ঢাকা | বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ধুঁকছে ‘মেঘনা এক্সপ্রেস’

author
চাঁদপুর প্রতিনিধি

প্রকাশিত : ২২ জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:২৭
ad003
একসময় দেশের অন্যতম লাভজনক ও জনপ্রিয় আন্তঃনগর ট্রেন ছিল চাঁদপুর-চট্টগ্রাম রুটের ‘মেঘনা এক্সপ্রেস’। কিন্তু চার দশক পেরিয়ে এখন ট্রেনটি যেন অবহেলা, সংকট ও অদক্ষ ব্যবস্থাপনার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইঞ্জিন বিকল, জরাজীর্ণ কোচ, ভাঙাচোরা দরজা-জানালা, অচল ওয়াশরুম, নষ্ট সিলিং ফ্যান এবং সময়সূচির চরম বিপর্যয়ে প্রতিদিন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে হাজারো যাত্রীকে।

১৯৮৭ সালে চালু হওয়া মেঘনা এক্সপ্রেস একসময় বাংলাদেশ রেলওয়ের আন্তঃনগর ট্রেনগুলোর মধ্যে যাত্রী ও রাজস্ব আয়ের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিনের অবহেলা ও প্রয়োজনীয় সংস্কারের অভাবে বর্তমানে ট্রেনটির অবস্থা নাজুক হয়ে পড়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, রেল বিভাগের উদাসীনতার কারণেই ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাচ্ছে দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ এই রেলসেবা।

যাত্রীরা জানান, ট্রেনটির অধিকাংশ বগি পুরোনো ও নিম্নমানের। বসার সিটগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। অনেক বগির দরজা-জানালা ভাঙা, ওয়াশরুমে পানি নেই, পরিচ্ছন্নতারও বেহাল দশা। গরমের দিনে পুরোনো সিলিং ফ্যান ঠিকমতো কাজ না করায় যাত্রীরা চরম অস্বস্তিতে পড়েন। অথচ আন্তঃনগর ট্রেন হিসেবে যাত্রীদের ন্যূনতম সেবাও নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইঞ্জিন সংকট। প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো কারণে ট্রেনটির ইঞ্জিন বিকল হয়ে পড়ছে। ফলে নির্ধারিত সময়সূচি ভেঙে পড়ছে এবং যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। চলতি সপ্তাহে পরপর দুই দিন চট্টগ্রাম থেকে চাঁদপুরগামী মেঘনা এক্সপ্রেসের ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। পরে বিকল্প ইঞ্জিন এনে ট্রেনটি চালু করা হয়। নির্ধারিত রাত সাড়ে ৯টার পরিবর্তে ট্রেনটি চাঁদপুর পৌঁছায় গভীর রাত দেড়টায়। সংশ্লিষ্টরা জানান, এমন পরিস্থিতি এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে এবং সপ্তাহে চার থেকে পাঁচ দিন ট্রেনটি বিলম্বে চলাচল করছে।

রেল সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, চাঁদপুর-লাকসাম রেলপথে আধুনিক সিগন্যালিং ব্যবস্থা এখনো চালু হয়নি। একই সঙ্গে ধাপে ধাপে বেশ কয়েকটি লোকাল ও পিক আওয়ার ট্রেন বন্ধ করে দেওয়ায় এ রুটের যাত্রীসেবা সংকুচিত হয়ে পড়েছে। একসময় এই রুটে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ জোড়া ট্রেন চলাচল করলেও বর্তমানে মাত্র দুটি ট্রেন চলাচল করছে। এর মধ্যে রয়েছে আন্তঃনগর মেঘনা এক্সপ্রেস এবং সাগরিকা এক্সপ্রেস কমিউটার।

রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, একসময় মেঘনা এক্সপ্রেস থেকে মাসে ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় হতো। কিন্তু সেবার মানের অবনতি, ট্রেন সংখ্যা হ্রাস এবং সময়সূচির অনিয়মের কারণে বর্তমানে যাত্রীসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এতে রেলওয়ের রাজস্ব আয়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ফেনী, নোয়াখালী, কুমিল্লা, সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও লক্ষ্মীপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের যাত্রীদের জন্য চাঁদপুর রুট এখনো গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নির্ভরযোগ্য ট্রেনসেবা না থাকায় অনেক যাত্রী বাধ্য হয়ে বাড়তি খরচে ঢাকা হয়ে সড়কপথ ব্যবহার করছেন। ফলে দক্ষিণাঞ্চলের যাতায়াত ব্যবস্থায়ও বিরূপ প্রভাব পড়ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, চাহিদা থাকা সত্ত্বেও চাঁদপুর-লাকসাম রুটে নতুন কোনো ট্রেন চালু করা হয়নি। বরং একের পর এক ট্রেন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ ও উন্নয়ন না হওয়ায় রেলপথটি ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাচ্ছে। ট্রেনের অনিয়মিত চলাচলের কারণে গভীর রাতে গন্তব্যে পৌঁছাতে হচ্ছে যাত্রীদের, যা নিরাপত্তা ও ভোগান্তি—উভয়ই বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এদিকে মেঘনা এক্সপ্রেসের এই দুরবস্থার প্রভাব পড়ছে চাঁদপুরের সামগ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থাতেও। ট্রেনযাত্রা কমে যাওয়ায় চাঁদপুর হয়ে ঢাকা ও দক্ষিণাঞ্চলের নৌপথের যাত্রী চলাচলেও নেতিবাচক প্রভাব দেখা দিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. সবুক্তগীন বলেন, দেশে বর্তমানে ইঞ্জিন সংকট রয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি এ রুটে উন্নতমানের কোচ দেওয়ার। যান্ত্রিক বিভাগকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। আশা করছি দ্রুত কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।

তবে যাত্রীদের প্রশ্ন, দীর্ঘদিনের অবহেলায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়া মেঘনা এক্সপ্রেসকে আধুনিক ও নির্ভরযোগ্য সেবায় ফিরিয়ে আনতে কবে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে। দক্ষিণাঞ্চলের লাখো মানুষের গুরুত্বপূর্ণ এই রেলসেবার ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনো রয়ে গেছে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা।

সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SH.AL

SH.AL

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT