বিলিয়ন ডলারের সামরিক বাজেট, যুদ্ধ বিমান, সুপারসনিক মিসাইল, ড্রোন আর স্যাটেলাইটের নিখুঁত নজরদারি সব কিছুকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কীভাবে সাধারণ মানুষ মাটি কামড়ে যুদ্ধ জিতে ছিল, আজ আমরা ইতিহাসের সেই আয়নায় নিজেদের মুখ দেখব।
বিশ্বের নানা দেশের সামরিক মনস্তত্ত্ব এবং তাদের বড় বড় রণকৌশল দেখার অভিজ্ঞতা থেকে একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করেছি। পরাশক্তির আধুনিকতম ফাইটার জেট বা ট্যাংকের চালকদের মনে একটা গোপন, অদৃশ্য ভয় কাজ করে। তারা প্রথাগত একটা বাহিনীকে চেনে, কিন্তু যখন তাদের এমন এক শত্রুর মুখোমুখি হতে হয় যার কোনো নির্দিষ্ট পরিচয় নেই, কোনো নির্দিষ্ট ক্যাম্প নেই, অচেনা সমর পদ্ধতি, তখন তাদের চেইন অব কমান্ড মানসিকভাবে পঙ্গু হয়ে পড়ে।
ভিয়েতনামের গহীন জঙ্গল; তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী এবং প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত সামরিক বাহিনী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সর্বাধুনিক সমরাস্ত্র, নেপাম বোমা আর রাসায়নিক ‘এজেন্ট অরেঞ্জ’ নিয়ে ভিয়েতনামে নেমেছিল। সামরিক হিসাব নিকাশে ভিয়েতনামের মতো একটি ছোট ও দরিদ্র দেশের টিকে থাকার কোনো সুযোগই ছিল না। কিন্তু ভিয়েতনামের আপামর জনতার ‘সহজাত আবেগ ও মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধের’ শক্তিকে মার্কিনিরা হিসাব করতে ভুল করেছিল। সেখানকার আধাবয়সী কৃষক আর সাধারণ নারীরা লুঙ্গি-গেঞ্জির মতো পোশাক পরে নিজেদের ভূখণ্ডে মার্কিন বাহিনীর কবর রচনা করেছিল। তারা মাটির নিচে মাইলের পর মাইল বিস্তৃত এমন সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিল, যা কোনো মার্কিন রাডার বা আধুনিক প্রযুক্তি ধরতে পারেনি। তাদের কোনো আধুনিক বোমা ছিল না; বাঁশ আর লোহা দিয়ে তৈরি করেছিল সাধারণ কিছু ফাঁদ । যখন একজন মার্কিন সৈন্য সেই অদৃশ্য সুড়ঙ্গ আর সাধারণ বাঁশের ফাঁদের মুখোমুখি হতো, তখন তার মিলিয়ন ডলারের প্রযুক্তির অহংকার এক লহমায় ধুলিসাৎ হয়ে যেত। ভিয়েতনামের এই ‘পিপলস আর্মি’ প্রমাণ করেছিল, প্রযুক্তি কখনো মানুষের আবেগকে পরাজিত করতে পারে না।
আফগানিস্তানের রুক্ষ পাহাড়ি গিরিপথ, যাকে বিশ্ব রাজনীতিতে বলা হয় সাম্রাজ্যের কবরস্থান। প্রথমে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং পরবর্তীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, উভয় পরাশক্তিই তাদের সেরা সামরিক শক্তি নিয়ে এই ভূখণ্ডে প্রবেশ করে নির্মমভাবে ব্যর্থ হয়েছিল। পাহাড়ের সাধারণ মেষপালক কিংবা অতিসাধারণ উপজাতিদের কাছে কোন মিসাইল কিংবা যুদ্ধ বিমান ছিল না, তারা কেবল চিনত নিজেদের রুক্ষ পাহাড়ের প্রতিটি ইঞ্চি, প্রতিটি কোণ। নিজের মাটিকে চেনার এই শক্তি এবং বহিরাগত শক্তির বিরুদ্ধে তাদের যে তীব্র আবেগীয় জেদ, তা দিয়ে তারা বিশ্বের সেরা দুই পরাশক্তিকে পাততাড়ি গুটাতে বাধ্য করেছিল।
বাংলার মহান মুক্তিযুদ্ধ কোনো প্রথাগত সেনাবাহিনীর যুদ্ধ ছিল না, তা ছিল ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ‘পিপলস ওয়ার’। তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম পেশাদার বাহিনী যখন আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তখন তারা ভেবেছিল মাত্র কয়েক দিনে এই নরম পলি মাটির সরল বাঙালিকে তারা স্তব্ধ করে দেবে। কিন্তু তারা পরাজিত হয়েছে; আমাদের পিতামাতার সেই যুদ্ধ ছিল জাতীয় আত্মসম্মানবোধ প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ। ঢাকা ও চট্টগ্রামে আমাদের সেনাদের প্রতিরোধকে তারা গুঁড়িয়ে দিয়েছিল, কিন্তু আমাদের যুদ্ধ শেষ হয়ে যায়নি; বরং আসল যুদ্ধটা সেখান থেকেই শুরু হয়েছিল। গ্রামের সাধারণ কৃষক, স্কুল-কলেজের ছাত্র, আর মাঝিরা কাদা-জল পেরিয়ে শুধু থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল আর অদম্য আবেগ নিয়ে নেমে পড়েছিল। ‘ক্র্যাক প্লাটুন’-এর শহুরে তরুণদের গেরিলা অপারেশনগুলো কোনো প্রথাগত চেইন অব কমান্ড দিয়ে পরিচালিত হয়নি; হয়েছিল দেশপ্রেমের তীব্র আবেগের টানে। পাকিস্তানি সৈন্যরা বাঙ্কারে বসে কাঁপত এই ভয়ে যে, রাস্তায় হেঁটে যাওয়া ছাতা মাথায় সাধারণ মানুষটি কিংবা লুঙ্গি পরা কৃষকটিই হয়তো একেকজন দুর্ধর্ষ গেরিলা।
পরাশক্তিগুলোর পতনের ইতিহাস কেবল ভিয়েতনাম বা একাত্তরের কাদা-জলে সীমাবদ্ধ নয়। যদি ভাবেন আধুনিক প্রযুক্তির এই যুগে ‘জনতার মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ’ বুঝি মার খেয়ে গেছে, তবে লক্ষ্য করুন মধ্যপ্রাচ্যের সিংহভাগজুড়ে প্রভাব বিস্তার করে রাখা ইরানের দিকে। বিগত কয়েক দশক ধরে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বড় অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, সাইবার আক্রমণ এবং সামরিক হুমকি, সবকিছুই ইরানের ওপর একযোগে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের সবচেয়ে বড় বড় বিজ্ঞানী এবং সামরিক কমান্ডারদের আন্তর্জাতিক চক্রান্তে হত্যা করা হয়েছে। তাদের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোতে ‘স্টাক্সনেট’ এর মতো ইতিহাসের সবচেয়ে জটিল ও ধ্বংসাত্মক সাইবার ম্যালওয়্যার দিয়ে আক্রমণ করা হয়েছে। বিশ্বের দুই সামরিক শক্তি একত্রিত হয়ে ইরানের উপর ইতিহাসের ভয়ঙ্কর সামরিক অভিযান চালিয়েছে; তাদের শীর্ষ সামরিক কমান্ডার এবং রাজনৈতিক ও আধ্যাতিক নেতাদের হত্যা করেছে। সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক হিসাবে, এত বড় বড় ধাক্কায় যেকোনো শক্তিশালী দেশেরও মেরুদণ্ড ভেঙে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ইরান টিকে আছে এবং শুধু টিকেই নেই, তারা তাদের নিজেদের উদ্ভাবন আর জাতীয় আবেগের শক্তিতে আজ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রধান নিয়ন্ত্রক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
কীভাবে পারল তারা?
ইরান খুব দ্রুতই বুঝে গিয়েছিল যে, অন্য দেশের কাছ থেকে কেনা সফটওয়্যার, স্পেয়ার পার্টস বা যুদ্ধবিমানের ওপর নির্ভর করে কখনো টিকে থাকা যায় না। তারা নিজেদের প্রযুক্তি নিজেরাই উদ্ভাবন করা শুরু করল। আজ তাদের যে ড্রোনের সক্ষমতা দেখে পরাশক্তিগুলো কাঁপে, তা কিন্তু কোনো বিলাসবহুল পশ্চিমা ল্যাবরেটরি থেকে আসেনি; তা এসেছে তাদের নিজেদের বিজ্ঞানীদের রাতদিন এক করা উদ্ভাবন থেকে।
ইরানি জনগণের মাঝে রয়েছে এক তীব্র ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় আবেগ। যখনই তাদের জাতীয় আত্মসম্মানে আঘাত করা হয়েছে, তাদের ভেতরের সেই আবেগ কোনো বিভেদ রাখেনি। দেশের ভেতরে রাজনৈতিক মতপার্থক্য যতই থাকুক না কেন, যখনই বহিরাগত কোনো কালো থাবা তাদের সার্বভৌমত্বের দিকে তাক করেছে, তাদের কোটি কোটি জনতা এক অদৃশ্য মনস্তাত্ত্বিক দেওয়ালে পরিণত হয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে যখন বিশ্বজুড়ে প্রোপাগান্ডা আর আক্রমণ শুরু হলো, তখন শুধু তাদের নিয়মিত সেনাবাহিনী লড়েনি। তাদের তরুণ প্রজন্ম, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ঘরের ল্যাপটপ আর স্মার্টফোনকে বানিয়ে তুলল একেকটি সাইবার অস্ত্র। তারা শত্রুর পাতা প্রোপাগান্ডার ফাঁদকে চূর্ণ করে নিজেদের সাইবার ডিফেন্স তৈরি করল।
ইরানের এই গল্পটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়, শত্রুর অস্ত্র যত আধুনিকই হোক না কেন, যদি জাতির নিজস্ব উদ্ভাবন সক্ষমতায় মনোনিবেশ করা যায় এবং ‘জাতীয় আবেগ’ যদি সঠিকভাবে পরিচর্যা করা হয়, তবে তাকে কোনো সামরিক আক্রমণ, কোন নিষেধাজ্ঞা বা সাইবার আক্রমণ দিয়ে তাকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। পরাশক্তির পরাজয়ের প্রধান কারণ একটাই, তারা লড়েছিল একটি নির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক বাহিনীর বিরুদ্ধে নয়, তারা লড়তে গিয়েছিল পুরো একটি ‘জনসমুদ্রের’ বিরুদ্ধে। যখন একটি দেশের কোটি কোটি মানুষ প্রতিরক্ষার অংশ হয়ে যায়, তখন শত্রুর পক্ষে সেই দেশকে দখল করা অসম্ভব।
আমাদের কী নেই, তা নিয়ে হাহাকার করার কোন প্রয়োজন নেই; কেনা বা ধার করা অস্ত্রের দরকার নেই। আমাদের নিজেদের উদ্ভাবন, প্রশিক্ষণ আর আত্মমর্যাদার শক্তি দিয়েই আমরা জগতের সমীহ আদায় করতে পারি। বিষ পিঁপড়াদের সেই সম্মিলিত কামড়ের মতো আঠারো কোটির ‘পিপলস আর্মি’ই হতে পারে বাংলাদেশের আসল প্রতিরক্ষা দুর্গ।
কিন্তু সময়ের সাথে সাথে যুদ্ধের রূপ বদলে যাচ্ছে। জনতার প্রতিরোধ অপরাজেয়, কিন্তু এই একবিংশ শতাব্দীতে মাঠে আর জংগলে যুদ্ধ সীমাবদ্ধ নেই; এখন যুদ্ধ হচ্ছে স্মার্টফোনের স্ক্রিনে, ইন্টারনেটের ফাইবারে আর প্রোপাগান্ডার সাইবার স্পেসে। আকাশ, সাগর কিংবা স্পেসে যে যুদ্ধ, তার চেয়েও মারাত্ত্বক যুদ্ধ চলছে জনগণের অন্তরের আকাশে। লিবিয়ার ধ্বংস, সিরিয়ার পতন এমন আরও অনেক উদাহরণ আমাদের চারপাশে। অত্যন্ত কৌশলে শত্রুরা জনগণের অন্তরে নানা পদ্ধতিতে বিষ ঢুকিয়ে দিয়ে জনগণকে বিভক্ত করার অপারেশন চালাচ্ছে। শত্রুরা টার্গেট দেশের রাজনৈতিক আর সাংস্কৃতিক কাঠামো দখল করে জনগণের আত্মসম্মানবোধ ও জাতিসত্তাকে প্যারালাইজড করার ফাঁদ সৃষ্টি করছে।
আমরা কীভাবে নিজেদের জাতিসত্তার প্রতিরক্ষায় ব্যারিকেড গড়ে তুলব? সেই বিষয়ে লিখব পরের পর্বে? (পর্ব-০২)
(মাইন্ড-ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের গবেষক)
বিশ্বের নানা দেশের সামরিক মনস্তত্ত্ব এবং তাদের বড় বড় রণকৌশল দেখার অভিজ্ঞতা থেকে একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করেছি। পরাশক্তির আধুনিকতম ফাইটার জেট বা ট্যাংকের চালকদের মনে একটা গোপন, অদৃশ্য ভয় কাজ করে। তারা প্রথাগত একটা বাহিনীকে চেনে, কিন্তু যখন তাদের এমন এক শত্রুর মুখোমুখি হতে হয় যার কোনো নির্দিষ্ট পরিচয় নেই, কোনো নির্দিষ্ট ক্যাম্প নেই, অচেনা সমর পদ্ধতি, তখন তাদের চেইন অব কমান্ড মানসিকভাবে পঙ্গু হয়ে পড়ে।
ভিয়েতনামের গহীন জঙ্গল; তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী এবং প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত সামরিক বাহিনী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সর্বাধুনিক সমরাস্ত্র, নেপাম বোমা আর রাসায়নিক ‘এজেন্ট অরেঞ্জ’ নিয়ে ভিয়েতনামে নেমেছিল। সামরিক হিসাব নিকাশে ভিয়েতনামের মতো একটি ছোট ও দরিদ্র দেশের টিকে থাকার কোনো সুযোগই ছিল না। কিন্তু ভিয়েতনামের আপামর জনতার ‘সহজাত আবেগ ও মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধের’ শক্তিকে মার্কিনিরা হিসাব করতে ভুল করেছিল। সেখানকার আধাবয়সী কৃষক আর সাধারণ নারীরা লুঙ্গি-গেঞ্জির মতো পোশাক পরে নিজেদের ভূখণ্ডে মার্কিন বাহিনীর কবর রচনা করেছিল। তারা মাটির নিচে মাইলের পর মাইল বিস্তৃত এমন সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিল, যা কোনো মার্কিন রাডার বা আধুনিক প্রযুক্তি ধরতে পারেনি। তাদের কোনো আধুনিক বোমা ছিল না; বাঁশ আর লোহা দিয়ে তৈরি করেছিল সাধারণ কিছু ফাঁদ । যখন একজন মার্কিন সৈন্য সেই অদৃশ্য সুড়ঙ্গ আর সাধারণ বাঁশের ফাঁদের মুখোমুখি হতো, তখন তার মিলিয়ন ডলারের প্রযুক্তির অহংকার এক লহমায় ধুলিসাৎ হয়ে যেত। ভিয়েতনামের এই ‘পিপলস আর্মি’ প্রমাণ করেছিল, প্রযুক্তি কখনো মানুষের আবেগকে পরাজিত করতে পারে না।
আফগানিস্তানের রুক্ষ পাহাড়ি গিরিপথ, যাকে বিশ্ব রাজনীতিতে বলা হয় সাম্রাজ্যের কবরস্থান। প্রথমে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং পরবর্তীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, উভয় পরাশক্তিই তাদের সেরা সামরিক শক্তি নিয়ে এই ভূখণ্ডে প্রবেশ করে নির্মমভাবে ব্যর্থ হয়েছিল। পাহাড়ের সাধারণ মেষপালক কিংবা অতিসাধারণ উপজাতিদের কাছে কোন মিসাইল কিংবা যুদ্ধ বিমান ছিল না, তারা কেবল চিনত নিজেদের রুক্ষ পাহাড়ের প্রতিটি ইঞ্চি, প্রতিটি কোণ। নিজের মাটিকে চেনার এই শক্তি এবং বহিরাগত শক্তির বিরুদ্ধে তাদের যে তীব্র আবেগীয় জেদ, তা দিয়ে তারা বিশ্বের সেরা দুই পরাশক্তিকে পাততাড়ি গুটাতে বাধ্য করেছিল।
বাংলার মহান মুক্তিযুদ্ধ কোনো প্রথাগত সেনাবাহিনীর যুদ্ধ ছিল না, তা ছিল ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ‘পিপলস ওয়ার’। তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম পেশাদার বাহিনী যখন আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তখন তারা ভেবেছিল মাত্র কয়েক দিনে এই নরম পলি মাটির সরল বাঙালিকে তারা স্তব্ধ করে দেবে। কিন্তু তারা পরাজিত হয়েছে; আমাদের পিতামাতার সেই যুদ্ধ ছিল জাতীয় আত্মসম্মানবোধ প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ। ঢাকা ও চট্টগ্রামে আমাদের সেনাদের প্রতিরোধকে তারা গুঁড়িয়ে দিয়েছিল, কিন্তু আমাদের যুদ্ধ শেষ হয়ে যায়নি; বরং আসল যুদ্ধটা সেখান থেকেই শুরু হয়েছিল। গ্রামের সাধারণ কৃষক, স্কুল-কলেজের ছাত্র, আর মাঝিরা কাদা-জল পেরিয়ে শুধু থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল আর অদম্য আবেগ নিয়ে নেমে পড়েছিল। ‘ক্র্যাক প্লাটুন’-এর শহুরে তরুণদের গেরিলা অপারেশনগুলো কোনো প্রথাগত চেইন অব কমান্ড দিয়ে পরিচালিত হয়নি; হয়েছিল দেশপ্রেমের তীব্র আবেগের টানে। পাকিস্তানি সৈন্যরা বাঙ্কারে বসে কাঁপত এই ভয়ে যে, রাস্তায় হেঁটে যাওয়া ছাতা মাথায় সাধারণ মানুষটি কিংবা লুঙ্গি পরা কৃষকটিই হয়তো একেকজন দুর্ধর্ষ গেরিলা।
পরাশক্তিগুলোর পতনের ইতিহাস কেবল ভিয়েতনাম বা একাত্তরের কাদা-জলে সীমাবদ্ধ নয়। যদি ভাবেন আধুনিক প্রযুক্তির এই যুগে ‘জনতার মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ’ বুঝি মার খেয়ে গেছে, তবে লক্ষ্য করুন মধ্যপ্রাচ্যের সিংহভাগজুড়ে প্রভাব বিস্তার করে রাখা ইরানের দিকে। বিগত কয়েক দশক ধরে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বড় অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, সাইবার আক্রমণ এবং সামরিক হুমকি, সবকিছুই ইরানের ওপর একযোগে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের সবচেয়ে বড় বড় বিজ্ঞানী এবং সামরিক কমান্ডারদের আন্তর্জাতিক চক্রান্তে হত্যা করা হয়েছে। তাদের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোতে ‘স্টাক্সনেট’ এর মতো ইতিহাসের সবচেয়ে জটিল ও ধ্বংসাত্মক সাইবার ম্যালওয়্যার দিয়ে আক্রমণ করা হয়েছে। বিশ্বের দুই সামরিক শক্তি একত্রিত হয়ে ইরানের উপর ইতিহাসের ভয়ঙ্কর সামরিক অভিযান চালিয়েছে; তাদের শীর্ষ সামরিক কমান্ডার এবং রাজনৈতিক ও আধ্যাতিক নেতাদের হত্যা করেছে। সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক হিসাবে, এত বড় বড় ধাক্কায় যেকোনো শক্তিশালী দেশেরও মেরুদণ্ড ভেঙে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ইরান টিকে আছে এবং শুধু টিকেই নেই, তারা তাদের নিজেদের উদ্ভাবন আর জাতীয় আবেগের শক্তিতে আজ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রধান নিয়ন্ত্রক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
কীভাবে পারল তারা?
ইরান খুব দ্রুতই বুঝে গিয়েছিল যে, অন্য দেশের কাছ থেকে কেনা সফটওয়্যার, স্পেয়ার পার্টস বা যুদ্ধবিমানের ওপর নির্ভর করে কখনো টিকে থাকা যায় না। তারা নিজেদের প্রযুক্তি নিজেরাই উদ্ভাবন করা শুরু করল। আজ তাদের যে ড্রোনের সক্ষমতা দেখে পরাশক্তিগুলো কাঁপে, তা কিন্তু কোনো বিলাসবহুল পশ্চিমা ল্যাবরেটরি থেকে আসেনি; তা এসেছে তাদের নিজেদের বিজ্ঞানীদের রাতদিন এক করা উদ্ভাবন থেকে।
ইরানি জনগণের মাঝে রয়েছে এক তীব্র ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় আবেগ। যখনই তাদের জাতীয় আত্মসম্মানে আঘাত করা হয়েছে, তাদের ভেতরের সেই আবেগ কোনো বিভেদ রাখেনি। দেশের ভেতরে রাজনৈতিক মতপার্থক্য যতই থাকুক না কেন, যখনই বহিরাগত কোনো কালো থাবা তাদের সার্বভৌমত্বের দিকে তাক করেছে, তাদের কোটি কোটি জনতা এক অদৃশ্য মনস্তাত্ত্বিক দেওয়ালে পরিণত হয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে যখন বিশ্বজুড়ে প্রোপাগান্ডা আর আক্রমণ শুরু হলো, তখন শুধু তাদের নিয়মিত সেনাবাহিনী লড়েনি। তাদের তরুণ প্রজন্ম, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ঘরের ল্যাপটপ আর স্মার্টফোনকে বানিয়ে তুলল একেকটি সাইবার অস্ত্র। তারা শত্রুর পাতা প্রোপাগান্ডার ফাঁদকে চূর্ণ করে নিজেদের সাইবার ডিফেন্স তৈরি করল।
ইরানের এই গল্পটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়, শত্রুর অস্ত্র যত আধুনিকই হোক না কেন, যদি জাতির নিজস্ব উদ্ভাবন সক্ষমতায় মনোনিবেশ করা যায় এবং ‘জাতীয় আবেগ’ যদি সঠিকভাবে পরিচর্যা করা হয়, তবে তাকে কোনো সামরিক আক্রমণ, কোন নিষেধাজ্ঞা বা সাইবার আক্রমণ দিয়ে তাকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। পরাশক্তির পরাজয়ের প্রধান কারণ একটাই, তারা লড়েছিল একটি নির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক বাহিনীর বিরুদ্ধে নয়, তারা লড়তে গিয়েছিল পুরো একটি ‘জনসমুদ্রের’ বিরুদ্ধে। যখন একটি দেশের কোটি কোটি মানুষ প্রতিরক্ষার অংশ হয়ে যায়, তখন শত্রুর পক্ষে সেই দেশকে দখল করা অসম্ভব।
আমাদের কী নেই, তা নিয়ে হাহাকার করার কোন প্রয়োজন নেই; কেনা বা ধার করা অস্ত্রের দরকার নেই। আমাদের নিজেদের উদ্ভাবন, প্রশিক্ষণ আর আত্মমর্যাদার শক্তি দিয়েই আমরা জগতের সমীহ আদায় করতে পারি। বিষ পিঁপড়াদের সেই সম্মিলিত কামড়ের মতো আঠারো কোটির ‘পিপলস আর্মি’ই হতে পারে বাংলাদেশের আসল প্রতিরক্ষা দুর্গ।
কিন্তু সময়ের সাথে সাথে যুদ্ধের রূপ বদলে যাচ্ছে। জনতার প্রতিরোধ অপরাজেয়, কিন্তু এই একবিংশ শতাব্দীতে মাঠে আর জংগলে যুদ্ধ সীমাবদ্ধ নেই; এখন যুদ্ধ হচ্ছে স্মার্টফোনের স্ক্রিনে, ইন্টারনেটের ফাইবারে আর প্রোপাগান্ডার সাইবার স্পেসে। আকাশ, সাগর কিংবা স্পেসে যে যুদ্ধ, তার চেয়েও মারাত্ত্বক যুদ্ধ চলছে জনগণের অন্তরের আকাশে। লিবিয়ার ধ্বংস, সিরিয়ার পতন এমন আরও অনেক উদাহরণ আমাদের চারপাশে। অত্যন্ত কৌশলে শত্রুরা জনগণের অন্তরে নানা পদ্ধতিতে বিষ ঢুকিয়ে দিয়ে জনগণকে বিভক্ত করার অপারেশন চালাচ্ছে। শত্রুরা টার্গেট দেশের রাজনৈতিক আর সাংস্কৃতিক কাঠামো দখল করে জনগণের আত্মসম্মানবোধ ও জাতিসত্তাকে প্যারালাইজড করার ফাঁদ সৃষ্টি করছে।
আমরা কীভাবে নিজেদের জাতিসত্তার প্রতিরক্ষায় ব্যারিকেড গড়ে তুলব? সেই বিষয়ে লিখব পরের পর্বে? (পর্ব-০২)
(মাইন্ড-ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের গবেষক)