শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়, সমাজ সংস্কার ও যেকোনো যৌক্তিক আন্দোলন-সংগ্রামে শিক্ষকরা সবসময় অভিভাবক, পথপ্রদর্শক এবং অনুপ্রেরণার মূল উৎস হিসেবে কাজ করেন। আন্দোলন-সংগ্রামে শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষকরা সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল। অনেক সময় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন বা দমন-পীড়ন নেমে এলে শিক্ষকরা সরাসরি তাদের পাশে দাঁড়িয়ে ঢাল হিসেবে কাজ করেন। ঠিক এভাবেই ঢাল হয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে পাশে ছিলেন হাজী মোহাম্মাদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) বর্তমান প্রক্টর অধ্যাপক ড. মোঃ নওশের ওয়ান।
তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৮ সালে বিএ(অনার্স) ইন ইংলিশ ও ১৯৯৯ সালে এমএ ইন ইংলিশ ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে হাবিপ্রবিতে ইংরেজি বিভাগে শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন ও পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই তিনি ছাত্ররাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত। ছাত্রজীবনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের একজন সমর্থক ও কর্মী ছিলেন। চাকুরীজীবনে বিএনপি পন্থী শিক্ষকদের শিক্ষক সমিতির সর্বোচ্চ ভোটে সদস্য নির্বাচিত হন।
সাদা দল, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এর ২০১৫ সাল হতে ২০২২ সাল পর্যন্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
তিনি বর্তমানে ইউট্যাব (ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশ) কেন্দ্রীয় কমিটির তথ্য প্রযুক্তি সম্পাদক হিসেবে ২০২৩ সাল হতে এবং ইউট্যাব হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সিনিয়র সহ-সভাপতি পদে অদ্যাবধি দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এছাড়াও তিনি জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশন এর আজীবন সদস্য হিসেবেও যুক্ত আছেন।
জুলাইয়ে কোটা বিরোধী আন্দোলনের শুরু থেকেই তিনি শিক্ষার্থীদের পাশে ছিলেন। দিনাজপুর শহরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে তাদের দিকনির্দেশনা থেকে শুরু করে সব ধরনের সহযোগিতা করেছিলেন, পাশাপাশি হাবিপ্রবিতে কোটা আন্দোলনের ডাক দেওয়া শিক্ষার্থীদের সাথেও নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন।
৩ আগস্ট, ২০২৪ সালের একটি স্ক্রিনসটে দেখা যাচ্ছে, হাবিপ্রবি'র সাবেক সমন্বয়ক সুজন ইসলাম নিজের পরিচয় দিয়ে অধ্যাপক ড. মোঃ নওশের ওয়ানকে বলছেন, স্যার আপনারা ক্যাম্পাসে নামলে আমরা আবারও নামবো। প্রত্যুত্তরে তিনি বলেন, সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে আছি ইনশাআল্লাহ, থাকবো ইনশাআল্লাহ।
ইউনিভার্সিটি টিচার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইউট্যাব) হলো বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের একটি সংগঠন। ২৪ এর জুলাইয়ে ইউট্যাব কর্তৃক আয়োজিত মানববন্ধনে ঢাকা গিয়ে অংশগ্রহণের পাশাপাশি সেখানে শিক্ষার্থীদের কোটাবিরোধী আন্দোলনের সাথেও ছিলেন সম্পৃক্ত।
৪ জুলাই ২০২৪, প্রথম আলো পত্রিকার অনলাইনে প্রকাশিত "সরকারি চাকরিতে কোটা পুনর্বহালে ইউট্যাবের উদ্বেগ" শিরোনামের নিউজটিতে কোটা বিরোধী আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে ইউট্যাবের বিবৃতিতে সারা বাংলাদেশের যে ১১৩ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক স্বাক্ষর করেছিলেন সেখানে হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অধ্যাপক ড.নওশের ওয়ান স্বাক্ষর করেছিলেন। সেসময় মামলা, হামলা ও হয়রানির ভয়কে তোয়াক্কা না করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কোটাবিরোধী আন্দোলনকে সমর্থন জানানো ইউট্যাবের সেই বিবৃতিতে স্বাক্ষর করা ছিল সাহসের পরিচয়।
১৬ জুলাই আবু সাইদ শহীদ হওয়ার পর পুরো বাংলাদেশের পরিস্থিতি খুবই উত্তপ্ত। শিক্ষার্থীদের উপর সরকারের নির্যাতনের মাত্রা যখন তুঙ্গে, ১৮ জুলাই এক ফেসবুক পোস্টে তিনি লিখেন; বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রায় সকল প্রতিষ্ঠানের সাধারণ শিক্ষার্থীরা আজ আক্রান্ত। এ পর্যন্ত অনেকেই নিজের প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে । এ সময় আমাদের সন্তানদের পাশে থাকার নৈতিক দায় বোধ করছি। তাদের কারও চিকিৎসার প্রয়োজন হলে আমরা যেন আমাদের সাধ্যমত সাহায্য করার চেষ্টা করি। সবার কাছে এটা আমার একান্ত অনুরোধ। তাদের পাশে দাঁড়ান এবং তাদের মূল্যায়ন করুন। অন্যথায় এ জাতি বিভীষিকাময় অন্ধকার কৃষ্ণগহব্বরে নিমজ্জিত হবে। পূর্ব দিগন্তে রক্তিম লাল সূর্য উদয়ের অপেক্ষায়।
জুলাই আন্দোলনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে হাবিপ্রবি শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম-আহ্বায়ক এহসানুল কবির অর্ণব জানান," স্যারের ব্যাপারে বলতে গেলে শেষ হবে না, উনি অন্য লেভেলের ডেডিকেশন ওয়ালা মানুষ। জাতীয়তাবাদী আদর্শকে তো অবশ্যই ধারণ করেন কিন্তু উনি সার্বজনীন যে বিষয়গুলো বিশেষ করে হচ্ছে জুলাইয়ে ছাত্র আন্দোলনে দিনাজপুরের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় সর্বত্র মিলায় উনার মত সহযোগিতা অন্য কেউ করে নাই। যেদিন যেই জায়গায় আন্দোলনগুলো হইছে তিনি সেই স্পটগুলোতে কিন্তু এসেছেন। এগুলোর অনেক ডকুমেন্টসও আছে, হ্যাঁ।"
হাবিপ্রবি'র আরেক ছাত্রদল নেতা মেহেদী হাসান বাবু বলেন, "নওশের ওয়ান স্যার জাতীয়তাবাদী শক্তির একজন নিবেদিত প্রাণ। দলের দুঃসময়ে তিনি ছাত্রদলের সবসময় খোঁজখবর রাখতেন। শহীদ জিয়ার আদর্শিক রাজনীতি করতে উৎসাহিত করতেন আমাদের। দলীয় প্রোগ্রামে আমাদের সাথে সামনের সারিতে থেকে আমাদের অনুপ্রাণিত করতেন। জুলাই আন্দোলনে স্যার ছিলেন সম্মুখ সারির একজন যোদ্ধা। আন্দোলনে আহত শিক্ষার্থীদের সবসময় খোঁজখবর রাখতেন এবং সাধ্যমতো পাশে থাকার চেষ্টা করতেন। স্যার খুব সৎ এবং ধর্মভীরু মানুষ। তিনি সর্বদা আমাদেরকে সততার সাথে শিক্ষার্থীবান্ধব কাজ করার উপদেশ দেন।"
আওয়ামী সরকার যখন পতনের দ্বারপ্রান্তে অর্থাৎ ৪ আগস্ট ২০২৪ সালের একটি ছবিতে দেখা যায় প্রফেসর ড. মোঃ নওশের ওয়ান দিনাজপুর জেলার বিএনপিসহ ছাত্রদল এবং যুবদল এর সাথে সরকার পতনের আন্দোলনে দিনাজপুর শহরের রাজপথে শিক্ষার্থীদের সাথে যুক্ত ছিলেন।
যেহেতু তিনি জাতীয়তাবাদী আদর্শ ধারণ করতেন, অতীতে আওয়ামী সরকারের আমলে নানা ধরনের হেনস্তার শিকারও হয়েছিলেন। ১৩ নভেম্বর, ২০১৪ যুগান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত "ছাত্রলীগে অচল হাবিপ্রবি" শিরোনামে দেখা যায়, ১২ বছর ধরে হাবিপ্রবিতে লেখাপড়া করছেন তৎকালীন ছাত্রলীগের সভাপতি ইফতেখারুল ইসলাম রিয়েল ও সাধারণ সম্পাদক অরুণ কান্তি রায় সিটন। এই দুই ছাত্রলীগ নেতা প্রত্যক্ষ ইন্ধনে তার অনুসারীরা ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ড. নওশের ওয়ান কে লাঞ্ছিত করেন।
কিন্তু এর পেছনের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে জানা যায়, যুগান্তরের ১৩ নভেম্বর ২০১৪ এ প্রকাশিত সে লেখায় শুধুমাত্র লাঞ্ছিত হওয়ার ইনফরমেশনটুকু যুগান্তর ছাপিয়েছে কিন্তু সে সময় অধ্যাপক ড. নওশের ওয়ান হাবিপ্রবি'র সাদা দল এবং জিয়া পরিষদে সক্রিয় ভূমিকা রাখার কারণে ও ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মরহুম প্রফেসর ড. পিয়াস করিম এর মরনোত্তর একটি আলোচনা অনুষ্ঠানে যোগদান এবং দোয়া পরিচালনা করার কারণে তৎকালীন ছাত্রলীগের সভাপতি এবং সেক্রেটারি যথাক্রমে রিয়েল ও অরুণের নির্দেশক্রমে তাদের সহযোগীরা দুই এক দিন পরে বিষয়টি যখন স্থানীয় পত্রিকায় ছাপানো হয় তখন তারা অধ্যাপক ড.নওশের ওয়ানকে রুমে অবরুদ্ধ করে রাখে এবং প্রায় দুই ঘণ্টা যাবত লাঞ্ছিত করে। এখানেই ক্ষান্ত না হয়ে তারা অধ্যাপক ড. নওশের ওয়ানের অনুষদের অনেকের সামনে জোরপূর্বক ১০ হাজার টাকা চাঁদা নেয় যা ওই সময়ের জন্য একটা মোটা অংকের টাকা ছিল। হাবিপ্রবি'র এই সাবেক ছাত্রলীগ নেতা অরুণ কান্তি রায় সিটনের নামে হত্যাসহ চারটি মামলা থাকায় সম্প্রতি ঢাকার মোহাম্মদপুরের একটি বাসা থেকে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে।
বিএনপিপন্থী শিক্ষক হওয়ায় নিজ অনুষদেও হয়েছেন নানা ধরনের বঞ্চনার শিকার। অধ্যাপক ড. নওশের ওয়ান বলেন," ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আমি উচ্চশিক্ষার জন্য গ্রীসে যাই এবং সেখান থেকে ২০১১ সালের অক্টোবর মাসে বাংলাদেশে ফিরি এবং বিশ্ববিদ্যালয় চাকরিতে যোগদানের জন্য আবেদনপত্র জমা দেই। তখন আমি সহযোগী অধ্যাপক। হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী কোন অনুষদে সহযোগী অধ্যাপক থাকলে সেই অনুষদে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে তিনি ডীন নিযুক্ত হইবেন। কিন্তু তৎকালীন প্রশাসন আমার যোগদানপত্র দীর্ঘদিন গ্রহণ না করে এবং আমি যাতে ডীন হতে না পারি এটি মাথায় রেখে তারা মালয়েশিয়া থেকে অন্য একজন সহযোগী অধ্যাপককে তার উচ্চশিক্ষা শেষ না হওয়ার ছয়মাস আগেই বাংলাদেশে নিয়ে আসে এবং আমার যোগদানপত্র গ্রহণ না করে আটকে রাখেন এবং সেই সহযোগী অধ্যাপককে বাংলাদেশে এনে ডীন নিয়ুক্ত করার পর আমার জয়েনিং একসেপ্ট করেন।"