নাটোরের লালপুর উপজেলার বিস্তীর্ণ পদ্মার চরাঞ্চল এখন এক রক্তাক্ত জনপদে পরিণত হয়েছে। চরের হাজার হাজার একর বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ, অবৈধভাবে ফসলি জমি ও কাশবনের খড় দখল এবং জেলে-কৃষকদের ওপর চাঁদাবাজির আধিপত্য ধরে রাখতে মরিয়া হয়ে উঠেছে একাধিক আঞ্চলিক সন্ত্রাসী বাহিনী।
এবিষয়ে সম্প্রতি জাতীয় সংসদে রাজশাহী-৬ (বাঘা-চারঘাট) আসনের সংসদ সদস্য আবু সাঈদ চাঁদ বাজেট অধিবেশনে বক্তব্য প্রদানকালে তিনি বাঘা, লালপুর, দৌলতপুরে, সন্ত্রাসীদের আধিপত্য, মাদক এবং গোলাগুলি বন্ধ করে এলাকায় শান্তি ফিরে আনতে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
স্থানীয় ও পুলিশ প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত ৯ মাসের ব্যবধানে এই চরাঞ্চলে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও গুলিবর্ষণের ঘটনায় অন্তত ৭ জন নিহত হয়েছেন। আর এই চরের ত্রাস ও অরাজকতার নেপথ্যে মূল ভূমিকা পালন করছে কুখ্যাত সন্ত্রাসী গ্রুপ ‘কাকন বাহিনী’।
সর্বশেষ গত মঙ্গলবার (১৬ জুন) ভোরের দিকে লালপুরের রাইটার চর এলাকায় পদ্মা নদীতে মাছ ধরার সময় শ্যালো ইঞ্জিনচালিত নৌকায় থাকা জেলেদের লক্ষ্য করে চর থেকে বেপরোয়া গুলিবর্ষণ করা হয়। এতে সাহাবুল ইসলাম (৪৫) নামের এক জেলে ঘটনাস্থলেই গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। এর আগে গত ৯ জুন লালপুরের চরজাজিরা এলাকায় পদ্মা নদীতে ভাসমান একটি স্পিডবোট থেকে আজিজুল হক ঝড়ু (৩৫) নামের এক যুবকের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করা হয়। জানা গেছে, কুষ্টিয়ার দৌলতপুর এবং রাজশাহীর বাঘা সীমান্তবর্তী হবির চরে বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বেলাল গ্রুপ ও কাকন গ্রুপের মধ্যে মধ্যরাতে চলা গোলাগুলির ঘটনায় তিনি নিহত হন এবং পরে লাশটি স্পিডবোটে করে লালপুর সীমানায় ফেলে যাওয়া হয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নাটোরের লালপুর, রাজশাহীর বাঘা, পাবনার ঈশ্বরদী এবং কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার সীমান্তঘেঁষা বিশাল পদ্মার চরাঞ্চল জুড়ে বেশ কয়েকটি সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে উঠেছে এদের মধ্যে সবচেয়ে আতঙ্কের কুখ্যাত ‘কাকন বাহিনী’। তৎকালীন একাদশ জাতীয় সংসদের নাটোর-১ আসনের এমপি শহিদুল ইসলাম বকুলের ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে পরিচিত কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার আদি বাসিন্দা ও নিজেকে ‘ইঞ্জিনিয়ার কাকন’ হিসেবে পরিচয় দেওয়া হাসিনুজ্জামান কাকন প্রায় শতাধিক সশস্ত্র ক্যাডার নিয়ে গড়ে তুলেছেন এই বাহিনী। বিগত আওয়ামী লীগ শাসনামল থেকেই লালপুরের দিয়ার বাহাদুরপুর, পাবনার ঈশ্বরদীর সাঁড়া ঘাট, কাইগিমারির চরসহ বিস্তীর্ণ নদীপথের বালু ব্যবসা ও অবৈধ বালুমহালের নিয়ন্ত্রণ মূলত এই বাহিনীর হাতে। কোনো ঘাট নিয়ন্ত্রণে নিতে ব্যর্থ হলে সেখানে ফিল্মি স্টাইলে স্পিডবোট ও ট্রলারে করে এসে প্রকাশ্য দিবালোকে অস্ত্রের মহড়া ও এলোপাতাড়ি গুলি চালানো এই বাহিনীর নিয়মিত রেওয়াজ। সম্প্রতি ঈশ্বরদীর সাঁড়া ঘাটের বৈধ ইজারাদারদের হটিয়ে ঘাট দখল করতে গিয়ে এই কাকন বাহিনী ফিল্মি স্টাইলে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়ে এক গরুর রাখালকে গুলিবিদ্ধ করে।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তালিকায় পদ্মার চরে একাধিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী সক্রিয় থাকলেও সবচেয়ে ভয়ংকর হিসেবে চিহ্নিত ‘কাকন বাহিনী’। গত বছরের ২৭ অক্টোবর নাটোরের লালপুর, রাজশাহীর বাঘা ও কুষ্টিয়ার দৌলতপুর সীমান্তবর্তী পদ্মার চরে খড়ের জমির আধিপত্য নিয়ে কাকন ও মুনতাজ বাহীনির গোলাগুলিতে দুইজন নিহত হয়। এ ঘটনার পর কুষ্টিয়ার দৌলতপুর থানায় কাকন বাহিনীপ্রধান হাসিনুজ্জামান কাকনকে প্রধান আসামি করে হত্যা মামলা করা হয়।
গত বছর চরের এই বিপজ্জনক পরিস্থিতি ও একের পর এক হত্যাকাণ্ডের পর প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে কাকন বাহিনীর আস্তানা ও ডেরায় বিশাল যৌথ অভিযান চালানো হয়। গত বছরের ৯ নভেম্বর ভোর থেকে নাটোরের লালপুর, পাবনার ঈশ্বরদী, রাজশাহীর বাঘা এবং কুষ্টিয়ার দৌলতপুর চরাঞ্চলে একযোগে শুরু হয় বিশেষ এই অভিযান, যার কোডনেম দেওয়া হয়েছিল ‘অপারেশন ফার্স্ট লাইট’। পুলিশ, র্যাব ও এপিবিএন এর প্রায় ১,২০০ থেকে ১,৫০০ সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনী ড্রোন উড়িয়ে দুর্গম কাশবন, কলাবাগান ও জঙ্গলের ভেতরে কাকন বাহিনীর আস্তানায় চিরুনি তল্লাশি চালায়। লালপুরের দিয়াড় বাহাদুরপুর, চর জাজিরা ও আক্তারের ঘাট এলাকায় ১৪টি নৌকায় ১০টি দলে ভাগ হয়ে যৌথ বাহিনী এই আক্রমণ চালায়, এই অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র দেশীয় অস্ত্রসহ তাদের ২১ জন সক্রিয় সশস্ত্র সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এছাড়াও গত বছরের ১৭ জুলাই ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত ঈশ্বরদীর সাড়া ঘাট, লালপুরের দিয়ার বাহাদুরপুর এলাকায় সেনাবাহিনী পাবনা ও নাটোর ক্যাম্পের সদস্যদের যৌথ অভিযানে কাকন বাহিনীর আস্তানা গুঁড়িয়ে দিয়ে বাহিনীর ৩ সদস্যকে আটক করে এবং তাদের হেফাজত থেকে ৫টি বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র (রামদা, চাইনিজ কুড়াল), কার্তুজ, মাদকদ্রব্য, একটি মানুষের মাথার খুলি এবং অবৈধ বালুমহাল ও চাঁদাবাজির টাকার ভাগবাঁটোয়ারার দীর্ঘ মাশোহারা তালিকা সংবলিত ডায়েরি জব্দ করা হয়। তবে প্রশাসনের এতগুলো অভিযানের পরেও কাকন বাহীনির প্রধান হাসিনুজ্জামান কাকন এখনো ধরাছোঁয়ার বাহিরে।
গত বছরের সেই মেগা অভিযানের পর সাময়িকভাবে পরিস্থিতি শান্ত হলেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কাকন বাহিনীর অবশিষ্ট ক্যাডাররা আবারও চরে অস্ত্রের মহড়া ও হত্যাকাণ্ড আশঙ্কাজনকভাবে বাড়িয়েছে। টানা একের পর এক হত্যাকাণ্ডে চরাঞ্চলের সাধারণ কৃষক ও মৎস্যজীবীরা এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। অনেকেই ভয়ে চরের জমিতে চাষাবাদ করতে বা নদীতে মাছ ধরতে যেতে সাহস পাচ্ছেন না।
এবিষয়ে নাটোরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফুল হক বলেন, পদ্মার চর অনেক প্রত্যন্ত এলাকা এ ঘটনায় দুইটি মামলা হয়েছে নৌপুলিশ তদন্ত করছে
এবং চরের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ কাজ করছে।