একসময় যেখানে ছিল পরিত্যক্ত ইটভাটা, সেখানে এখন সবুজের সমারোহ। সারি সারি আমগাছ, ডালে ডালে ঝুলছে নানা রঙ ও আকৃতির বিদেশি আম। চাঁদপুর সদর উপজেলার শাহতলী বাজার সংলগ্ন ডাকাতিয়া নদীর তীরে গড়ে উঠেছে এক ব্যতিক্রমী ফলবাগান। সিনিয়র সাংবাদিক ও উদ্যোক্তা মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের প্রতিষ্ঠিত ‘ফ্রুটস ভ্যালি অ্যাগ্রো’ এখন কৃষি উদ্যোক্তাদের কাছে সম্ভাবনার নতুন নাম।
তিন শতাধিক আমগাছ নিয়ে গড়ে ওঠা এই বাগানে বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ৭৫ জাতের উচ্চমূল্যের ও বিরল আমের চাষ হচ্ছে। দেশের কৃষি খাতে নতুন দিগন্ত উন্মোচনের পাশাপাশি এটি তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য অনুপ্রেরণার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
ডাকাতিয়া নদীর পাড়ের পরিত্যক্ত ইটভাটাটি দীর্ঘদিন অনাবাদি পড়ে ছিল। কেউ ভাবেনি, একদিন এটি আধুনিক কৃষি খামারে রূপ নেবে। সেই অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন উদ্যোক্তা মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন।
নিজস্ব পরিকল্পনা, গবেষণা এবং দীর্ঘ পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি জায়গাটিকে ফলবাগানে রূপান্তর করেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে উন্নত জাতের ফল ও আমের চারা সংগ্রহ করে শুরু করেন পরীক্ষামূলক চাষ। ধীরে ধীরে সফলতা আসতে থাকে। বর্তমানে তার বাগানটি চাঁদপুরের অন্যতম আলোচিত কৃষি উদ্যোগে পরিণত হয়েছে।
ফ্রুটস ভ্যালি অ্যাগ্রোতে রয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জনপ্রিয় ও উচ্চমূল্যের আমের সমাহার।
বাগানে চাষ হচ্ছে ভ্যালেন্সিয়া প্রাইড, লেমন জেস্ট, বেইলি মার্বেল, রোসা রোসা, সানসেট, কিং অব চাকাপাত, আতাউলফো, কারাবাও, আলফানসো, গ্লেন, হাডেন, মায়া, সেনসেশন, অস্টিন, অস্টিন গোল্ড, আর-টু-ই-টু, ক্যাংসিংটন প্রাইড, টমি অ্যাটকিনস, রেড আইভরি, মিয়াজাকি, কেন্ট, কেইট, পালমার, কেশর, পুষা আম্বিকা, পুষা অরুণিমা, পুষা সুরাইয়া, মল্লিকা, তোতাপুরি, নাম ডক মাই, গোল্ডেন নাম ডক মাই, মহাচানক, ক্যারি, কাটিমন, ব্রুনাই কিং, ফ্রান্সিস, থাই কাঁচামিঠা, গৌরমতি এবং বারি-৪সহ আরও বহু বিরল জাতের আম।
বিশেষ করে জাপানের বিখ্যাত মিয়াজাকি, ভারতের আলফানসো এবং থাইল্যান্ডের নাম ডক মাই জাতের আম দর্শনার্থীদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করছে।
বাগানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো নিরাপদ ও বিষমুক্ত ফল উৎপাদন ব্যবস্থা। পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে আম রক্ষা করতে প্রতিটি ফলের ওপর ব্যবহার করা হয়েছে বিশেষ পট ও প্লাস্টিকের আবরণ। এতে রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার কমে আসে এবং নিরাপদ ফল উৎপাদন সম্ভব হয়।
খামার কর্তৃপক্ষের দাবি, আধুনিক ব্যবস্থাপনার কারণে আমের গুণগত মান বজায় থাকছে এবং ভোক্তারা পাচ্ছেন নিরাপদ ফল।
আমের মৌসুম ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিদিনই দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়ছে বাগানটিতে। টিকিট কেটে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসছেন এই ব্যতিক্রমী বাগান দেখতে। অনেকেই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘুরতে আসছেন এবং বিভিন্ন জাতের আম সম্পর্কে জানার সুযোগ পাচ্ছেন।
বাগান পরিদর্শনে আসা জাহিদুল ইসলাম বলেন, এক জায়গায় এত ধরনের আম আগে কখনও দেখিনি। বাগানের পরিবেশ খুবই মনোমুগ্ধকর। এখানে এসে মনে হয়েছে কৃষিও হতে পারে লাভজনক ও আকর্ষণীয় একটি খাত।
আরেক দর্শনার্থী মো. সবুজ বলেন, বিভিন্ন জাতের আম কাছ থেকে দেখা এবং কিছু আমের স্বাদ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছি। এমন উদ্যোগ তরুণদের কৃষিমুখী হতে উৎসাহিত করবে।
উদ্যোক্তা মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন জানান, গত বছর ৫৭ জাতের আম বিক্রি করে প্রায় ৬ লাখ টাকা আয় হয়েছিল। চলতি বছর ফলন কিছুটা কম হলেও জাতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৫-এ।
তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে সংগ্রহ করা উচ্চমূল্যের ফলের চারা এনে আমরা এখানে চাষ করছি। বিশ্বের সবচেয়ে দামি আমের অন্তত ৩০টি জাত আমাদের সংগ্রহে রয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কারিগরি সহায়তা আরও বেশি পেলে উৎপাদন ও ফলন অনেক বাড়ানো সম্ভব হবে।
চাঁদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ আবু তাহের বলেন, বিদেশি ফলের জাত সাধারণত নিজস্ব আবহাওয়া ও মাটির সঙ্গে বেশি উপযোগী হলেও বর্তমানে বাংলাদেশের কৃষকরাও নতুন সম্ভাবনা তৈরির জন্য এসব জাতের চাষ করছেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের মাটি ও আবহাওয়ার কারণে বিদেশি জাতের আমে স্বাদ ও মিষ্টতার কিছু পার্থক্য দেখা যেতে পারে। তবে সঠিক পরিকল্পনা, পরিচর্যা, সুষম সার প্রয়োগ এবং আধুনিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে বাণিজ্যিকভাবে এসব আম চাষ সফল হতে পারে।
তিনি আরও জানান, চলতি বছর অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও কিছু ক্ষেত্রে পরিচর্যার ঘাটতির কারণে ফলন কিছুটা কম হতে পারে। তবে নিয়মিত পরিচর্যার মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে ফলের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, কৃষি পর্যটনের বিকাশ এবং উচ্চমূল্যের ফল উৎপাদনে এমন উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে অনাবাদি বা পরিত্যক্ত জমিকে উৎপাদনশীল খামারে রূপান্তরের ক্ষেত্রেও এটি একটি সফল উদাহরণ।
পরিত্যক্ত ইটভাটাকে আধুনিক ফলবাগানে রূপান্তর করে ৭৫ জাতের বিদেশি আম চাষের এই উদ্যোগ শুধু চাঁদপুরেই নয়, দেশের কৃষি খাতেও নতুন সম্ভাবনার বার্তা দিচ্ছে। উদ্যোক্তা হেলাল উদ্দিনের এই ব্যতিক্রমী প্রচেষ্টা প্রমাণ করেছে, সঠিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং উদ্ভাবনী চিন্তা থাকলে কৃষিই হতে পারে টেকসই উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অন্যতম হাতিয়ার।