মানিকগঞ্জের শিবালয়ের আরিচা ও পাটুরিয়া ঘাটে এবং উথুলী-পাটুরিয়া সংযোগ সড়কের মোড়ে পরিবহণ শ্রমিকরা ঢাকাগামী কর্মস্থলমুখী যাত্রীদেরকে জিম্মি করে অতিরিক্ত ভাড়া নিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা। যাত্রীর চাপ বাড়লেই ঢাকা-আরিচা-পাটুরিয়া মহাসড়কে চলাচলকারী সেলফি, নীলাচল ও পদ্মা লাইনসহ এ সকল বাস হয়ে যায় ডাইরেক, আর মহুর্তের মধ্যেই লাফিয়ে-লাফিয়ে বেড়ে যায় এসব বাসের ভাড়া। এসব বাস আজকে লোকাল কোন যাত্রী তুলছেন না, তুললেও যাত্রীরা পথিমধ্যে যেখানেই নামুক কেন তাদেরকে গাবতলির ৩শ’ টাকা ভাড়া দিতে হচ্ছে। ফলে আজ শুক্রবার সকাল থেকেই আরিচা, পাটুরিয়া ঘাট এবং উথুলী-পাটুরিয়া সংযোগ মোড় এলাকায় স্থানীয় এবং ঈদ শেষে কর্মস্থলগামী যাত্রীদেরকে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে বলে যাত্রীরা অভিযোগ করেন।
শুক্রবার দুপুরে উথুলী-পাটুরিয়া ইন্টারসেকশন এলাকায় ঢাকাগামী যাত্রীদের উপচে পড়া ভীড় দেখা গেছে। যারা পোশাক কারখানায় কাজ করেন আজ শুক্রবার হয়তো তাদের ছুটি শেষ। শনিবার থেকে কারখানা খোলা এবং কাজে যোগদান করতে হবে। তাই প্রিয়জনদের সাথে ঈদ করে তারা আজ আশুলিয়া, নবীনগর, সাভার, গাবতলী, গাজীপুর, নারায়নগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কর্মস্থলে মানুষ ফিরতে শুরু করেছে। এরা আরিচা-পাটুরিয়া ঘাট হয়ে বিভিন্ন বাসে গন্তব্যে পৌঁছে থাকে। এ সুযোগ পরিবহণ সংকটের অজুহাতে বাস শ্রমিকরা যাত্রীদেরকে জিম্মি করে বাড়তি ভাড়া আদায় করতে দেখা গেছে।
শুক্রবার (৫ জুন) সকাল থেকেই শিবালয় উপজেলার উথুলী-পাটুরিয়া সংযোগ মোড়, পাটুরিয়া ঘাট ও আরিচা ঘাট এলাকায় যাত্রীবাহী বাসগুলোতে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেশি আদায় করা হচ্ছে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিষয়টি প্রকাশ্যেই চললেও ঘটনাস্থলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি বলে যাত্রীরা। জিনিসপত্রসহ শিশু ও নারী যাত্রীদেরকে উক্ত স্থানে এসে বাসের জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা অসহায়ের মতো বসে থাকেতে দেখা গেছে।
জানা গেছে, সেলফি ও নীলাচল এসব বাস তাদের নির্ধারিত গন্তব্য গাবতলী আর চিটাগাং রোডের সাইনবোট এর বাইরে কোন যাত্রী তারা তুলছে না। আর তুললেও আগেই বলতে থাকে রাস্তার যেখানেই নামেন ভাড়া ৩০০টাকা দিতে হবে। যাত্রীর চাপ না থাকলে এ সকল বাস নবীনগর, সাভার এর ভাড়া নিয়ে থাকে ১২০ টাকা এবং গাবতলীর ভাড়া নেয় ২০০টাকা। আর সেখানে আজকে ভাড়া নেয়া হচ্ছে ৩০০টাকা করে। প্রকাশ্যে পরিবহণ শ্রমিকরা যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া আদায় করলেও এগুলো দেখার কেউ নেই। অন্যদিকে, নীলাচল পরিবহনে চিটাগাং রোড রুটের নির্ধারিত ২৫০ টাকার ভাড়ার পরিবর্তে আদায় করা হচ্ছে ৩০০ টাকা। এভাবে সকল পরিবহনেই নবীনগরগামী যাত্রীদের কাছ থেকে নির্ধারিত ১৫০ টাকার পরিবর্তে ২০০-৩০০ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে। একইভাবে গাবতলিগামী যাত্রীদের কাছ থেকে ১৯৫ টাকার পরিবর্তে নেওয়া হচ্ছে ৩০০ টাকা।
বাস শ্রমিকদের অত্যাচারের কারণে অনেক যাত্রীরা জীবনের ঝুকি নিয়ে ট্রাক, পিকাপ ও সিএনজিতে গন্তব্যে যেতে দেখা গেছে। সিএনজি চালকরা হেমায়েতপুর পর্যন্ত ভাড়া নিচ্ছে ৪০০টাকা করে।
পরিবহন শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে হলে তারা বলেন, ঈদ উপলক্ষে বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। পাশাপাশি পরিবহন নেতাদের জন্য অতিরিক্ত ‘জিপি’ (গেট পাস/চাঁদা) দেওয়ার বিষয়টিও তারা স্বীকার করেন। তাদের দাবি, সেলফি পরিবহনের প্রতি ট্রিপ থেকে আজকে শুক্রবার সাড়ে ৫০০ টাকা এবং নীলাচল পরিবহনের প্রতি ট্রিপ থেকে ১ হাজার ১৫০ টাকা করে জিপি দিতে হচ্ছে।
তবে সেলফি পরিবহনের লাইনম্যান সুলতান বলেন, সেলফি পরিবহনে অনেক গাড়ি রংপুরে রিজার্ভ যাত্রী আনতে গেছে যেকারণে আজকে গাড়ি একটু কম। ঢাকা-পাটুরিয়া রোডে আজকে ৫০/৬০টি গাড়ি ছিল। গাবতলীর ভাড়া কেউ কেউ ২০০টাকা নিয়েছে আবার কেউ কেউ ৩০০টাকা করে নিয়েছে। যারা বেশী নিয়েছে তারা মামলা খেয়েছে। আজকে অনেক গাড়ি মামলা খেয়েছে।
যাত্রীরা অভিযোগ বরে বলেন, ঈদকে কেন্দ্র করে প্রতি বছরই অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের ঘটনা ঘটলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর নজরদারি না থাকায় তারা বাধ্য হয়েই বাড়তি টাকা দিয়ে গন্তব্যে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। তারা অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
পাবনা থেকে আশুলিয়াগামী আক্তার হোসেন জানান, আমি নবীনগর যাবো কিন্তু ১৫০ টাকার ভাড়া ৩০০টাকা চাচ্ছে। বাধ্য হয়ে বেশি ভাড়া দিয়েই যেতে হবে কর্মস্থলে।
নবীনগরগামী ফজলুল হক বলেন, তিনি উথুলী মোড়ে এসে ২ঘন্টা ধরে বাসের জন্য বসে আছেন। বাড়তি ভাড়ার জন্য যেতে পারছেন না। ঈদের মধ্যে বাড়িতে গিয়ে টাকা পয়সা সব শেষ। এখন বাড়তি ভাড়া তার কাছে যেন মড়ার পর খড়ার ঘার মতো।
পাবনার বেড়া থেকে ঢাকাগামী কুব্বাত আলী বলেন, ঈদ আসলেই বেশি ভাড়া দেওয়া লাগে আমাদের। এমনে গাবতলীর ভাড়া দেই ২০০ কিন্তু আজকে ৩০০ টাকা দিয়ে যেতে হচ্ছে।
ফরিদপুর থেকে আসা এক যাত্রী হাছনা বেগম বলেন, আমি চিটাগাং রোড যাবো। নীলাচল বাসে ৩০০টাকা ভাড়া চাচ্ছে কিন্তু আসল ভাড়া ২৫০ টাকা। কি আর করার আমাদের তো যেতেই হবে।
এ বিষয়ে দায়িত্বরত বরংগাইল হাইওয়ে পুলিশের ওসির সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে তাকে পাওয়া যায়নি।
এ ব্যাপারে শিবালয় থানার ওসি মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ঈদ পরবর্তী কর্মস্থলমুখী যাত্রীদের নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে ফেরার জন্য পুলিশ ব্যাপক তৎপর রয়েছে। পুলিশের নিয়মিত টহল অব্যাহত আছে। যাত্রীদের কাছে থেকে বাড়তি ভাড়ার অভিযোগ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া, বাড়তি ভাড়ার অভিযোগে কয়েকটি গাড়িকে মামলা দেয়া হয়েছে।
এ ব্যাপারে শিবালয় উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জান্নাতুল নাইম বলেন, আগামীকাল শনিবার থেকে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করা হবে।