ঢাকা | শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পিপলস আর্মি ও প্রতিরক্ষা

পর্ব-৯

author
এ ইউ দৌলা

প্রকাশিত : ৭ জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৩৫
ছবি-সংগৃহীত ছবি-সংগৃহীত
ad003
প্রচলিত সামরিক দর্শনের ধারনা হলো, যে দেশের সমরাস্ত্র যত দামি এবং আধুনিক, সেই দেশ প্রতিরক্ষায় তত বেশি অপরাজেয়। কিন্তু বৈশ্বিক সামরিক ইতিহাস ও আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধবিদ্যার গভীর কোণগুলো বিশ্লেষণ করলে এক  সম্পূর্ণ ভিন্ন সত্যের মুখোমুখি হতে হয়। বিলিয়ন ডলার খরচ করে কেনা বিদেশি যুদ্ধবিমান, ট্যাংক ও সাবমেরিন অনেক সময়ই কেবল এক জাঁকজমকপূর্ণ ‘বোঝা’ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে যখন যুদ্ধের চরম মুহূর্তে প্রয়োজনীয় গোলাবারুদ আর খুচরা যন্ত্রাংশের চাবিকাঠি রয়ে যায় বিক্রেতা পরাশক্তিদের হাতে, কিংবা যখন ‘রিমোট এক্সেস’-এর মাধ্যমে দূর নিয়ন্ত্রিত কোডিং ব্যবহার করে মুহূর্তের মধ্যেই সেইসব প্রযুক্তির কার্যকারিতা প্যারালাইজড করে দেওয়া সম্ভব হয়।

বাস্তবিক অর্থে, আধুনিক ভূ-রাজনীতিতে পরাশক্তিগুলো ছোট ও মধ্যম অর্থনীতির দেশগুলোর ওপর নিজেদের ছায়া-নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির এই চক্রটিকে ব্যবহার করে। কখনও নামমাত্র মূল্যে, আবার কখনও আকাশচুম্বী মূল্যে অস্ত্র সরবরাহ করে তারা মূলত এই দেশগুলোকে আজীবন এক মনস্তাত্ত্বিক ও কারিগরি  নির্ভরশীলতার ফাঁদে আটকে রাখে। এটি আসলে এক প্রকার নব্য-উপনিবেশবাদ ; যেখানে একটি দেশ কাগজে-কলমে ও মানচিত্রে স্বাধীন মনে হলেও,  কৌশলগত পরাধীনতার অদৃশ্য শিকল হতে মুক্তি পায় না। কিন্তু পিপলস আর্মির মূল দর্শনই হলো এই  পরনির্ভরশীলতার শৃঙ্খল ভেঙে পুর্ণ স্বাধীনতা অর্জন করা। কারণ, পিপলস আর্মির জন্মই হয় আগ্রাসী শত্রুর বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ এবং স্বদেশের প্রতিরক্ষার তাগিদ থেকে। তাই এই বাহিনীর সমরাস্ত্র ও সরঞ্জামের মুল দর্শন দাঁড়িয়ে থাকে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তির স্বনির্ভরতা, অস্ত্রের সুদূরপ্রসারী বিকেন্দ্রীকরণ এবং নিজস্ব ভূপ্রকৃতির সাথে সমরাস্ত্রের এক নিখুঁত ও জৈবিক সামঞ্জস্যের ওপর। ইতিহাসে দেখা যায়, যখনই কোনো পেশাদার পরাশক্তি কোনো স্বাধীন ভূখণ্ডের ওপর আগ্রাসন চালিয়েছে, তখন সেই দেশের  গণপ্রতিরোধ বাহিনী  লড়েছে এমন সব অপ্রচলিত সরঞ্জাম, প্রযুক্তি এবং চতুর মনস্তাত্ত্বিক কৌশল দিয়ে, যা শত্রুর সামরিক সিলেবাস এবং চিন্তার সীমানার সম্পূর্ণ বাইরে ছিল। 

বিগত কয়েক দশক ধরে তীব্র আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং প্রযুক্তিগত অবরোধের মুখে থাকা একটি দেশ কীভাবে আমেরিকার মতো পরাশক্তির নাকের ডগায় নিজস্ব সামরিক আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে পারে, তার সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক ও সামরিক উদাহরণ হলো আজকের ইরান। প্রচলিত সামরিক সংজ্ঞায় ইরান হয়তো পশ্চিমা দেশগুলোর মতো বিলিয়ন ডলারের আধুনিক ‘স্টেলথ ফাইটার জেট’ বা বিশাল আকৃতির ‘এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার’ তৈরি করতে পারেনি। কিন্তু তারা তাদের নিয়মিত সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি ‘ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কোর (IRGC) এবং তাদের বেসামরিক মিলিশিয়া নেটওয়ার্কের সমন্বয়ে এমন এক ত্রিমাত্রিক ‘পিপলস আর্মি’ গড়ে তুলেছে, যা হরমুজ প্রণালী ও পারস্য উপসাগরে মার্কিন নৌবহরের জন্য সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। এই পর্বে আমরা জানব কীভাবে ইরান তাদের নিজস্ব প্রযুক্তি, সস্তা ড্রোন এবং সোয়ার্মিং কৌশল দিয়ে আধুনিক নেটওয়ার্ক-কেন্দ্রিক যুদ্ধনীতিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে।

পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালী হলো বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের সবচেয়ে সংবেদনশীল ধমনী। এই সংকীর্ণ জলসীমায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল ও আধুনিক এজিস ক্লাস ক্রুজার বা ডেস্ট্রয়ারের মুখোমুখি হওয়া যেকোনো সাধারণ দেশের নৌবাহিনীর জন্য আত্মহত্যার শামিল। ইরান এই সত্যটি খুব ভালো করেই জানে; তাই তারা শত্রুর শক্তির জায়গায় আঘাত না করে নিজস্ব এক অনন্য নৌ-গেরিলা কৌশল তৈরি করেছে।

বিলিয়ন ডলার খরচ করে একটি বড় যুদ্ধজাহাজ বানানোর চেয়ে ইরান সেই বাজেট দিয়ে তৈরি করেছে হাজার হাজার ছোট, অত্যন্ত দ্রুতগামী এবং হালকা স্পিডবোট। এই বোটগুলো সাধারণ রাডারে সহজে ধরা পড়ে না। এগুলো গাইডেড মিসাইল, টর্পেডো এবং রকেট লঞ্চারে সজ্জিত থাকে। কিছু বোটকে সরাসরি ‘কামিকাজে’ বা সুইসাইড বোটে রূপান্তর করা হয়, যা বিস্ফোরক বোঝাই করে সরাসরি শত্রুর জাহাজে গিয়ে আঘাত হানতে পারে। মার্কিন যুদ্ধজাহাজের রাডার ও মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম একযোগে ৪ থেকে ৫টি লক্ষ্যবস্তুকে নিখুঁতভাবে ধ্বংস করতে পারে। ইরান এই সীমাবদ্ধতাকে পুঁজি করে ‘সোয়ার্মিং’ বা ঝাঁক বেঁধে আক্রমণের কৌশল নেয়। একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজকে অবরুদ্ধ করতে ইরান একসাথে ৫০ থেকে ১০০টি স্পিডবোট চারপাশ থেকে মৌমাছির মতো লেলিয়ে দেয়। শত্রুর আধুনিক ডিফেন্স সিস্টেম একসাথে এতগুলো দ্রুতগতির লক্ষ্যবস্তুকে ট্র্যাক করতে গিয়ে জ্যাম হয়ে পড়ে। কোটি টাকার একটি ডিফেন্স সিস্টেম যখন সস্তা বোট ধ্বংস করতে ব্যস্ত থাকে, ঠিক সেই ফাঁকে ২-১টি বোট শত্রুর মূল জাহাজের হাল বা ইঞ্জিনে আঘাত করে পুরো যুদ্ধজাহাজকে চিরতরে অকেজো করে দেয়।

ইরানের পিপলস আর্মি বা মিলিশিয়া দর্শনের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো, "অস্ত্রের দাম কত, তা বড় নয়; অস্ত্রটি শত্রুর ডিফেন্সের চেয়ে সস্তা কি না, সেটাই আসল হিসাব।" এই দর্শনের ওপর ভিত্তি করেই ইরান গড়ে তুলেছে পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম সস্তা ড্রোন এবং প্রিসিশন-গাইডেড মিসাইলের এক অভেদ্য নেটওয়ার্ক।

ইরানের তৈরি ‘শাহেদ-১৩৬’ এর মতো আত্মঘাতী ড্রোনগুলোর উৎপাদন খরচ ২০ হাজার ডলারের কাছাকাছি। এই ড্রোনগুলো ওড়ে খুব নিচু দিয়ে এবং এর ইঞ্জিন তৈরি হয় সাধারণ ঘাস কাটার মেশিনের প্রযুক্তিতে, যার ফলে এর থার্মাল সিগনেচার খুব কম থাকে এবং প্রথাবদ্ধ রাডার একে সহজে ধরতে পারে না। পশ্চিমারা এই ২০ হাজার ডলারের একটি সস্তা ড্রোন ভূপাতিত করতে যে মিসাইল  ব্যবহার করে, তার একেকটির দাম প্রায় ২০ থেকে ৪০ লাখ ডলার! এই যে খরচের বিশাল অসমতা, এটি শত্রুর অর্থনীতি এবং সমরাস্ত্রের মজুতকে ধীরে ধীরে ভেতর থেকে ধসিয়ে দেয়।

আমেরিকার স্যাটেলাইট ও বিমান হামলা থেকে নিজেদের স্ট্র্যাটেজিক সমরাস্ত্র রক্ষা করতে ইরান তাদের পাহাড়ের নিচে এবং মাটির তলদেশে গড়ে তুলেছে অসংখ্য ‘মিসাইল সিটি’ বা আন্ডারগ্রাউন্ড ক্ষেপণাস্ত্র শহর। এই সুড়ঙ্গগুলো এত গভীর এবং সুরক্ষিত যে, যেকোনো আধুনিক বাঙ্কার-বাস্টার বোমাবর্ষণেও এগুলো অক্ষত থাকে। এই সুড়ঙ্গগুলোর মুখ স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে মিসাইল ফায়ার করে আবার মুহূর্তের মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়, যা শত্রুর প্রি-এম্পটিভ স্ট্রাইক বা আগাম হামলাকে সম্পূর্ণ ব্যর্থ করে দেয়।

ইরানের ডিফেন্স ডকট্রিনের সবচেয়ে চতুর অংশ হলো, তারা যুদ্ধকে কখনো নিজেদের মূল ভূখণ্ডে আসতে দেয় না। পিপলস আর্মির ধারণাকে তারা আন্তর্জাতিক স্তরে রূপান্তর করেছে, যা সামরিক পরিভাষায় ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ নামে পরিচিত। লেবানন, ইয়েমেন, ইরাক এবং সিরিয়ার স্থানীয় স্বাধীনতাকামী বা মিলিশিয়া গ্রুপগুলোকে তারা ‘প্রযুক্তি ও উৎপাদন কৌশল’ সরবরাহ করেছে। তারা ইয়েমেনের মরুভূমিতে বা লেবাননের পাহাড়ের নিচে সস্তা ড্রোন ও রকেট তৈরির ছোট ছোট কুটির শিল্প তৈরি করে দিয়েছে। এর ফলে সুবিধা হলো, কোনো পরাশক্তি যদি ইরানকে আক্রমণ করার হুমকি দেয়, তখন ইরানকে সরাসরি যুদ্ধ করতে হয় না। লোহিত সাগরে হুথিরা সস্তা ড্রোন দিয়ে পরাশক্তির নৌচলাচল থমকে দেয়, কিংবা হিজবুল্লাহ হাজার হাজার রকেট দিয়ে শত্রুর ভূখণ্ডকে ব্যস্ত রাখে। এই বিকেন্দ্রীভূত আঞ্চলিক গ্রিডের কারণে শত্রুপক্ষ কখনোই কোনো একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্রে আঘাত করে ইরানকে কাবু করতে পারে না।

আইটি এবং সাইবার স্পেসকে ইরান তাদের পিপলস আর্মির চতুর্থ উইং হিসেবে ব্যবহার করে। দীর্ঘদিন অবরুদ্ধ থাকায় তারা নিজেদের একটি সম্পূর্ণ স্বনির্ভর ও এনক্রিপ্টেড জাতীয় ইন্টারনেট এবং সাইবার কমান্ড গড়ে তুলেছে। ২০১১ সালে ইরান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে গোপন ও অত্যাধুনিক ‘RQ-170 Sentinel’ স্টেলথ ড্রোনটিকে কোনো গুলি না ছুড়ে, শুধুমাত্র ইলেকট্রনিক জ্যামিং এবং GPS Spoofing বা সংকেত বিভ্রান্তির মাধ্যমে অক্ষত অবস্থায় নিজেদের মাটিতে ল্যান্ড করিয়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। এটি প্রমাণ করে যে, পিপলস আর্মির সাইবার উইং শত্রুর কোটি টাকার কোডিং ও প্রযুক্তির অহংকারকে শুধু মগজের বুদ্ধি দিয়ে হ্যাক করতে সক্ষম। পশ্চিমা মিডিয়ার মনস্তাত্ত্বিক আক্রমণ ঠেকাতে ইরান তাদের নিজস্ব ভাষায় এবং আঞ্চলিক সংস্কৃতিকে পুঁজি করে কড়া ডিজিটাল ফিল্টার ও প্রোপাগান্ডা প্রতিরোধী আখ্যান তৈরি করেছে, যা দেশের যুবসমাজকে ভেতর থেকে মানসিকভাবে মজবুত রাখে।  

ইরানি পিপলস আর্মির রণকৌশল বিশ্ব প্রতিরক্ষা বিজ্ঞানকে একটি নতুন সমীকরণ দিয়েছে, "তোমার যদি দামি ঢাল বা তলোয়ার না থাকে, তবে শত্রুকে এমন হাজারটা সুচ দিয়ে আঘাত করো, যেন সে ব্যথায় নিজেই তলোয়ার ফেলে দিতে বাধ্য হয়।" ইরান প্রমাণ করেছে, ভৌগোলিক অবস্থানকে চিনে, অস্ত্রের উৎপাদনকে সস্তা ও বিকেন্দ্রীকরণ করে এবং প্রক্সি গ্রিড তৈরির মাধ্যমে যেকোনো আধুনিক নেটওয়ার্ক-কেন্দ্রিক পরাশক্তিকেও দীর্ঘমেয়াদে অবরুদ্ধ ও ক্লান্ত করে দেওয়া সম্ভব। আসলে পিপলস আর্মির সমরাস্ত্র নীতি এমনই হওয়া উচিত, যা হবে সস্তা, দেশীয়, সংখ্যায় বিপুল এবং শত্রুর খরচের সমীকরণকে ধ্বংস করার মতো চতুর। (পর্ব-৯)

ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান ও ইরানের ইতিহাস মানেই পিপলস আর্মির এক গৌরবগাথা। তবে ইতিহাসের পাতায় এমন অনেক শক্তিশালী গণপ্রতিরোধের গল্পও আছে, যা চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছিল। কেন সেই অপরাজেয় প্রতিরোধগুলো ভেঙে পড়েছিল? পিপলস আর্মির আসল দুর্বলতাগুলো ঠিক কোথায়? জানতে চোখ রাখুন আগামী পর্বে।

(মাইন্ড-ইঞ্চিনিয়ারিং বিষয়ের গবেষক)

সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SH.AL

SH.AL

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT