একবিংশ শতাব্দীর ভূ-রাজনীতি এখন গতানুগতিক সামরিক সংঘাতের গণ্ডি ছাড়িয়ে এমন এক জটিল স্তরে পৌঁছেছে, যাকে আমরা 'হাইব্রিড যুদ্ধ' বলছি। এই নতুন রণক্ষেত্রে শত্রুপক্ষ সরাসরি সীমান্তে সৈন্য পাঠানোর আগে কূটনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, সাইবার আক্রমণ এবং প্রোপাগান্ডার মতো অদৃশ্য অস্ত্র ব্যবহার করে রাষ্ট্রের ভিত্তি উপড়ে ফেলার চেষ্টা করে। ফলে আধুনিক যুদ্ধের সংজ্ঞায় এখন আর শুধু ট্যাংকের মহড়া বা মিসাইল ব্যবস্থার আধুনিকায়নই প্রধান নয়, বরং প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে রাষ্ট্রের 'সফট পাওয়ার' বা মনস্তাত্ত্বিক সক্ষমতা।
পূর্বে একটি দেশের শক্তি বিচার করা হতো তার সামরিক বাজেট এবং পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যার ভিত্তিতে। কিন্তু আধুনিক হাইব্রিড যুদ্ধে বিলিয়ন ডলার খরচ করে কেনা স্টিলথ ফাইটার বা বিশাল নৌবহর ব্যর্থ হয় যদি রাষ্ট্রের ভেতর থেকে জনগণের আস্থা ভেঙে পড়ে। আজকের দুনিয়ায় যুদ্ধ শুরু হয় ফোনের স্ক্রিনে, সোশ্যাল মিডিয়ার পাতায় এবং মানুষের অন্তরে ধারণার জগতে। এই বাস্তবতায় ছোট অর্থনৈতিক শক্তির রাষ্ট্রগুলোর জন্য বড় অস্ত্রের চেয়েও বেশি প্রয়োজনীয় হলো 'ডিজিটাল বুদ্ধিমত্তা'। ড্রোনের মতো সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সাইবার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে একটি কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন যেকোনো দামি মিসাইল সিস্টেমের চেয়ে বেশি কার্যকরী ও টেকসই।
সীমিত সম্পদের রাষ্ট্রও যদি তার সামর্থ্যকে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনে ব্যয় করে, তবে সে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারে। আধুনিক যুদ্ধের ময়দানে এখন আর শুধু ভারী লোহালক্কড় কাজ করে না; কাজ করে ডেটা। রাষ্ট্রের আইটি সেক্টর, তরুণ উদ্ভাবক এবং ফ্রিল্যান্সাররা যদি সামরিক বাহিনীর সাথে আধা-সামরিক সাইবার গ্রিডে যুক্ত থাকে, তবে তারা যে কোনো পরাশক্তির লজিস্টিক সিস্টেম, যোগাযোগ লাইন ও ডেটাবেজ হ্যাক করে তাদের যুদ্ধক্ষমতা অকেজো করে দিতে পারে। এটিই হলো অ্যাসিম্যাট্রিক ওয়ারফেয়ার যেখানে সামান্য অর্থ বিনিয়োগ করেও বড় বড় পরাশক্তির অহংকার চূর্ণ করা সম্ভব।
আধুনিক রণকৌশল এখন কেবল 'মেশিন' বনাম 'মেশিন' নয়, এটি এখন 'বুদ্ধিমত্তা' বনাম 'বুদ্ধিমত্তা' তাই ছোট অর্থনীতির রাষ্ট্রের জন্য প্রথম কৌশল হলো ব্যয়বহুল সমরাস্ত্রের প্রতিযোগিতা থেকে বেরিয়ে আসা। কোটি টাকার মিসাইলের বিপরীতে কয়েক হাজার টাকার ড্রোন ও ‘সোয়ার্ম’ প্রযুক্তির ডিস্ট্রিবিউটেড নেটওয়ার্ক শত্রুর বিরুদ্ধে অনেক বেশি কার্যকর। এই বাস্তবতায় রাষ্ট্রের আইটি সেক্টর, ফ্রিল্যান্সার এবং তরুণ প্রযুক্তিবিদদের সামরিক বাহিনীর সাইবার ডিফেন্স উইংয়ের সাথে একটি আধা-সামরিক গ্রিডে যুক্ত করা প্রয়োজন। এতে শান্তিকালীন সময়ে রাষ্ট্রের ওপর কোনো বাড়তি অর্থনৈতিক চাপ পড়বে না, কিন্তু সংকটের মুহূর্তে এই বিশাল বেসামরিক সাইবার বাহিনী শত্রুর লজিস্টিক নেটওয়ার্ক, কমিউনিকেশন লাইন এবং ডেটাবেজ হ্যাক করে তাদের যুদ্ধক্ষমতা পুরোপুরি অবরুদ্ধ করে দিতে সক্ষম হবে।
ডিজিটাল দুনিয়ার শক্তিশালী ও অদৃশ্য অস্ত্র হলো ‘ইনফরমেশন ওয়ারফেয়ার’। শত্রুরা রাষ্ট্রের সীমান্তে আঘাত করার অনেক আগেই দেশের সাধারণ মানুষ এবং সামরিক বাহিনীর সদস্যদের ব্রেইনে প্রোপাগান্ডার ভাইরাস ছড়িয়ে দেয়; তারা চায় দেশ যেন ভেতর থেকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। এই অদৃশ্য আক্রমণ ঠেকাতে বাহিনীর অভ্যন্তরে এবং রাষ্ট্রের সকল পর্যায়ে নিয়মিত সঠিক সংবাদ, মনস্তাত্ত্বিক ব্রিফিং ও বস্তুনিষ্ঠ কনটেন্টের ব্যবস্থা রাখতে হবে। একজন সৈনিক কিংবা নাগরিকের অন্তরে যখন দেশপ্রেম, দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতির শেকড় এবং "আমরা কেন লড়ছি" তার কগনিটিভ বুনিয়াদ স্পষ্ট থাকবে, তখন শত্রুর বিলিয়ন ডলারের তথ্যযুদ্ধ তাদের মনে অবিশ্বাসের ফাটল ধরাতে পারবে না।
প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি মজবুত রাখার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জনগণ ও নেতৃত্বের মধ্যে গভীর আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করা। হাইব্রিড যুদ্ধের যুগে শত্রুপক্ষের প্রধান লক্ষ্য থাকে শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ‘দুর্নীতি’, ‘বিলাসিতা’ বা ‘স্বার্থপরতার’ ভুয়া প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে জনগণের অন্তরে ঘৃণা তৈরি করা। এই যুদ্ধ জয়ের একমাত্র অস্ত্র হলো প্রচারণামূলক স্বচ্ছতা। যখন নেতৃত্ব তাদের ব্যক্তিগত জীবনে বিলাসিতা ত্যাগ করে জনগণের দুঃখ-কষ্টের সাথে নিজেকে মিলিয়ে নেন এবং তাদের ব্যক্তিগত জীবনযাত্রার মান জনগণের সামনে স্বচ্ছ রাখেন, তখন তারা জনগণের মনে ‘অভিভাবক’ হিসেবে জায়গা করে নেন। এই বিশ্বাসই প্রোপাগান্ডার বিরুদ্ধে দুর্ভেদ্য ঢাল হিসেবে কাজ করে।
সামরিক বাহিনীতে মোটিভেশনের সর্বোচ্চ স্তর কেবল কোনো আদেশ বা নির্দেশনার মাধ্যমে অর্জিত হয় না; এটি জন্ম নেয় কমান্ডার এবং সেনাসদস্যের মধ্যকার এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক অভিন্নতার মধ্য দিয়ে। যখন সংকটের মুহূর্তে কমান্ডারেরা রণাঙ্গনের ধুলোবালি, কাদা-পানি আর প্রতিকূল পরিস্থিতির সরাসরি অংশীদার হন, তখনই বাহিনীর মোটিভেশন এক অভাবনীয় মাত্রায় পৌঁছে যায়। একেই আমরা বলছি 'শেয়ার্ড ফেট' বা অভিন্ন ভাগ্যের বন্ধন।
প্রথাগত ঔপনিবেশিক মডেলে অফিসার এবং সাধারণ সৈনিকের মধ্যে এক ধরনের অদৃশ্য দেয়াল বা বিভাজন রেখা বজায় রাখা হতো। মনে করা হতো, এই দূরত্বই শৃঙ্খলার মূল ভিত্তি। কিন্তু হাইব্রিড যুদ্ধের বাস্তবতায় এই পদ্ধতি সম্পূর্ণ অকার্যকর। যখন একজন কমান্ডার রণাঙ্গনের সংকটে নিজের সৈন্যদের মতোই একই সাধারণ খাবার, একই ক্লান্তি এবং একই জীবনের ঝুঁকির মুখে থাকেন, তখন তিনি কেবল একজন ‘ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা’ থাকেন না, তিনি হয়ে ওঠেন দলের ‘প্রাণসত্তা’। এই সাহচর্য সেনাদের মনে এক নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করে যেখানে তারা বুঝতে পারে যে, তাদের দুঃখ-কষ্টের সাক্ষী এবং অংশীদার স্বয়ং তাদের নেতৃত্ব। এটি যোদ্ধাদের অন্তরে এই বিশ্বাস গেঁথে দেয় যে, তারা কোনো একা পরিত্যক্ত যুদ্ধক্ষেত্রে নেই, বরং একজন অভিভাবকের ছায়াতলে লড়ছে।
মাও সেতুং-এর অমোঘ বাণী "জনগণ হলো সমুদ্রের পানি, আর বাহিনী হলো সেই পানির ভেতরের মাছ", ডিজিটাল যুগে এসে এই বানী আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে এর প্রকাশভঙ্গি কেবল দর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা এখন প্রযুক্তিনির্ভর শক্তিশালী কৌশল। তাই এই অটুট সংযোগকে কার্যকর ও টেকসই করার জন্য বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। প্রথমত, সামরিক বাহিনীর কর্মপরিধিকে কেবল সীমানা রক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বরং জাতীয় জীবনের মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। দেশের বৃহৎ প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, জটিল ডেটা ম্যানেজমেন্ট, জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলা কিংবা সামাজিক সেবামূলক প্রজেক্টে এবং বিশেষ করে শিক্ষা ব্যবস্থায় সামরিক বাহিনীকে ফ্রন্টলাইনে রাখার উদ্যোগ নিতে হবে। যখন ছাত্র-শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষ দেখবে যে রাষ্ট্রের সংকটপূর্ণ মুহূর্তে বাহিনীর সদস্যরা নিবেদিতপ্রাণ হয়ে তাদের পাশে রয়েছে, তখন কেবল প্রথাগত সম্মান নয়, বরং বাহিনীর প্রতি জনগণের এক নিবিড় ও সামষ্টিক আস্থার ভিত্তি স্থাপিত হবে। বাহিনীর এই 'সেবামূলক উপস্থিতি' জনগণের হৃদয়ে এক ধরনের পরম নির্ভরতার জন্ম দেয়, যা যেকোনো প্রোপাগান্ডার বিরুদ্ধে শক্তিশালী রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে।
দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল যুগে জনগণের হাতের স্মার্টফোনকেই একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্র হিসেবে রূপান্তর করা উচিত। এ লক্ষ্যে একটি সুরক্ষিত ও সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ডিজাইন করা যেতে পারে, যা নাগরিক এবং সামরিক বাহিনীর মধ্যে তথ্যের এক নিরবচ্ছিন্ন সেতু গড়ে দেবে। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে যেকোনো সাধারণ নাগরিক দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে সন্দেহজনক গতিবিধি, সাইবার থ্রেট কিংবা জাতীয় নিরাপত্তার পরিপন্থী তথ্য সরাসরি বাহিনীর সাইবার ডিফেন্স ইউনিটের কাছে তাৎক্ষণিকভাবে পৌঁছে দিতে পারবে। এতে করে পুরো রাষ্ট্র একটি ‘রিয়েল-টাইম ইন্টেলিজেন্স গ্রিড’-এর আওতায় চলে আসবে, যেখানে প্রতিটি সচেতন নাগরিক হয়ে উঠবেন দেশের এক একজন অতন্দ্র প্রহরী।
একটি রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে অপরাজেয় করতে হলে ঔপনিবেশিক মডেল থেকে পুরোপুরি বের হয়ে আসতে হবে। যখন নেতৃত্ব বিলাসিতা ও অহংকার বিসর্জন দেন, কমান্ডাররা সৈনিকের সাথে একই ভাগ্য ভাগ করে নেন এবং বাহিনী জনগণের সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দেয়, তখন পুরো রাষ্ট্র একটি দুর্গে পরিণত হয়। এই প্রচারণামূলক স্বচ্ছতার চূড়ান্ত ফলাফল হলো একটি অভেদ্য মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরক্ষা ব্যূহ। একটি দেশের অর্থনৈতিক শক্তি ছোট হতে পারে, কিন্তু তার "সামষ্টিক মনস্তাত্ত্বিক জিদ" যদি ইস্পাতকঠিন হয়, তবে সেই রাষ্ট্র অপরাজেয়। মনে রাখতে হবে, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আসল শক্তি লোহার কারখানায় বা বিদেশি ঋণে তৈরি হয় না; তা তৈরি হয় প্রযুক্তিগতভাবে সচেতন নাগরিকের দেশপ্রেম এবং বাহিনীর প্রতি জনগণের অবিচ্ছেদ্য বিশ্বাসের গভীরতম স্তরে। এই দুইয়ের মিলনই হলো একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে আধুনিক ও শক্তিশালী পারমাণবিক বোমা, যার সামনে যেকোনো পরাশক্তির প্রযুক্তি ও অহংকার হাঁটু গেঁড়ে বসতে বাধ্য।(পর্ব-১৪)
লেখক ও মাইন্ড-ইঞ্জিনিয়ারিং গবেষক