ঢাকা | রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইকোনমিক চেঞ্জ রেভল্যুশন দিয়ে আনা যায় না: আব্দুল হাই সরকার

author
রাজু আলীম

প্রকাশিত : ২৫ মে, ২০২৬ বিকেল ৫:১৯
আব্দুল হাই সরকার, চেয়ারম্যান, ঢাকা ব্যাংক পিএলসি, চেয়ারম্যান, বিএবি আব্দুল হাই সরকার, চেয়ারম্যান, ঢাকা ব্যাংক পিএলসি, চেয়ারম্যান, বিএবি
ad003
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যখন সংকটের আলোচনাকে আর শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। জিডিপি প্রবৃদ্ধি, রিজার্ভ, মূল্যস্ফীতি কিংবা বাজেট ঘাটতির সংখ্যাগুলো গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাস্তব অর্থনীতির ভেতরের যে অস্বস্তি, সেটি এখন আরও গভীর। কারণ অর্থনীতি শেষ পর্যন্ত মানুষের আস্থা, উদ্যোক্তার সাহস এবং বিনিয়োগকারীর ভবিষ্যৎ প্রত্যাশার ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে। সেই জায়গাটিতেই এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছে।

ঢাকা ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকারের সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলো তাই কেবল একজন ব্যাংকারের মন্তব্য নয়; বরং বাংলাদেশের শিল্প, ব্যাংকিং ও বিনিয়োগ বাস্তবতার একটি গভীর প্রতিফলন। তিনি যখন বাজেট, ব্যাংকিং খাত, ট্রেজারি বন্ড, শিল্পায়ন কিংবা জ্বালানি সংকট নিয়ে কথা বলেন, তখন সেখানে শুধু নীতিগত আলোচনা থাকে না; বরং থাকে দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসা এক ধরনের সতর্কতা।

আসন্ন ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট সামনে রেখে তাঁর বক্তব্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি উঠে এসেছে, সেটি হলো—বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন আস্থার সংকটের মধ্যে আছে। আর এই আস্থাহীনতার প্রভাব ব্যাংকিং খাত থেকে শুরু করে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং বিদেশি বিনিয়োগ পর্যন্ত সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে।

আব্দুল হাই সরকার প্রথমেই যে প্রশ্নটি তুলেছেন, সেটি হচ্ছে বাজেটের অর্থায়ন। বাংলাদেশের বাজেট বহু বছর ধরেই ঘাটতি নির্ভর। সরকার যে পরিমাণ ব্যয় করে, রাজস্ব আয় তার তুলনায় কম। ফলে প্রতি বছরই বড় অঙ্কের ঘাটতি থেকে যায়। এই ঘাটতি পূরণ করতে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় বৈদেশিক ঋণপ্রাপ্তি আগের মতো সহজ নয়। আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও এখন শর্ত আরোপ করছে। ফলে সরকারের ভরসা আরও বেশি করে ব্যাংকিং খাতের দিকে চলে যাচ্ছে।

এই জায়গাটিকেই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন আব্দুল হাই সরকার। তাঁর ভাষায়, “ব্যাংকের টাকা তো আসলে ইন্ডাস্ট্রি, ব্যবসা-বাণিজ্য, ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল এবং উৎপাদনের জন্য থাকার কথা। কিন্তু সরকার যখন ডেফিসিট বাজেট পূরণের জন্য ব্যাংকের দিকে যায়, তখন ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর চাপ পড়ে।”

এই বক্তব্যের ভেতরে বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার একটি বড় সংকট লুকিয়ে আছে। কারণ ব্যাংকগুলো এখন ক্রমশ ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ শিল্প ঋণের বদলে সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ তাদের জন্য বেশি নিরাপদ। সেখানে রিটার্ন নিশ্চিত, ঝুঁকি কম, আর ঋণ আদায়ের ঝামেলাও নেই। আব্দুল হাই সরকার এই প্রবণতাকে “সহজ আয়” হিসেবে উল্লেখ করে সতর্ক করেছেন।

তিনি বলেন, “ট্রেজারি তো একটা সিকিউর ইনভেস্টমেন্ট। ১১ শতাংশ রিটার্ন পেলে ব্যাংক কেন বাইরে রিস্ক নিয়ে লোন দিতে যাবে? কিন্তু এটা দীর্ঘমেয়াদে ভালো না। কারণ তখন ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, মার্কেটে লিকুইডিটি কমে যায়, ব্যবসা সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হয়।”

এই কথাগুলো শুধু ব্যাংকের বিনিয়োগ আচরণ নিয়ে নয়; বরং অর্থনীতির উৎপাদনশীল শক্তি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। একটি ব্যাংকিং ব্যবস্থার মূল কাজ হলো সঞ্চয়কে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে রূপান্তর করা। কিন্তু যখন ব্যাংকগুলো ঝুঁকি এড়িয়ে কেবল সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ করে, তখন অর্থনীতির ভেতরের গতি কমে যায়। নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হয় না, পুরোনো উদ্যোক্তারা সম্প্রসারণে আগ্রহ হারান, আর কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এই সংকট আরও গভীর হয়েছে জ্বালানি সমস্যার কারণে। আব্দুল হাই সরকার বারবার শিল্প খাতের বাস্তব সমস্যাগুলোর দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তাঁর মতে, কোনো কারখানা ইচ্ছা করে বন্ধ হয় না। যখন বছরের পর বছর লোকসান হয়, যখন গ্যাস পাওয়া যায় না, যখন বিদ্যুৎ সরবরাহ অনিশ্চিত থাকে, তখনই উদ্যোক্তারা বাধ্য হয়ে কারখানা বন্ধ করেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি এই বাস্তবতার কথাই তুলে ধরেন। তাঁর মতে, শুধু টাকা দিলেই শিল্পকারখানা চালু হবে না। আগে বুঝতে হবে কেন সেগুলো বন্ধ হয়েছে।

তিনি বলেন, “কোন ফ্যাক্টরি এমনি এমনি বন্ধ হয় না। যখন সে বছরের পর বছর লস দেয়, যখন ঠিকমতো গ্যাস পায় না, পাওয়ার পায় না, তখন বাধ্য হয়ে বন্ধ করতে হয়। এখন আবার টাকা ইনজেক্ট করার আগে দেখতে হবে ওই ফ্যাক্টরির ভবিষ্যৎ আছে কিনা।”

এই বক্তব্যের ভেতরে বাংলাদেশের শিল্প খাতের বর্তমান চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কারণ এখনকার বড় সংকট শুধু অর্থ নয়; বরং অবকাঠামো ও জ্বালানি। উদ্যোক্তারা কারখানা তৈরি করছেন, বিদেশ থেকে যন্ত্রপাতি আনছেন, বড় বিনিয়োগ করছেন—কিন্তু গ্যাস সংযোগ পাচ্ছেন না। বিদ্যুতের নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না। ফলে বহু শিল্প প্রকল্প আটকে যাচ্ছে।

এখানে আব্দুল হাই সরকারের বক্তব্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন তিনি বিদেশি বিনিয়োগের প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি খুব পরিষ্কারভাবে বলেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা প্রথমে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের অবস্থান দেখেন। যদি স্থানীয় ব্যবসায়ীরাই অনিশ্চয়তায় থাকেন, তাহলে বাইরের বিনিয়োগকারীও সতর্ক হয়ে যায়।

তাঁর ভাষায়, “বিদেশি ইনভেস্টর আগে দেখবে লোকাল ইনভেস্টর কতটা কমফোর্টেবল। তারা দেখবে পাওয়ার আছে কিনা, গ্যাস আছে কিনা, গভমেন্টের পলিসি স্টেবল কিনা, ইনফ্রাস্ট্রাকচার ঠিক আছে কিনা। শুধু বললেই হবে না যে বিদেশি ইনভেস্টর আসবে।”

এই বক্তব্যের তাৎপর্য গভীর। কারণ বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য বড় বড় সম্মেলন, রোডশো এবং প্রচারণা হলেও বাস্তবতা হচ্ছে—বিদেশি বিনিয়োগ কখনো কেবল বক্তৃতা দেখে আসে না। তারা দেখে স্থানীয় অর্থনীতি কতটা স্থিতিশীল, উদ্যোক্তারা কতটা আত্মবিশ্বাসী, আর নীতিমালা কতটা ধারাবাহিক।

আব্দুল হাই সরকারের বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি বারবার ফিরে এসেছে, সেটি হলো “আস্থা”। তিনি মনে করেন, অর্থনীতি মূলত আস্থার ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে। এই আস্থা একবার নষ্ট হয়ে গেলে সেটি ফিরিয়ে আনতে বহু বছর লাগে।

তিনি বিশেষভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ব্যাংকিং খাত নিয়ে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কিছু বক্তব্যের কারণে। তাঁর মতে, সব ব্যাংকের অবস্থা এক নয়। কিছু সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের কারণে পুরো খাতকে একইভাবে উপস্থাপন করলে সাধারণ আমানতকারী আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।

তিনি বলেন, “যখন দায়িত্বশীল লোকজন বক্তৃতা করে বলেন ব্যাংকিং সেক্টর খারাপ, তখন সাধারণ মানুষ মনে করে সব ব্যাংকের একই অবস্থা। এটা ঠিক না। কিছু ব্যাংক সমস্যা আছে, কিন্তু অনেক ব্যাংক ঠিকমতো চলছে।”

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত যেহেতু আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে, তাই এই পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ যদি ব্যাংকের নিরাপত্তা নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়ে, তাহলে পুরো আর্থিক ব্যবস্থাই চাপের মুখে পড়ে।

এই প্রসঙ্গে ইসলামী ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংকের সাম্প্রতিক অস্থিরতার দিকেও ইঙ্গিত করেছেন তিনি। তাঁর আশঙ্কা, যদি আবার বিতর্কিত গোষ্ঠীগুলো ব্যাংকিং খাতে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পায়, তাহলে সেটি পুরো অর্থনীতির জন্য নেতিবাচক হবে।

তবে আব্দুল হাই সরকারের বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অর্থনৈতিক সংস্কার নিয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি মনে করেন, অর্থনৈতিক পরিবর্তন কখনো “রেভল্যুশন” দিয়ে আনা যায় না। এগুলো ধাপে ধাপে, আলোচনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে করতে হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ন্যূনতম মূলধন বাড়ানো এবং নগদ লভ্যাংশের সীমাবদ্ধতা নিয়ে তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, “অর্থনৈতিক কার্যকলাপগুলোকে ওভারনাইট পরিবর্তন করা ঠিক না। একটা প্রসেস আছে। এগুলো গ্রাজুয়ালি করতে হয়।”

এই বক্তব্যের ভেতরে একটি বড় অর্থনৈতিক বাস্তবতা রয়েছে। কারণ শিল্প ও ব্যাংকিং খাত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। উদ্যোক্তারা যদি মনে করেন নীতিমালা হঠাৎ বদলে যেতে পারে, তাহলে তারা বিনিয়োগে আগ্রহ হারান।

বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় কর্মসংস্থানের প্রশ্নটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। এই জনগোষ্ঠীকে কর্মসংস্থানের আওতায় আনতে না পারলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি টেকসই হবে না। আব্দুল হাই সরকার তাই খুব স্পষ্টভাবেই শিল্পায়নের ওপর জোর দিয়েছেন।

তাঁর বক্তব্যের সারকথা হলো—বাংলাদেশের মতো দেশে এখনো বৃহৎ পরিসরের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে মূলত উৎপাদনমুখী শিল্প। কেবল ক্ষুদ্র উদ্যোগ, স্টার্টআপ কিংবা সৃজনশীল অর্থনীতির কথা বলে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব নয়।

এই জায়গাটিতেই তাঁর বক্তব্য বাস্তববাদী হয়ে ওঠে। তিনি সংকটের কথা বলেছেন, কিন্তু হতাশা ছড়াননি। বরং তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো সম্ভাবনাময়। দেশের বড় বাজার আছে, তরুণ শ্রমশক্তি আছে, উদ্যোক্তা শ্রেণি আছে। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে প্রথমে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।

কারণ শেষ পর্যন্ত অর্থনীতির মূল প্রশ্ন খুব জটিল নয়। একটি দেশ তখনই এগোয়, যখন তার উদ্যোক্তা বিনিয়োগে আগ্রহী হয়, ব্যাংক ঋণ দিতে স্বস্তি পায়, শিল্প উৎপাদন বাড়ে এবং মানুষ ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী থাকে। বাংলাদেশের বর্তমান সংকটের কেন্দ্রেও আসলে সেই আস্থার প্রশ্নটিই রয়েছে। আর সেই কারণেই আব্দুল হাই সরকারের বক্তব্য কেবল একটি টেলিভিশন আলোচনার অংশ নয়; বরং এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান সময়ের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

আব্দুল হাই সরকারের বক্তব্যে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ব্যাংকিং খাতে নীতিনির্ধারণের ধরন নিয়ে তাঁর উদ্বেগ। তিনি সরাসরি অভিযোগের ভাষা ব্যবহার না করলেও বারবার ইঙ্গিত করেছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এমন এক পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে যেখানে সিদ্ধান্তের চেয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতিটিই অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ ব্যাংকিং খাত মূলত আস্থাভিত্তিক একটি খাত। এখানে একটি ভুল বার্তা, একটি অসতর্ক মন্তব্য কিংবা আকস্মিক কোনো নীতিগত সিদ্ধান্তও বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব তৈরি করতে পারে।

তিনি বিশেষভাবে যে বিষয়টি তুলে ধরেছেন, সেটি হলো নীতিনির্ধারক ও স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠকে বসে যখন একটি ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হয়, ব্যাংকাররা যখন মনে করেন যে পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়ছে, ঠিক তখনই হঠাৎ করে এমন কিছু নির্দেশনা আসে যা পুরো খাতকে অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। বিশেষ করে ন্যূনতম মূলধন ও নগদ লভ্যাংশ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁর প্রতিক্রিয়া ছিল স্পষ্ট। তিনি মনে করেন, অর্থনৈতিক সংস্কার অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু সেই সংস্কার হতে হবে ধাপে ধাপে, বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে।

এখানে তাঁর বক্তব্যের ভেতরে একটি বড় অর্থনৈতিক দর্শন কাজ করছে। তিনি আসলে বলতে চাইছেন, অর্থনীতিকে প্রশাসনিক নির্দেশে চালানো যায় না। কারণ শিল্প, ব্যাংকিং এবং বিনিয়োগের সিদ্ধান্তগুলো দীর্ঘমেয়াদি। একজন উদ্যোক্তা যখন একটি ব্যাংকে বিনিয়োগ করেন বা একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন, তখন তিনি আগামী ১০ থেকে ২০ বছরের সম্ভাবনা মাথায় রেখেই এগোন। ফলে নীতির ধারাবাহিকতা এবং পূর্বানুমানযোগ্যতা বিনিয়োগের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই জায়গাটিতে এসে আব্দুল হাই সরকার বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসের কথাও স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন, একসময় বেসরকারি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল সেবার মান বাড়ানো এবং অর্থনীতিকে গতিশীল করা। সরকারি ব্যাংকের জটিলতা, ধীরগতি ও আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর বাইরে এসে নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তারা আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তাঁর নিজের অভিজ্ঞতার কথাও উঠে আসে সেখানে। তিনি মনে করিয়ে দেন, খুব ছোট মূলধন দিয়ে যাত্রা শুরু করেও বাংলাদেশের অনেক ব্যাংক ধীরে ধীরে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ ব্যাংকিং খাতের এই প্রবৃদ্ধি রাতারাতি হয়নি; এটি এসেছে দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবসায়িক সম্প্রসারণ, গ্রাহকের আস্থা এবং বাজারভিত্তিক বিকাশের মাধ্যমে।

কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সেই ধারাবাহিকতা যেন চাপের মুখে। ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি, খেলাপি ঋণ, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থতা—এসব সমস্যা তো আছেই, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নীতিগত অনিশ্চয়তা। আব্দুল হাই সরকারের আশঙ্কা, যদি ব্যাংকিং খাতে এমন পরিবেশ তৈরি হয় যেখানে উদ্যোক্তারা মনে করেন যে যেকোনো সময় হঠাৎ করে নতুন নিয়ম চাপিয়ে দেওয়া হতে পারে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে এটি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করবে।

তাঁর বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে। বাংলাদেশে প্রায়ই বলা হয়, বিদেশি বিনিয়োগ আনতে হবে, আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে আকৃষ্ট করতে হবে, বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে আরও সংযুক্ত হতে হবে। কিন্তু আব্দুল হাই সরকার বাস্তবতার জায়গা থেকে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলেছেন—স্থানীয় উদ্যোক্তারাই যদি স্বস্তিতে না থাকেন, তাহলে বিদেশিরা কেন আসবে?

এই বক্তব্যের ভেতরে বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি অপ্রিয় কিন্তু বাস্তব সত্য রয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শুধু সরকারি বক্তব্য শোনেন না; তারা বাস্তব পরিস্থিতিও পর্যবেক্ষণ করেন। তারা দেখেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ বাড়াচ্ছেন কি না, শিল্পপ্রতিষ্ঠান সম্প্রসারণ হচ্ছে কি না, জ্বালানি ও অবকাঠামো কতটা নির্ভরযোগ্য, আদালত ও নীতিনির্ধারণ কতটা স্থিতিশীল। অর্থাৎ বিদেশি বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন আসলে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের আচরণ।

এই কারণেই আব্দুল হাই সরকার গ্যাস সংকট, বিদ্যুৎ সমস্যা এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাকে কেবল শিল্প খাতের সমস্যা হিসেবে দেখছেন না; তিনি এগুলোকে বিনিয়োগ আস্থার প্রশ্ন হিসেবেও দেখছেন। কারণ একটি কারখানা যখন বছরের পর বছর পরিকল্পনার পর নির্মাণ শেষ করে গ্যাস সংযোগের জন্য অপেক্ষা করে, তখন সেটি শুধু একটি প্রকল্পের বিলম্ব নয়; সেটি পুরো অর্থনীতির সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

বাংলাদেশের শিল্প খাত এখন এক ধরনের রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তৈরি পোশাক শিল্প এখনও অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হলেও বৈশ্বিক বাজার দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ম্যানমেড ফাইবার, উচ্চমূল্যের টেক্সটাইল, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন—এসব খাতে প্রবেশ ছাড়া ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে। শরীফ জহির যেমন তাঁর কারখানার উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, তেমনি আব্দুল হাই সরকারও বুঝিয়ে দিয়েছেন যে উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে আগ্রহ হারাননি। সমস্যা হচ্ছে, তারা প্রয়োজনীয় সহায়ক পরিবেশ পাচ্ছেন না।

এই আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে আসে—কর্মসংস্থান। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার তরুণ জনগোষ্ঠী। কিন্তু এই জনসংখ্যাকে যদি উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানের আওতায় আনা না যায়, তাহলে সেটিই ভবিষ্যতে বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হতে পারে। আব্দুল হাই সরকার এই জায়গায় খুব বাস্তববাদী অবস্থান নিয়েছেন। তিনি পরিষ্কারভাবে বলেছেন, কর্মসংস্থান তৈরির জন্য শিল্পায়নের বিকল্প নেই। শুধু ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ বা সৃজনশীল অর্থনীতির আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না; বড় আকারের উৎপাদনমুখী শিল্প ছাড়া ব্যাপক কর্মসংস্থান সম্ভব নয়।

এখানে তিনি একধরনের সতর্ক বার্তাও দিয়েছেন। বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তি, অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসারের ফলে শ্রমঘন শিল্পগুলোও দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশ যদি এখনই নতুন শিল্পায়ন তরঙ্গ তৈরি করতে না পারে, তাহলে ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়ে যাবে। তাঁর বক্তব্যে তাই বারবার ফিরে এসেছে “ম্যাস স্কেল ম্যানুফ্যাকচারিং”-এর প্রয়োজনীয়তা।

তবে শিল্পায়নের এই আলোচনায় তিনি শুধুমাত্র অর্থনৈতিক লাভের বিষয়টি দেখেননি; বরং সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নটিকেও গুরুত্ব দিয়েছেন। কারণ কর্মসংস্থান সংকট কেবল অর্থনীতির সমস্যা নয়, এটি সামাজিক অস্থিরতারও কারণ হতে পারে। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে বিপুলসংখ্যক তরুণ যদি দীর্ঘ সময় কর্মসংস্থানের বাইরে থাকে, তাহলে তার প্রভাব রাজনীতি, সমাজ এবং নিরাপত্তা—সব জায়গায় পড়তে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে ব্যাংকিং খাতের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ শিল্পায়নের জন্য মূলধন দরকার, আর সেই মূলধনের প্রধান উৎস হচ্ছে ব্যাংক। কিন্তু ব্যাংক যদি ঝুঁকি নিতে না চায়, যদি তারা ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগকেই বেশি নিরাপদ মনে করে, তাহলে শিল্প খাতের সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হবেই। আব্দুল হাই সরকার তাই ব্যাংকগুলোর নিরাপদ বিনিয়োগ প্রবণতাকে এক ধরনের “ডাইভারশন” হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, এতে হয়তো ব্যাংকের স্বল্পমেয়াদি ঝুঁকি কমে, কিন্তু অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হয়।

তিনি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছেন—বাংলাদেশে এখন অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতার বাইরে গিয়ে দেখা সম্ভব নয়। কারণ অনেক সময় অর্থনীতির প্রকৃত সমস্যা অর্থনৈতিক নয়; বরং প্রশাসনিক বা নীতিগত। উদাহরণ হিসেবে তিনি বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরুজ্জীবনের প্রসঙ্গ তুলেছেন। তাঁর মতে, একটি কারখানা কেন বন্ধ হয়েছে, সেটি না বুঝে শুধু অর্থ দেওয়া সমাধান নয়। কারণ সমস্যার মূল যদি হয় জ্বালানি সংকট, বাজার হারানো বা অব্যবস্থাপনা, তাহলে নতুন ঋণ দিয়ে সেটি টেকসই করা কঠিন।

এই বক্তব্য বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। গত কয়েক বছরে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান ঋণের চাপ, বৈশ্বিক বাজার সংকোচন, উচ্চ উৎপাদন ব্যয় এবং জ্বালানি সমস্যার কারণে দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে এখন প্রশ্ন হচ্ছে—রাষ্ট্র কি কেবল আর্থিক সহায়তা দেবে, নাকি উৎপাদনব্যবস্থার মৌলিক সমস্যাগুলোও সমাধান করবে?

আব্দুল হাই সরকারের বক্তব্যের একটি বড় শক্তি হলো তিনি সংকটের কথা বলেছেন, কিন্তু হতাশার কথা বলেননি। বরং তাঁর বক্তব্যে একটি বাস্তববাদী আশাবাদ ছিল। তিনি বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনও সম্ভাবনাময়। কারণ দেশের উদ্যোক্তারা এখনও বিনিয়োগ করতে চান, শিল্পায়নের সুযোগ এখনও আছে, তরুণ শ্রমশক্তি এখনও বড় সম্পদ। কিন্তু এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে রাষ্ট্রকে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।

সেই আস্থা কেবল ব্যাংকিং খাতে নয়; পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় প্রয়োজন। ব্যবসায়ীরা যদি মনে করেন নীতি স্থিতিশীল থাকবে, জ্বালানি পাওয়া যাবে, ব্যাংক সহায়তা দেবে এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হঠাৎ বদলে যাবে না, তাহলে বিনিয়োগ আবার বাড়বে। আর বিনিয়োগ বাড়লে কর্মসংস্থান বাড়বে, উৎপাদন বাড়বে এবং অর্থনীতিও পুনরুদ্ধারের পথে ফিরবে।

এই কারণেই আব্দুল হাই সরকারের বক্তব্যকে শুধুমাত্র একজন ব্যাংকারের মতামত হিসেবে দেখলে ভুল হবে। তাঁর কথাগুলো আসলে বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সময়ের এক ধরনের প্রতিচ্ছবি। সেখানে যেমন উদ্বেগ আছে, তেমনি সম্ভাবনার কথাও আছে। যেমন সংকটের স্বীকারোক্তি আছে, তেমনি পুনরুদ্ধারের আকাঙ্ক্ষাও আছে।

সবশেষে তাঁর বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা সম্ভবত এটিই—অর্থনীতি শেষ পর্যন্ত মানুষের আস্থার ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে। ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা, শিল্পায়নের গতি, বিদেশি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান—সবকিছুর কেন্দ্রে আছে সেই আস্থা। আর বাংলাদেশ এখন ঠিক সেই জায়গাতেই সবচেয়ে বড় পরীক্ষার মুখোমুখি।

রাজু আলীম
কবি, সাংবাদিক, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব
সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SH.AL

SH.AL

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT