বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দেশের বিদ্যমান বিস্তীর্ণ সমুদ্রসীমার গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার, যেখানে নিরাপদ নৌ-যোগাযোগ, সমুদ্রসম্পদের টেকসই ব্যবহার এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো হাইড্রোগ্রাফি। বিশ্ব হাইড্রোগ্রাফি দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য “Transforming How Ocean Data is Shared” আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে আধুনিক বিশ্বে সমুদ্র সম্পর্কিত তথ্য কেবল প্রযুক্তিগত সম্পদ নয়, বরং জাতীয় উন্নয়নের একটি কৌশলগত ভিত্তি।
বাংলাদেশের প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার বর্গকিলোমিটারের বেশি সামুদ্রিক এলাকা রয়েছে, যা মৎস্যসম্পদ, খনিজ সম্পদ, জ্বালানি সম্ভাবনা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বিশাল জলসীমার নিরাপদ ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজন নির্ভুল সমুদ্রতলের তথ্য, নৌপথের গভীরতা, জোয়ার-ভাটার গতিপ্রকৃতি এবং নেভিগেশন সংক্রান্ত হালনাগাদ উপাত্ত। আর এসব তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও প্রকাশের কাজই করে হাইড্রোগ্রাফি।
হাইড্রোগ্রাফিক জরিপের মাধ্যমে সমুদ্র ও নদীপথের গভীরতা, তলদেশের বৈশিষ্ট্য এবং সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ স্থানসমূহ চিহ্নিত করা হয়। এসব তথ্যের ভিত্তিতেই প্রস্তুত করা হয় নটিক্যাল চার্ট, যা জাহাজ চলাচলের জন্য অপরিহার্য। আন্তর্জাতিক মেরিটাইম সংস্থা (IMO)-এর “Safety of Life at Sea (SOLAS)” কনভেনশন অনুযায়ী প্রত্যেক উপকূলীয় রাষ্ট্রের জন্য যথাযথ হাইড্রোগ্রাফিক সেবা প্রদান বাধ্যতামূলক। এই দায়িত্ব পালনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার ১৯৮৩ সালে দেশের সমুদ্র এলাকার হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ওপর অর্পণ করে।
গত চার দশকে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর হাইড্রোগ্রাফিক বিভাগ একটি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। দেশের সমুদ্রসীমার শতভাগ এলাকায় জরিপ কার্যক্রম সম্পন্ন করার পাশাপাশি নিয়মিত হালনাগাদ তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে নিরাপদ নেভিগেশন নিশ্চিত করা হচ্ছে। এর ফলে বন্দর কার্যক্রম, আন্তর্জাতিক শিপিং, উপকূলীয় উন্নয়ন এবং সামুদ্রিক অর্থনীতি আরও গতিশীল হয়েছে। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর আধুনিকায়ন কর্মসূচির অংশ হিসেবে যুক্তরাজ্য থেকে অত্যাধুনিক সমুদ্র জরিপ ও গবেষণা জাহাজ HMS Enterprise সংযোজিত হতে যাচ্ছে। এটি দেশের হাইড্রোগ্রাফিক ও সামুদ্রিক গবেষণা সক্ষমতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন এই জাহাজের মাধ্যমে সমুদ্র জরিপ কার্যক্রম আরও নির্ভুল, দ্রুত এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের হাইড্রোগ্রাফিক সক্ষমতা স্বীকৃতি পেয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ North Indian Ocean Hydrographic Commission (NIOHC)-এর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে। ২০২৬ সালের মে মাসে চট্টগ্রামে কমিশনের ২৫তম সম্মেলন সফলভাবে আয়োজনের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার পেশাগত দক্ষতা ও নেতৃত্বের পরিচয় দিয়েছে। এটি দেশের সামুদ্রিক সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি।
নিরাপদ নৌ-চলাচল, বন্দর ব্যবস্থাপনা এবং উপকূলীয় অঞ্চলে উন্নয়নের ক্ষেত্রে সমন্বিত তথ্য ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় সরকার জাতীয় পর্যায়ে একটি স্বতন্ত্র কর্তৃপক্ষ হিসেবে ‘ন্যাশনাল হাইড্রোগ্রাফার’ পদ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এই পদ সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের সকল হাইড্রোগ্রাফিক ও সামুদ্রিক ভূ-তাত্ত্বিক তথ্যের জন্য একটি কেন্দ্রীয় ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে। ফলে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি পাবে এবং তথ্য ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হবে।
বর্তমান বিশ্বে তথ্যই শক্তি। সমুদ্র সম্পর্কিত নির্ভুল ও হালনাগাদ তথ্যের ওপর নির্ভর করে পরিচালিত হয় বৈশ্বিক বাণিজ্য, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, বন্দর পরিকল্পনা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা। এ বছরের প্রতিপাদ্য সমুদ্র তথ্যের আধুনিক ও সমন্বিত আদান-প্রদানের গুরুত্বকে সামনে নিয়ে এসেছে। উন্নত ডিজিটাল প্রযুক্তি ও তথ্যভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের মাধ্যমে দ্রুত তথ্য বিনিময় নিশ্চিত হলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কাজের পুনরাবৃত্তি কমবে, সময় ও অর্থ সাশ্রয় হবে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া আরও কার্যকর হবে।
বাংলাদেশের সুনীল অর্থনীতির বিকাশে হাইড্রোগ্রাফিক তথ্যের গুরুত্ব অপরিসীম। বন্দর সম্প্রসারণ, গভীর সমুদ্রবন্দর উন্নয়ন, অফশোর জ্বালানি অনুসন্ধান, উপকূলীয় অবকাঠামো নির্মাণ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় নির্ভরযোগ্য সামুদ্রিক তথ্য অপরিহার্য। তাই আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, গবেষণা সম্প্রসারণ এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার বিকল্প নেই।
দেশের একমাত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ নৌবাহিনী আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন Category-A Hydrographic Course পরিচালনার স্বীকৃতি পেয়েছে, যা International Board on Standards of Competence for Hydrographic Surveyors and Nautical Cartographers (IBSC) কর্তৃক অনুমোদিত। বিশ্বের মাত্র ২০টি দেশ এবং এশিয়ার মাত্র ৫টি দেশে এই মর্যাদাপূর্ণ কোর্স পরিচালিত হয়। ফলে বাংলাদেশ এখন আন্তর্জাতিক মানের হাইড্রোগ্রাফিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশের সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা অপরিসীম। সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে নিরাপদ নৌ-চলাচল, আধুনিক তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং দক্ষ হাইড্রোগ্রাফিক সেবার কোনো বিকল্প নেই। সরকার ও সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনের সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে সমুদ্রসম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
বিশ্ব হাইড্রোগ্রাফি দিবস আমাদের সেই বার্তাই দেয়— সমুদ্রকে জানতে হবে, সমুদ্রের তথ্যকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হবে এবং সমুদ্রের সম্ভাবনাকে জাতীয় উন্নয়নের শক্তিতে পরিণত করতে হবে। সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে বাংলাদেশ তার সামুদ্রিক সম্ভাবনাকে পূর্ণমাত্রায় কাজে লাগিয়ে সুনীল অর্থনীতির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে— এটাই প্রত্যাশা।
লেখক:
কাজী আরিফ বিল্লাহ
বিসিএস (ইনফরমেশন), পাবলিক রিলেশনস অফিসার, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়।