ইতিহাসের এক মহা সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে মধ্যপ্রাচ্য। যখন গাজা থেকে শুরু করে লেবাননের আকাশ পর্যন্ত আগুনের ফুলকি জ্বলছে, যখন ফিলিস্তিনি শিশুদের আর্তনাদ এমনকি নন-মুসলিম বিশ্ববিবেকের দেয়ালেও ধাক্কা দিচ্ছে, তখন কোটি কোটি মুসলিমের হৃদয়ে একটি প্রশ্নই বারবার অনুরণিত হচ্ছে " মুসলিম বিশ্বের অভিভাবক ঠিক কারা? আর তাদের জন্য সম্মান ঠিক কতটুকু অবশিষ্ট থাকা উচিত?" সাথে সাথে আরও সন্দেহ দানা বাঁধে, যারা আজ অধিকাংশ আরব দেশগুলোর নেত্রিত্বে আছেন তারা কি সত্যিই মুসলিম? অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে জায়ানিস্ট আগ্রাসন চলছে, এবং এই দীর্ঘ সময়ে আরব দেশগুলোর নজিরবিহীন উদাসীনতা আজ কেবল রাজনৈতিক আলোচনার বিষয় নয়, বরং এটি মুসলিম বিশ্বের বিশ্বাস ও আস্থার এক চরম সংকটের স্থান।
নৈতিকতা, গণতন্ত্র, মানবাধিকার এই শব্দগুলির অর্থ কি কেবল সুবিধা নেওয়ার হাতিয়ার, নাকি দুর্বলের উপর জুলুম করার অজুহাত? গত পাঁচ দশক ধরে ফিলিস্তিনিরা তাদের ভিটেমাটি হারানোর যে করুণ দলিল রচনা করছে, তা মানবসভ্যতার জন্য এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। ১৯৪৮ থেকে ২০২৬, এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় জায়ানিস্ট শক্তির নির্মমতা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ফিলিস্তিনের প্রতিটি অলিগলি লাশের মিছিল আর ধ্বংসস্তূপের সাক্ষী। অথচ, এই একই জাতির মানুষ, একই ভূখণ্ডে বাস করা আরব রাষ্ট্রগুলোর ভূমিকা এতদিন বড্ড অদ্ভুত দেখা গেছে আর এখন তারা এতদিনের গোপন কূটনৈতিক অবস্থান থেকে বেড়িয়ে স্পষ্টভাবেই জায়ানিস্টদের স্বার্থেই ব্যবহার হচ্ছে। প্রশ্ন জাগে, যে ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মের অটুট বন্ধনে আরব বিশ্ব একে অপরের সাথে যুক্ত, সেই বন্ধন কি সুলতান আর কিং হওয়ার বাসনা, রাজা আর মহারাজা থাকার আকাঙ্ক্ষা, পেট্রোডলার আর ভূ-রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার নিচে চাপা পড়ে গেছে? জানতে ইচ্ছে করে, এটাই কি ইসলামের শিক্ষা?
মক্কা ও মদিনার খাদেম হওয়ায় সারা বিশ্বের মুসলিম অন্তরে আরব শাসকদের জন্য যে এক সহজাত সম্মান ও ভালোবাসার স্থান ছিল, তা এখন এক গভীর সন্দেহের গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষ যখন দেখে, গাজার অবরুদ্ধ মানুষগুলো খাবারের অভাবে ধুঁকে মরছে, আর তাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো আন্তর্জাতিক আইনের দোহাই আর পরাশক্তির তোষামদ করতে ব্যস্ত, তখন তাদের বিশ্বাসের ভিত নড়ে ওঠে। এই উদাসীনতা কি কেবলই কৌশল, নাকি এটি আত্মপরিচয় ও আত্মমর্যাদার এক চূড়ান্ত অবক্ষয়?
পাঁচ দশক ধরে জায়ানিস্টরা যখন ফিলিস্তিনের মানচিত্র মুছে ফেলার নীল নকশা বাস্তবায়িত করছে, তখন আরব দেশগুলোর অধিকাংশ উদ্যোগই ছিল কেবল লোক দেখানো কিছু বিবৃতি। তাদের এই তথাকথিত 'শান্তি আলোচনা' কি আসলেই ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষায় কার্যকর হয়েছে? না, বরং প্রতিটি চুক্তির পর ফিলিস্তিনিদের ভূখণ্ড আরও ছোট হয়েছে, বন্দিশিবির আরও বিস্তৃত হয়েছে। জায়ানিস্টদের নির্মমতার প্রধান কারনই হলো আরব দেশগুলোর বিভক্তি ও নির্লিপ্ততা। তারা জানে, মধ্যপ্রাচ্যের তথাকথিত অভিভাবকদের মেরুদণ্ড মোটেই মজবুত নয়, তাই তারা রাজতন্ত্র টিকিয়ে রাখার লোভ দেখিয়ে আর শিয়া সুন্নির মানসিক বিভেদ সৃষ্টি করে বিনা বাধায় তাদের ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যেতে পারছে।
আরব রাষ্ট্রগুলোর এই নির্বিকার অবস্থানের পেছনে রয়েছে ক্ষমতার লিপ্সা ও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এক তীব্র ভীতি। জ্ঞানের দুর্বলতায় তারা এতোটাই অবুঝ শিশু যে তারা বুঝতেও পারছে না কীভাবে পুরো মুসলিম বিশ্বকে ম্যাকেয়াভেলিয়ান নীতির ‘ডিভাইড এন্ড রুল’ দিয়ে ঐ জায়ানিস্টরা শিয়া সুন্নিতে বিভক্ত করে দাপট চালাচ্ছে। তারা ভুলে গেছে যে, একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার অস্ত্রাগারে নয়, বরং তার জনগণের হৃদয়ে এবং উম্মাহর ঐক্যে। যদি ফিলিস্তিনিদের প্রতি এই চরম উদাসীনতা আর অন্যায় চলতেই থাকে, তবে নিশ্চিত ভবিষ্যতে আরব রাষ্ট্রগুলোর ধর্মপ্রাণ জনগণ নিশ্চয়ই আর মুখ বুজে সহ্য করবে না। আর তেমন হলে রাজতন্ত্র আর সুলতানি ব্যবস্থা কি অক্ষত থাকবে? জায়ানিস্ট আর তাদের দোসররা কি পারবে আরব রাজতন্ত্র বাঁচিয়ে রাখতে?
সার দুনিয়া জুরে যারা গণতন্ত্রের কথা প্রচার করেন, লিবিয়া, সিরিয়া আর ইরাকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য যারা কন্নায় মরু ভূমি ভিজিয়েছেন এখন তারা ঠিক কোথায়? ফিলিস্তিনের গণতান্ত্রিক অধিকার ও মানবিক মর্যাদার আওয়াজ যখনই উঠেছে, তখনই দেখা গেছে তাদের এক অদ্ভুত দ্বিমুখী আচরণ।
আরব দেশগুলোর এই আচরণ বিশ্বব্যাপী মুসলিম হৃদয়ে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক সংকট তৈরি করেছে। মুসলিমগণ আজ স্পষ্ট বুঝতে পারছেন যে, আরব বিশ্বের অভিভাবকগণ আসলে নিজেদের সিংহাসন রক্ষায় এতটাই ব্যস্ত যে, ইসলামের মর্যাদা কিংবা ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতার অধিকার তাদের কাছে গৌণ। এই উদাসীনতা কি মুসলিম অন্তরে আরব নেতাদের জন্য সম্মানের শেষ বিন্দুটুকুও মুছে দিচ্ছে না?
সম্মান সৃষ্টি হয়, ঘৃণাও সৃষ্টি হয়। আজ মধ্যপ্রাচ্যের তরুণ প্রজন্ম যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের ওপর চলা নির্যাতনের লাইভ ভিডিও দেখছেন, তখন তাদের হৃদয়ে নিশ্চয়ই নেতাদের প্রতি ঘৃণা আর গভীর শূন্যতা তৈরি হচ্ছে। তারা দেখছেন, মক্কা ও মদিনার custodian-রা আজ ফিলিস্তিনিদের দুর্দিনে কেবল দর্শকের ভূমিকায়। এই বৈপরীত্য নিশ্চিতভাবেই আরব মুসলিম হৃদয়ে এক বিশাল আস্থার সংকট তৈরি করেছে।
ফিলিস্তিনিদের প্রতি এই বিমাতাসুলভ আচরণ কেবল একটি ভূ-রাজনৈতিক ভুল নয়, বরং এটি ধর্মীয় ও নৈতিক এক চূড়ান্ত বিচ্যুতি। মুসলিম উম্মাহ আজ এক অভিভাবকহীন সময় অতিক্রম করছে। যারা আজ অভিভাবকের আসনে বসে আছেন বলে দাবী করছেন, তাদের প্রতি যদি সম্মানের শেষটুকুও হারিয়ে যায়, তবে তা হবে বর্তমান শতাব্দীতে আরব বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়। কারণ, একবার যদি জনগণের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা হারিয়ে যায়, তবে কোনো বিশাল অট্টালিকা বা আধুনিক অস্ত্র দিয়ে তা আর পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়।
সময় শেষ হয়ে গেছে? হয়তো না। ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। আরব অভিভাবকদের সামনে এখনও সুযোগ আছে তাদের নৈতিক সাহসিকতা প্রদর্শন করার। তাদের বুঝতে হবে যে, ফিলিস্তিনের মুক্তি কেবল ফিলিস্তিনিদের সমস্যা নয়; এটি পুরো মুসলিম বিশ্বের মর্যাদার লড়াই। তাই, আরব দেশগুলোকে জায়ানিস্ট আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কেবল মৌখিক নয়, কার্যকর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে। শাসকদের তাদের জনগণের আবেগের সাথে মিশে যেতে হবে। ফিলিস্তিনিদের জন্য রাস্তায় নামা সাধারণ মানুষ যখন দেখবে তাদের শাসকরাও তাদের সাথে একাত্ম, তখনই সম্মান ফিরবে।
মুসলিম অন্তরে আরব অভিভাবকদের জন্য সম্মান অবশিষ্ট রাখা কিংবা হারিয়ে ফেলার বিষয়টি সম্পূর্ণ তাদের বর্তমান কর্মকাণ্ডের ওপর নির্ভরশীল। সম্মান কেনা যায় না, সম্মান অর্জন করতে হয়। ফিলিস্তিনিদের রক্তাক্ত লাশের ওপর দিয়ে যে শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে, তা শেষ পর্যন্ত বালুর বাঁধের মতোই ধসে পড়বে। আমাদের হৃদয়ের আকাঙ্ক্ষা, অভিভাবকরা জেগে উঠুক। আমরা চাই, গাজার মায়েদের আর্তনাদ আরব নেতাদের বিলাসবহুল প্রাসাদে প্রতিধ্বনিত হোক। যদি তারা আজও নিবৃত থাকে, তবে ইতিহাসের পাতায় তাদের নাম কীভাবে লেখা হবে তা ইতিহাসই বলবে। আর যদি তারা ঘুরে দাঁড়ায়, তবে কোটি মুসলিমের অন্তরে তাদের জন্য সম্মান নতুন করে জন্ম নেবে। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিচারক হলো সময়, আর সেই সময় এখন আরব অভিভাবকদের সামনে এক কঠিন পরীক্ষা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ফিলিস্তিন কোনো সাধারণ দেশ নয়, এটি মুসলিম উম্মাহর হৃদপিণ্ড; আর এই হৃদপিণ্ডকে রক্তাক্ত রেখে কেউ দীর্ঘকাল মুসলিম অভিভাবকত্বের দাবি করতে পারে না।
লেখক ও মাইন্ড-ইঞ্জিনিয়ারিং গবেষক