ঢাকা | বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মানবের দেশে আর দানব নয়

author
শাহীন রাজা

প্রকাশিত : ১৭ জুন, ২০২৬ বিকেল ৪:৪১
ad003
দানব অবশেষে ধরা পড়েছে। ধরা খেয়েছে, দুবাই শহরে। মরু'র শহরে ধরা খেলেও উৎফুল্ল বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ। কেননা, বাংলাদেশের মানুষের কাছে সে ছিল আতঙ্কের মূর্তিমান প্রতিক ।  সবসময় ভয়ে থাকতে হতো। কখন, কোন সময়ে কাকে ধরে নিয়ে যায়, এই দানব। অথচ আজ সে আইনে'র শেকলে আটক। সময় কাউকেই বোধহয় ছাড় দেয় না। সময়-ই সব নির্ধারণ করে দেয়। এই দানবের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে ।

দানবের নামটা নাই-বা বললাম। নামটা না বললে-ও পাঠক ইতিমধ্যে ঠিকই বুঝে গেছেন, কে হতে পারে এই দানব। গ্রেপ্তারের ঘটনাটি উল্লেখ করার একটাই কারণ। অপকর্মের শাস্তি বিচারিক বা সামাজিক যা-ই হোক না কেন একদিন পেতেই হবে। 

আওয়ামী সরকার নিজেদের শাসন দীর্ঘমেয়াদী করতে, এরকম অনেক দানব গড়ে তুলেছিল। যাইহোক দুবাইয়ে যাকে  গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাঁর আতঙ্কে দেশবাসী একসময় আতঙ্কগ্রস্ত ছিল। এদেশের রাজনীতিক থেকে ব্যবসায়ী, সাংবাদিক আতঙ্কে সময় কাটাতেন। এমনকি রূপনগরের সেলিব্রিটি'রাও তার অশুভ দৃষ্টি থেকে রেহাই পায়নি। কখন, কোন অপরাধে কাকে তুলে নিয়ে যাবে, কেউ জানতো না। বিশেষ করে সরকার বিরোধী দলের সদস্যদের সবসময়  আতঙ্কে থাকতেন । সেই সময়কার সরকার প্রধানের নির্দেশই সবকিছু হতো।  কেননা বাজারে কথিত আছে, সরকারের আশীর্বাদ নিয়েই অশুভ কর্মকাণ্ড চালাতেন,দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হওয়া দানব। যার কারণে তাঁর সকল অপকর্ম জানা সত্ত্বেও, সেই সময়কার সরকার প্রধান এই দানবের বিরুদ্ধে কোন প্রকার ব্যবস্থা নেয়নি।

দানবদের কল্পকথা মানব সভ্যতার প্রাচীন কাল থেকেই   চলে আসছে। দানব হচ্ছে,  অজানার ভয় এবং প্রকৃতির রুদ্ররূপ। কিংবা মানুষের অভ্যন্তরীণ অন্ধকারের প্রতীক হিসেবে যুগে যুগে বিভিন্ন দেশের লোকগাথায় নানা রকম দানবের আবির্ভাব ঘটেছে। দানব শুধু রক্তমাংসের কোনো ভয়ঙ্কর জীব নয়। এ হচ্ছে, মানুষের অন্তর্নিহিত লোভ, অহংকার এবং ক্রোধ। নীতিহীনতার প্রতীক এই দানবদের বিরুদ্ধে  পৌরাণিক কাহিনীর মাধ্যমে প্রাচীন কাল থেকে মানুষকে নৈতিকতা শেখাতে চেয়েছিল। কাহিনির সমাপ্তি হতো, অবশেষে অশুভ শক্তির বিনাশ অবশ্যম্ভাবী। এর ধারাবাহিক ঘটনাই হচ্ছে, দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হয়েছে উল্লেখিত দানব।

দানবের উত্থান সম্পর্কে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের কথাই বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ছিল প্রযোজ্য। তারা যা বলেছেন, আওয়ামী সরকার আমল ছিল হুবহু তার প্রতিচিত্র। তাই আমরা দেখেছিলাম, আওয়ামী সরকারের সময় আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে প্রশাসনের কিছুকিছু  আমলা বা প্রশাসনের লোক   নিজেদের আইনের ঊর্ধ্বে মনে করতে থাকেন। তারা মনে করতে থাকেন, তাঁরাই রাষ্ট্রে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। অতিরিক্ত ক্ষমতা ব্যবহার করতে, করতে একসময় দানবে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। অপকর্মের জন্য জবাবদিহি করতে হতোনা। তাদের ছিল, মাত্রাতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা। এবং সবসময় রাজনৈতিক তোষামোদ অব্যাহত রাখতেন।  এমন কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে প্রশাসনের কেউ, কেউ  জনকল্যাণের পরিবর্তে নিপীড়ক বা 'দানবীয়' রূপ ধারণ করে। 

এ প্রসঙ্গে রাষ্ট্রচিন্তাবিদ লর্ড অ্যাক্টনের বিখ্যাত উক্তি যথার্থ। তিনি বলেছেন, "ক্ষমতা মানুষকে দুর্নীতিগ্রস্ত করে। এবং চরম ক্ষমতা মানুষকে চরমভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত করে"। যখন প্রশাসনের কর্মকর্তারা সীমাহীন ক্ষমতার অধিকারী হন, তখন তারা আইন ও নৈতিকতার তোয়াক্কা না করে স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠেন। এটা তখনই হয়, যখন সরকার এইসব প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের পক্ষে থাকে। সরকার নিজেদের স্বৈরশাসন টিকিয়ে রাখতে চায় বলে, এদের সবকাজে সমর্থন দিয়ে যায়। সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে এই সকল কর্মকর্তা'রা একসময় দানবে রূপান্তরিত হয়ে ওঠে। আওয়ামী সরকার আমলে কিছুকিছু কর্মকর্তা এমনটাই হয়েছিলেন। 

আওয়ামী সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য, দুবাইয়ে গ্রেপ্তার দানবের মতো কয়েকজন দানব তৈরী করে। এই করতে যেয়ে জনপ্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্বকে ধ্বংস করে দেয়। রাজনৈতিক আনুগত্যকে যোগ্যতার মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আমলারা জনকল্যাণের পরিবর্তে দলের স্বার্থরক্ষায় কাজ করতে থাকে। এর ফলে একসময় রাজনৈতিক সরকার আর আমলারা এক হয়ে যায়। যার মধ্য দিয়ে একধরনের সুবিধাভোগী বলয় তৈরি হয়। যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় থাকার কৌশল হিসেবে প্রশাসনকে দলীয়করণ করে ফেলেছিল, আওয়ামী সরকার।

সাবেক স্বৈরশাসক  প্রশাসনিক কর্মকর্তা বা আমলাদের পূর্ণ প্রতিষ্ঠা করতে যেয়ে, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো একেবারে দুর্বল করে দেয়। 

আওয়ামী সরকার আমলে রাষ্ট্র ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব এবং নির্বাচনের বৈধতা কেড়ে নেয়া হয়। এই করতে যেয়ে এক সময় হাসিনা সরকার স্বৈরশাসকে রূপান্তরিত হয়ে যায়। রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিজ দলের স্বার্থে ব্যবহার করা হলে একটি গণতান্ত্রিক কাঠামোও স্বৈরাচারী শাসনে পরিণত হতে পারে। এর অন্যতম উদাহরণ হচ্ছে, শেখ হাসিনার  সরকার। 

আওয়ামী সরকার আমলে আইনসভা, নির্বাচন কমিশন এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয়ভাবে  নিয়ন্ত্রিত হতে থাকে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব করে  আদালতকে সরকারের আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়। যাতে সরকারপ্রধানের কোনো সিদ্ধান্ত আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে না পড়তে পারে। বিরোধী দলের নেতাকর্মী, পুলিশ, র‍্যাব বা অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীকে নিজস্ব রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করে। একসময় গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও বিরোধী মতের ওপর দমন-পীড়ন চালানো হয়। এই দমন-পীড়ন জন্য অনেক প্রশাসনিক লাঠিয়াল সৃষ্টি করেছিলেন।

প্রশাসনিক কর্মকতাদের সহযোগিতায় আওয়ামী সরকার সমর্থিত কিছু সুবিধাবাদী ব্যবসায়ী'র অভ্যুদয় ঘটে। এই ব্যবসায়ীরা বিশ্বে 'অলিগার্ক' হিসেবে পরিচিত ।  বিশ্বখ্যাত অর্থনীতিবিদরা মনে করেন এইসকল কারণে রাষ্ট্রীয় মদদে দুর্নীতি বা ‘স্টেট ক্যাপচার’ সৃষ্টি হয়। 'স্টেট ক্যাপচার' হচ্ছে  প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ এবং ব্যবসায়িক গোষ্ঠী রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠান ও আইনকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে। এটি সাধারণ দুর্নীতির চেয়েও ভয়ংকর, যা পুরো অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়।

তাই বর্তমান সরকারের কাছে বিনীত অনুরোধ, আপনাদের সরকার সময়ে কোন দানব সৃষ্টি হতে যেন না দেখা যায়। ৫ আগষ্ট বাংলাদেশের মানুষ স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছে। রাস্তায় নামার প্রধানই হচ্ছে, একটা সুন্দর ভবিষ্য বাংলাদেশ দেখার জন্য। এই সাধারণ মানুষেরা নিরাপদ বাংলাদেশ দেখতে চায়। যেখানে প্রশাসনিক জটিলতা'য় হয়রানি হতে না হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হবে জনগণের সহযোগী। এবং  বিচারের বাণী নিভৃতে যেন না কাঁদে। আপনাদের কথা-ই আপনাদের মনে করিয়ে দিচ্ছি,  সবার আগে বাংলাদেশের  মানুষ।
সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SH.AL

SH.AL

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT