আজ ১৫ জুন, নোয়াখালীর শ্রীপুর-সোনাপুর গণহত্যা দিবস। ১৯৭ সালের এইদিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী
নির্বিচারে গুলি করে শ্রীপুর, সোনাপুর, মধ্যম করিমপুরে অর্ধশতাধিক মানুষকে হত্যা করে। গান পাউডার দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হয় অসংখ্য বাড়িঘর, দোকানপাট, গাছপালা।
ভয়াল সেই স্মৃতি বুকে নিয়ে বেঁচে আছেন স্বজনহারা অনেকে। যাদের মধ্যে কারো কারো শরীরে এখনো রয়ে গেছে হানাদার বাহিনীর গুলির ক্ষত। কারো চোখের সামনে এখনো ভেসে উঠে সেইদিন বাড়িঘর ছেড়ে প্রাণভয়ে মাইলের পর মাইল পথ দৌঁড়ে পালানোর স্মৃতি। তবে, স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও নিহতদের সঠিক তালিকা এবং শহিদ পরিবারগুলোকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সহায়তা করা হয়নি বলে অভিযোগ স্বজন হারানো পরিবারগুলোর।
শ্রীপুরের বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক ইব্রাহিম খলিল(৭৫)। ১৫ জুন বিকাল ৩টার দিকে পাক আর্মি গ্রামে প্রবেশ করে তাঁর সহোদর দুই ভাই ও চাচাসহ পাঁচজনকে ঘর থেকে বাইরে এনে করে গুলি করে। ঘটনাস্থলে ইব্রাহিম খলিলের চাচা মারা যান। পাশে গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে ছিলেন তিনি। হানাদার বাহিনী চলে যাওয়ার পর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় তাদের দুই ভাইকে। পরে রাতে হাসপাতালে মারা যান তার বড় ভাই।
ইব্রাহিম খলিল বলেন, ‘আমাকে বাড়ি থেকে টেনে এনেছে। ঘরে ছিলাম আমি। আমার আরো দুই ভাই আর আমার চাচা সহ পাঁজজন ছিলাম আমরা। ঘরের সামনে থেকে গুলি করা শুরু করে। প্রথম গুলি আমার গায়ে লাগে। এর পরে আরো গুলি হয়েছে। আমার চাচা মারা গেছেন এখানে। তারা চলে গেলে আমি এবং আমার বড় ভাইকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। আমার বড় ভাই ওইদিন রাতেই হাসপাতালে মারা যান।’
সেদিনের চার বছরের শিশু মোঃ জহির উদ্দীনের স্মৃতিতে আজো অমলিন সেইসব ঘটনা। অন্য চার ভাই বোনদের সাথে টানা তিন থেকে সাড়ে তিন কিলোমিটার পথ দৌঁড়ে এক আত্মীয়ের বাড়িতে উঠেন তারা। তিনি বলেন, ওইদিন চার বছর এক মাস সাতদিন আমার বয়স। আমার দাদা তখন হিন্দু এক লোকের রেখে যাওয়া কিছু ঘটিবাটি তাকে ফেরত দিতেছিলেন। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতেছি। এমন সময় পাকিস্থানি আর্মি আহম্মদিয়া স্কুলের মাঠে এসে আমাদের প্রতিবেশী তোতা চাচা এবং উনাদের গাড়ির হেলপার ইয়াছিনকে হত্যা করে। পরে স্কুলের পেছনে তাদের বাড়িতে ডুকে উনার বড় ভাই আলী হোসেন, আলী করিমকে হত্যা করে এবং অন্যান্য বাড়িগুলোতে ডুকে। আমার একমাত্র মামা আমাদের ভাই বোন তিনজনকে বাড়ি থেকে একশ গজ এগিয়ে দেন। আসার পথে উনাকে ওখানেই গুলি করে হত্যা করা হয়। আমার যে দাদা ঘটিবাটি নামিয়ে দিচ্ছিলেন, ওই দাদাকে গুলি করছে। কিন্তু উনি গুলিবিদ্ধ হলেও মারা যাননি। আমরা তখন মারার বাড়ির দিকে প্রায় চার সাড়ে চার কিলোমিটার পথ দৌঁড়াতেছি। তিন/সাড়ে তিন কলোমিটার দৌঁড়ে মামার শ্বশুর বাড়ির দিকে গেলে মামিকে ওখানে দেখি। মামি তখন আমাদের বাড়ির দিকে আগুনের লেলিহান শিখা দেখালে আমরা পেছেনে ফিরি। এর আগে আমরা কেবল সামনের দিকে দৌঁড়াতেছি।
তবে, সেদিনের শহীদদের সঠিক তালিকা না করার কারণে শহীদ পরিবারগুলোর মধ্যে অনেকেই মানবেতর জীবন যাপন করছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, ১৫ জুন যেসব লোক মারা যান। তারমধ্যে ৫/৬টি পরিবার তারা অন্য এলাকায় যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন বলে সনদ নিয়ে নেন এবং ওরা ভাতা পান। বাকিরা যারা শহীদ হয়েছেন তাদের পরিবার ভাতা পান না। তারা বছরে একবার স্বাধীনতা দিবসে এক দুইশ টাকার পুরস্কার পেয়ে থাকেন। ওই পরিবারগুলোর মানবেতর জীবন যাপন করতেছে। পরিবারের করমক্ষম ব্যক্তি যখন মারা যায় তখন সেই পরিবারের কি হাল হতে পারে আপনারা জানেন।’
সেদিন জাহেদ হোসেনের তিন ভাই আলী হোসেন, আলী করিম ও আলী হায়দারকে গুলি করে হত্যা করে হানাদার বাহিনী। তিনি বলেন, স্থানীয় এক বিহারী স্টেনোগ্রাফারের কাছ থেকে শ্রীপুরে মুক্তিযোদ্ধারা এসেছে এমন খবর পেয়ে হানাদার বাহিনী চারদিকে ঘিরে ফেলে পরিকল্পিত এ হত্যাযজ্ঞ চালায়। স্থানীয় চিহ্নিত কিছু ব্যক্তি তাদেরকে সহায়তা করে বলে জানান জাহেদ হোসেন।
সেদিনের ৭ বছরের শিশু হেলাল উদ্দিনের বাবাকে বাড়ির বাইরে এবং বাড়িতে এক দাদাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। প্রাণভয়ে তারা বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে অনত্র আশ্রয় নেন। পরদিন সকালে বাড়ি ফিরে বাবার লাশ দেখেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘হানাদার বাহিনী যখন আমাদের গ্রামে আক্রমণ করে তখন আমার বয়স ৭ বছর। আমি অনেকটা দেখেছি তারা যে এসছে। আমার এলাকার অনেক মানুষ মেরে ফেলেছে। মুক্তিযোদ্ধা দেখেও মেরেছে, অমুক্তিযোদ্ধা দেখেও মেরেছে। গান হাউডার দিয়ে বাড়িঘর, অনেক গাছ জ্বালিয়ে ফেলেছে। মাঠের মধ্যে কাজ করতেছে ট্রাকের ড্রােইভার, হেলপার ওদেরকেও মেরে ফেলেছে। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যাদের নাম শুনেছে তাদেরকেও মেরেছে, যারা মুক্তিযোদ্ধার সহকারী তাদেরকেও মেছে। সোনাপুর বাজারে আগুন দিয়েছে। ওদেরকে সহযোগীতা করেছে বাঙালী রাজাকারা। আমাদের বাড়িতে এসে আমার এক দাদা হয় সম্পর্ ওনাকে মেরেছে। তখন আমরা জীবন বাঁচাতে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে এক জায়গায় আশ্রয় নিয়েছি। কিছিুক্ষণ পরে শুনলাম যে আমার বাবাকে মেরে ফেলেছে। তখনতো আমরা শোকাহত কি করবো। এরপরে বলতেছে যে, যাদেরকে এলাকাতে বাইরে ওদের লাশ ক্যাম্পে নিয়ে যাবে। এরপরে সকালে বাবার লাশ নিয়ে আসছে। সরারি গোরস্থানে লাশ দাফন করা হয়।’
১৫ জুন শ্রীপুরে অন্য্যদের সাথে মোশাররফ হোসেন বাবলুর বাবাকেও হত্যা করা হয়েছিল। অসহায় পরিবারটি এখন চরম কষ্টে দিনযাপন করছে। তিনি বলেন, আমার আব্বু মারা যাওয়ার পর থেকে আমরা, আমি তখন ছোট ছিলাম আমার আম্মু সরকার থেকে দুই হাজার টাকা পেয়েছেন। এরপর ২০ কেজি চাল পেয়েছে। এরপর আমরা প্রায় ৫৫ বছর কোন কিছু পায়নি। কিছুদিন আগে আমরা মুক্তিযোদ্ধা অফিস থেকে উপহার পেয়েছি।
এ বিষয়ে নোয়াখালী সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার হোমায়রা ইসলাম বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধ বাঙালী জাতির অধিাকার আদায়ের একটা লড়াই ছিল। এ যুদ্ধে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে যাদেরই অবদান আছে, রাষ্ট্র হিসেবে প্রত্যেকটা মানুষেরই সেই সময়ের স্বীকৃতিটা প্রয়োজন। এখানে যদি প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কোন পরিবার থেকে থাকে যাদের আসলে পর্যাপ্ত স্বীকৃতি পাওয়া প্রয়োজন হবে, সেইসব শহীদ পরিবারের বিষয়ে উধ্বর্তন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা অবগত করা হবে এবং প্রশাসনের তরফ থেকে কিছু করার থাকলে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে।
স্মৃতির অতলে হারিয়ে যাওয়ার আগেই শ্রীপুর-সোনাপুরে গণহত্যার সঠিক ইতিহাস লিপিবদ্ধ করার পাশাপাশি শহীদ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে রাষ্ট্রীয় সহায়তার দাবি জানিয়েছন স্থানীয় বাসিন্দারা।