সমাপ্তির পথে প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্প (খউউচ)। আর এর সাথেই আগামী ৩০ জুন থেকে একযোগে চাকরি হারাতে যাচ্ছেন ৪৬৫ জন প্রাণিসম্পদ সম্প্রসারণ কর্মকর্তা (খঊঙ) এবং ৯৩০ জন লাইভস্টক ফিল্ড অ্যাসিস্ট্যান্ট (খঋঅ)। সব মিলিয়ে প্রায় ১,৪০০ জনের এই বিশাল দক্ষ জনবল হঠাৎ বেকার হয়ে পড়ার আশঙ্কায় পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় এসকল কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) সকালে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী আমিন উর রশীদ সাভারের এলডিডিপি প্রকল্পের সমাপনী অনুষ্ঠান ও ডেইরি উন্নয়ন বোর্ড এর ভবন উদ্বোধনে আসবেন, বিষয়টি জানতে পেরে বাংলাদেশ ডেইরি ডেভেলপমেন্ট বোর্ড ভবনের সামনে ভুক্তভোগী কর্মকর্তা কর্মচারীরা মানববন্ধন করেন। মানববন্ধনে এলডিডিপি প্রকল্পের বিভিন্ন জেলায় কাজ করা প্রায় এক হাজার বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় মন্ত্রী এসকল কর্মকর্তা কর্মচারীদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেন। পরবর্তী প্রজেক্টে তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চাকরি দেয়ার কথাও জানান। এর আগে সকালে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহিষ গবেষণা ও উন্নয়ন প্রকল্পের সমাপনী অনুষ্ঠানে যোগ দেন এবং দুপুরে সাভারে বাংলাদেশ ডেইরি ডেভেলপমেন্ট বোর্ড ভবনের উদ্বোধন করেন মন্ত্রী।
মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনিশ্চয়তা সরকার দেশের দুগ্ধ খাতের টেকসই উন্নয়নের জন্য 'বাংলাদেশ ডেইরি ডেভেলপমেন্ট বোর্ড' গঠন করেছে। এলডিপিপি প্রকল্পের তৈরি করা পিজি গ্রুপগুলোকেই মূলত এই ডেইরি বোর্ডের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে ধরা হয়েছে।
সিরাজগঞ্জের বেলকুচি থেকে আসা ভুক্তভোগী প্রাণিসম্পদ সম্প্রসারণ অফিসার, কৃষিবিদ আবু হেনা মোঃ আসিফ যায়যায়দিনকে বলেন, শুধু আমরা ৪৬৫ জন না, আমরা ৪৬৫ টি কিন্তু পরিবার। এবং এছাড়াও আমাদের ৯৩০ জন এলএফ-এর আরও পরিবার, আমরা বিশাল একটা জনগোষ্ঠী। আমাদের আগামী ৩০ তারিখ থেকে চাকরি শেষ হয়ে যাচ্ছে। এরপরে আমরা কি করব, এটা নিয়ে আমরা খুবই দুশ্চিন্তায় রাত পার করতেছি।
আমাদের এই প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়নে ডেইরি বোর্ড তৈরি করা হইছে, এই ডেইরি বোর্ডের আন্ডারে প্রত্যেকটা জেলা থেকে পিজি গ্রুপ আমরা নিজেরা তৈরি করেছি। এই পিজি গ্রুপগুলাকে তারা নিচ্ছে, কিন্তু পিজি গ্রুপ দেখভাল করার জন্য কোন জনগোষ্ঠী কর্তৃপক্ষের নাই।
বর্তমান সরকারের ম্যান্ডেট ছিল যে চাকরি নিশ্চয়তা দেওয়া। সেখানে আমরা এতজন লোক একসাথে বেকার হয়ে যাচ্ছি, দেশের জিডিপিতে এটা বড় একটা প্রভাব ফেলবে। আর আমরা ৬ বছর ধরে এখানে নিরলসভাবে কাজ করেছি। করোনাকালীন সময়ে আমরা কাজ করে টেকনিক্যাল সাপোর্ট দিয়েছি। কিন্তু হঠাৎ করে যদি এখন এই ৪৬৫ জন অফিসার, ৯৩০ জন এলএফ-এর আরও জনগোষ্ঠীকে যদি বাদ দিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে এই প্রাণিসম্পদ সেক্টরে বড় একটা ধাক্কা লাগবে।
সরকারের কাছে আমাদের উদাত্ত আহ্বান— আমাদের পারিবারিক জীবন, ব্যক্তিগত জীবন, দেশের কথা, উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস, খামারিদের কথা, সবার কথা বিবেচনা করে হলেও আমাদের সবাইকে যাতে রাজস্বকরণের ভিতরে নিয়ে আসা হয়। অথবা এই ডেইরি বোর্ডের আন্ডারে নিয়ে এসে আমাদের লোকবল হিসেবে স্থায়ী নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়।
নারী ভেটেরিনারিয়ানদের কর্মসংস্থানের সংকট- সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর থানা থেকে আসা ভুক্তভোগী নারী কর্মকর্তা ডাঃ সোনালী, যায়যায়দিনকে বলেন, "আমরা অব ভেটেরিনারি মেডিসিন (উঠগ) ডিগ্রি নিয়ে অনেক কষ্ট করে মাঠপর্যায়ে দিন-রাত সেবা দিয়েছি। সন্তান ও পরিবার ফেলে দেশের স্বার্থে কাজ করেছি। মেয়েদের জন্য বেসরকারি ডেইরি বা পোল্ট্রি ফার্মে কাজ করা অত্যন্ত কঠিন, অনেক সার্কুলারে সরাসরি পুরুষ প্রার্থী চাওয়া হয়। এমন পরিস্থিতিতে হঠাৎ চাকরি চলে গেলে আমরা কোথায় যাব? আমাদের কর্মদক্ষতা থাকা সত্ত্বেও কেন আমাদের রাস্তায় বসানো হচ্ছে?"
দিনাজপুুরের বিরল থানার লাইভস্টক এক্সটেনশন অফিসার (এলইও) ডাঃ সাউদিয়া আক্তার যায়যায়দিনকে বলেন, খামারিদের এই গ্রুপগুলো দেখাশোনা বা গাইড করার জন্য ডেইরি বোর্ডে কোনো দক্ষ মাঠপর্যায়ের জনবল বা টেকনিক্যাল অফিসার রাখা হয়নি। যে কর্মকর্তারা দীর্ঘ ৭ বছর ধরে এই খামারিদের সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করে গ্রুপগুলোকে দাঁড়িয়ে করিয়েছেন, তাদের বাদ দিয়ে এই বোর্ডের লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব হয়ে পড়বে এবং দেশের প্রাণিসম্পদ খাতে বড় ধরণের ধস নামার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যান্য আন্দোলনকারীরা এ সময়ে গণমাধ্যম কর্মীদের জানান, বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ও ম্যান্ডেট হলো দেশের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এবং বেকারত্ব দূর করা। কর্মকর্তারা উল্লেখ করেন, যেখানে সরকার নতুন করে লাখো কর্মসংস্থান তৈরির পরিকল্পনা করছে, সেখানে দীর্ঘ মেয়াদে প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ ১,৪০০ জন দক্ষ জনশক্তিকে একসাথে চাকরিচ্যুত করা হচ্ছে । দেশের জিডিপি (এউচ) ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন আন্দোলনকারী এ সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
"দক্ষ জনবল নষ্ট হোক, আমরা চাই না" — মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী-
এদিকে আন্দোলনরত ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আশ্বাসের বাণী শুনিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী আমিন উর রশিদ। তিনি গণমাধ্যম কর্মীদেরকে প্রকল্পের নিয়ম ও এই দক্ষ জনবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে সরকারের ইতিবাচক ভাবনার কথা জানান।
মন্ত্রী বলেন, "সরকারের কাজ দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করা। এই প্রজেক্টটা গত ৭ বছর ধরে চলছিল। প্রজেক্টটা অনেক বড় ছিল এবং বিভিন্ন ধরনের কর্মের সাথে অনেক লোকজন জড়িত ছিলেন। নরমালি প্রজেক্টের নিয়ম হলো—যখন প্রজেক্ট শেষ হয়ে যায়, তখন তাদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিতেই বলা হয় যে এটি প্রজেক্টভিত্তিক। প্রজেক্ট শেষ হয়ে গেছে, অটোমেটিক্যালি তাদের জবও শেষ হয়ে গেছে।"
তবে এই দক্ষ জনবলকে একদম ফেলে দেওয়া হচ্ছে না উল্লেখ করে মন্ত্রী আরও বলেন, "এই বোর্ডের তো আগামী দিনে আরও প্রকল্প সামনে আসবে। আমি তাদের কথা শুনতে চাই। আমরা চেষ্টা করব ফিউচারে যদি কোনোদিন এই ধরনের কোনো প্রজেক্ট আসে, তাদের অভিজ্ঞতাটা যেন কাজে লাগাতে পারি—সেভাবে আমরা চিন্তাভাবনা করব।"
মন্ত্রী আরো বলেন, "তারা তো একটা দক্ষ জনবল। এই দক্ষ জনবলটা নষ্ট হোক, সেটাও আমরা চাই না। আবার অপরচুনিটিও তো থাকতে হবে। সবকিছু মিলিয়ে জনগণের সরকার, জনগণের কাজ করবে।