রাত পোহালেই পবিত্র ঈদুল আযহা। প্রথম দিকে এবার ঈদ যাত্রা স্বস্তিতে হলেও শেষের দিকে এসে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ পড়েছে পাটুরিয়া ও আরিচা ফেরি ঘাট এলাকায়। বুধবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত আরিচা ঘাটের অবস্থা একেবারেই দুর্বিসহ হয়ে পড়েছে।
আরিচা ফেরি ঘাট থেকে বোয়ালী ডাক্তারখানা পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকা জুড়ে গাড়ির দীর্ঘ লাইনে ফেরি পারের জন্য মহাসড়কের উপর অপেক্ষায় রয়েছে। দেখে মনে হয় আরিচা ঘাটের যেন সেই চিরচেনা রূপ ফেরে পেয়েছে। যানজটের কারণে আরিচা ঘাটের ট্রাফিক ব্যবস্থা একেবারেই ভেঙে পড়েছে। ফলে যাত্রী এবং যানবাহন শ্রমিকদের ভোগান্তির মাত্রা আরো বেড়ে গেছে।
যাত্রীরা সকালে বৃষ্টিতে ভিজে দীর্ঘ পথ পায়ে হেটে আরিচা ঘাটে পৌঁছাতে হচ্ছে। ফলে এবারের ঈদ যাত্রায় শেষের দিকে এসে যাত্রীরা অর্বনীয় দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে। ঝড়ো বাতাস, ফেরির যান্ত্রীক ত্রুটি, সরকারের নিষেধাজ্ঞা অমান্য, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহসড়েক যানজট, ও দুর্বল ট্রাফিক ব্যাবস্থার কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বুধবার ( ২৭ মে) সরজমিনে আরিচা ও পাটুরিয়া ঘাট ঘুরে দেখা গেছে, বৃষ্টিতে ভীজে দুই কিলোমিটার পথ পায়ে হেটে যাত্রীরা আরিচা ঘাটে পৌঁছিয়ে ফেরি, লঞ্চ ও স্পিডবোটযোগে পার হচ্ছে। সকাল ৭টায় আরিচাতে ঝড়ো বাতাস ও মশুলধারে বৃষ্টি শুরু হয়। এতে আরিচা-কাজিরহাট এবং পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে ১ ঘন্টা ফেরি চলচল বন্ধ ছিল।
এছাড়া, আরিচা-কাজিরহাট নৌরুটে চলাচলরত রো-রো ফেরি শাহ আলী মাঝে মধ্যেই যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে মেরামতে থাকছে। ফেরিটি বুধবার দিবাগত রাত ৩টায় যান্ত্রীক ত্রুটি দেখা দিলে আরিচাতেই মেরামতে রাখা হয়েছে। বেলা ৩টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ফেরিটি মেরামতে রয়েছে। ফলে আরিচা-কাজিরহাট নৌরুটে ৫টি ফেরির মধ্যে ৪টি ফেরি চলাচল করছে। যানবাহনের চাপের কারণে বেলা ১২টার দিকে পাটুরিয়া থেকে আরো ১ট ফেরি আরিচা-কাজিরহাট নৌরুটে যুক্ত হয়েছে। এ নিয়ে বর্তমানে ৫টি ফেরি চলাচল করছে।
এদিকে, ঈদের তিন দিন আগে এবং তিন দিন পরে কোরবানির পশুবাহি ও পচঁনশীল দ্রব্য বহণকারী ট্রাক বাদে অন্য সকল পণ্যবাহী ট্রাক চলাচল বন্ধ রাখার সরকারি নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তুু আরিচা-কাজিরহাট নৌরুটের আরিচা ঘাট হয়ে পাথর, সিমেন্টবাহী ট্রাকসহ অন্যান্য পণ্যবাহী ট্রাকও চলাচল করতে দেখা গেছে।অনেক সময় পাথরবাহী ট্রাক ফেরি থেকে নেমে ঢালু খাড়া ফেরি লোড-আনলোডের রাস্তায় ট্রাকগুলো থেমে যাচ্ছে। এতে ফেরি লোড-আনলোডে বিঘ্ন ঘটছে।
ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যানজটের কারণে যমুনা সেতু হয়ে চলাচলকারী উত্তরাঞ্চলের অনেক যানবাহন এবার আরিচা ঘাট হয়ে আরিচা-কাজিরহাট নৌরুট হয়ে চলাচল করছে। যাত্রীবাহি অনেক বাস আরিচা ঘাটে ফেরি পারের জন্য অপেক্ষায় থাকতে দেখা গেছে। বিশেষ করে পাবনা, ইশ্বরদী বাসগুলো আরিচা ঘাট হয়ে চলাচল করছে। আজ সকাল থেকেই প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস ও মটরসাইকেলের চাপ দেখা গেছে।
অন্যান্য বছরের চেয়ে এবার সকাল থেকেই হঠাৎ করে আরিচা ঘাটে যানবাহনের চাপ অনেক বেশী হওয়ায় ট্রাফিক ব্যবস্থা একেবারে ভেঙে পড়েছে।ফেরি ঘাট এলাকাতে এবং শিবালয় থানার সামনে থেকে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের উপর গাড়িগুলোকে এলোপাতাড়িভাবে রাখার কারণে স্থানীয় যানবাহনসহ ফেরি ঘাটের মধ্যে চলাচলকারি যানবাহগুলো চলাচলে চরমভাবে বিঘ্ন ঘটছে। এতে ফেরি লোড-আনলোডেও বেশী সময় লাগছে। ফলে ফেরি চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে এবং যানবাহন পারাপার কমে যায়।এসব কারণে ফেরি ঘাট এলাকায় এ অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
বুধবার বেলা সাড়ে ৩টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত আরিচা ঘাট থেকে বোয়ালী ডাক্তারখানা পর্যন্ত ২কিলোমিটার এবং পাটুরিয়া ঘাট এলাকা থেকে আরসিএল মোড় পর্যন্ত ২কিলোমিটার এলাকা জুড়ে যানজট রয়েছে। সকালে মুশুলধারে বৃষ্টি হওয়ায় বৃষ্টিতে ভীজেই পায়ে হেটে যাত্রীদেরকে ঘাট এলাকায় পৌঁছাতে হচ্ছে। একদিকে ঘাট এলাকায় যানজট, অপরদিকে বৃষ্টির কারণে যাত্রীদের ভোগান্তির মাত্রা আরো বেড়ে যায়।
যানজটের কারণে যমুনা সেতু হয়ে চলাচলকারি ওই রোডে চলাচলকরি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ অরিচা ঘাট হয়ে লঞ্চ, ফেরি ও স্পিডবোটে পার হয়ে প্রিয়জনদের সাথে ঈদ করার জন্য তারা বাড়ি যাচ্ছে।
এদিকে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কর্মজীবী হাজার হাজার মানুষ ফেরি ও লঞ্চে নদী পারাপার হয়ে গন্তব্যের দিকে যাচ্ছেন। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার ঈদে ঘরমুখো মানুষ ও যানবাহন এ রুটে চলাচল করতো। তবে পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর থেকে যাত্রী ও যানবাহনের চাপ কিছুটা কমে এসেছে। তবে ঈদের সময় যাত্রী ও যানবাহনের চাপ বেড়ে যায়।
ফেরি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, আরিচাতে ছোট-বড় প্রায় আড়াশ’ এবং পাটুরিয়া ঘাট এলাকায় আনুমানিক প্রায় তিন শতাধিক ছোট-বড় গাড়ি ফেরির অপেক্ষায় রয়েছে। স্বল্প পরিমাণ যানবাহন ফেরি পারাপার হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঘাটে জমতে থাকে যানবাহন।
পাবনার সি-লাইন পরিবহনের যাত্রী আরিফ মিয়া জানান, ঢাকা-টাঙ্গাইল রোডে যানজটের কারণে আরিচা হয়ে আসলাম। এখানে এসেও দেখি সমস্যা। তিন ঘন্টা অপেক্ষা করেও ফেরি পার হতে পারছি না।
ট্রাক চালক হামিদ আলী বলেন, মঙ্গলবার রাত ৯টায় সিমেন্ট লোড নিয়ে ঢাকা থেকে আরিচায় আসি। বেলা দুইটাতেও ফেরি পার হতে পারেনি। ঘাটে যে যানবাহনের চার দেখছি তাতে আজকে পার হতে পারবো কিনা তা বলতে পারছি না।
পাবনাগামী আব্দুস সালাম বলেন, প্রাইভেটকার নিয়ে সকালে আরিচা ঘাটে আসছি। তিন ঘন্টা অপেক্ষার পরও ফেরির নাগাল পায়নি। কখন ফেরির নাগাল পাবো তা বলতে পারছি না। পরিবার নিয়ে অনেক কষ্ট হচ্ছে।
রাজবাড়ীর হোসেন আলী বলেন, গাবতলী থেকে ভালোমতো এসেছি। ঘাটে এসে দেখি খারাপ অবস্থা। অনেক যানজট দুই ঘণ্টা হয় ঘাটে এসে পৌঁছেছি। জানিনা কখন যেতে পারব। কোরবানি ঈদের খুব একটা বাড়ি যাওয়া হয় না। ৬ বছর পর বাড়িতে কোরবানি ঈদ করতে যাচ্ছি কপাল খারাপ তাই ঘাটে এসে দুর্ভোগে পড়েছি।
ট্রাকচালক কামাল হোসেন বলেন, কাল রাতে আরিচা ঘাটে ছিলাম। ঘাটের অবস্থা ভালো না। এভাবে থাকলে মানুষের জীবন চলে না। জানিনা বাড়ি গিয়ে এবার ঈদ করতে পারবো কিনা জানিনা।
বিআইডব্লিউটিসি উপ-মহাব্যবস্থাপক (ভারপ্রাপ্ত) মো. আব্দুস সালাম বলেন, আজ বুধবার গাড়ির চাপ একটু বেড়েছে। মটর সাইকেল ও প্রাইভেটকারসহ যাত্রীবাহি বাস পার করতেই হিমশিম খাচ্ছি। যে কারণে বর্তমানে পণ্যবাহী ট্রাক পারাপার বন্ধ রয়েছে। যাত্রীবাহি ১২০টি বাস এবং ২শ’ পণ্যবাহী ট্রাক ফেরি পারের অপেক্ষায় রয়েছে।
আশা করি সন্ধ্যার মধ্যেই স্বাভাবিক হয়ে যাবে। এখন ১৪টি ফেরি পাটুরিয়া- দৌলতদিয়া নৌরুটে ও আরিচা- কাজিরহাট নৌরুটে ৫ ফেরি দিয়ে যানবাহন পারাপার করা হচ্ছে। যমুনা সেতুতে দীর্ঘ যানজট হওয়ার কারণে বুধবার সকাল থেকে আরিচা- কাজিরহাট নৌরুটে যানবাহনের চাপ বেড়ে গেছে বলে তিনি জানান।