যে দেশের অস্ত্র যত আধুনিক, সেই দেশ কি প্রতিরক্ষায় তত বেশি শক্তিশালী?
ইতিহাসের পাতা ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধবিদ্যার গভীর বিশ্লেষণ প্রমাণ করছে যে, মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার খরচ করে কেনা যুদ্ধবিমান, ট্যাংক বা সাবমেনিন শুধুই বোঝা হয়ে দাঁড়ায় যখন যুদ্ধের চরম মুহূর্তে প্রয়োজনীয় গোলাবারুদ আর খুচরা যন্ত্রাংশের নিয়ন্ত্রণ থাকে বিক্রেতা দেশের হাতে; কিংবা যখন ‘রিমোট এক্সেস’-এর মাধ্যমে দূর থেকেই সেইসব প্রযুক্তির কার্যকারিতা প্যারালাইজড করে দেওয়া হয়।
পরাশক্তিগুলো প্রায়ই নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে ছোট অর্থনীতির দেশগুলোর কাছে সামরিক অস্ত্র ও সরঞ্জাম কখনও কম দামে, আবার কখনও উচ্চমূল্যে বিক্রি করে থাকে। তারা মূলত এই দেশগুলোকে আজীবন নির্ভরশীল করে রাখার জন্য এমনটি করে। এটি এক প্রকার আধুনিক ঔপনিবেশিক প্রক্রিয়া; যেখানে ছোট অর্থনীতির দেশগুলো ধীরে ধীরে এমনভাবে তাদের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে যে, কাগজে-কলমে স্বাধীন মনে হলেও মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত নির্ভরশীলতার কারণে তারা আসলে পরাধীনই থেকে যায়।
কিন্তু এর বিপরীতে পিপলস আর্মির ধারণাটিই হলো স্বনির্ভরতা; এটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ, অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী শত্রুর বিরুদ্ধে অসম যুদ্ধ এবং প্রতিরক্ষার যুদ্ধ। তাই এর ভিত্তি হলো প্রযুক্তির স্বনির্ভরতা, অস্ত্রের বিকেন্দ্রীকরণ এবং নিজস্ব ভূপ্রকৃতির সাথে অস্ত্রের নিখুঁত সামঞ্জস্য। ভিয়েতনাম যুদ্ধ পৃথিবীর সেই ইতিহাসের এক অভূতপূর্ব ও অবিস্মরণীয় অধ্যায়। যেখানে একদিকে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরাক্রমশালী সামরিক বাহিনী, যাদের হাতে ছিল আকাশ কাঁপানো বি-৫২ বোমারু বিমান, মানুষকে পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া রাসায়নিক ‘নেপাম বোমা’ এবং আধুনিক ট্যাংক। আর অন্য পিঠে ছিল ভিয়েতনামের সাধারণ মানুষের সমন্বয়ে গঠিত ‘ভিয়েতকং’ বা ভিয়েতনামের পিপলস আর্মি। তাদের কোনো বিমানবাহিনী ছিল না, ছিল না কোনো প্রথাবদ্ধ লজিস্টিক চেইন। তারা লড়েছিল সম্পূর্ণ নিজেদের মাটি, বাঁশ এবং মানুষের মনস্তাত্ত্বিক সহনশীলতাকে পুঁজি করে।
মার্কিন বিমানবাহিনীর অবিরাম বোমাবর্ষণ থেকে বাঁচতে ভিয়েতকংরা মাটির নিচে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার জুড়ে এক অবিশ্বাস্য সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিল, যা ‘কু চি টানেল’ নামে পরিচিত। এই টানেল নেটওয়ার্কটি ছিল মাটির নিচে গড়ে তোলা এক একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ আন্ডারগ্রাউন্ড শহর। টানেলগুলো মাটির নিচে তিন থেকে চার স্তর বিশিষ্ট গভীরতায় তৈরি করা হয়েছিল। এর প্রথম স্তরে চলত সাধারণ চলাচল, দ্বিতীয় স্তরে ছিল আশ্রয়কেন্দ্র, আর একদম নিচের স্তরে ছিল বোম্ব শেল্টার ও পানির উৎস। মার্কিন বাহিনীর ট্যাংক যখন ওপর দিয়ে যেতো, মাটির নিচের এই বিশেষ স্তরায়ন ও সূক্ষ্ম আর্কিটেকচারের কারণে সুড়ঙ্গ ধসে পড়ত না। এই অন্ধকার জগতে ভিয়েতকংরা তৈরি করেছিল লিভিং কোয়ার্টার, রান্নাঘর, অস্ত্র তৈরির কারখানা, হাসপাতাল এবং কম্যান্ড সেন্টার। তাদের রান্নাঘরের ধোঁয়া বের করার জন্য এমন এক সূক্ষ্ম ফিল্টারিং ব্যবস্থা ছিল, যা মাটির ওপরের কুয়ার সাথে ধোঁয়াকে মিশিয়ে দিত। ফলে মার্কিন থার্মাল ক্যামেরা বা স্কাউটরা বুঝতেই পারত না যে নিচে হাজার হাজার মানুষ বসবাস করছে ও রান্না করছে। এই টানেলের প্রবেশপথগুলো ছিল মাত্র একজন রোগা-পাতলা ভিয়েতনামি মানুষের প্রবেশের উপযোগী এবং সেগুলো গাছের পাতা ও মাটি দিয়ে এমনভাবে ছদ্মবেশ করে রাখা হতো যে, মার্কিন সেনারা তার ওপর দিয়ে হেঁটে গেলেও টের পেত না। কোনো মার্কিন সেনা যদি প্রবেশপথ খুঁজেও পেত, ভেতরে ঢুকতেই সে মুখোমুখি হতো বিষাক্ত সাপের ফাঁদ কিংবা অন্ধকারের ভেতরের চোরাগুপ্তা হামলার।
ভিয়েতকংদের অন্যতম প্রধান এবং সবচেয়ে আতঙ্কজনক মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্র ছিল ‘পুঞ্জি স্টিক’ বা বাঁশের তৈরি তীক্ষ্ণ শলাকা। যখন মার্কিন সেনারা তাদের অত্যাধুনিক মাইন ডিটেক্টর দিয়ে মাইন খুঁজত, তখন ভিয়েতকংদের এই সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক অস্ত্র মার্কিন প্রযুক্তির অহংকারকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিল। ভিয়েতকংরা বাঁশ কেটে সেগুলোকে তীরের মতো তীক্ষ্ণ ও ধারালো করত। এরপর সেই শলাকাগুলোকে তারা বনের বিষাক্ত লতা-পাতার রস ও জীবানুতে চুবিয়ে রাখত, যার ফলে এই হুলের আঘাতে শত্রু সেনাদের ক্ষতস্থানে দ্রুত মারাত্মক গ্যাংগ্রিন ছড়িয়ে পড়ত। তারা বনের ভেতরের সাধারণ হাঁটাপথের মাটিতে গভীর গর্ত খুঁড়ে তার নিচে এই পুঞ্জি স্টিকগুলো সোজা করে পুঁতে রাখত। এরপর গর্তের মুখ হালকা বাঁশের কাঠি, কাদা আর শুকনো পাতা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হতো। মার্কিন সেনারা যখনই স্কোয়াড নিয়ে বনের ভেতর দিয়ে যেত, আচমকা তাদের পা বা পুরো শরীর সেই গর্তে পড়ে যেত এবং বুট ভেদ করে সেই বিষাক্ত বাঁশের হুল মাংসের গভীরে ঢুকে যেত। পুঞ্জি স্টিকের মূল লক্ষ্য ছিল শত্রুকে পঙ্গু ও রক্তাক্ত করা। যখন একজন মার্কিন সেনা পুঞ্জি স্টিকের গর্তে পড়ে যন্ত্রণায় চিৎকার করত, তখন তাকে উদ্ধার করতে আরও ৪ থেকে ৫ জন সেনাকে ব্যস্ত হতে হতো। এর ফলে পুরো মার্কিন প্লাটুনের গতি থমকে যেত এবং বনের ভেতর লুকিয়ে থাকা ভিয়েতকং স্নাইপারদের জন্য তাদের নিশানা করা সহজ হতো।
ভিয়েতকংরা মার্কিন সেনাদের ফেলে যাওয়া বা অক্ষত উদ্ধার করা ল্যান্ডমাইনগুলো সংগ্রহ করত। এরপর সেগুলোকে নতুন করে এমনভাবে মডিফাই করে মাটির নিচে পুঁতে রাখত যে, কোনো সেনা সেখানে পা দিলে মাইনটি সরাসরি বিস্ফোরিত হতো না। এটি প্রথমে স্প্রিংয়ের চাপে মাটি থেকে ৩-৪ ফুট ওপরে লাফিয়ে উঠত এবং তারপর বিস্ফোরিত হতো। এর ফলে চারপাশের পুরো স্কোয়াড আক্রান্ত হয়ে যেত। তারা ব্যবহার করত 'মেস ট্র্যাপ' বা 'কার্টিজ ট্র্যাপ', যা ছিল অত্যন্ত সস্তা কিন্তু মারাত্মক একটি কৌশল। একটি বাঁশের ছোট চোঙার ভেতর একটি রাইফেলের কার্তুজ ঢুকিয়ে তার নিচে একটি পেরেক বসিয়ে দেওয়া হতো। এরপর এই পুরো সেটআপটি মাটিতে এমনভাবে পুঁতে রাখা হতো যেন বুলেটের অগ্রভাগ মাটির সামান্য ওপরে থাকে। কোনো মার্কিন সেনার বুট সেখানে চাপ দিলে পেরেকটি বুলেটের পেছনে আঘাত করত এবং বুটের তলা ফুটো করে বুলেটটি সরাসরি সেনার পায়ের হাড় ও মাংস ভেদ করে ওপরে চলে যেত। একই সাথে বনের ভেতরের সরু রাস্তার পাশে গাছের ডালে বা বাঁশে শক্তিশালী ইলাস্টিক বা লতা বেঁধে বড় বড় বিষাক্ত তীর বা ধারালো বাঁশের টুকরো টেনে লক করে রাখা হতো। মাটিতে লতা দিয়ে তৈরি একটি তার বা ট্রিপ-ওয়্যার বিছানো থাকত। অসাবধানতাবশত কোনো শত্রু সেনার পা সেই তারে লাগলেই লকটি খুলে যেত এবং তীব্র গতিতে সেই বিষাক্ত ফলা এসে শত্রুর বুকে বা মুখে আঘাত করত।
হো চি মিন ট্রেইল ছিল ভিয়েতনাম যুদ্ধের লজিস্টিকসের মূল মেরুদণ্ড। উত্তর ভিয়েতনাম থেকে দক্ষিণ ভিয়েতনামে ভিয়েতকংদের কাছে অস্ত্র, গোলাবারুদ ও খাদ্য সরবরাহ করার জন্য লাওস এবং কম্বোডিয়ার দুর্গম পাহাড় ও জঙ্গলের ভেতর দিয়ে হাজার কিলোমিটারের এক গোপন সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছিল। মার্কিন বিমানবাহিনী এই ট্রেইলে প্রায় ৪০ লাখ টন বোমা ফেলেছিল, রাসায়নিক ‘এজেন্ট অরেঞ্জ’ দিয়ে বনের গাছপালা পুড়িয়ে দিয়েছিল, কিন্তু তারা এই সাপ্লাই চেইন বন্ধ করতে পারেনি। কারণ, দিনের বেলা বোমাবর্ষণে রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হলে, রাতে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ মিলে তা স্বতঃস্ফূর্তভাবে মেরামত করে ফেলত।
ভারী ট্রাক ব্যবহার করলে মার্কিন যুদ্ধবিমানের চোখে পড়ার ঝুঁকি থাকত। তাই ভিয়েতকংরা সাধারণ সাইকেলকে মডিফাই করে সেগুলোর দুই পাশে ও উপরে কাঠের ফ্রেম বেঁধে এক একটি সাইকেলে ২০০ থেকে ৩০০ কেজি পর্যন্ত অস্ত্র ও চালের বস্তা বহন করত। তারা সাইকেলে চড়ত না, বরং সাইকেল ধরে হেঁটে হেঁটে জঙ্গলের এমন সব সরু পথ দিয়ে লজিস্টিকস পার করত, যেখানে কোনো আধুনিক গাড়ি বা ট্যাংক যাওয়ার কথা মার্কিন কমান্ড ভাবতেও পারত না।
‘হাগ অ্যান্ড ফাইট’ বা বুক ঘেঁষে লড়াই করার কৌশলটি ছিল এক অসাধারণ সমর চিন্তার ফসল। এই অনন্য কৌশলটি ভিয়েতনামের বিখ্যাত জেনারেল নগুয়েন চি থান তৈরি করেন। মার্কিন বাহিনীর মূল শক্তি ছিল তাদের দূরপাল্লার আর্টিলারি বা কামান এবং বিমানবাহিনীর ভারী বোমাবর্ষণ। ভিয়েতকংরা জানত, একটু দূরত্ব বজায় রাখলেই মার্কিনরা আকাশ থেকে বোমা ফেলে তাদের শেষ করে দেবে। তাই তারা শত্রুর খুব কাছাকাছি চলে আসত। যুদ্ধক্ষেত্রে দুই পক্ষ যখন মাত্র কয়েক মিটারের ব্যবধানে মুখোমুখি লড়াই করত, তখন মার্কিন বিমানবাহিনী তার আর্টিলারি আর বোমা ফেলতে পারত না; কারণ বোমা ফেললে তাদের নিজেদের সেনারাই মারা যেত। এই কৌশলে মার্কিনদের দূরপাল্লার অস্ত্রের সক্ষমতা সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে গিয়েছিল।
ভিয়েতকংরা কখনোই মার্কিন বাহিনীর শক্ত ঘাঁটিতে বা মুখোমুখি বড় সমরে জড়াত না। গভীর রাতে বা ভোরের আলো ফোটার আগে তারা মার্কিন ক্যাম্পে আচমকা মর্টারের গোলা বা স্নাইপার দিয়ে তীব্র আক্রমণ চালাত। মার্কিন সেনারা যখন নিজেদের সামলে নিয়ে পাল্টা আক্রমণ শুরু করত, ততক্ষণে ভিয়েতকংরা তাদের কু চি টানেল বা গভীর জঙ্গলের ভেতর অদৃশ্য হয়ে যেত। দিনের বেলা ভিয়েতকং যোদ্ধারা সাধারণ কৃষকের ছদ্মবেশ ধারণ করত। তারা মাঠে ধান চাষ করত এবং সাধারণ মানুষের সাথে মিশে থাকত। মার্কিন কপ্টার বা টহল দল তাদের সাধারণ গ্রামবাসী মনে করে চলে যেত। কিন্তু রাত নামলেই সেই শান্ত কৃষকেরা হয়ে উঠত একেকজন ভয়ংকর গেরিলা; এমনকি ১০-১২ বছরের শিশু ও সাধারণ নারীরাও গ্রেনেড হামলার কাজ করত। ভিয়েতকংরা প্রমাণ করেছিল যে, যুদ্ধ জয়ের জন্য কেনা অস্ত্রের উপর নির্ভর না করে বরং নিজস্ব সম্পদকে বুদ্ধিমত্তার সাথে ব্যবহার করার সক্ষমতাই আসল শক্তি। (পর্ব-৭)
কিন্তু ব্রিটেন, সোভিয়েত রাশিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটোর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সমরাস্ত্র আর সর্বাধুনিক প্রযুক্তি কীভাবে অর্থহীন প্রমাণিত হয়েছিল, কেন আফগানিস্তানকে বলা হয় ‘Graveyard of Empires’ – সেই বিষয়ে লিখব পরের পর্বে।
(মাইন্ড-ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের গবেষক)