আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা। তাঁরা বলেছেন, টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে আদিবাসীদের ভূমির ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সরকার, নাগরিক সমাজ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে একযোগে কাজ করতে হবে।
আজ রবিবার (২১ জুন) রাজধানীর কারিতাস ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট (সিডিআই) মিলনায়তনে বাংলাদেশ অ্যাগ্রো-ইকোলজি প্ল্যাটফর্ম (বিএপি) প্রকল্প আয়োজিত ভূমি ও আদিবাসী অধিকার এবং জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা বিষয়ক অ্যাডভোকেসি সেমিনারে এসব কথা বলেন তারা। কারিতাস বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক দাউদ জীবন দাশের সভাপতিত্বে সেমিনারে বক্তৃতা করেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ফারিদা আখতার, জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. সাদরুজ্জামান, বারসিকের পরিচালক পাভেল পার্থ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কাজী কামরুল ইসলাম, শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. শিল্পী কুন্ডু, বাংলাদেশ কৃষক ফাউণ্ডেশনের সভাপতি সভাপতি মো. বদরুল আলম, কারিতাস বাংলাদেশের পরিচালক (প্রোগ্রাম) অপূর্ব ম্রং প্রমূখ। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইন্ডিজেনাস পিপলস ডেভেলপমেন্ট সার্ভিসেস (আইপিডিএস)-এর সভাপতি সঞ্জীব দ্রং এবং বাংলাদেশ অ্যাগ্রো-ইকোলজি প্ল্যাটফর্মের কার্যক্রম তুলে ধরেন কারিতাসের ব্যবস্থাপক সুবাস এ. গোমেজ।
মূল প্রবন্ধে আদিবাসীদের ভূমি অধিকার ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় ১৫ দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়। সুপারিশ বলা হয়, আদিবাসীদের প্রথাগত ভূমি অধিকারের স্বীকৃতি দিতে হবে। সমতলের আদিবাসীদের জন্য আদিবাসী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে একটি স্বতন্ত্র ভূমি কমিশন গঠন করতে হবে। প্রথাগতভাবে ভোগদখলকৃত ভূমির ম্যাপিং ও নিবন্ধনের মাধ্যমে আইনি মালিকানা নিশ্চিত করতে হবে। বন বিভাগের গেজেট, জরিপ বা ফরেস্ট ল্যান্ড হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়া আদিবাসীদের ভূমি প্রকৃত মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে। আদিবাসীদের জীবন ও জীবিকায় প্রভাব ফেলতে পারে এমন যেকোনো প্রকল্প গ্রহণের আগে তাদের পূর্বানুমোদিত ও অবহিত সম্মতি গ্রহণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। আরো বলা হয়, আদিবাসীদের প্রথাগত ভূমিতে জাতীয় উদ্যান, ইকো-পার্ক বা অনুরূপ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে সেখানে আদিবাসীদের অংশীদারিত্ব ও মালিকানা নিশ্চিত করতে হবে। শত্রু সম্পত্তি ও অর্পিত সম্পত্তি আইনের কারণে হারানো ভূমি পুনরুদ্ধারে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, আদিবাসীদের জমি ফেরত পেতে সরকারের প্রত্যক্ষ ভূমিকা নিশ্চিত, ভূমি রক্ষা ও পুনরুদ্ধারে আইনি সহায়তা প্রদান এবং ভূমি-সংক্রান্ত নথিপত্র সংরক্ষণ, খাজনা প্রদান ও ভূমি জরিপ বিষয়ে আদিবাসীদের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।
সেমিনারে আদিবাসীদের নিপীড়ন ও হয়রানির ঘটনা তুলে ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। তিনি বলেন, আদিবাসীদের অনেক কিছুর নাম বদলে দেওয়া হচ্ছে। এটা একটা জেনোসাইড (গণহত্যা)। যা বন্ধ হওয়া দরকার। তিনি আরো বলেন, যত্রতত্র ইকোপার্ক করা বন্ধ করতে হবে। ইকোপার্ক পরিবেশ ও প্রতিবেশ ধ্বংস করে এবং সেখানকার মানুষের অধিকার লংঘন করে। ভূমির অধিকারসহ আদিবাসীদের সুরক্ষায় বর্তমান সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
ড. মো. সাদরুজ্জামান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা কারণে আদিবাসীরা সব থেকে ঝুঁকিতে আছে। তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। ভূমির অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এ বিষয়ে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বর্তমান সরকার এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিচ্ছে।
গবেষক পাভেল পার্থ বলেন, শুধু বাংলাদেশ নয়, সারাবিশ্বে আদিবাসীরা নির্যাতিত ও বিতাড়িত হচ্ছে। পাঠ্যপুস্তকে যখন লেখা হয়, আদিবাসীদের প্রধান খাদ্য সাপ, পিঁপড়া ও মদ, তখন সেটা রাষ্ট্রের সমস্যা। তাই আদিবাসীদের সমস্যা সমাধানে সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে আদিবাসী সম্প্রদায়ের ভূমি অধিকার ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষার বিষয়কে জাতীয় উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে উল্লেখ করেন। সেমিনারে উত্থাপিত সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে আদিবাসীদের ভূমি অধিকার সুরক্ষা, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে কার্যকর অগ্রগতি অর্জন সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।