কর্মস্থল নেত্রকোণার আটপাড়া ও কেন্দুয়া উপজেলায় হলেও অধিকাংশ সময় ঢাকার সাভারে নিজ বাড়িতে অবস্থান করেন উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. ইমরান হোসেন— এমন অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার কারণে দুই উপজেলায় চলমান গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য কার্যক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টি এবং অনিয়ম-দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়েছে বলেও অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
খাদ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মো. ইমরান হোসেনের মূল কর্মস্থল আটপাড়া উপজেলা। পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে তিনি কেন্দুয়া উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের দায়িত্বও পালন করছেন। তবে স্থানীয়দের দাবি, তিনি নিয়মিতভাবে কর্মস্থলে অবস্থান না করে ঢাকার সাভার থেকে দায়িত্ব পালন করেন। প্রয়োজন হলে মাঝে মধ্যে এসে আটপাড়া ডাকবাংলোয় অস্থায়ীভাবে অবস্থান করেন এবং পরে আবার ঢাকায় ফিরে যান।
অভিযোগ অনুযায়ী, ঈদুল আজহার সরকারি ছুটি শুরু হওয়ার আগেই গত ২৩ মে অফিস কার্যক্রম শেষ করে তিনি সাভারে চলে যান। যদিও সরকারি ছুটি শুরু হয় ২৬ মে থেকে। ফলে ছুটির আগের কয়েকটি কর্মদিবসে তিনি কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে ঈদের ছুটি শেষে ১ জুন সরকারি অফিস খোলার পরও পুরো সপ্তাহ তিনি কর্মস্থলে ছিলেন না। পরে ৭ জুন দায়িত্বস্থলে ফেরেন বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
গত ১৩ মে থেকে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য আটপাড়া ও কেন্দুয়া উপজেলায় সরকারের ভর্তুকিমূল্যের ওএমএস (ওপেন মার্কেট সেল) কার্যক্রম চলমান রয়েছে। প্রতিদিন দুই উপজেলায় প্রায় দুই টন চাল ও দুই টন আটা বিক্রি করা হচ্ছে। পাশাপাশি সরকারিভাবে ধান-চাল সংগ্রহ কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ওএমএসের চাল উত্তোলনের ডেলিভারি অর্ডার (ডিও) এবং ধান-চাল সংগ্রহ সংক্রান্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নথিতে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের স্বাক্ষর বাধ্যতামূলক। কর্মকর্তার অনুপস্থিতির কারণে অনেক ক্ষেত্রে নিয়মিত তদারকি ব্যাহত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়ভাবে কিছু ওএমএস পয়েন্টে চাল ও আটা বিতরণে অনিয়ম এবং সরকারি খাদ্যশস্য আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছে।
আটপাড়া উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের উপ-খাদ্য পরিদর্শক শরীফা আক্তার বলেন, “ঈদের পরের সপ্তাহে স্যার অসুস্থতার কারণে ছুটিতে ছিলেন। পরে কেন্দুয়ার একটি সমস্যা সমাধানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ফোন পেয়ে তিনি রাতে চলে আসেন। স্যার সাধারণত ঢাকায় থাকেন এবং এখানে এসে ডাকবাংলোয় অবস্থান করে দায়িত্ব পালন করেন।”
কেন্দুয়া খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ঢাকায় বসবাস করে একই সঙ্গে আটপাড়া ও কেন্দুয়ার দায়িত্ব কার্যকরভাবে পালন করা কঠিন। ফলে অনেক সময় জরুরি প্রয়োজনেও কর্মকর্তাকে পাওয়া যায় না। কখনও কখনও ডেলিভারি অর্ডারসহ গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রে পরে এসে একসঙ্গে স্বাক্ষর করতে দেখা গেছে। এতে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে তাদের আশঙ্কা।
তাদের ভাষ্য, খাদ্য বিভাগের মতো জনসেবামূলক গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নিয়মিত উপস্থিতি না থাকলে সরকারি কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রশ্নের মুখে পড়ে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. ইমরান হোসেন বলেন, “ঈদের আগে দায়িত্ব পালন শেষে বাড়ি গিয়েছি। ঈদের পরও দুই-একদিন অফিস করেছি। অসুস্থতার কারণে কিছুটা সমস্যা হয়েছে।” এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি পরে কথা বলবেন বলে ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।
অন্যদিকে স্থানীয় সূত্রের দাবি, সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য পরিচিতজনদের মাধ্যমে বিভিন্ন মহলে তদবিরও করা হয়েছে। যদিও এ অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোয়েতাছেমুর রহমান বলেন, “বিষয়টি আপনার কাছ থেকেই প্রথম শুনলাম। আমাকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কিছু জানাননি। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
উল্লেখ্য, সম্প্রতি জেলার খাদ্য খাত নিয়ে একাধিক অনিয়মের ঘটনা আলোচনায় আসে। গত ৬ জুন কেন্দুয়ার টেঙ্গুরি এলাকায় একটি পরিত্যক্ত অটোরাইস মিলে বিপুল পরিমাণ চাল অবৈধভাবে মজুদের অভিযোগে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে জরিমানা করে। এর আগে ১৪ মে মদন উপজেলায় ২০ টন চালবোঝাই একটি ট্রাক জব্দের পর তদন্তে আরও প্রায় ৪৪ টন অতিরিক্ত চাল মজুদের তথ্য পাওয়া যায়। এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট দুই কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, খাদ্য বিভাগের তদারকির দুর্বলতার সুযোগেই এমন অনিয়ম বারবার ঘটছে।
স্থানীয়দের দাবি, আটপাড়া ও কেন্দুয়ার খাদ্য বিভাগের সার্বিক কার্যক্রম তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলে সরকারি খাদ্য কর্মসূচিতে শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে।