ঢাকা | শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পিপলস আর্মি ও প্রতিরক্ষা

পর্ব-৮

author
এ ইউ দৌলা

প্রকাশিত : ৬ জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪১
এ আই নির্মিত প্রতীকী ছবি এ আই নির্মিত প্রতীকী ছবি
ad003
আফগানিস্তানকে বলা হয় ‘Graveyard of Empires’; কিন্তু কেন?

ঊনবিংশ শতাব্দীতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য, বিংশ শতাব্দীতে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং একবিংশ শতাব্দীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর মতো ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং আধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত পরাশক্তিগুলো এই একটি অঞ্চলে এসে শতাব্দীর সবচেয়ে অপমানজনক পরাজয়ের স্বাদ নিয়ে ফিরে গেছে। আফগানদের কাছে কোনো আধুনিক ফাইটার জেট ছিল না, ছিল না কোনো স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং সিস্টেম বা বিলিয়ন ডলারের লজিস্টিকস। কিন্তু তাদের ছিল এমন এক অনন্য গণপ্রতিরোধের দর্শন, যা সামরিক বিজ্ঞানীদের যুদ্ধ জয়ের সমস্ত সমীকরণকে ওলটপালট করে দিয়েছিল। এই পর্বে আমরা জানব কীভাবে আফগানিস্তানের মানুষ কেবল তাদের মনস্তাত্ত্বিক সহনশীলতা ও রণকৌশলকে পুঁজি করে বিশ্ব কাঁপানো পরাশক্তিগুলোকে হাঁটু গেঁড়ে বসতে বাধ্য করেছিল।

আফগান প্রতিরোধ যোদ্ধাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছিল তাদের দেশের রুক্ষ, দুর্গম ও পাথুরে পাহাড়-পর্বত। পরাশক্তিগুলো যখন তাদের ট্যাংক, সাঁজোয়া যান এবং আধুনিক লজিস্টিকস নিয়ে আফগানিস্তানে প্রবেশ করত, তখন আফগান পিপলস আর্মি শত্রুর দীর্ঘদিনের প্রশিক্ষণ ও যুদ্ধকৌশলকে সম্পূর্ণ অকেজো করে দিত। পর্বতমালাগুলোর ভেতর দিয়ে যাওয়ার জন্য যে সরু গিরিপথ রয়েছে, সেগুলোকে আফগানরা শত্রুর জন্য মরণফাঁদে রূপান্তর করত। তারা কখনো শত্রুর বিশাল বহরের সাথে মুখোমুখি যুদ্ধে যেত না। শত্রুর সামরিক কনভয় বা গাড়ির বহর যখন কোনো সরু ও গভীর গিরিপথে প্রবেশ করত, তখন আফগানরা পাহাড়ের খাঁজে লুকিয়ে থেকে একযোগে অতর্কিত আক্রমণ চালাত। তারা বহরের একদম সামনের এবং একদম পেছনের গাড়িটিকে প্রথমে আরপিজি দিয়ে উড়িয়ে দিত। এর ফলে মাঝখানের পুরো সামরিক বহরটি অবরুদ্ধ হয়ে আটকা পড়ে যেত এবং তখন তারা পাহাড়ের ওপর থেকে নিখুঁত নিশানা করে শত্রুবাহিনীকে ধ্বংস করত। 

ভিয়েতনামের কু চি টানেলের মতোই আফগানিস্তানে ছিল প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা পর্বতগুহা এবং শত শত বছর পুরনো প্রাচীন আন্ডারগ্রাউন্ড সেচ ব্যবস্থা, যা ‘কারেজ’ নামে পরিচিত। তোরা বোরার মতো জটিল পাহাড়ি গুহা এবং মাটির নিচে শত শত কিলোমিটার দীর্ঘ এই সুড়ঙ্গগুলোকে যোদ্ধারা সামরিক যোগাযোগের গোপন নেটওয়ার্ক ও বাঙ্কার বানিয়ে ফেলেছিল। কোনো মানচিত্রে এর উল্লেখ না থাকায় যোদ্ধারা এক গ্রামের কারেজ সুড়ঙ্গে ঢুকে মাটির নিচ দিয়ে হেঁটে অনায়াসে কয়েক কিলোমিটার দূরের অন্য গ্রামে গিয়ে বের হতো, যা পরাশক্তির ড্রোন বা থার্মাল ক্যামেরায় ধরা পড়ত না। উপর থেকে লাখ লাখ টন কার্পেট বোমাবর্ষণ করেও এই গুহা ও সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি; কারণ বোমা ফেলার সাথে সাথেই যোদ্ধারা গুহার আরও গভীরে আত্মগোপন করত।

পরাশক্তিগুলোর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাদের আধুনিক বিমানবাহিনী (যেমন সোভিয়েতদের Mi-24 হাইন্ড হেলিকপ্টার এবং মার্কিনদের অ্যাপাচি ও ড্রোন)। এই বিমান শক্তিকে অকেজো করতে আফগানরা  আকাশে বিমান বা হেলিকপ্টার দেখলেই গভীর পাহাড়ি খাঁজে বা গুহায় লুকিয়ে যেত। পাহাড়ের গভীরতার কারণে উপর থেকে ছোড়া রকেট গুহার ভেতরে থাকা যোদ্ধাদের কোনো ক্ষতি করতে পারত না। 
১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে মার্কিন সিআইএ যখন মুজাহিদীনদের কাঁধে বহনযোগ্য ‘স্টিঙ্গার মিসাইল’ সরবরাহ শুরু করে, তখন আফগানরা এর সর্বোচ্চ সুবিধা নেয়। তারা পাহাড়ের চূড়ায় লুকিয়ে থেকে নিচ দিয়ে উড়ে যাওয়া সোভিয়েত যুদ্ধবিমান বা গানশিপ হেলিকপ্টার লক্ষ্য করে আচমকা এই মিসাইল ছুড়ে আবার পাথরের আড়ালে চলে যেত। এর ফলে সোভিয়েত পাইলটরা এতটাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল যে এরপর তারা ১২,০০০ ফুটের ওপর দিয়ে ওড়া শুরু করে, যা তাদের বোমাবর্ষণের নিখুঁত লক্ষ্যকে সম্পূর্ণ নষ্ট করে দেয়।

আফগান যুদ্ধের মূল চালিকাশক্তি ছিল ‘অ্যাসিমেট্রিক ওয়ারফেয়ার’ বা অসম যুদ্ধনীতি। এর অর্থ হলো, শত্রু যে ধরনের যুদ্ধে অভ্যস্ত এবং যেখানে শত্রুর শক্তি সবচেয়ে বেশি, সেখানে তার সাথে না লড়ে এমন এক অপ্রচলিত উপায়ে লড়াই করা যার কোনো সুনির্দিষ্ট ছক শত্রুর সামরিক সিলেবাসে নেই। আফগান পিপলস আর্মির মূল অস্ত্র ছিল কালাশনিকভ রাইফেল, আরপিজি এবং সহজে বহনযোগ্য মর্টার। এই অস্ত্রগুলোর জন্য কোনো বিশাল লজিস্টিক সাপোর্টের প্রয়োজন হত না। পরাশক্তির কোটি কোটি টাকার মাইন-ডিটেক্টর ও জ্যামারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আফগানরা ব্যবহার করত সস্তা আইইডি। যোদ্ধারা মাইনের ডেটোনেটর ও বিস্ফোরকগুলোকে হুবহু পাহাড়ের ভাঙা পাথরের মতো দেখতে নকল ফাইবারগ্লাস বা প্লাস্টিক এর ভেতর ঢুকিয়ে রাস্তার পাশে রেখে দিত। এগুলোকে দূর থেকে দেখলে সাধারণ পাথরই মনে হতো। তারা মাইনে কোনো ধাতব উপাদান ব্যবহার করত না, যাতে  মাইন ডিটেক্টর তা ধরতে না পারে। কাঠের তক্তা বা প্লাস্টিকের তৈরি 'প্রেসার প্লেট' মাটির নিচে বিছিয়ে রাখা হতো, যার উপর দিয়ে  শত্রুর সাঁজোয়া যান যাওয়ার সাথে সাথেই তা বিস্ফোরিত হয়ে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের ট্যাংক খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যেত।

একটি আধুনিক পেশাদার বাহিনী তাদের প্রতিদিনের খাদ্য, তেল এবং গোলাবারুদের সাপ্লাই চেইনের ওপর নির্ভরশীল। তাই আফগান পিপলস আর্মির প্রধান লক্ষ্য ছিল শত্রুর এই রসদ সরবরাহ লাইনে আঘাত হানা। তারা পাকিস্তান বা অন্য সীমান্ত থেকে আসা ন্যাটোর তেলের ট্যাংকার এবং লজিস্টিক ট্রাকগুলোর ওপর গেরিলা হামলা চালাত। শত শত কিলোমিটার দীর্ঘ পাহাড়ি রাস্তায় প্রতিটি ট্রাক পাহারা দেওয়া পরাশক্তির জন্য সম্ভব ছিল না। রসদ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শত্রুর ঘাঁটিগুলো পাহাড়ের বুকে এক একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হয়েছিল, যেখানে সেনারা না খেয়ে বা তেলের অভাবে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল।

একবিংশ শতাব্দীতে মার্কিন ও ন্যাটো বাহিনীর বিরুদ্ধে আফগান যোদ্ধারা অত্যন্ত সুকৌশলে ছদ্মবেশে মার্কিনদের দ্বারা গঠিত ‘আফগান জাতীয় সেনাবাহিনী’ বা পুলিশ বাহিনীতে চাকরি নিয়ে ঢুকে পড়ত। তারা মাসের পর মাস মার্কিন সেনাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রশিক্ষণ নিত, একসাথে খাওয়া-দাওয়া করত এবং তাদের বিশ্বাস অর্জন করত। এরপর কোনো এক যৌথ মিশন বা ঘাঁটির ভেতরে সুযোগ বুঝে তারা আচমকা নিজেদের সাথে থাকা অস্ত্র দিয়ে মার্কিন বা ন্যাটো ট্রেইনার ও সেনাদের ওপর খুব কাছ থেকে গুলি চালিয়ে দিত। এই আকস্মিক ভেতরগত হামলার কারণে মার্কিন সেনাদের মধ্যে তীব্র অবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল। তারা তাদের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আসল আফগান সরকারি সেনাকেও শত্রু মনে করতে শুরু করে, যা মার্কিন বাহিনীর সামগ্রিক মনোবল ও কার্যক্ষমতা ভেতর থেকে ধসিয়ে দিয়েছিল। পরাশক্তির ড্রোন যখন মাথার ওপর ঘুরত, তখন আফগান যোদ্ধারা তাদের ঐতিহ্যবাহী ‘শালওয়ার কামিজ’ পরে সাধারণ মেষপালক বা কৃষকের ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াত। তারা মাঠে কাজ করত, বাজারে চা খেত। শত্রু সেনারা তাদের সাধারণ গ্রামবাসী মনে করে চলে যেত। কিন্তু রাত নামলেই সেই শান্ত মেষপালকটিই তার চাদরের নিচ থেকে একে-৪৭ বের করে হয়ে উঠত এক একজন ভয়ংকর যোদ্ধা। এই কৌশলের কারণে বিদেশি পেশাদার সৈন্যরা চরম হতাশায় ভুগত, কারণ তারা কাউকেই বিশ্বাস করতে পারত না; কে শত্রু আর কে মিত্র, তা চেনার কোনো উপায় তাদের আধুনিক প্রযুক্তির রাডারে ছিল না।

আফগান যোদ্ধারা কোনো ব্যাটালিয়ন আকারে যুদ্ধ করত না। তারা ৫ থেকে ১০ জনের ছোট ছোট স্বাধীন দলে বিভক্ত থাকত। এই দলগুলো কাজ করত প্রকৃতির বিষ পিঁপড়া বা মৌমাছির ‘সোয়ার্ম ইন্টেলিজেন্স’ নীতিতে। যখনই কোনো মার্কিন বা সোভিয়েত টহল দল তাদের সীমানায় ঢুকত, চারপাশের পাহাড় থেকে এই ছোট ছোট দলগুলো একযোগে ঝাঁক বেঁধে আক্রমণ করত এবং পাল্টা আক্রমণের সুযোগ দেওয়ার আগেই পাহাড়ের খাঁজে বা স্থানীয় গ্রামে অদৃশ্য হয়ে যেত।

বিংশ শতাব্দীতে সোভিয়েতদের বিরুদ্ধে আফগানদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছিল রাত। সোভিয়েত বাহিনীর কাছে তখন উন্নত নাইট-ভিশন প্রযুক্তি ছিল না। দিনের বেলা আফগানরা পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় থাকত। কিন্তু সূর্য ডোবার সাথে সাথেই পুরো আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ চলে যেত এই পিপলস আর্মির হাতে। তারা রাতের অন্ধকারে কোনো আলো না জ্বালিয়ে, শুধুমাত্র নিজেদের চিরচেনা পাহাড়ি পথ আর অন্ধকারে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতাকে ব্যবহার করে সোভিয়েত ক্যাম্পগুলো চারপাশ থেকে অবরুদ্ধ করে ফেলত এবং মর্টার ও স্নাইপার দিয়ে হামলা চালিয়ে ভোরের আলো ফোটার আগেই উধাও হয়ে যেত।

পশ্চিমা সামরিক বিশ্লেষকগণ বলেছেন, "আমেরিকানদের হাতে  দামি প্রযুক্তি ছিল, কিন্তু আফগানদের হাতে ছিল অন্তহীন সময় ও ধৈর্য।" তারা শত্রুকে কখনো একবারে বড় যুদ্ধে হারাতে চায়নি; বরং ২০ বছর ধরে ছোট ছোট হামলায় প্রতিনিয়ত রক্তক্ষরণ ঘটিয়ে, কফিনবন্দি লাশ দেশে পাঠিয়ে পরাশক্তির দেশের ভেতরের অর্থনীতি ও জনমতকে যুদ্ধবিরোধী করে তুলতে বাধ্য করেছিল। আফগান পিপলস আর্মি বিশ্ববাসীকে এই পরম সত্যটি শিখিয়েছে যে, "যুদ্ধ জয়ের জন্য অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রের চেয়ে জনগণের মানসিক দৃঢ়তা, স্বদেশের  প্রতি অগাধ ভালোবাসা এবং নিজস্ব ভূপ্রকৃতিকে চেনার দক্ষতাই আসল সুপারপাওয়ার। (পর্ব-৮) 

(লেখকঃ মাইন্ড-ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের গবেষক)

সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SH.AL

SH.AL

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT