জরাজীর্ণ,নড়বড়ে টিনের ঘরে অসহনীয় কষ্ট নিয়ে বসবাস করছেন দরিদ্র বৃদ্ধ দম্পতি। দিনের বেলায় ভাঙা টিনের ফাঁক দিয়ে ঘরে প্রবেশ করে সূর্যের আলো, আর বৃষ্টি হলেই টপটপ করে পড়ে পানি।
কখনো তীব্র বাতাস উঠলে টিনের চালা উড়ে যাওয়ার ভয় তাদের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেয়। অভাবের যন্ত্রণায় ছটফট করে পার হচ্ছে তাদের দিন। সুখের স্বপ্ন ভুলে এখন কোনো রকমে জীবন বাঁচানোর যুদ্ধ চলছে তাদের। এমনই সীমাহীন কষ্ট আর অভাবের কষাঘাতে জর্জরিত জীবন পার করছেন নিন্দু মিয়া (৬৫) ও কুলসুম (৪৬) নামের এই বৃদ্ধ দম্পতি।
কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার জালালপুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ফেকামারা গ্রামের বাসিন্দা তারা। দীর্ঘদিন ধরে এমন দুঃখ-কষ্ট নিয়ে জীবন যাপন করলেও কারো কাছ থেকে কোনো সহায়তা পাননি তারা। মানুষের সহানুভূতি ও সহযোগিতায় এই বৃদ্ধ স্বামী-স্ত্রীর জীবনের বাকি দিনগুলো হয়তো একটু হলেও ভালো কাটতে পারে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ফসলের মাঠের মধ্যে ঝোপঝাড়ঘেরা নির্জন স্থানে একটি ছোট্ট, নড়বড়ে ও জরাজীর্ণ বাঁশের তৈরি টিনের ঘর। কোথাও পুরোনো টিন খুলে পড়ে রয়েছে, আবার কোথাও পলিথিন দিয়ে জোড়াতালি দেওয়া। ঘরের ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, দুই বৃদ্ধ স্বামী-স্ত্রী পলিথিন মুড়িয়ে শুয়ে আছেন। কারণ, বৃষ্টির পানি ঘরের ফুটো দিয়ে শরীরে পড়ে। ভেতরের দৃশ্য অত্যন্ত করুণ। এমন স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে মানুষের বসবাস প্রায় অসম্ভব।ঘরের ভেতরের বিভিন্ন অংশ ফাঁকা হয়ে থাকায় পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। এ যেন পরিস্থিতির সঙ্গে অসম টিকে থাকার নির্মম লড়াই।
স্থানীয় লোকজন জানায়, এই বৃদ্ধ দম্পতির তিন মেয়ে ও দুই ছেলে রয়েছে। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। বড় ছেলে থাকলেও তিনি বাবা-মায়ের খোঁজ নেন না। ছোট ছেলেকে নিয়ে কোনোমতে বসবাস করছেন তারা। ভিটেমাটি ছাড়া আর কোনো জমিজমা নেই তাদের। একটি ঘর ও চলার মতো সহায়তা এখন তাদের জরুরি প্রয়োজন। অসুস্থ শরীর নিয়ে চিকিৎসার অভাবে ধুঁকছেন এ দম্পতি।
বৃদ্ধ নিন্দু মিয়া বলেন,‘রাইতে ঝড় হলে চিন্তা করি,এই বুঝি ঘরটা উড়াইয়া গেল। ভয়ে দুজন থরথর করে কাঁপতে থাকি। বৃষ্টি হলেই টিনের ফাঁক দিয়ে পানি পড়ে শরীরে। বিছানা ভিজে যায়। ওপরে পলিথিন দিয়ে দুজন শুয়ে থাকতে হয়। আমার উপার্জন করার কিছু নাই। বয়স্ক ভাতাও পাচ্ছি না। আগে শরীরে শক্তি ছিল, মানুষের জমিতে কাজ করে চলতাম। এখন অসুস্থ শরীর নিয়ে বেঁচে থাকাটাই দায়।’
স্ত্রী কুলসুম বলেন, ‘ঈদ আসে যায়, আমাদের মুখে হাসি আসে না। মন চাইলে ভালো খাবারও মুখে দিতে পারি না। ঘর, চিকিৎসা, খাবার— কিছুই তো মেলে না। রোগের শরীর নিয়ে পড়ে আছি। সব সময় চিন্তার মধ্যে থাকি, ঘরটা কখন ভেঙে পড়ে মাথার ওপরে। আমাদের তো কেউ তাকিয়াও দেখে না।’
জালালপুর ইউনিয়নের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘ফুটন্ত কলি সোশ্যাল অর্গানাইজেশন অ্যান্ড স্পোর্টস একাডেমির চেয়ারম্যান মো. শফিকুর রহমান আল-আমিন দৈনিক যায়যায় দিন বলেন, ‘হতদরিদ্র পরিবারের পাশে দাঁড়ানো আমাদের সবার দায়িত্ব। আমি নিজেও এই বৃদ্ধ স্বামী-স্ত্রীর নিদারুণ কষ্ট দেখেছি। আমরা কিছু একটা করার উদ্যোগ নিচ্ছি। দানশীল ব্যক্তি ও সরকারের কাছে সহযোগিতার আহ্বান জানাচ্ছি। যার যার অবস্থান থেকে এগিয়ে এলে এমন হতদরিদ্র পরিবারের পাশে দাঁড়ানো সহজ হবে।’
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আবুল খায়ের বলেন, ‘বিষয়টি আমি খোঁজ নিয়ে দেখব। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী তারা অবশ্যই বয়স্ক ভাতার আওতায় আসবেন। প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।