একটি পেশাদার সামরিক বাহিনী মূলত প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা, বেতন-ভাতা, পেনশন এবং রাষ্ট্রীয় আইনি কাঠামোর শৃঙ্খলে পরিচালিত হয়। সেখানে একজন সৈনিকের আনুগত্যের পেছনে বড় অনুঘটক হলো তার জীবিকা ও বৈষয়িক নিরাপত্তা। কিন্তু একটি ‘পিপলস আর্মি’ বা গণপ্রতিরোধ বাহিনীর চরিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে প্রতিরোধ যোদ্ধারা কোনো আর্থিক লাভ বা ক্যারিয়ার গড়ার উদ্দেশ্যে বুলেটের সামনে বুক পাতে না। যেহেতু কোনো বস্তুগত প্রাপ্তির লোভ এখানে কাজ করে না, তাই এই বাহিনীর মানসিক শক্তিকে দীর্ঘকাল ধরে বাঁচিয়ে রাখার কাজটি অত্যন্ত জটিল। এই বস্তুগত শূন্যতা পূরণের জন্যই প্রয়োজন হয় সুনির্দিষ্ট কিছু ‘মাইন্ড-ইঞ্জিনিয়ারিং’ বা মনস্তাত্ত্বিক প্রকৌশল পদ্ধতি। এটি হলো মানুষের মগজের ভেতরের বিশ্বাস ও উদ্দেশ্যকে এমনভাবে দৃঢ় করা, যেন বাহ্যিক কোনো সুযোগ-সুবিধা ছাড়াই ভেতরের আদর্শিক তাড়না তাকে প্রতিনিয়ত লড়াইয়ের শক্তি জোগায়।
"যার কাছে বেঁচে থাকার বা লড়াই করার একটি সুনির্দিষ্ট 'কেন' আছে, সে যেকোনো উপায়ে টিকে থাকতে পারে।" — ফ্রিডরিখ নিটশে একজন যোদ্ধাকে যখন বলা হবে, "তোমাকে এই বাঙ্কারে অবরুদ্ধ থাকতে হবে এবং জীবন বাজি রেখে লড়াই করতে হবে", তখন তার অবচেতন মন সাথে সাথে প্রশ্ন তুলবে, কেন? কীসের জন্য আমি এই কষ্ট করব? যদি এই ‘কেন’ প্রস্নের উত্তর তার কাছে অস্পষ্ট বা সস্তা স্লোগান বলে মনে হয়, তবে সেই ব্যক্তি প্রথম সুযোগেই বাঙ্কার ছেড়ে পালাবে। তাই পিপলস বাহিনীর মাঠপর্যায়ের রিক্রুট থেকে শুরু করে কম্যান্ডার পর্যন্ত প্রতিটি সদস্যের মগজে যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্যটি কাঁচের মতো স্বচ্ছ থাকতে হবে। এই লক্ষ্যে প্রথাগত প্যারেডের চেয়ে বেশি প্রয়োজন নিয়মিত স্টাডি সার্কেল এবং মনস্তাত্ত্বিক ব্রিফিং। ভিয়েতকং বা আফগান যোদ্ধারা প্রতিদিন লড়াইয়ে যাওয়ার আগে বা বাঙ্কারে বসে তাদের রাজনৈতিক ও আদর্শিক লক্ষ্য নিয়ে আলোচনা করতেন। যখন ইতিহাসের সফল প্রতিরোধগুলোর উদাহরণ নিয়ে নিজেদের বিশ্লেষণ করা হয়, তখন যোদ্ধাদের মনে এই বিশ্বাস দৃঢ় হয় যে, তাদের বর্তমান কষ্টটি অর্থহীন নয়, এটি একটি ঐতিহাসিক মহৎ উদ্দেশ্যের অংশ। এই প্রক্রিয়াটি যোদ্ধাদের মানসিক বুনিয়াদকে এমন এক ইস্পাতকঠিন স্তরে নিয়ে যায়, যেখানে শত্রুর ভারী বোমাবর্ষণও তাদের সিদ্ধান্তকে টলাতে পারে না।
মানুষের মন সবসময় এমন একজন নেতাকে অনুসরণ করতে চায়, যার কথা ও কাজের মধ্যে স্পষ্টতা আছে। প্রথাগত যুদ্ধে অনেক সময় অফিসাররা পিছনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কম্যান্ড সেন্টারে বসে ম্যাপ দেখে নির্দেশ দেন, আর সাধারণ সৈনিকেরা সামনে গিয়ে প্রাণ হারায়। পিপলস আর্মিতে এই মডেল হলে সেনাদের মোটিভেশন নিমেষেই শূন্য হয়ে যায়।
তাই বাহিনীর কমান্ডারদের প্রধান দায়িত্ব হল সবচেয়ে সাধারণ জীবনযাপন করা এবং সর্বোচ্চ সততায় মাঠপর্যায়ের যোদ্ধাদের সাথে আবেগের সম্পর্ক মজবুত করা। যখন একজন যোদ্ধা দেখে যে, তার কম্যান্ডারও তার মতোই সাধারণ মাটির মেঝেতে ঘুমাচ্ছে, একই খাবার খাচ্ছে এবং যুদ্ধের ময়দানে সবার সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছে, তখন তাদের মধ্যে ‘শেয়ার্ড ফেট’ এর এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক বন্ধন তৈরি হয়। নেতৃত্ব যখন নিজেই ত্যাগের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়, তখন অনুসারীদের মনে কোনো ক্ষোভ বা বৈষম্যের অনুভূতি থাকে না। তারা তখন সুড়ঙ্গ বা বাঙ্কারে না খেয়ে মরে যেতেও দ্বিধা করে না, কারণ তারা জানে তাদের নেতা তাদের ধোঁকা দিচ্ছে না। এই ইনসাফ ও বিশুদ্ধ সততাই বাহিনীর ভেতরের পারস্পরিক বিশ্বাস বা ‘সোয়ার্ম ট্রাস্ট’-কে টিকিয়ে রাখে।
"জনগণ হলো সমুদ্রের পানি, আর পিপলস আর্মি হলো সেই পানিতে বাস করা মাছ।" — মাও সেতুং
একটি গণপ্রতিরোধ বাহিনী কখনো সমাজ বা দেশের সাধারণ মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একা লড়তে পারে না। যখন কোনো গেরিলা বাহিনী জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখন তারা শুধুই একটি ‘সশস্র গ্যাং’-এ পরিণত হয়। জনগণের অবিশ্বাস যোদ্ধাদের নৈতিক শক্তিকে চূর্ণ করে দেয়। পিপলস আর্মির মোটিভেশনের একটি বিশাল অংশ আসে জনগণের নিঃশর্ত সমর্থন, দোয়া এবং ভালোবাসা থেকে। একজন যোদ্ধা যখন জানে যে সে পুরো সমাজের প্রতিনিধি হয়ে লড়ছে এবং পুরো দেশ তার পেছনে দোয়া করছে, তখন তার আত্মত্যাগ করার ইচ্ছা বহুগুণ বেড়ে যায়। তবে, এই মনস্তাত্ত্বিক সেতুটি কিন্তু রাতারাতি তৈরি হয় না; এর জন্য ব্যাপক সামাজিক কাজ, দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং সেবামূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জনগণের সাথে একাত্ম হতে হয়। যখন এই সংযোগটি প্রাকৃতিক হয়ে ওঠে, তখন সাধারণ মানুষই যোদ্ধাদের নিজেদের ঘরে লুকিয়ে রাখে, নিজেদের খাবার ভাগ করে দেয় এবং গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে শত্রুর হাত থেকে বাঁচায়। জনগণের এই ভালোবাসাই যোদ্ধাদের প্রধান বর্ম হিসেবে কাজ করে।
"বড় জয় হলো ছোট ছোট সফলতার এক একটি সমষ্টি মাত্র।"
মানুষের মস্তিষ্ক দীর্ঘসময় ধরে কোনো ইতিবাচক ফলাফল বা ‘রিওয়ার্ড’ না পেলে মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। পিপলস আর্মির যুদ্ধগুলো যেহেতু দীর্ঘমেয়াদি এবং কখনও কখনও তা কয়েক যুগ পর্যন্ত হয়, তাই চূড়ান্ত বিজয় আসতে অনেক সময় লাগে। বছরের পর বছর শুধু মার খাওয়া বা লুকিয়ে থাকার ফলে যোদ্ধাদের মস্তিষ্কে স্ট্রেস হরমোন বেড়ে যায়, যা তাদের হতাশ ও নিষ্ক্রিয় করে তোলে। এই মনস্তাত্ত্বিক ক্লান্তি দূর করার সবচেয়ে বৈজ্ঞানিক কৌশল হলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিজয়ের উদযাপন। শত্রুর একটি বিশাল রেজিমেন্ট ধ্বংস করার পরিকল্পনা বাদ দিয়ে, শত্রুর ছোট একটি চেকপোস্ট উড়িয়ে দেওয়া, তাদের একটি তেলের ট্যাংকার বা লজিস্টিক লাইন বিচ্ছিন্ন করা, কিংবা সাইবার ডিফেন্সে শত্রুর একটি নেটওয়ার্ক হ্যাক করার মতো ছোট ছোট মিশন ডিজাইন করতে হয়। যখন এই ছোট মিশনগুলো সফল হয় এবং সেগুলোকে বাহিনীর ভেতরে বড় করে প্রচার ও উদযাপন করা হয়, তখন যোদ্ধাদের মস্তিষ্কে ‘ফিল গুড’ নিউরোট্রান্সমিটার রিলিজ হয়। এই ডোপামিন লুপ যোদ্ধাদের ভেতরের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনে, তাদের ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয় এবং পরবর্তী বড় মিশনের জন্য তীব্র উদ্দীপনা ও বারুদ জোগায়।
পিপলস আর্মির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি কোনো পারমাণবিক বোমা নয়, বরং তাদের ভেতরের মানসিক ভাঙন। এই বাহিনীর মোটিভেশন প্রধানত ৪টি কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ও ধসে যায়:
অন্তরায়ের ধরণ
মনস্তাত্ত্বিক ও সাংগঠনিক পরিণতি
১. তথ্য যুদ্ধ
শত্রু যখন প্রোপাগান্ডা ও ফেক নিউজের মাধ্যমে যোদ্ধাদের মনের ভেতর নেতাদের বিরুদ্ধে অবিশ্বাস তৈরি করতে পারে, তখন যোদ্ধারা ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ে।
২. বৈষম্যের অনুভব
মাঠপর্যায়ের যোদ্ধারা যখন না খেয়ে লড়ে, আর সেন্ট্রাল কম্যান্ডের নেতারা বিলাসবহুল জীবনযাপন করে কিংবা স্বজনপ্রীতি করছে বলে যোদ্ধারা বিশ্বাস করে, তখন ‘সোয়ার্ম ট্রাস্ট’ এক মুহূর্তে বিষে পরিণত হয়।
৩. দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতা
যুদ্ধ যদি কোনো স্পষ্ট নৈতিক উদ্দেশ্য ছাড়া বছরের পর বছর শুধু অবরুদ্ধ অবস্থায় ঝুলে থাকে, তবে যোদ্ধাদের মস্তিষ্ক ক্লান্ত হয়ে পড়ে। ভবিষ্যৎ স্বপ্ন তাদের অন্তরে মজবুত না হলে যোদ্ধারা তখন শর্টকাট বা আত্মসমর্পণের পথ খোঁজে।
৪. আদর্শিক বিচ্যুতি
বাহিনীর ভেতরে ক্ষমতার লোভ, অর্থলিপ্সা কিংবা অপরাধের অনুপ্রবেশ ঘটলে তা আর ‘পিপলস আর্মি’ থাকে না; সেটি একটি গ্যাং বা ভাড়াটে বাহিনীতে রূপ নেয়।
কারখানার লোহা বা আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে কোনো বাহিনীর আসল শক্তি মাপা যায় না; বাহিনীর আসল সমরাস্ত্র তৈরি হয় যোদ্ধাদের বিশ্বাসের গভীরে। যেখানে একজন শত্রুর লড়াই করার কারণ হলো তার ডিউটি বা চাকরি, সেখানে পিপলস আর্মির লড়াই করার কারণ হলো তার জীবনের উদ্দেশ্য। আর এই উদ্দেশ্যের স্পষ্টতা ও পবিত্রতা রক্ষা করাই হলো একটি স্বাধীন ও স্বনির্ভর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রধান কাজ, যার সামনে পৃথিবীর সমস্ত পরাশক্তির আধুনিক টেকনোলজি ও অহংকার যুগে যুগে হাঁটু গেঁড়ে বসতে বাধ্য হয়েছে। (পর্ব-১৩)
পিপলস আর্মির দর্শন কীভাবে আধুনিক ডিজটাল যুগের বাস্তবতায় যে কোন ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের ডিফেন্সিভ আর্মির জন্য অনুকরণীয় হতে পারে, তা নিয়ে লিখব পরের পর্বে।
(মাইন্ড-ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের গবেষক)