ঢাকা | শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় লিচুর বাম্পার ফলন

২৯ কোটি টাকার লিচু বিক্রির আশাবাদ

author
স্টাফ রিপোর্টার ,ব্রাহ্মণবাড়িয়া

প্রকাশিত : ২৫ মে, ২০২৬ দুপুর ১২:১০
ad003
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় চলতি বছর লিচুর বাম্পার ফলন হয়েছে। আবহাওয়া ভালো থাকায় এবং ঝড়-বৃষ্টি কম হওয়ায় লিচুর বাম্পার ফলন হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাগান মালিকেরা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার লিচু রসালো ও সুস্বাদু হওয়ায় বাজারে এর দামও ভালো। এ বছর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় প্রায় ২৯ কোটি টাকার লিচু বিক্রির আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন চাষীরা। চাষীদের মুখে এখন তৃপ্তির হাসি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০২ সাল থেকে বিজয়নগর উপজেলায় বাণিজ্যিকভাবে লিচুর আবাদ করা শুরু হয়। কম পরিশ্রমে বেশী লাভ হওয়ায় পর্যায়ক্রমে এখানকার ধানি জমিগুলোকেও লিচু বাগানে পরিনত করতে থাকেন চাষীরা।

বর্তমানে উপজেলার পাহাড়পুর, বিষ্ণুপুর, কাঞ্চনপুর, খাটিঙ্গা, কাশিমপুর, সিঙ্গারবিল, চম্পকনগর, আদমপুর, কালাছড়া, মেরাশানী, সেজামুড়া, কামালমোড়া, নুরপুর, হরষপুর, মুকুন্দপুর, নোয়াগাঁও, অলিপুর, চান্দপুর, কাশিনগর, ছতুরপুর, রূপা, শান্তামোড়া, কামালপুর, কচুয়ামোড়া, ভিটিদাউপুর এলাকায়  ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় তিন শতাধিক লিচুর বাগান রয়েছে।

এছাড়াও উপজেলার প্রায় প্রত্যেকের বাড়িতেই একটি লিচু গাছ আছে। যাদের বাড়িতে একটু জায়গা আছে, তারা প্রত্যেকেই বাড়িতে অন্যান্য ফলের গাছের সাথে লিচু গাছ লাগান।

এসব বাগানে দেশী লিচু, এলাচি লিচু, চায়না লিচু, পাটনাই লিচু ও বোম্বাই লিচু চাষ করা হয়। এলাকাবাসী ও চাষীরা জানান, লিচু গাছে মুকুল আসার পর থেকে কয়েক দফা বাগান বিক্রি হয়। গাছে মুকুল ও গুটি আসার পর প্রথমে বাগান কিনেন স্থানীয় ও বিভিন্ন জেলার মহাজনরা। গুটি একটু বড় হওয়ার পর দ্বিতীয় দফায় গাছ বিক্রি হয়। লিচু আকার ধারণ করলে তৃতীয় দফায় বিক্রি হয়। লিচু বড়  হলে চতুর্থ দফায় বাগান বিক্রি হয়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এ বছর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৫৫৫ হেক্টর জমিতে লিচু উৎপাদিত হয়েছে। যার বাজার মূল্য আনুমানিক ২৯ কোটি টাকা। তারা জানান, লিচুর উৎপাদন এ বছর লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলা কসবা, আখাউড়া ও বিজয়নগর উপজেলার পাহাড়ি জমিতে লিচুরুর চাষ করা হয়। আখাউড়া উপজেলার ধলেশ্বর, রাজাপুর, আমোদাবাদ, মোগড়া ও মনিয়ন্দ এলাকা এবং কসবা উপজেলার গোপীনাথপুর ও বায়েক ইউনিয়নে রয়েছে কয়েকশত লিচুর বাগান। তবে সবচেয়ে বেশী লিচুর বাগান বিজয়নগর উপজেলায়। বিজয়নগর উপজেলার লিচু মিষ্টি ও রসালো হওয়ায় দেশজুড়ে রয়েছে এর খ্যাতি রয়েছে।

দেশের অন্যান্য জায়গায় এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে লিচু বাজারে আসলেও বিজয়নগর উপজেলার লিচু  মে মাসের প্রথম দিকে বাজারে আসে। বিজয়নগর উপজেলার সবচেয়ে বড় লিচুর বাজার হচ্ছে আউলিয়া বাজার ও মেরাশানী। এছাড়াও উপজেলার মুকুন্দপুর, কাংকইরা বাজার, চম্পকনগর, সিঙ্গারবিল বাজার, আমতলী বাজারসহ আরো কয়েকটি বাজারে পাইকারীভাবে লিচু বেচা-কেনা হয়। এসব বাজার থেকে পাইকাররা লিচু কিনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন উপজেলা, কুমিল্লা জেলা, নরসিংদী জেলা, কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব, নোয়াখালী জেলা, চাদপুর জেলা, মৌলভীবাজার জেলা, সিলেট জেলা, হবিগঞ্জ জেলা, ফেনী জেলা ও রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন বাজারে যানবাহনে করে নিয়ে যান।

 এলাকাবাসী ও চাষীরা জানায়,  বিজয়নগর উপজেলার সবচেয়ে বড় লিচু বাজার পাহাড়পুর ইউনিয়নের আউলিয়া বাজার। সেখানে প্রতিদিন প্রায় অর্ধকোটি টাকার লিচু বেচা-কেনা হয়। প্রতিদিন গভীর রাতে চাষী ও বাগানের মালিকরা তাদের উৎপাদিত লিচু বাজারে নিয়ে আসে। রাত তিনটা থেকে শুরু হয়ে সকাল আটটার মধ্যেই বেচা-কেনা শেষ হয়ে যায়।

লিচু চাষীরা জানান, বিজয়নগরে পাটনাই, বোম্বাই, চায়না থ্রি ও এলাচি জাতের লিচু চাষ করা হয়। এলাচি ও চায়না থ্রি জাতের লিচু আকারে একটু বড়। আবহাওয়া ভালো থাকায় ও সার কীট নাশকের দাম সহজলভ্য হওয়ায় এ বছর লিচুর ভালো ফলন হয়েছে।

এদিকে প্রতিদিন সকাল-বিকেল জেলা শহরসহ আশপাশ এলাকা থেকে সৌন্দর্য পিয়াসুরা দল বেঁধে আসেন এই লিচু বাগান দেখতে। অনেকেই বাগানে ঢুকে শখ করে ছবি তুলেন।

বিজয়নগর উপজেলার কালাছড়া গ্রামের লিচু চাষী রহমত আলী জানান, তিনি চার লাখ টাকা দিয়ে একটি বাগান ইজারা নিয়েছেন। পরিবেশ অনুকূলে থাকায় লিচু ভালো হয়েছে। তার বাগানে ৬০টি লিচু গাছ রয়েছে। প্রতিদিনই বাগানে দর্শনার্থীরা ঘুরতে আসেন এবং তারা লিচু কিনে নিয়ে যান। তিনি বলেন, চায়না-থ্রি এক'শ লিচু ১২০০ থেকে দেড় হাজার টাকা ও বোম্বে লিচু ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা দরে বাগান থেকে দর্শনার্থীরা কিনে  নিয়ে যাচ্ছেন।

উপজেলার কালাছড়া গ্রামের লিচুর চাষী শফিকুল ইসলাম বলেন, তার দুইটা বাগানে ৯০টি লিচু গাছ আছে। গত ৫/৭দিন ধরে তিনি আউলিয়া বাজারে লিচু বিক্রি করছেন। এ পর্যন্ত প্রায় দুই লাখ টাকার লিচু বিক্রি করেছেন।

একই এলাকার সোলেমান মিয়া, কাউছার মিয়া ও ফারুক ইসলামসহ একাধিক লিচু চাষী জানান, তারা প্রত্যেকেই এ পর্যন্ত দুই লাখ টাকার উপরে লিচু বিক্রি করেছেন। ফলন ভালো হওয়ায় তারা সন্তুষ্ট। তারা বলেন, ঈদের পর বাজার আরো ভালো হবে। তাদের বাগানে যে পরিমান লিচু আছে আরো ২০/২৫ দিন বিক্রি করতে পারবেন।

জেলা শহরের লিচুর পাইকার রমজান আলী জানান, গত ৭ দিন ধরে তিনি এই বাজারে আসছেন। প্রতিদিন গড়ে প্রায় লাখ টাকার লিচু  কিনেন তিনি। বিজয়নগরের লিচু ভালো ও মিষ্টি হওয়ায় লিচু বিক্রি করে তিনি লাভবান হচ্ছেন।

হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর থেকে আসা পাইকার বেলাল মিয়া জানান, প্রতিবছরই এ বাগান থেকে লিচু কিনে নেই। বিজয়নগরের লিচুর চাহিদা বেশ। নিজের পছন্দমত লিচু কিনে নিয়ে যাচ্ছি। দাম হাতের নাগালেই।

বিজয়নগর কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় প্রায় পাঁচ শতাধিক লিচুর বাগান রয়েছে। এসব বাগানে  দেশী লিচু, এলাচি লিচু, চায়না লিচু, পাটনাই লিচু ও বোম্বাই লিচু চাষ করা হয়।

এ ব্যাপারে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রশিক্ষণ অফিসার মুনসী তোফায়েল হোসেন বলেন, মাটির গুণাগুণ ভাল হওয়ায় চলতি বছর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় ৫৫৫ হেক্টর জমিতে লিচু চাষ করা হয়েছে। এ বছর জেলাতে প্রায় ২৯ কোটি টাকার লিচু বিক্রি করা যাবে।
সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SHA.AZH

SHA.AZH

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT