ঢাকা | বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঢাকার আভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থাঃ টেকসই ও পরিচ্ছন্ন নগরীর প্রত্যাশায়

author
কমডোর এস এম জসিমুজ্জামান

প্রকাশিত : ১৪ জুন, ২০২৬ সকাল ১০:৫৮
ad003
ঢাকা বিশ্বের ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম। শহরটিতে সঠিক পর্যবেক্ষণ ও পরিকল্পনার অভাবে ঢাকা দেশের অধিকাংশ সরকারি ও বেসরকারি কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ উন্নত কর্মসংস্থান ও মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর আশায় প্রতিনিয়ত এখানে আসছে, যা একদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখলেও অন্যদিকে তীব্র যানজট, বায়ুদূষণ, কর্ম ঘন্টা নষ্ট, ইউটিলিটি সেবা ব্যাহত, ফুটপাত দখল, এবং একটি অনিয়ন্ত্রিত ধীর-দ্রুত বহুমুখী গণপরিবহন ব্যবস্থার মতো গুরুতর সমস্যার সৃষ্টি করেছে। উল্লেখ্য, দ্রুতগামী পরিবহন ব্যবস্থার অধীনে মেট্রোরেল ও ফ্লাইওভারের মতো বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প চলমান থাকলেও সমন্বিত, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও টেকসই ব্যবস্থাপনার অভাবে পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে। ফলে নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবনযাপন দিন দিন আরও কঠিন হয়ে উঠছে।

বিশ্বের কতিপয় যানজটপূর্ণ এবং খারাপ বায়ুমানের শহরের চিত্র: টম টম ট্রাফিক ইনডেক্স এবং নাম্বিও অনুযায়ী, বিশ্বের অন্যতম বেশি যানজটপূর্ণ ৪টি শহর এবং তাদের বায়ুর গুনগতমান সূচক (একিউআই) নিচে উল্লেখ করা হলো:

শহর

১০ কিমি যেতে সময় (আনুমানিক)

বায়ু দূষণ সূচক

 

উৎপাদনশীলতা ও  অর্থনৈতিক ক্ষতি

 

ঢাকা, বাংলাদেশ

 

+৬০ মিনিট

একিউআই ১৫০+ (উচ্চ পিএম ২.৫, অস্বাস্থ্যকর মাত্রা)

 

শ্রম, উৎপাদনশীলতা ও জ্বালানি খরচের ব্যাপক ক্ষতি

নয়াদিল্লি, ভারত

+৫৭.৫ মিনিট (পিক সময়ে)

একিউআই ১৮০+ (খুবই অস্বাস্থ্যকর/গুরুতর দূষণ)

 

আনুমানিক বছরে ~$ ১৪.৭ বিলিয়ন অর্থনৈতিক ক্ষতি

ব্যাংকক, থাইল্যান্ড

+৫৩ মিনিট+

মাঝারি থেকে উচ্চ দূষণ (ট্রাফিক ও মৌসুমি প্রভাবজনিত)

 

 

আঞ্চলিক জিডিপি এর প্রায় ৮% ক্ষতি

করাচি, পাকিস্তান

৪৫ মিনিট+ (জ্যামে ২ ঘণ্টা পর্যন্ত)

একিউআই ১৯৩+ (উচ্চ পিএম ২.৫ অস্বাস্থ্যকর)

 

দৈনিক আনুমানিক দশ লক্ষাধিক রুপি সমমূল্যের অর্থনৈতিক ক্ষতি



মূল অবদানকারী কারণসমূহ। ঢাকা শহরের সামগ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থা তথা পরিচ্ছন্ন শহরে রূপান্তরে প্রধান সমস্যাগুলো নিম্নরূপ:

দুর্বল পরিবহন নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো।    দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণে ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থা বিশৃঙ্খল অবস্থায় রয়েছে। অযোগ্য ও পুরনো যানবাহন ব্যাপকভাবে চলাচল করছে, যা উচ্চমাত্রার বায়ুদূষণ সৃষ্টি করছে। পাশাপাশি অদক্ষ চালকরা (ভুয়া লাইসেন্সধারী) যত্রতত্র পার্কিংসহ ভাড়ার লড়াইয়ে লিপ্ত। এছাড়া সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সঠিক তদারকির অভাবে যানজট ও নিরাপত্তা ঝুঁকি দিনদিন আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বেসরকারী পরিবহন মালিকদের আধিপত্য। বেসরকারি পরিবহন মালিকদের আধিপত্য, ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থাকে পরিকল্পিতভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে্। এর ফলে অন্যায় ভাড়া নির্ধারণ, অসুস্থ প্রতিযোগীতা, নিয়ন্ত্রণহীন চলাচল, যত্রতত্র যাত্রী বহনসহ ধারাবাহিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে, আর নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা পরিবহন ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতে হিমশিম খাচ্ছে।

ট্রাফিক পুলিশের স্বল্পতা। পর্যাপ্ত জনবলের অভাবে ঢাকায় ট্রাফিক পুলিশ আইন বাস্তবায়ন, অবৈধ পার্কিং নিয়ন্ত্রণ এবং অবৈধ গণপরিবহন পর্যবেক্ষণে দিশেহারা হয়ে পড়ছে। একই সাথে ফুটপাত দখল, আইন অমান্যের প্রবণতা, রাস্তার উপর মিটিং/ সমাবেশ/ আন্দোলন ইত্যাদির কারনে পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। ফলশ্র্রুতিতে চালকরা ট্রাফিক আইন অমান্য করতে উৎসাহিত হচ্ছে এবং অনিরাপদ আচরণ করছে, যা যানজট বৃদ্ধি করছে।

বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীনতা। ঢাকার যানজট সমস্যা নিরসনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক গৃহীত উদ্যোগগুলো প্রসংশনীয় হলেও যথাযথ সমন্বয়ের অভাবে পদক্ষেপগুলো কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারছে না। ঢাকা মেট্রোরেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মতো প্রকল্পগুলো ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও যানজট ও পরিবহন ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলার কারনে এর সুফল দৃশ্যমান হচ্ছে না। উল্লেখ্য, বৈদ্যুতিক যানবাহনের ওপর বর্তমান সরকারের আমদানি শুল্ক ২০% করা একটি অত্যন্ত ইতিবাচক পদক্ষেপ, যা পরিবহন ব্যবস্থার উন্নতি ও দূষণমুক্ত নগরী গঠনে কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে বলে আশাবাদী। 

অনিয়ন্ত্রিত শহুরে অভিবাসন। ঢাকায় আয়-রোজগারের বিবিধ সুযোগ, কম খরচে ব্যবসা, চাকুরির     সহজলভ্যতা, উন্নত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য সুবিধার সহজ প্রাপ্যতার কারণে অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসনের ফলে প্রতিদিন যাতায়াতকারীর সংখ্যা বাড়ছে, যা সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা, চলাচল এবং সামগ্রিকভাবে ঢাকার জীবনযাত্রার ওপর অসহনীয় চাপ সৃষ্টি করছে।

ট্রাফিক আইন মানায় শীথিলতা। বর্তমানে অবৈধ পার্কিং, অসুস্থ প্রতিযোগিতা ও রাস্তা দখল, গণপরিবহনে নৈরাজ্য, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন এবং অবৈধ হকারদের দ্বারা ফুটপাত দখল ইত্যাদি মিলিয়ে ঢাকার সড়ক ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এটি একটি ধারাবাহিক প্রভাবের মতো, কেননা এসব সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী যানজট, পথচারীদের নিরাপত্তা হ্রাস এবং সড়কের অকার্যকর ব্যবহার সৃষ্টি করছে, যা যোগোযোগ ব্যবস্থাপনাকে কঠিন করে তুলছে।

অসমান গণপরিবহন। ঢাকা শহরে খুব ধীর গতির যানবাহন থেকে শুরু করে দ্রুতগতির যানবাহন একই সময়ে একই সড়কে চলাচল করছে, যা মারাত্মক যানজট ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। যানবাহনের ধরন অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ ও নির্দিষ্ট লেনের অভাবে মানুষ অধৈর্য হয়ে পড়ছে। ফলে বেপরোয়া চালনা এবং আইন অমান্য করার প্রবণতা বাড়ছে। বিশেষ করে মটর চালিত/ ইজি বাইকের আধিপত্য যেভাবে বেড়ে যাচ্ছে, তাতে ঢাকা শহরে দ্রুতই মহামারী আকার ধারন করতে পারে। উল্লেখ্য ঢাকা শহরের প্রধান সড়কে এসকল যানবাহনের অবাধ চলাচল দূর্ঘটনার ঝুঁকি বহুলাংশে বৃদ্ধি করছে।

অব্যবহৃত জলপথ। ঢাকা শহর নদীবেষ্টিত হলেও সঠিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার অভাবে জলপথ যথাযথভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। ব্যাপক পানি দূষণ, নির্বিচারে বর্জ্য ফেলা, দখলদারিত্ব এবং নদী, খাল ও জলাশয়ের দূর্বল রক্ষণাবেক্ষণের কারণে জলপথের অবস্থা মারাত্মকভাবে অবনতি হচ্ছে। পাশাপাশি আধুনিক জলপরিবহন অবকাঠামোর অভাবে জলপথগুলো কার্যকর পরিবহন মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারছে না।

ঢাকার যানজট নিরসন কেন গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের রাজধানী হিসেবে ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থাপনা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বিষয়। কেননা এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, জননিরাপত্তা, আরামদায়ক জনজীবন এবং শহরের বাসযোগ্যতার পূর্বশর্ত। দ্রুত নগরায়ণ, জনসংখ্যার অতিরিক্ত চাপ, আইনশৃঙ্খলার প্রতি জনসাধারণের উদাসীনতা এবং মেয়াদউত্তীর্ণ যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি বিদ্যমান অবকাঠামোকে অতিক্রম করে ফেলেছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) এর এসডিজি-১১ (টেকসই শহর ও সম্প্রদায়) এবং এসডিজি-১৩ (জলবায়ু কর্মসূচি) এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ঢাকা একটি পরিচ্ছন্ন ও সবুজ শহর হবার আকাঙ্ক্ষা রাখে।  এ লক্ষ্য অর্জনে বৈদ্যুতিক যানবাহনের আমদানি বৃদ্ধি, গণপরিবহন অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং অযোগ্য যানবাহন নিষিদ্ধকরণ অপরিহার্য, যা নির্গমন কমিয়ে জনস্বাস্থ্য ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করবে এবং একটি টেকসই ও বাসযোগ্য নগর উন্নয়ন সম্ভব করবে। এছাড়া, বিষয়টি দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যা বিদেশি বিনিয়োগকারী, পর্যটক এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের নিরুৎসাহিত করছে।

পার্সপেক্টিভ প্ল্যান: একটি সমন্বিত পদক্ষেপ।        বাংলাদেশের সড়ক ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রয়োজন, যেখানে স্পষ্ট অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সকল সংস্থার মধ্যে শক্তিশালী সমন্বয় নিশ্চিত, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং পরিবহন ব্যবস্থা ও শহুরে অভিবাসনের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। এ লক্ষ্যে নিম্ববর্ণিত বিষয়সমূহ বিবেচনা করা যেতে পারেঃ

রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত বাস সেবা চালুকরণ।   বেসরকারী গণপরিবহন অপারেটরকে সরকারি তদারকির আওতায় এনে জ্বালানি-নির্ভর বাসগুলোকে ধাপে ধাপে বৈদ্যুতিক বাসে প্রতিস্থাপন করে গণপরিবহন ব্যবস্থা আধুনিকীকরণ ও সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। সেই সাথে প্রধান রুটে সরকারি নিয়ন্ত্রিত বাস বহর চালু করা, কঠোর পরিচালনা, ডিজিটাল টিকিটিং ও রুট ব্যবস্থাপনা চালু করা। রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত এই বাস সেবা ঈদের মতো বড় উৎসবের সময় আন্তঃজেলা যাতায়াতেও একটি নির্ভরযোগ্য বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে, যা অনিয়ম হ্রাস করবে, দুর্ঘটনা কমাবে এবং সড়কে যানজট লাঘব করবে। রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত এ পরিবহন সেবা একদিকে ঢাকার আভ্যন্তরীন পরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবে এবং অন্যদিকে ঈদের সময় অতিরিক্ত গণপরিবহন চাহিদার সম্পূরক হিসেবে কাজ করবে।

পুরোনো ও মানহীন স্থানীয় তৈরী যানবাহন নিয়ন্ত্রনকরণ। সরকার ঢাকা শহরের অভ্যন্তরে ১৫-২০ বছরের (প্রকার ভেদে) বেশি পুরোনো পাবলিক যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ করার নীতি গ্রহণ করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, দিল্লি বায়ুদূষণ কমানো ও সড়ক নিরাপত্তা উন্নত করতে এ ধরনের নীতি ইতোমধ্যে তারা গ্রহণ করেছে। পুরোনো যানবাহন বেশি কার্বন নির্গমন ও ক্ষতিকর কণা উৎপন্ন করে, যানজট বাড়ায় এবং শহরের সামগ্রিক পরিবহন মানের অবনতি করে। এই নীতি বাস্তবায়ন করা হলে আধুনিক ও জ্বালানি-সাশ্রয়ী যানবাহনের ব্যবহার উৎসাহিত হবে, গণপরিবহনের মান উন্নত হবে এবং টেকসই নগর চলাচল ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। 

স্থল ও জল পরিবহনের সমন্বয়। যানজট কমানো এবং চলাচল সহজ করার জন্য বহুমাত্রিক (মাল্টিমডাল) পরিবহন নেটওয়ার্ক বেগবান করা যেতে পারে। নদী ও খালগুলো ড্রেজিং এবং সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জলপথ পুনরুদ্ধার করতে হবে। জলবাস ও যাত্রীবাহী ফেরি শহরের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোকে সংযুক্ত করতে পারে, এবং বাস, মেট্রো ও জলপথ পরিবহনকে একীভূত টার্মিনালের মাধ্যমে যুক্ত করলে যাতায়াত আরও নির্বিঘ্ন হবে বলে আশা করা যায়। 

বৈদ্যুতিক যানবাহন ক্রয়।    এসডিজি ২০৩০-এর লক্ষ্য অর্জনে ঢাকা শহরে বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি) ব্যবহারে বেসরকারি অপারেটরদের উৎসাহ প্রদান এবং শহরব্যাপী চার্জিং অবকাঠামো স্থাপন করা প্রয়োজন। ব্যাপকভাবে ইভি ব্যবহারের ফলে কার্বন নিঃসরণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে, বায়ুর মান উন্নত হবে এবং একটি পরিচ্ছন্ন, সবুজ ও টেকসই ঢাকা গড়ে উঠবে। প্রসঙ্গত, সরকার কর্তৃক ইতোমধ্যে বেশ কিছু বৈদ্যুতিক বাস ক্রয়ের বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে বলে জানা যায়। এই উদ্যোগ অত্যন্ত ইতিবাচক, যা পরিবহন ব্যবস্থায় প্রভুত উন্নতি সাধন করবে বলে আশা করা যায়। তবে এসকল বাসসহ বেসরকারী মালিকানাধীন বাসসমূহ একসাথে কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ না করা হলে প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হতে পারে। 

ট্রাফিক আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও সুশাসন নিশ্চিতকরণ। সড়ককে বাঁধামুক্ত রাখতে এবং ফুটপাত দখলসহ অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা দূর করতে রিয়েল-টাইম ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে সড়ক শৃঙ্খলা উন্নত, যানজট হ্রাস এবং জননিরাপত্তা উন্নতি করা সম্ভব, যা একই সাথে ট্রাফিক পুলিশের উপর চাপ কমাবে। সেই সাথে বিআরটিএকে ডিজিটাল সেবার আওতায় এনে উক্ত সংস্থার কার্যক্রমে নজরদারী বৃদ্ধি এবং সুশাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। প্রসঙ্গত ঢাকা শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় সম্প্রতি এআই প্রযু্ক্তি অন্তর্ভূক্ত করায় অনেক ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জিত হয়েছে, যা অত্যন্ত ইতিবাচক। সেই সাথে রিয়েল টাইম মনিটরিং ও রেসপন্স ব্যবস্থাপনা চালু করা হলে এ উদ্যোগ আরও গতিশীল হবে বলে দৃঢ়ভাবে আশাবাদী।

অসম পরিবহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ।    ঢাকা শহরের প্রধান সড়কসমূহে ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন যথা ব্যাটারি চালিত রিক্সা/ ইজি বাইক চলাচল নিষিদ্ধ/সীমিত করা প্রয়োজন। এসকল পরিবহন শুধুমাত্র এলাকা ভিত্তিক চলাচল অনুমোদন করে এর একটি সর্বোচ্চ সংখ্যা নির্ধারণ করতঃ সরকারী নিয়ন্ত্রনে আনা যেতে পারে। এ লক্ষ্যে এসকল যানবাহন তৈরীকারক যত্রতত্র গ্যারেজগুলো বন্ধ করে একটি মানসম্মত প্রতিষ্ঠান হতে উক্ত যানবাহন আহরন করা যেতে পারে। সেইসাথে ভ্যানগাড়ী, ঠেলাগাড়ী ইত্যাদি ‍দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চলাচলের অনুমোদন দেয়া যেতে পারে। একইসাথে অটোরিক্স/ ইজি বাইকগুলোকে দুটি কালার কোডের আওতায় এনে সকাল-বিকাল ও বিকাল-রাত দুটি ভাগে আলাদাভাবে চালনার  পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে। এর ফলে এসকল যানবাহনের চাপ অর্ধেক হয়ে যাবে। 

ঢাকা শহরে অবাধ প্রবেশ সীমিতকরণ। ঢাকায় প্রবেশকারী ভাসমান ও অস্থায়ী ব্যবসায়ী/ ব্যক্তিবর্গকে শহরে প্রবেশ নিরুৎসাহিত করতে এন্ট্রি পাস ব্যবস্থা চালু করা যেতে পাবে। এই ব্যবস্থার আওতায় যারা ফুটপাতে ব্যবসা, রিকশা/অটো চালানো বা ভিক্ষাবৃত্তি ইত্যাদির জন্য ঢাকায় আসে তাদের নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা প্রয়োজন। এটি বাস্তবায়ন করা কঠিন হলেও, টেকসই ঢাকায় জন্য জরুরি। ঢাকা শহরে প্রবেশের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু না করা হলে ঢাকার যানজট নিরসন অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হবে।

মৌসুমি পরিবহন সংকট ব্যবস্থাপনা।      বাংলাদেশে দুটি ঈদের সময় বিপুল সংখ্যক মানুষ একসঙ্গে ঢাকা ত্যাগ করে, যার ফলে দীর্ঘ দূরত্বের পরিবহনে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয় এবং দূর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়। এই সময়ে রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত উক্ত আভ্যন্তরিক বাস সেবা এই চাপ সামলাতে সহায়তা করতে পারে। এ ধরনের সমন্বিত ব্যবস্থা ভাড়ার নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করবে, দুর্ঘটনা কমাবে এবং উৎসবকালীন সময়ে একটি নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াত নিশ্চিত করবে।

ক্ষেত্রবিশেষে বিনামূল্যে গণপরিবহন ও অর্ধেক ভাড়া সুবিধা।   কেন্দ্রীভূত বাস ব্যবস্থার আওতায় নির্দিষ্ট ও বিশেষ দিনে বিনামূল্যে গণপরিবহন চালু করা যেতে পারে, যা যানজট কমাতে এবং জনগণকে গণপরিবহনে অভ্যস্ত করতে সহায়তা করবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য সারাবছর অর্ধেক ভাড়া সুবিধা প্রদান করলে ছাত্র-ছাত্রীরা ব্যক্তিগত যানবাহনের পরিবর্তে গণপরিবহনের ওপর নির্ভরশীল হবে।

অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিকেন্দ্রীকরণ। ঢাকায় জনসংখ্যার চাপ কমাতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যেমন গার্মেন্টস কারখানা, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প এবং অন্যান্য উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনে সরকারি ভর্তুকির মাধ্যমে ঢাকা হতে বিভিন্ন জেলায় স্থানান্তর করা যেতে পারে। এর ফলে ঢাকার জনসংখ্যা হ্রাস ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুষম বণ্টন নিশ্চিত হবে, যা ঢাকার উপর চাপ কমাবে বলে আশা করা যায়।

জনসচেতনতা ও আচরণগত পরিবর্তন।    ঢাকা শহরের জীবনমান উন্নয়নের জন্য ট্রাফিক আইন মানা, গণপরিবহন ব্যবহার এবং নাগরিক দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রচারণা চালানো জরুরি, যা একটি শৃঙ্খলাপূর্ণ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাশীল নগর সংস্কৃতি গড়ে তুলবে। এ লক্ষ্যে টিভি ও সোশ্যাল মিডিয়ায় সরকারী উদ্যোগে প্রচারনাসহ আইন অমান্যকারীদের শাস্তির বিষয়ে জনগণকে অবহিক করা যেতে পারে। সেই সাথে অটোরিক্স বা ইজিবাইক নির্ধারিত লেন/ রাস্তা থেকে সড়ক বা মহাসড়কে আগমন করলে উক্ত পরিবহনের চালকসহ যাত্রীকে একইভাবে দায়ী করে শাস্তির আওতায় আনা হবে বলে প্রচারনা করা যেতে পারে। 

ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা শুধুমাত্র একটি যাতায়াত সমস্যা নয়, এটি মানুষের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার চ্যালেঞ্জ। মেট্রোরেলের মতো প্রকল্পগুলো আশার আলো দেখালেও টেকসই সমাধানের জন্য একটি সমন্বিত, সুপরিকল্পিত ও একীভূত পদক্ষেপ প্রয়োজন, যেখানে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, অবকাঠামো উন্নয়ন, পরিবেশগত দায়বদ্ধতা এবং জনসাধারণের অংশগ্রহণ একসাথে কাজ করবে। ঢাকাকে একটি স্থিতিশীল ও বাসযোগ্য শহরে রূপান্তর করতে হলে একটি সঠিক, কৌশলগত ও কার্যকর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন, যা আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে ঢাকাকে একটি টেকসই ও কার্যকর নগরে রুপান্তরিত করবে বলে আশাবাদী। 


লেখক:
কমডোর এস এম জসিমুজ্জামান 
       (বাংলাদেশ নৌবাহিনী)

সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SHA.AZH

SHA.AZH

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT