দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বড় দুই ধর্মীয় স্থাপনায় এবারের ঈদের ছুটিতে আসা ভক্ত আশেকানদের চরম যাতায়াত দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। ভাড়াও গুনতে হয়েছে দ্বিগুণ, সময়ও লেগেছে বেশি।
সরকার এই পথের কষ্ট কমাতে দুই বছর আগে ৫৬ কোটি টাকা ব্যয়ে সড়ক সংস্কারের কাজ শুরু করলেও যথাসময়ে এই কাজ শেষ হবার কোন সম্ভাবনা নেই। ঠিকাদার ও এলজিইডি কর্তৃপক্ষের গাফিলতিতে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী।
নোয়াগাঁওয়ের কালীবাড়ি এলাকা থেকে ৯০ জন ভক্ত নিয়ে বাসে রবিবার রাতে এসে সুনামগঞ্জে পৌঁছান রনি কুমার সরকার। শহরের একটি মন্দিরে রাত কাটান তারা। সোমবার সকালে সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের যাদুকাটার পাড়ের শ্রী শ্রী অদ্বৈত মন্দিরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন তারা। অদ্বৈত মন্দিরে যাবার সড়ক শহরের আব্দুজ জহুর সেতু থেকে কারেন্টের বাজার হয়ে ধনপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশের সড়ক দিয়ে। কিন্তু তারা সেটি ব্যবহার করতে পারেন নি।
রণি কুমার সরকার বললেন,‘আমাদের বহনকারী দুটি বাস সুনামগঞ্জ শহরের নতুন বাসস্টেশন এলাকায় রাখা হয়। রাতে মন্দিরে থেকে সকালে যাবার সময় লেগুনা’র সঙ্গে কথা বললে, তারা জানায় অদ্বৈত বাড়ি বা শাহ্ আরেফিন (র.) আস্থানায় যেতে হলে নয় কিলোমিটার ঘুরে যেতে হবে। ভাড়া ১২ শ’ টাকার স্থলে ২৫শ’ টাকা দিতে হবে। পরে সেভাবেই পথে পথে ঝাঁকুনি খেয়ে কোনভাবে অদ্বৈত মন্দিরে পৌঁছাই আমরা। এখানে এসে শুনলাম এই সড়কের দুটি সেতু ও কালভার্টে কাজ চলছে, এখানে বিকল্প সড়ক করে দেবার কথা থাকলেও, সেটি হয় নি। এজন্য এই কষ্ট এলাকাবাসীসহ এখানে আসা ভক্ত-আশেকানদের।’
রাজশাহীর সুফল দাসও ৫৫ জন ভক্ত নিয়ে রবিবার রাতে সুনামগঞ্জে পৌঁছে এভাবেই বেকায়দায় পড়েন।
ঈদের লম্বা ছুটিতে প্রতিদিনই এভাবে ভোগান্তি সইতে সইতে সীমান্তের এই দুই ধর্মীয় স্থানে গিয়েছেন হাজারো মানুষ।
অদ্বৈত মন্দির কমিটির সভাপতি করুণা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল বললেন, ‘গেল চৈত্র মাসে যাদুকাটা নদীতে গঙ্গা স্নান ও শাহ্ আরেফিন (র.)’এর ওরসের আগে ঠিকাদারকে চলাচলের উপযোগি বিকল্প সড়ক করে দেবার জন্য জেলা প্রশাসকও নির্দেশ দিয়েছিলেন। দরপত্রে বিকল্প সড়কের উল্লেখ থাকলেও তারা দায়সারা কাজ করে রাখে, এ কারণে হাজার হাজার মানুষ ভোগান্তিতে পড়ে। নামকাওয়াস্তে করা এই বিকল্প সড়কের কোন চিহৃই এখন নেই। এ কারণে এই পথে যাতায়াত বন্ধ হয়ে গেছে। লোকজনকে নয় কিলোমিটার পথ ১৮ কিলোমিটার ঘুরে ভাঙাচোরা-খানাখন্দে ভরা সড়ক দিয়ে যেতে হচ্ছে। এটা কোনভাবেই মানা যায় না। একই ধরণের মন্তব্য করলেন, মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক কানন বন্ধু রায়।
রাজাগাঁওয়ের বাসিন্দা অদ্বৈত রায় বললেন, সুনামগঞ্জ থেকে মধ্যনগরমুখী সড়ক এটি। এই সড়কের যাদুকাটার ব্রীজের গার্ডার কয়েকদফায় ভেঙে পড়ায় ক্ষুব্ধ মানুষ। সড়কের বিশ^ম্ভরপুরের শেষ সীমানা থেকে-যাদুকাটা সেতুমুখী সড়ক অংশের চরগাঁও গ্রামের পাশের দুটি সেতু এবং একটি কালভার্টেও কাজ এমনভাবে করে রাখা হয়েছে, কেউ পায়ে হেঁটেও যেতে পারবে না, নৌকাও চলবে না। এখানকার লামাশ্রম, রাজারগাঁও, জাঙ্গালহাটি, লাউড়েরগড়, পুটিয়া, পুরানগাঁওসহ অন্তত ২০ টি গ্রামের মানুষও চলাচল কষ্টে পড়েছে।
স্থানীয় বাদাঘাট ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন বললেন, ঠিকাদার বা এলজিইডি কর্তৃপক্ষ কেউই এলাকাবাসীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ভক্ত-অনুরাগীদের কষ্ট আমলে নিচ্ছে না। আমি বার বার তাগাদা দিচ্ছি, তারা শুনছেন না কোন কথাই। ঈদের লম্বা ছুটিতে অদ্বৈত বাড়ি, যাদুকাটার ইসকন মন্দির এবং শাহ্ আরেফিন (র.) আস্থানায় বহু কষ্টে এসেছেন ভক্ত-আশেকানরা। বিষয়টি সকল কর্তৃপক্ষের গুরুত্ব দেওয়া উচিত। আমার রীতিমত লজ্জা লেগেছে মানুষের কষ্ট দেখে। এই সড়কে ৫৬ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ দুই বছর আগে শুরু হয়েছে। দুই বছরে কাজ যেটুকু আগানোর কথা, এর অর্ধেকও আগায় নি। এভাবে চলতে পারে না।
সুনামগঞ্জ এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন বললেন, ‘২০২৫ সালের মে মাসে ৫৬ কোটি টাকা ব্যয়ে এই সড়কে কাজ শুরু হয়েছিল। এখানে দুটি সেতু, ১৪ টি বক্স কালভার্ট হবার কথা, কাজও শুরু হয়েছে। রাজধানীর হামিম ইন্টারন্যাশনাল নামের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান এখানে কাজ করছে, এর প্রোপাইটার লুবনা খানম। এই সড়কে কিছু গাছ ছিল, এগুলো কর্তন করতে কিছু বেশি সময় লেগেছে। এজন্য তিন বছর মেয়াদি এই কাজের সময় হয়তো আরও এক বছর বাড়াতে হবে। সেই সময়কালে সেতু দুটিতে এবং কালভার্ট এলাকায় ভালোভাবে বিকল্প সড়কের ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে। বিকল্প সড়ক ছিল, বৃষ্টিতে ক্ষতি হয়েছে। এগুলো ঠিক করে দেবার নির্দেশ দেওয়া হবে।