুকিংয়েও চাপ কম। এই অবস্থায় ঈদের ছুটির আগে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনারও দাবি জানিয়েছেন পযটনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা।
সিলেট-ঢাকা মহসড়ক দিয়ে সুনামগঞ্জ থেকে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে যাতায়াত করতে হয়। এই পথ দিয়ে যানবাহন চলাচল করতে এখন আটঘণ্টার পথ ২৪ ঘণ্টায় পৌঁছানোর উদাহরণ প্রতিদিনের।
সড়কের লাক্সারিয়াস সার্ভিস শ্যামলী পরিবহনের ‘শ্যামলী স্লিপারে’ সুনামগঞ্জে আসার জন্য শনিবার রাত সাড়ে নয়টায় স্ত্রী তন্দ্রাকৃতিসহ ওঠেছিলেন বস্ত্র প্রকৌশলী স্বজন দেব। রোববার বিকাল তিনটায় সিলেটে পৌঁছান তারা। স্বজন জানালেন, পথে তাদের মনে হয়েছে, বাস সারাক্ষণই এক জায়গায় ছিল। নরমাল বাসগুলোতে যারা উঠেছেন, তাদের হা-পিত্যেশ আরও বেশি ছিল বলে জানান তিনি।
শ্যামলী পরিবহনের সুনামগঞ্জের পরিবেশক হোসেন আহমেদ বললেন, সুনামগঞ্জ-সিলেট-ঢাকা অর্থাৎ রাজধানীমুখী বাসসহ এই সড়কপথে যাতায়াতকারী সারাদেশের পরিবহনের চালকসহ স্টাফরাও এদিক দিয়ে আসতে ভয় পান। যাত্রীরাও চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিশ^রোড ও নারায়ণগঞ্জের রূপসীতে পৌঁছার আগে রীতিমত আতঙ্কিত থাকেন পরিবহন চালকরা। কত ঘণ্টায় জ্যাম থেকে বের হবেন আগেই এই চিন্তায় পড়ে যান সকলে। এছাড়া মাধবপুর-শায়েস্তাগঞ্জে এসেও কিছু বিড়ম্বনা হচ্ছে।
এদিকে, সাতদিনের টানা ছুটিতে পর্যটক বরণে প্রস্তুত হয়েছে সুনামগঞ্জ। হোটেল থেকে শুরু করে হাউসবোটগুলোও ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে।
নতুন পানিতে ভরে ওঠা হাওর, মেঘালয়ের সবুজ পাহাড়, যাদুকাটা নদীর স্বচ্ছ জলরাশি আর খোলা আকাশের মায়াবী পরিবেশ উপভোগ করতে ইতোমধ্যে হাউসবোট- হোটেল বুকিং করেছেন অনেক পর্যটক। সড়ক ভোগান্তি কমলে পর্যটকের আগমন বাড়বে এমনটা আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
হাওরাঞ্চলের হাউজবোটগুলোও প্রস্তুত হয়ে উঠেছে। সংস্কার, রেনোভেশন এবং উন্নত সেবার প্রস্তুতি শেষ করে পর্যটকদের বরণে অপেক্ষায় রয়েছেন হাউজবোট মালিক ও কর্মীরা।
মৌলভীবাজার থেকে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা পর্যটক কামরুজ্জামান বললেন, যাদুকাটায় এসে পরিষ্কার আকাশ, মেঘালয়ের সবুজ পাহাড় আর স্বচ্ছ নদীর পানি দেখে মনে হচ্ছে যেন স্বর্গীয় কোনো পরিবেশে আছি। কর্মব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি ভুলে নতুন মানসিক শক্তি পাচ্ছি। ঈদের ছুটিতে সবাইকে অন্তত একবার টাঙ্গুয়ার হাওরে ঘুরতে আসার আহ্বান জানাই।
পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা সাহেলা বলেন, নদীতে ঘুরতে ভালো লাগে। বিশেষ করে জযদুকাটা নদীর খোলা আকাশ, পাহাড় আর স্বচ্ছ জলরাশি মিলে অন্যরকম অনুভূতি তৈরি করছে। সুযোগ পেলেই পরিবার নিয়ে ঘুরতে বের হই, আর সুনামগঞ্জ সবসময়ই পছন্দের তালিকায় থাকে।
বরিশাল থেকে আসা এক নবদম্পতি জানান, তারা বর্তমানে বারেক টিলায় অবস্থান করছেন। সেখান থেকে জাদুকাটা নদী ও ভারতের বিশাল পাহাড়ের দৃশ্য উপভোগ করছেন। সবকিছু মিলিয়ে খুব সুন্দর সময় কাটছে। বিশেষ করে জীবনসঙ্গীর সঙ্গে এই ভ্রমণ আরও আনন্দঘন হয়ে উঠেছে।
ঢাকা থেকে আসা পর্যটক আদনান বলেন, শনিবার থেকে হাউজবোটে ঘুরছি, সময়টা খুব ভালো কাটছে। তবে ঢাকা থেকে সুনামগঞ্জ আসতে দীর্ঘ যানজটে পড়তে হয়েছে। সড়কের অবস্থা ভালো হলে ভ্রমণ আরও স্বস্তিদায়ক হতো।
হৈমন্তি হাউজ বোটের ব্যবস্থাপক রোকন উদ্দিন বলেন, ঈদকে সামনে রেখে আমরা সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি। ইতোমধ্যে কয়েকটি ট্রিপ সম্পন্ন হয়েছে। এখন হাওরে নতুন পানি এসেছে, তাই পর্যটকরা দারুণ সময় উপভোগ করতে পারবেন।
হাউজবোট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. আরাফাত হোসেন বলেন, প্রত্যেকটি হাউসবোট রেনোভেশন করা হয়েছে। কিন্তু ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের বেহাল অবস্থা আমাদের দুশ্চিন্তার কারণ হয়েছে। শ্রীমঙ্গল থেকে সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়া সকল পর্যটসম্পটেই মহাসড়ক দুর্ভোগের নেতিবাচক প্রভাব আছে। সাতদিনের ছুটি অথচ সিলেট বিভাগের পর্যটনস্পটে যে পরিমাণ ভিড় হবার কথা, সেটা দেখা যাচ্ছে না। শ্রীমঙ্গলের কটেজগুলোতে চাপ যতটা হবার কথা সেটি হয় নি এখনো। সড়ক পথে শৃঙ্খলা আসলে হয়তো সেটি কাটবে। এজন্য আমরা দ্রুত সড়কপথে শৃঙ্খলার অনুরোধ জানাচ্ছি নানা মাধ্যমে। রেল ও বিমানেও টিকেট মিলছে না।
তিনি জানান, ৩০ ও ৩১ মে এই দুদিনের বুকিং তাদের শেষ পর্যায়ে। তবে ২৮-২৯ মে’এর বুকিং কম। পহেলা জুন থেকে পরের তারিখগুলোতেও বুকিং কম। তিনি জানালেন, হাউসবোটগুলোতে এবার প্রতিজন পর্যটকের জন্য পাঁচ থেকে দশহাজার টাকা পর্যন্ত বুকিং মূল্য আছে। এই প্যাকেজের মধ্যে দুইদিন এক রাতের মধ্যে ছয় বেলা খাবার, চার বেলা নাস্তা। টাঙ্গুয়ার ওয়াচ টাওয়ার, সীমান্তের টেকেরঘাট, নিলাদ্রী লেক, শিমুল বাগান, যাদুকাটা, বারেকের টিলা ভ্রমণের সুযোগ আছে।
তিনি জানান, তাদের অ্যাসোসিয়েশনের ১০৬টি হাউজবোটসহ জেলায় প্রয় দুই শতাধিক হাউসবোট পর্যটক বরণে প্রস্তুত রয়েছে।
সুনামগঞ্জ শহরের হোটেল গ্রান্ড এর ব্যবস্থাপক অনিশ তালুকদার বাপ্পু বললেন, ‘এই পথ দিয়ে আসা সারা দেশের ব্যবসায়ী-পর্যটকরা সড়কের দুর্ভোগে বিরক্ত। এখানে আসার পর নাস্তার টেবিলে বসেই দীর্ঘ যাত্রাপতের ভোগান্তির কথা বলেন তারা। পর্যটক বরণে তাদেরসহ জেলা শহরের অভিজাত হোটেলগুলোর প্রস্তুতি রয়েছে জানিয়ে বলেন, সড়ক ভোগান্তির জন্য কেবল তাদেরই একটি ৩০, একটি ৩৫ এবং আরেকটি ২০ জনের বুকিং বাতিল হয়েছে। পথের দুর্ভোগ দ্রুত কমাতে সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ জানালেন তিনিও।
পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতেও করতে তৎপর রয়েছে জেলা পুলিশ।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) সুজন সরকার বললেন, সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর, নীলাদ্রি লেকসহ বিভিন্ন পর্যটন স্পটে ঈদের ছুটিতে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে পুলিশি টহল ও চেকপোস্ট কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। যাতে ভ্রমণকারীরা নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়াতে পারেন, এই বিষয়ে জেলা পুলিশ সতর্ক রয়েছে।