পবিত্র ঈদুল আযহাকে কেন্দ্র করে ঘরমুখো মানুষের দুর্ভোগকে পুঁজি করে নেত্রকোণায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছে সিএনজি স্ট্যান্ড সিন্ডিকেট। জেলা প্রশাসনের মোবাইল কোর্ট, জরিমানা ও কড়া হুঁশিয়ারির পরও প্রকাশ্যে চলছে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের মহোৎসব। অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় পরিচালিত এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কার্যত অসহায় সাধারণ যাত্রীরা।
ঈদ সামনে রেখে যাত্রীসাধারণের নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করতে সম্প্রতি নেত্রকোণা জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ঢাকা বাসস্ট্যান্ড, রাজুর বাজার এলাকা ও মদন বাসস্ট্যান্ডে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগে বিভিন্ন পরিবহনের বিরুদ্ধে মামলা ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। একইসঙ্গে যাত্রীদের কাছ থেকে আদায়কৃত অতিরিক্ত ভাড়াও ফেরত দেওয়া হয়। প্রশাসন জানিয়েছিল, এমন অভিযান অব্যাহত থাকবে।
কিন্তু বাস্তব চিত্র যেন সম্পূর্ণ উল্টো। প্রশাসনের অভিযানের কয়েক ঘণ্টা না পেরোতেই জেলা শহরের বিভিন্ন সিএনজি স্ট্যান্ডে শুরু হয় নতুন করে ভাড়া নৈরাজ্য। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি রাজুর বাজার সিএনজি স্ট্যান্ডে।
স্থানীয় সূত্র ও একাধিক চালকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগে প্রতিটি সিএনজি থেকে স্ট্যান্ড বাবদ ৩০ টাকা করে নেওয়া হলেও ঈদ উপলক্ষে তা দ্বিগুণেরও বেশি বাড়ানো হয়েছে। আর সেই বাড়তি ‘জিপি’ তুলতেই যাত্রীদের কাছ থেকে দ্বিগুণ-তিনগুণ ভাড়া আদায় করছেন চালকেরা।
বর্তমানে রাজুর বাজার থেকে বারহাট্টা যেতে জনপ্রতি ১৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। অথচ স্বাভাবিক সময়ে এই ভাড়া ছিল মাত্র ৫০ টাকা। কলমাকান্দায় যেতে লাগতো ১২০ টাকার সেখানে যাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে প্রায় ৩০০ টাকা করে। একইভাবে মোহনগঞ্জে ভাড়া ছিলো ১০০ টাকা। এর পরিবর্তে গুনতে হচ্ছে ৩০০ টাকা পর্যন্ত।
ভুক্তভোগী যাত্রীরা জানান, অতিরিক্ত ভাড়ার প্রতিবাদ করলেই শুরু হয় ভয়ভীতি ও হুমকি। স্ট্যান্ড সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা প্রকাশ্যে বলে দেন—“ভাড়া কম দিতে চাইলে, কোনো সিএনজিতেই না নেওয়ার জন্য।” অনেক যাত্রীকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও গাড়ি না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
একাধিক যাত্রীর অভিযোগ, স্ট্যান্ডে কিছু চিহ্নিত ব্যক্তি প্রকাশ্যে সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছেন। তাদের ইশারা ছাড়া কোনো চালক নির্ধারিত ভাড়ার নিচে যাত্রী তুলতে পারেন না। কেউ নিয়ম ভাঙার চেষ্টা করলে তাকে স্ট্যান্ডে দাঁড়াতে দেওয়া হয় না বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, এই সিন্ডিকেটের পেছনে রয়েছে কয়েকজন পাতি রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়-প্রশ্রয়। ফলে প্রশাসনের অভিযানও অনেকটা ‘লোক দেখানো’ পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকছে বলে মনে করছেন সাধারণ মানুষ।
সচেতন মহলের প্রশ্ন, জেলা প্রশাসনের মোবাইল কোর্ট চলমান থাকার পরও কীভাবে একই এলাকায় প্রকাশ্যে এমন ভাড়া সন্ত্রাস চলতে পারে? অভিযানের পরও যদি যাত্রীরা দ্বিগুণ-তিনগুণ ভাড়া দিতে বাধ্য হন, তাহলে অভিযানের কার্যকারিতা কোথায়—এমন প্রশ্নও উঠেছে জনমনে।
ঈদে পরিবার-পরিজনের কাছে ফিরতে না পেরে কিংবা অতিরিক্ত ভাড়া গুনে কষ্টে বাড়ি ফিরছেন নিম্নআয়ের মানুষ। আর এই সুযোগেই এক শ্রেণির স্ট্যান্ড সিন্ডিকেট ও দালালচক্র সাধারণ মানুষের অসহায়ত্বকে ব্যবসায় পরিণত করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগীরা অবিলম্বে সিএনজি স্ট্যান্ডগুলোতে স্থায়ী নজরদারি, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন।