দৈনিক পত্রিকা খোললেই সমাজের নানা সমস্যা চোখে পড়ে যেগুলো নীরব ঘাতকের মত পরিবার ও সমাজকে শেষ করে দিচ্ছে। এই ঘাতক মহামারীটি হলো পারিবারিক সম্পর্কের চরম অবক্ষয়। সাম্প্রতিক সময়ে সংবাদপত্র ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রায়ই এমন খবর দেখা যায় যে, বাবা-মা সারাজীবন কষ্ট করে যে সন্তানকে উচ্চশিক্ষিত করেছেন, প্রতিষ্ঠিত করেছেন, কিন্তু বার্ধক্যে এসে সেই সন্তানই তাদের খোঁজ-খবর রাখে না। ফলে কোনো কোনো বাবা-মা বৃদ্ধাশ্রমে স্থান পাচ্ছেন, কেউবা নিজ ঘরেই অবহেলা, অযত্ন ও নিঃসঙ্গতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এগুলো আমাদের সামাজিক মূল্যবোধের ক্রমবর্ধমান অবক্ষয়ের লক্ষণ।
একজন মা কিংবা বাবা সন্তানের জন্য যে ত্যাগ স্বীকার করেন, তার কোনো বাজার মূল্য নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। নিজের চাহিদা, স্বপ্ন, আরাম-আয়েশ এমনকি অনেক সময় প্রয়োজনীয় চিকিৎসাও তারা সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে বিসর্জন দেন। সন্তান যেন ভালো থাকে, বড় হয়, প্রতিষ্ঠিত হয়—এই স্বপ্নই তাদের জীবনের প্রধান অনুপ্রেরণা। কিন্তু বাস্তবতা অনেক সময় নির্মম। মা-বাবা যখন তাদের জীবনের শেষ প্রান্তে এসে পৌছান, সেই সন্তানের কাছেই তারা বোঝা হয়ে যান। এমন ঘটনা সমাজে অসংখ্য এবং তা নীরবেই ঘটে চলেছে। এগুলোর খবর কেউ রাখে না। দুই একটা ঘটনা মিডিয়াতে আসলে আমরা সরব হই, ঘোর কেটে গেলে এগুলো নিয়ে আর আমরা মাথা ঘামাই না। এটি শুধু পারিবারিক ব্যর্থতা নয়, বরং এটি আমাদের সবার জন্য এক লজ্জাজনক বাস্তবতা।
আমরা সব সময় আমাদের প্রচেষ্টা, সম্পদ ও সময় সন্তানকে সফল করার পেছনে ব্যয় করি। কিন্তু সন্তানকে মানুষ বানানোর প্রচেষ্টা কতটুকু? বর্তমান সমাজে অনেক পরিবারই অর্থনৈতিক সাফল্য, চাকরি, পদ-পদবি, সম্পদ ও সামাজিক মর্যাদাকেই জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে সন্তানের কাছে উপস্থাপন করে। যে সব চাকরী বা পেশায় ক্ষমতার অপব্যবহার ও উপরি আয়ের সুযোগ আছে সেগুলোকে সম্মানজনক পেশা মনে করা হয়। শিশুদের শেখানো হয় কীভাবে প্রতিযোগিতায় জয়ী হতে হয়। কিন্তু শেখানো হয় না নীতিনৈতিকতা, কৃতজ্ঞতাবোধ, দায়িত্বশীলতা, কর্তব্যবোধ, ন্যায়পরায়ণতার মত মানবিক বিষয়গুলো। ফলস্বরূপ, এমন একটি প্রজন্ম গড়ে উঠছে যারা পেশাগতভাবে সফল হলেও মানবিকতার পরীক্ষায় হয়তো সমভাবে হচ্ছে না।
এই সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে সর্বাগ্রে প্রয়োজন সন্তানের প্রতি দায়িত্ব পালনে ভারসাম্য আনা। অনেক বাবা-মা সন্তানের জন্য নিজের সমস্ত সঞ্চয় ব্যয় করেন । তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার কথা ভাবেন না। অবসর জীবনের জন্য কোনো পরিকল্পনা রাখেন না। ফলে বৃদ্ধ বয়সে তাদের সন্তানদের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা তৈরি হয়। এ সমস্যা থেকে পরিত্রাণের লক্ষ্যে প্রত্যেক মা-বাবাকেই নিজের বার্ধক্যের জন্য কিছু আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সন্তানকে শিক্ষিত ও যোগ্য করে তোলা অবশ্যই দায়িত্ব, কিন্তু নিজেকে পুরোপুরি নিঃস্ব করে দিয়ে নয়। আবার শুধু আর্থিক নিরাপত্তাই বৃদ্ধ বয়সে যথেষ্ট নয়। অনেক ক্ষেত্রে তাদের দেখাশোনা ও তত্ত্বাবধানের প্রয়োজন হয়, বিশেষত যখন তারা শারীরিকভাবে অক্ষম হয়ে যান। ফলে বৃদ্ধ বয়সের কথা চিন্তা করে হলেও সন্তানের নৈতিক শিক্ষা ও মানবিক বিকাশ গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুকাল থেকেই সন্তানের নৈতিক শিক্ষা পরিবার থেকেই নিশ্চিত করতে হবে। সন্তান কি ধরনের নৈতিক মূল্যবোধ নিয়ে বড় হচ্ছে তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা দরকার। দৈনিক পত্রিকায় অতি সম্প্রতি যে মায়ের মৃত্যুর ঘটনায় আমরা বিচলিত হয়েছি, তাদের এরূপ অমানবিক হওয়ার পেছনে মা-বাবার ভূমিকা প্রশ্নাতীত নয়। কিন্তু একটি অন্যায় দিয়ে আরেকটি অন্যায়কে ন্যায্যতা দেওয়ার সুযোগ নেই। তাই, এ প্রসঙ্গ এখানে প্রাসঙ্গিক নয়। সন্তানকে শুধু ভালো বিদ্যালয়ে ভর্তি করে, কয়েকটি প্রাইভেট টিউটর দিয়ে আর দামি কোচিং সেন্টারে ভর্তি করে দিয়েই দায়িত্ব শেষ করা যাবে না; তাদেরকে শেখাতে হবে সম্মানজনক সম্পর্ক, সহমর্মিতা, কৃতজ্ঞতা ও পারিবারিক দায়িত্ববোধ। বাবা-মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা কেবল ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক শিক্ষা নয়, এটি একটি মানবিক শিক্ষা। যে সন্তান তার শেকড়কে ভুলে যায়, সে শেষ পর্যন্ত নিজের মানবিক পরিচয়কেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, সন্তানকে বড় মানুষ বানানোর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো তাকে ভালো মানুষ বানানো। মা-বাবাকেই উপলব্ধি করা দরকার যে, সম্পদ, পদমর্যাদা কিংবা সামাজিক অবস্থানই সন্তানের সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি নয়। প্রকৃত সাফল্য তখনই আসে, যখন একজন মানুষ ব্যস্ততম ও প্রতিকূল সময়েও তার বাবা-মায়ের হাতটি শক্ত করে ধরে রাখতে পারে। যে পরিবারে কৃতজ্ঞতা, দায়িত্ববোধ ও ভালোবাসার চর্চা আছে, সেখানে বৃদ্ধাশ্রমের প্রয়োজন হবে না। আর যে সমাজে প্রবীণরা সম্মানিত হন, সেই সমাজই প্রকৃত অর্থে মানবিক সমাজ। মনে রাখতে হবে আজকের একটি বৃদ্ধাশ্রমই আগামী দিনের অসংখ্য বৃদ্ধাশ্রমের হাতছানি। আপনি যখন আপনার মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে রাখবেন, আপনার সন্তান আপনার ক্ষেত্রে তা করবে না, তার কী কোনো নিশচয়তা আছে?
লেখক :
মো: রায়হান উদ্দিন
সহকারী অধ্যাপক
অর্থনীতি বিভাগ
বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজ, সিলেট।