মুসলিম উম্মাহর জীবনে দুটি প্রধান ধর্মীয় উৎসব—ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। একটি আত্মসংযমের বিজয়ের আনন্দ, অন্যটি আত্মত্যাগ ও আনুগত্যের মহিমান্বিত প্রতীক।একমাস সিয়াম সাধনার পর ঈদুল ফিতর যেমন মানুষকে আত্মশুদ্ধির বার্তা দেয়, তেমনি ঈদুল আজহা মানুষকে শেখায় ত্যাগ, সহমর্মিতা ও আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যের শিক্ষা।
ঈদুল আজহার মূল প্রতিপাদ্য কেবল পশু কুরবানি নয়; বরং নিজের ভেতরের অহংকার, লোভ, হিংসা ও স্বার্থপরতাকে কুরবানি করা। ইসলামের ইতিহাসে হজরত ইব্রাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-এর আত্মত্যাগের ঘটনা মানব সভ্যতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।
আল্লাহর নির্দেশ পালনে একজন পিতা তাঁর সবচেয়ে প্রিয় সন্তানকে কুরবানি করতে প্রস্তুত হয়েছিলেন, আর পুত্র ও অকাতরে নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন স্রষ্টার সন্তুষ্টির জন্য। এই ঘটনার মধ্য দিয়েই কুরবানির চেতনা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
আল্লাহতাআলা পবিত্র কোরআনে বলেছেন, কুরবানির পশুর রক্ত বা গোশত তাঁর কাছে পৌঁছে না; পৌঁছে শুধু বান্দার তাকওয়া ও আন্তরিকতা।অর্থাৎ কুরবানির প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের প্রমাণ দেওয়া। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, আজ অনেক ক্ষেত্রেই কুরবানি তার আধ্যাত্মিক তাৎপর্য হারিয়ে লোক দেখানো প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। কে কত বড় গরু কিনলেন, কার পশুর দাম কত—এসব নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে আড্ডার টেবিল পর্যন্ত একধরনের প্রদর্শনীর সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।অথচ ইসলাম কুরবানিকে কখনোই অহংকার বা আড়ম্বরের বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করেনি।
ইসলামে কুরবানির একটি গভীর সামাজিক তাৎপর্য রয়েছে। সামর্থ্যবান মানুষের সম্পদে দরিদ্র মানুষের হক রয়েছে।
কুরবানির মাংস বণ্টনের বিধান সেই সামাজিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠারই এক অনন্য ব্যবস্থা। কুরবানির মাংসের এক অংশ গরিব মানুষের জন্য, এক অংশ আত্মীয় স্বজনের জন্য এবং এক অংশ নিজের পরিবারের জন্য রাখার যে বিধান, তার মধ্যে নিহিত রয়েছে পারস্পরিক সহমর্মিতা ও সামাজিক সম্প্রীতির শিক্ষা।
দরিদ্র মানুষের হাতে কুরবানির মাংস তুলে দেওয়া কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়; বরং এটি তাদের ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রতি বছর কুরবানির মাংস বিতরণকে কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খলা, অতিরিক্ত ভিড়, এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে।যা অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং ইসলামি শিক্ষার পরিপন্থি। ইসলাম কখনোই মানুষের সম্মানহানি বা অপমানকে সমর্থন করে না। তাই কুরবানির মাংস বিতরণে শৃঙ্খলা, সৌজন্য ও মানবিকতা নিশ্চিত করা জরুরি।
আমাদের সমাজে আরও একটি প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে—হারাম উপার্জনের অর্থ দিয়ে কুরবানি করা। কেউ দুর্নীতি, প্রতারণা বা অবৈধ উপার্জনের অর্থ দিয়ে বড় পশু কিনে কুরবানি করেন, অথচ মনে করেন এতে সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু ইসলাম সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, হারাম উপার্জনে ইবাদত কবুল হয় না।
ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির ওপর কুরবানি ওয়াজিব নয়। অথচ অনেকেই সামাজিক চাপে পড়ে ধারদেনা করে কুরবানি দেন।ধর্মীয় বিধান কেনা বুঝে কেবল সামাজিক মর্যাদা রক্ষার মানসিকতা কুরবানির প্রকৃত চেতনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
বাংলাদেশে বৃহস্পতিবার অর্থাৎ ২৮ মে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত হতে যাচ্ছে। ঈদ এলেই শৈশবের স্মৃতিগুলো নতুন করে হৃদয়ে দোলা দেয়।ছোটবেলার ঈদছিল এক অন্য রকম নির্মল আনন্দের নাম। ঈদের কয়েকদিন আগে থেকেই বাড়িতে উৎসবের আমেজ শুরু হতো। নতুন জামা-কাপড় কেনার আনন্দ, সেটি লুকিয়ে রাখার শিশুসুলভ উচ্ছ্বাস, কুরবানির পশুকে ঘাস খাওয়ানো, পানি খাওয়ানো—সবকিছু মিলিয়ে ঈদ যেন ছিল একরঙিন স্বপ্নের জগৎ।
ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে ঈদের নামাজ পড়তে যাওয়ার স্মৃতি আজও চোখে ভাসে। খুব ভোরে ঘুম থেকে ডেকে তোলা হতো।
গোসল করে নতুন পোশাক পরে আমরা মুরব্বিদের সঙ্গে ঈদগাহে যেতাম। ঈদুল ফিতরের তুলনায় ঈদুল আজহার জামাত একটু আগে শুরু হতো, কারণ নামাজ শেষে কুরবানি দিতে হতো। বাড়িতে সাধারণত ঈদের দুই-তিন দিন আগে গরু ও ছাগল কেনা হতো। আমরা ছোটরা দল বেঁধে পশুর যত্ন নিতাম। কিন্তু কুরবানির সময় এলে মনটা খারাপ হয়ে যেত। মনে হতো, এত আদরের পশুটিকে যদি কুরবানি না করা হতো!
ঈদের দিন আত্মীয় স্বজনদের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া, সেমাই-পোলা ও খাওয়া, বন্ধু ও পরিচিতজনদের সঙ্গে কুশলাদি বিনিময়, আড্ডা—সব মিলিয়ে ঈদ ছিল হৃদয়ের গভীর আনন্দের উৎস।এখনো ঈদ আসে, মানুষ আনন্দ করে, কিন্তু সেই শৈশবের নির্মল আনন্দ যেন কোথাও হারিয়ে গেছে।
সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ঈদ উদযাপনের ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। প্রযুক্তি নির্ভর ব্যস্ত নগর জীবনে মানুষ অনেকটাই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে।
একসময় ঈদ ছিল আত্মীয় তার বন্ধন দৃঢ় করার উপলক্ষ; এখন অনেক ক্ষেত্রে তা সামাজিক আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। গ্রামে এখনো ঈদের প্রাণ আছে—খেলাধুলা, মেলা, পাড়া-প্রতিবেশীর সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি । কিন্তু শহুরে জীবনে ঈদের অনেকটাই আবদ্ধ হয়ে গেছে ফ্ল্যাটের চার দেয়ালে।
ঈদ আমাদের শেখায় পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সম্প্রীতি ও সহমর্মিতা। কিন্তু আমরা কি সত্যিই সেই শিক্ষা গ্রহণ করছি? যদি ঈদের মর্মবাণী বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে পারতাম, তাহলে সমাজে এত বৈষম্য, হিংসা ও বিভেদ থাকত না। ধর্মীয় উৎসবের বাহ্যিক আয়োজন আমরা জাঁকজমকভাবে পালন করি, কিন্তু তার অন্তর্নিহিত শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করতে ব্যর্থ হই।
পরিবারের বড়দের অবদান ঈদের সময় সবচেয়ে বেশি উপলব্ধি করা যায়। ছোটবেলায় বুঝিনি, এখন বুঝতে পারি—একটি পরিবারের কর্তা সন্তানদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য কত ত্যাগ স্বীকার করেন। বাবা সত্যিইএকটি পরিবারের বটবৃক্ষের মতো। নিজের কষ্ট লুকিয়ে রেখে তিনি পরিবারের সবার জন্য আনন্দের ব্যবস্থা করেন।সন্তান যখন নিজে পরিবার-প্রধান হয়, তখনই বাবার সেই নিঃশব্দ ত্যাগের গভীরতা উপলব্ধি করতে পারে।
ঈদ শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি প্রবাসীদের জন্য ও এক আবেগের নাম। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কর্মসূত্রে অবস্থানরত লাখো বাংলাদেশি ঈদের সময় পরিবার-পরিজনের জন্য গভীরভাবে ব্যাকুল হয়ে ওঠেন। বিদেশে থাকলে দেশের প্রতি ভালোবাসা আর ও গভীরভাবে অনুভব করা যায়। প্রবাসীদের কাছে ঈদ মানে স্মৃতি, নস্টালজিয়া আর আপনজনের অভাববোধ।
আমাদের ঈদের তাৎপর্য নতুনভাবে উপলব্ধি করার প্রয়োজন রয়েছে। সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য, সামাজিক অস্থিরতা ও নৈতিক অবক্ষয়ের মধ্যে ঈদ হতে পারেমানবিক পুনর্জাগরণের উপলক্ষ। কুরবানির প্রকৃত শিক্ষা যদি আমরা হৃদয়ে ধারণ করতে পারি, তাহলে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব।
ঈদুল আজহার মূল শিক্ষা হচ্ছে ত্যাগ। শুধু পশু কুরবানি নয়, অন্যায়-অবিচার, দুর্নীতি, লোভ ও হিংসাকে কুরবানি করার মধ্যেই ঈদের প্রকৃত সৌন্দর্য নিহিত।
সমাজের বিত্তবানরা যদি আন্তরিকভাবে দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ান, যদি আমরা একে অপরের অধিকারকে সম্মান করতে শিখি, তাহলেই ঈদের প্রকৃত আনন্দ প্রতিষ্ঠিত হবে।
ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত এই ঈদ আমাদের শিখাক মানবিকতা, সহানুভূতি ও ভ্রাতৃত্ববোধের পাঠ। ঈদ হোক আত্মশুদ্ধির, সামাজিক সম্প্রীতির এবং একটি ন্যায় ভিত্তিক মানবিক বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকারের উৎসব।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: [email protected]