আমরা কোনো একনায়ক চাই না, আমরা কোনো ফ্যাসিস্ট চাই না, আমরা কোনো রাজতন্ত্রও চাই না; আমরা মনে-প্রাণে চাই জনগণের সরকার। কিন্তু প্রশ্ন হলো, 'জনগণের সরকার' আসলে কী? একটি রাষ্ট্রে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মূল উপাদানগুলোই বা কী কী, যা ছাড়া গণতন্ত্র কখনোই টিকে থাকতে পারে না?
আমরা মনে করি, গণতন্ত্র মানে কেবল একটি রাজনৈতিক কাঠামো। কিন্তু আচরণ বিজ্ঞান ও সামাজিক মনস্তত্ত্ব বলছে, গণতন্ত্র আসলে একটি সামাজিক মনস্তাত্ত্বিক চুক্তি। এটি এমন এক ব্যবস্থা যা নাগরিকদের পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা এবং দায়িত্ববোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় এবং টিকে থাকে। একদল দায়িত্ববোধসম্পন্ন মানুষ যখন নিজেদের মধ্য থেকেই কয়েকজন অধিক দায়িত্ববোধসম্পন্ন মানুষকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেয়, তখনই প্রকৃত গণতন্ত্রের জন্ম হয়। তাই, দায়িত্ববোধসম্পন্ন আত্মসম্মানী জনগণ ছাড়া সত্যিকারের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়া সম্ভব নয়।
আমরা কি আসলেই রাষ্ট্রের 'মালিক পক্ষ'?
ধরুন, আমি আর আপনি একটি শতভাগ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নাগরিক। গণতন্ত্রের মূল কথা অনুযায়ী, এই দেশের প্রতিটি মানুষের মতো আমি আর আপনিও হলাম এ রাষ্ট্রের 'মালিক পক্ষ' আর রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের জন্য যারা নিয়োগ পেয়েছেন, তারা হলেন আমাদের 'সাহায্যকারী পক্ষ'। পুলিশ বা অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও এই সাহায্যকারী পক্ষেরই অংশ।
এবার একটু গভীরভাবে চিন্তা করে দেখুন, আমি আর আপনি হলাম দেশের মালিক পক্ষ, অথচ আমাদেরই বেতন ভুক্ত সেই সাহায্যকারী পক্ষ আপনাকে আর আমাকে রাষ্ট্রের নিয়ম ভঙ্গের দায়ে যদি ধরে নিয়ে বিচার করে, দণ্ড দেয়, তবে একজন মানুষ হিসেবে এর চেয়ে লজ্জাজনক আর কী হতে পারে? যে অপরাধের জন্য আমাদের দণ্ড দেওয়া হচ্ছে, আমি আর আপনি দেশের একজন মালিক হয়ে সেই অপরাধ করলাম কীভাবে? ভেবে দেখুন বাড়ির মালিককে দারোয়ান ধরে নিয়ে এল, তার বিচার করল তারপর দণ্ড দিল এবং সেটা বাড়ির মালিকের অপরাধের কারনেই ঘটল। এটা কি নির্লজ্জতা নয়? যারা অপরাধ করে কিংবা যাদের মধ্যে অপরাধ করার মানসিকতা থাকে, তাদের কি আদৌ দেশের মালিক পক্ষ হওয়ার যোগ্যতা আছে? এখানেই গণতন্ত্রের সংকট। নিরলজ্জতাকে বয়কট করতে না পারলে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। আত্মসম্মানি জনগণই গণতন্ত্রের মুল শক্তি। এর কারণ, একজন আত্মসম্মানী মানুষ কখনো নিয়ম অমান্য করার চিন্তা করতে পারেন না। একজন আত্মসম্মানী মানুষ কখনো কর্তব্যে অবহেলা করেন না এবং তিনি কখনো অন্যের অসুবিধার কারণ হন না। আত্মসম্মানি মানুষ কখনও ঘুষ বাণিজ্য কিংবা স্বজনপ্রীতি করতে পারেন না। যখন একটি সমাজের সিংহভাগ মানুষের মধ্যে আত্মসম্মানবোধ জাগ্রত হয়, কেবল তখনই সমাজ থেকে অন্যায়, অপরাধ, দুর্নীতি এবং বিভাজনের রাজনীতি দূর হয়ে প্রশান্তির পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে।
কীভাবে রক্ষা পাবে গণতন্ত্র?
জনগণের শত্রুরা সব সময় রাষ্ট্রকে দুর্বল করে রাখতে তৎপর। জনগণকে ধোঁকা দিয়ে, বোকা বানিয়ে গণতন্ত্রকে নানা কৌশলে পকেট বন্দি করে ব্যক্তিস্বার্থ আর গোষ্ঠীস্বার্থ কায়েম করতে যারা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত তাদের থাকে বিশেষ বিশেষ সব কৌশল, যার একটি হলো 'ফ্রেমিং ইফেক্ট'। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধ শক্তিরা জাতিকে বিভক্ত করতে প্রায়শই সমাজকে "আমরা বনাম ওরা" নামক একটি কৃত্রিম মনস্তাত্ত্বিক ফ্রেমে বন্দি করে ফেলে। তারা মিডিয়া স্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে এক ধরণের ভীতি ও হীনম্মন্যতা তৈরি করে রাষ্ট্রকে ছোট ছোট দলে ভাগ করে এমন ভাবে নিয়ন্ত্রণ করে যাতে জনগণ তাদের স্বাধীন চিন্তার রিমোট কন্ট্রোলটি সেই সব কুচক্রিদের হাতে তুলে দেয়।
কিন্তু যে সমাজের জনগণের আত্মসম্মানবোধ মজবুত, তেমন জনগণ এই ফাঁদে পা দেয় না। আত্মসম্মানবোধ মানুষকে নিজের যৌক্তিক অবস্থানের ওপর আস্থা রাখতে শেখায়। ফলে, যখনই কেউ কোনো ক্ষতিকর এজেন্ডা চাপিয়ে দিতে চায়, আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন নাগরিকরা তা অন্ধভাবে বিশ্বাস না করে পাল্টা প্রশ্ন করে ওঠে। এই প্রশ্ন করার এবং নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখার ক্ষমতাই গণতন্ত্রকে রক্ষা করে।
স্বার্থান্বেষী মহল প্রায়শই নাগরিকদের আবেগ, রাগ এবং ক্ষোভকে পুঁজি করে নিজেদের ফায়দা লোটে। কিন্তু আত্মসম্মান বোধসম্পন্ন একজন নাগরিক নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে জানেন। কেউ তাকে উস্কানি দিলে সে তাৎক্ষণিক সস্তা রিঅ্যাকশন দেখায় না; সে শান্ত থাকে এবং যুক্তিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। যখন ভোটাররা আবেগের বদলে শান্ত মাথায় যুক্তি দিয়ে দেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো বিচার করার সংস্কৃতি গড়ে তোলে, তখন উস্কানিমূলক সস্তা প্রচার ব্যর্থ হয়ে পড়ে এবং গণতন্ত্র সুরক্ষিত হয়।
মনোবিজ্ঞানী লিওন ফেস্টিঙ্গার তাঁর 'কগনিটিভ ডিসোনেন্স' তত্ত্বে দেখিয়েছেন, যখন কোনো প্রিয় ইনফ্লুয়েন্সার, নেতা বা তারকা কোনো অনৈতিক বা মূল্যবোধ পরিপন্থী কাজ করে, তখন নাগরিকদের অন্তরে এক প্রকার মানসিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। কিন্তু দুর্বল আত্মসম্মান বোধসম্পন্ন মানুষ সেই দ্বন্দ্ব কে উপেক্ষা করে; তারা নিজের বা প্রিয় তারকার দোষকে উপেক্ষা করে; ফলে তারা অন্ধ আনুগত্যের কাছে আত্মসমর্পণ করে সেই অনৈতিক কাজটির পক্ষে সাফাই গাওয়া শুরু করে। বিপরীতপক্ষে, যার আত্মসম্মানবোধ মজবুত, তিনি নিজের নৈতিক আদর্শকে কোনো ব্যক্তি স্বার্থে বিসর্জন দেন না। তিনি বুঝতে পারেন যে, কোনো ভুলকে সমর্থন করা মানে নিজেকেই অপমানিত করা; তাই এমন ব্যক্তির মাঝে সত্যকে সত্য এবং ভুলকে ভুল নৈতিক সাহস মজবুত হতে থাকে। ন্যায়ের প্রতি সমর্থন করার এই স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নাগরিক সত্তাই হলো কার্যকর গণতন্ত্রের প্রাণ।
নিশ্চিতভাবেই গণতন্ত্র হল জনগণের অধিকার, কিন্তু সেই অধিকারের চেয়েও এটি রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্বশীলতার সংগঠন। আচরণ বিজ্ঞান বলে, উচ্চ আত্মসম্মানবোধ জনগণের মধ্যে এক প্রকার অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ শক্তি তৈরি করে। একজন আত্মসম্মানী ব্যক্তি বিশ্বাস করেন যে, সমাজের ভালো-মন্দের জন্য তিনি নিজেও দায়ী; তাই এমন মানুষ কেবল সরকারের ওপর দোষ চাপিয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকেন না। এমন নাগরিকরা নিজেকে সমাজের একজন গুরুত্বপূর্ণ অংশ বা 'স্টেকহোল্ডার' বলে মনে করেন। ফলে তারা দুর্নীতি প্রতিরোধী হন, আইন মেনে চলেন এবং ইনসাফপূর্ণ সমাজ গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। এমন নাগরিকগণ নিজেদের অধিকার সম্পর্কে যেমন সচেতন থাকেন, তেমনি অন্যের অধিকার ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রতিও সমান শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেন। অন্যের মতকে শ্রদ্ধা করার এই আচরণগত সংস্কৃতিই গণতান্ত্রিক সহনশীলতার মূল ভিত্তি।
অন্যদিকে রাষ্ট্রে যদি নাগরিকগণ আত্মসম্মানের অভাব বা হীনম্মন্যতায় ভোগেন, তখনই সেখানে 'ডমিনেন্স-সাবমিশন' বা প্রভু-দাস মানসিকতার জন্ম হয়। মানুষ তখন নিজেরা দায়িত্ব না নিয়ে একজন 'ত্রাণকর্তা' বা এমন একজন অলৌকিক শক্তিশালী নেতার সন্ধান করে, যে এসে জাদুর মতো তাদের সব সমস্যার সমাধান করে দেবে। এই মানসিকতা থেকেই একনায়কতন্ত্রের জন্ম হয়। পজিটিভ মাইন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং এর কৌশলে মানসিক রূপান্তরের মাধ্যমে জনগণের মন থেকে এই হীনম্মন্যতা দূর করে তাকে আত্মসম্মানি মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা যায়। যখন একজন নাগরিক অনুভব করেন যে তাঁর নিজের একটি অনন্য ব্যক্তিত্ব আছে, তাঁর চিন্তার মূল্য আছে, তখন তিনি আর কোনো 'ত্রাণকর্তা'র মোহে অন্ধ হন না। তিনি তখন একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার মানসিকতা অর্জন করেন। ব্যক্তির আত্মসম্মানবোধ তাকে শেখায় যে, শাসনব্যবস্থার মূল চাবিকাঠি জনগণের মানসিকতা, সচেতনতা আর দায়িত্ববোধের মাঝেই যুক্ত থাকে। তিনি বুঝতে পারেন, গণতন্ত্রের বাহ্যিক কাঠামো হলো সংসদ, নির্বাচন ও সংবিধান; কিন্তু এর আসল চালিকাশক্তি হলো মানুষের দৈনন্দিন আচরণ। কিন্তু আত্মসম্মানবোধ কোনো কাল্পনিক বা বিমূর্ত ধারণা নয়; এটি একটি দেশের নাগরিকদের সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা।
যখন একটি দেশের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থা, সামাজিক শিক্ষা ব্যবস্থা, পরিবার এবং সামাজিক পরিবেশ এমন ভাবে রক্ষা করা হয় যেন তা প্রজন্মের অন্তরে আত্মসম্মানবোধকে মজবুত রাখে, তখনই তারা মানসিকভাবে শক্তিশালী ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠে। এমন জনগণ সমাজ বা রাষ্ট্রের যেকোনো সংকটে আবেগ দিয়ে নয়, বরং ব্যক্তিত্ব, যুক্তি এবং প্রশ্ন করার মানসিকতা দিয়ে পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। নাগরিকদের এই আত্মমর্যাদা এবং নৈতিক দৃঢ়তাই স্বৈরতন্ত্রের আক্রমণ থেকে গণতন্ত্রকে রক্ষার অজেয় রক্ষাকবচ।
(মাইন্ড-ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের গবেষক)