ঢাকা | বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশের আর্থিক খাত, আওয়ামী দুর্নীতি ও ভবিষ্যতে করণীয়

author
রাজু আলীম

প্রকাশিত : ১৮ জুন, ২০২৬ বিকেল ৪:০১
ad003
বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ এমন এক সংকটময় বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, যেখানে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের নাম ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত। একসময় যে খাতকে দেশের প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি বলা হতো, আজ সেই খাতই আস্থাহীনতা, দুর্নীতি, খেলাপি ঋণ, অর্থ পাচার ও রাজনৈতিক প্রভাবের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। গত দেড় দশকে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে থাকলেও একই সময়ে আর্থিক খাতের ভেতরে জমা হয়েছে এক গভীর পচন। উন্নয়নের বাহ্যিক পরিসংখ্যানের আড়ালে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভিত দুর্বল হয়েছে নীরবে, আর এখন সেই সংকট প্রকাশ্য বাস্তবতা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, দেশের খেলাপি ঋণের পরিমাণ সরকারি হিসাবেই প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছেছে। অথচ ২০০৯ সালে এই খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ দেড় দশকে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ১৮ গুণ। তবে অর্থনীতিবিদদের একটি বড় অংশ মনে করেন, প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ থেকে ৭ লাখ কোটি টাকার কম নয়। কারণ বছরের পর বছর ঋণ পুনঃতফসিল, বিশেষ সুবিধা, সুদ মওকুফ ও কাগুজে হিসাব সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রকৃত সংকট আড়াল করা হয়েছে।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং সংকটের সবচেয়ে আলোচিত নাম ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। একসময় দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী ও লাভজনক ব্যাংকগুলোর একটি ছিল এই প্রতিষ্ঠান। ২০২২ সালের পর বিভিন্ন তদন্ত ও আর্থিক বিশ্লেষণে উঠে আসে, রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে এস আলম গ্রুপ ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর বিভিন্ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের নামে বিপুল অঙ্কের ঋণ বের করে নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৫০ থেকে ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি বেরিয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, ব্যাংকটির আমানত-ঋণ অনুপাতও অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। একসময় যেখানে ইসলামী ব্যাংকের আমানত ছিল ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি, সেখানে তার একটি বড় অংশ ঝুঁকিপূর্ণ ঋণে আটকে পড়ে। এর ফলে ব্যাংকটিতে তারল্য সংকট তৈরি হয় এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তা ছাড়া পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

একই ধরনের সংকটে পড়েছে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংক। অভিযোগ রয়েছে, এসব ব্যাংক থেকেও হাজার হাজার কোটি টাকা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কাছে গেছে। ইউনিয়ন ব্যাংকের ক্ষেত্রেই কয়েক বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের তথ্য সামনে আসে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে উঠে এসেছে, অনেক ঋণ অনুমোদন করা হয়েছে কাগুজে কোম্পানি, অতিমূল্যায়িত জামানত এবং জাল আমদানি নথির বিপরীতে।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে হলমার্ক কেলেঙ্কারি ছিল একটি বড় ধাক্কা। ২০১২ সালে সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখা থেকে হলমার্ক গ্রুপ জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা বের করে নেয়। এই কেলেঙ্কারি শুধু একটি ব্যাংকের দুর্বলতা নয়; বরং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ভেতরে রাজনৈতিক প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণহীনতার প্রতীক হয়ে ওঠে। একইভাবে বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারিতে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ঋণ অনিয়মের অভিযোগ উঠে। অথচ দীর্ঘ সময়েও অর্থের বড় অংশ উদ্ধার সম্ভব হয়নি।

ফারমার্স ব্যাংক, যা পরে পদ্মা ব্যাংক নামে পুনর্গঠিত হয়, সেটিও বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যর্থতার বড় উদাহরণ। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকটি প্রায় দেউলিয়ার অবস্থায় পৌঁছে যায়। ২০১৭ সালে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার ৬০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। পরে রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংক ও ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের অর্থ সহায়তায় ব্যাংকটিকে টিকিয়ে রাখা হয়। অর্থাৎ জনগণের টাকায় আবারও একটি ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানকে উদ্ধার করা হয়েছে।

বাংলাদেশের আর্থিক খাতের আরেকটি বড় সংকট তৈরি হয়েছে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা এনবিএফআই খাতে। দেশে বর্তমানে ৩৫টির বেশি এনবিএফআই থাকলেও এর একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে তারল্য সংকটে ভুগছে। পিপলস লিজিংয়ের পতন ছিল এই খাতের সবচেয়ে বড় ধাক্কা। প্রতিষ্ঠানটি ভেঙে পড়ার পর প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার বেশি আমানত অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। হাজার হাজার আমানতকারী তাদের সঞ্চয় ফেরত পাননি। এরপর আন্তর্জাতিক লিজিং, এফএএস ফাইন্যান্স, প্রিমিয়ার লিজিংসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে ভয়াবহ অনিয়ম সামনে আসে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এনবিএফআই খাতে খেলাপি ঋণের হার দীর্ঘ সময় ৩০ শতাংশের কাছাকাছি ছিল, যা পুরো আর্থিক ব্যবস্থার জন্য বিপজ্জনক।

এই প্রেক্ষাপটে আইডিএলসি ফাইন্যান্স তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে টিকে আছে। আইডিএলসির খেলাপি ঋণের হার দীর্ঘদিন ধরে খাতের গড়ের তুলনায় কম ছিল এবং করপোরেট সুশাসনের দিক থেকেও প্রতিষ্ঠানটি ইতিবাচক উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে পুরো আর্থিক ব্যবস্থার ওপর আস্থাহীনতার প্রভাব তাদেরও বহন করতে হচ্ছে। কারণ যখন মানুষ আর্থিক খাতের ওপর আস্থা হারায়, তখন ভালো ও খারাপ প্রতিষ্ঠানের পার্থক্যও অনেকাংশে মুছে যায়।

বাংলাদেশের শেয়ারবাজারও গত দেড় দশকে ধারাবাহিক কারসাজির শিকার হয়েছে। ২০১০ সালের শেয়ারবাজার ধসে প্রায় ৩৩ লাখ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হন। বাজার মূলধন থেকে উধাও হয়ে যায় কয়েক হাজার কোটি টাকা। তদন্তে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, নিয়ন্ত্রক সংস্থার ব্যর্থতা এবং ব্যাংকগুলোর অস্বাভাবিক বিনিয়োগের বিষয় উঠে এলেও বড় ধরনের শাস্তি কার্যত দেখা যায়নি। এরপরও বিভিন্ন সময়ে আইপিও কারসাজি, কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দাম বাড়ানো এবং ইনসাইডার ট্রেডিংয়ের অভিযোগ উঠেছে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকটের সবচেয়ে ভয়ংকর দিকগুলোর একটি হলো অর্থ পাচার। গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত দেড় দশকে বাংলাদেশ থেকে বছরে গড়ে ৭ থেকে ৯ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ কয়েক লাখ কোটি টাকা। ট্রেড মিসইনভয়েসিং বা আমদানি-রপ্তানির মূল্য কম-বেশি দেখানোর মাধ্যমে এই অর্থ বিদেশে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কানাডার বেগমপাড়া, দুবাই, মালয়েশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি অর্থ পাচারের আলোচনা এখন প্রকাশ্য বিষয়।

অর্থনীতিবিদদের মতে, পাচার হওয়া অর্থের বড় অংশ এসেছে ব্যাংক ঋণ থেকে। অর্থাৎ সহজ শর্তে ঋণ নেওয়া হয়েছে, পরে সেই অর্থ বিদেশে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত ঋণ খেলাপি হয়ে গেছে। এতে একদিকে ব্যাংক দুর্বল হয়েছে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও চাপ তৈরি হয়েছে। ২০২১ সালে যেখানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৪৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি, সেখানে পরবর্তী সময়ে তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। একইসঙ্গে ডলারের দামও ৮৫ টাকা থেকে বেড়ে ১২০ টাকার কাছাকাছি পৌঁছায়।

আওয়ামী লীগ আমলে অর্থনৈতিক নীতির বড় সমালোচনা ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা কমে যাওয়া। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর থেকে শুরু করে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পর্যন্ত রাজনৈতিক বিবেচনাকে প্রাধান্য দেওয়ার অভিযোগ ছিল প্রবল। একই পরিবারের সদস্যদের দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে থাকার সুযোগ তৈরি হয়। ফলে ব্যাংকিং খাতে জবাবদিহির বদলে গড়ে ওঠে প্রভাব ও ক্ষমতার সংস্কৃতি।

একইসঙ্গে বড় ঋণখেলাপিদের জন্য বিশেষ সুবিধা ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এক ধরনের নৈতিক বিপর্যয় তৈরি করেছে। ২০১৯ সালে মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলো কার্যত বার্তা পেয়েছে যে রাজনৈতিক প্রভাব থাকলে ঋণ ফেরত না দিলেও সমস্যা নেই। অথচ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বা সাধারণ গ্রাহকদের ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে পুরো অর্থনীতিতে। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি কমেছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা সহজে ঋণ পাচ্ছেন না। উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনকে চাপে ফেলেছে। শিল্পখাতে নতুন বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় কর্মসংস্থানও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

সবচেয়ে বড় সংকট এখন আস্থার। ব্যাংকিং ব্যবস্থা মূলত মানুষের বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। মানুষ যদি মনে করে ব্যাংকে টাকা রাখা নিরাপদ নয়, তাহলে পুরো আর্থিক কাঠামো ঝুঁকির মুখে পড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি ব্যাংকের সামনে আমানতকারীদের দীর্ঘ লাইন, টাকা উত্তোলনের আতঙ্ক এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব সেই আস্থাহীনতারই বহিঃপ্রকাশ।

তবে সংকট যত গভীরই হোক, বাংলাদেশের আর্থিক খাত ঘুরে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু এজন্য প্রয়োজন কঠোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা, পেশাদার সংস্কার এবং জবাবদিহি।

প্রথমত, ব্যাংকিং খাতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে হবে। পরিচালনা পর্ষদে পেশাদার, দক্ষ ও স্বাধীন ব্যক্তিদের নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। একই পরিবার বা গোষ্ঠীর দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ সীমিত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রকৃত স্বাধীনতা দিতে হবে। প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়িয়ে সন্দেহজনক লেনদেন দ্রুত শনাক্ত করতে হবে। বড় ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে কঠোর যাচাই নিশ্চিত করতে হবে।

তৃতীয়ত, বড় ঋণখেলাপি ও অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু মামলা নয়, বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্ত, সম্পদ জব্দ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগ নিতে হবে।

চতুর্থত, দুর্বল ব্যাংকগুলোর বাস্তবভিত্তিক পুনর্গঠন জরুরি। সব ব্যাংককে কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা না করে প্রয়োজনে একীভূতকরণ, পুনঃমূলধনীকরণ কিংবা লাইসেন্স বাতিলের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একইসঙ্গে আমানতকারীদের সুরক্ষায় শক্তিশালী ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

পঞ্চমত, শেয়ারবাজার ও এনবিএফআই খাতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে। আইপিও কারসাজি, ইনসাইডার ট্রেডিং ও বাজার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার ও কার্যকর শাস্তি নিশ্চিত না করলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরবে না।

বাংলাদেশ আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে রয়েছে দুর্নীতি, আস্থাহীনতা ও আর্থিক বিপর্যয়ের গভীর খাদ; অন্যদিকে রয়েছে সংস্কার, জবাবদিহি ও পুনর্গঠনের সুযোগ। আর্থিক খাতের পতন কখনো শুধু ব্যাংকের পতন নয়; এটি পুরো অর্থনীতির ভবিষ্যৎকে বিপন্ন করে। সঠিক নীতি, কঠোর জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক সাহস থাকলে বাংলাদেশের আর্থিক খাত আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে এখনই।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সংকট এখন আর কেবল কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যাংকের সমস্যা নয়; এটি রাষ্ট্রের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বিশ্বব্যাংক এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থাও গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের আর্থিক খাত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কারণ একটি দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের ওপর।

বর্তমানে বাংলাদেশের অনেক ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত কয়েকটি ব্যাংকে এই ঘাটতি কয়েক দশ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। প্রতিবছর জনগণের করের টাকা ব্যবহার করে এসব ব্যাংককে পুনঃমূলধনীকরণ করা হচ্ছে। অর্থাৎ ব্যাংক লুটের ক্ষতি শেষ পর্যন্ত বহন করছে সাধারণ মানুষ। অথচ যাদের অনিয়মের কারণে এই সংকট তৈরি হয়েছে, তাদের বড় অংশের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা খুব কমই দেখা গেছে।

আর্থিক খাতের এই দুর্বলতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়া। একটি সুস্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থা শিল্প ও ব্যবসাকে অর্থায়ন করে অর্থনীতিকে সচল রাখে। কিন্তু যখন ব্যাংকের বড় অংশের অর্থ আটকে যায় খেলাপি ঋণে, তখন নতুন উদ্যোক্তারা ঋণ পান না। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের বড় অংশ এই খাতের ওপর নির্ভরশীল হলেও বর্তমানে অনেক উদ্যোক্তা উচ্চ সুদ, জামানত সংকট এবং ব্যাংকের অনীহার কারণে অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি। খাদ্য মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় ধরে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে চাপে রেখেছে। ব্যাংকিং খাত দুর্বল হওয়ায় বাজারে অর্থের সুষম প্রবাহও ব্যাহত হয়েছে। ডলার সংকটের কারণে এলসি খোলা কঠিন হয়ে পড়েছে, ফলে শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতেও সমস্যা তৈরি হয়েছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে এবং বাজারে পণ্যমূল্য আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাংলাদেশের আর্থিক খাতের আরেকটি জটিল সমস্যা হলো করপোরেট সুশাসনের অভাব। বিশ্বের উন্নত অর্থনীতিতে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে স্বাধীন পরিচালক, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটি এবং শক্তিশালী অডিট ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক স্বার্থের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ফলে পরিচালনা পর্ষদই কখনও কখনও অনিয়মের উৎসে পরিণত হয়েছে।

এই বাস্তবতায় এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো আস্থা পুনর্গঠন। জনগণকে বিশ্বাস করাতে হবে যে ব্যাংকে রাখা অর্থ নিরাপদ। এজন্য শুধু বক্তব্য নয়, দৃশ্যমান সংস্কার প্রয়োজন। বড় ঋণখেলাপিদের তালিকা প্রকাশ, অর্থ পাচারকারীদের সম্পদ জব্দ, ব্যাংক পরিচালনায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে আদালতে বছরের পর বছর ঝুলে থাকা আর্থিক অপরাধের মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি জরুরি।

বাংলাদেশের সামনে এখন দুটি পথ খোলা। একদিকে রয়েছে পুরোনো রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করে সংকটকে আরও দীর্ঘায়িত করা; অন্যদিকে রয়েছে কঠোর কিন্তু প্রয়োজনীয় সংস্কারের পথে হাঁটা। ইতিহাস বলছে, কোনো দেশই দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী অর্থনীতি গড়তে পারেনি। দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া কিংবা ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোও আর্থিক সংকটের পর কঠোর সংস্কার, জবাবদিহি এবং প্রতিষ্ঠানগত শক্তিশালীকরণের মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশকেও সেই বাস্তবতাই মেনে নিতে হবে। ব্যাংকিং খাতকে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত না করলে, অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এবং দুর্নীতিকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা থেকে বিচ্ছিন্ন না করলে সংকট আরও গভীর হবে। কারণ ব্যাংক লুট শুধু কিছু প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি নয়; এটি দেশের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং সাধারণ মানুষের আর্থিক নিরাপত্তাকে ধ্বংস করে দেয়।

আজ বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নতুন আস্থা, নতুন শৃঙ্খলা এবং নতুন জবাবদিহি। আর্থিক খাতকে পুনর্গঠন করা এখন শুধু অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্র পুনর্গঠনেরও প্রশ্ন। কারণ একটি দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা যখন দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন দুর্বল হয়ে পড়ে সেই দেশের উন্নয়নের ভিত্তিও।

রাজু আলীম
কবি, লেখক, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব
সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SH.AL

SH.AL

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT