ঢাকা | সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভারতীয় ফলে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিকে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

author
আহসান হাবিব বরুন

প্রকাশিত : ২৩ জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৫০
ad003
একটি জাতির প্রকৃত শক্তি নির্ভর করে তার জনগণের স্বাস্থ্য, কর্মক্ষমতা এবং জীবনমানের ওপর। সুস্থ মানুষই একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ। অথচ বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা আমাদের উদ্বিগ্ন করে তুলছে। বাজারে, বাসস্ট্যান্ডে কিংবা অফিস-আদালতে মানুষের ভিড় যেমন চোখে পড়ে, তার চেয়েও অনেক বেশি ভিড় দেখা যায় ফার্মেসি ও ওষুধের দোকানে। যেন ওষুধ এখন মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তালিকায় স্থায়ীভাবে জায়গা করে নিয়েছে।

এই দৃশ্য কেবল একটি অর্থনৈতিক বাস্তবতা নয়; এটি জনস্বাস্থ্যের এক গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি। 

দেশে ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ, লিভারের জটিলতা, ক্যানসার, উচ্চ রক্তচাপ এবং নানা ধরনের দীর্ঘমেয়াদি রোগ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণাগুলো বারবার বলছে, এসব রোগ বৃদ্ধির পেছনে জীবনযাত্রার পরিবর্তনের পাশাপাশি খাদ্যে ভেজাল, অতিরিক্ত রাসায়নিক এবং বিষাক্ত উপাদানের প্রভাবও সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে।

এই প্রেক্ষাপটে ভারত থেকে আমদানি করা ফলের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বাংলাদেশ প্রতিবছর ভারত থেকে বিপুল পরিমাণ আম, আপেল, আঙুর, কমলা, ডালিমসহ বিভিন্ন ফল আমদানি করে। ভৌগোলিক নৈকট্য, তুলনামূলক কম দাম এবং সহজ সরবরাহ ব্যবস্থার কারণে ভারতীয় ফল বাংলাদেশের বাজারে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এসব ফল কতটা নিরাপদ? এগুলোর মাধ্যমে আমরা কি অজান্তেই আমাদের শরীরে বিষ প্রবেশ করাচ্ছি?

সম্প্রতি নেপাল সরকার ভারতীয় আম আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। তাদের দাবি, বিভিন্ন চালানে অনুমোদিত সীমার চেয়ে বেশি মাত্রায় কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ পাওয়া গেছে। ভোক্তার স্বাস্থ্য সুরক্ষার স্বার্থে তারা সীমান্তে ভারতীয় আমের প্রবেশ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর আগে জাপানও ভারতীয় আমের কিছু চালান নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল এবং কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রয়োগ করেছিল।

এসব ঘটনা আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় কৃষিপণ্যের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।

অবশ্য এটিও সত্য যে ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ফল উৎপাদনকারী দেশ। বিশেষ করে আম উৎপাদনে ভারতের সুনাম দীর্ঘদিনের। আলফনসো, ল্যাংড়া, কেশর কিংবা বঙ্গনপল্লীর মতো জাত বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়। 

কিন্তু কোনো দেশের কৃষিপণ্য বিখ্যাত হলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিরাপদ হয়ে যায় না। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের যুগে খাদ্য নিরাপত্তা একটি বৈজ্ঞানিক বিষয়। এখানে আবেগ নয়, পরীক্ষাগারের রিপোর্টই শেষ কথা।

বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের বিষয় হলো, আমরা এখনও খাদ্য নিরাপত্তা পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারিনি। সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ফল দেশে প্রবেশ করে। কিন্তু প্রতিটি চালান কতটা কঠোর পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যায়, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। যদি উন্নত দেশগুলো কোনো ফল বা কৃষিপণ্যে অতিরিক্ত রাসায়নিকের উপস্থিতি শনাক্ত করতে পারে, তাহলে বাংলাদেশকেও একই সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

বাস্তবতা হলো, কৃষিতে কীটনাশক ও রাসায়নিকের ব্যবহার একেবারে নতুন কিছু নয়। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই উৎপাদন বাড়াতে এবং ফসলকে রোগবালাই থেকে রক্ষা করতে বিভিন্ন রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। কিন্তু সমস্যা তখনই সৃষ্টি হয় যখন অনুমোদিত মাত্রা অতিক্রম করা হয় অথবা ফল সংগ্রহের আগে নির্ধারিত সময়সীমা মানা হয় না। এতে রাসায়নিকের অবশিষ্টাংশ সরাসরি ফলের মধ্যে থেকে যায় এবং তা মানুষের শরীরে প্রবেশ করে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত কীটনাশকযুক্ত খাদ্য গ্রহণ করলে ক্যানসার, হরমোনজনিত সমস্যা, যৌন অক্ষমতা, স্নায়বিক জটিলতা, শিশুদের বিকাশগত প্রতিবন্ধকতা এবং প্রজননস্বাস্থ্যের নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। যদিও কোনো নির্দিষ্ট রোগের জন্য এককভাবে কোনো একটি ফলকে দায়ী করা যায় না, তবুও খাদ্যে বিষাক্ত রাসায়নিকের উপস্থিতি জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি গুরুতর ঝুঁকি।

বাংলাদেশে বর্তমানে অসংখ্য মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। কিডনি রোগীর সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। ক্যানসার চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে প্রতিদিন রোগীর চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। অবশ্য এসব রোগের পেছনে বহু কারণ কাজ করে। কিন্তু খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা যে একটি বড় কারণ, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আমাদের খাদ্য ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে ভেজাল, ফরমালিন, কৃত্রিম রং, সংরক্ষণকারী রাসায়নিক এবং কীটনাশকের অপব্যবহার দীর্ঘদিন ধরে একটি উদ্বেগের বিষয়।

আরও দুঃখজনক হলো, অনেক সময় ভোক্তারা জানতেই পারেন না তারা কী খাচ্ছেন। চকচকে, আকর্ষণীয় এবং বড় আকারের ফল দেখে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই আকৃষ্ট হয়। কিন্তু বাহ্যিক সৌন্দর্যের আড়ালে কতটা রাসায়নিক লুকিয়ে আছে, তা নির্ণয় করা সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। ফলে রাষ্ট্রকেই এখানে অভিভাবকের ভূমিকা পালন করতে হয়।

বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, ভ্রাম্যমাণ আদালত এবং বিভিন্ন পরীক্ষাগার কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় এসব উদ্যোগকে আরও শক্তিশালী করা জরুরি। বিশেষ করে আমদানিকৃত ফলের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক ল্যাবরেটরি পরীক্ষা, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ নির্ণয় এবং পরীক্ষায় ব্যর্থ চালান তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

একই সঙ্গে সীমান্ত বন্দরগুলোতে আধুনিক পরীক্ষাগার স্থাপন করা প্রয়োজন। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে নমুনা সংগ্রহ করে দূরবর্তী ল্যাবে পাঠাতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ। ফলে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ব্যাহত হয়। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পরীক্ষার মাধ্যমে আমদানির মুহূর্তেই ঝুঁকিপূর্ণ ফল শনাক্ত করা সম্ভব।

তবে বিষয়টি শুধু ভারতবিরোধী কোনো অবস্থান নয়। বাংলাদেশের স্বার্থে যে দেশ থেকেই খাদ্যপণ্য আসুক না কেন, তা কঠোর পরীক্ষার আওতায় আনতে হবে।

যদি ভারতীয় ফল নিরাপদ প্রমাণিত হয়, তাহলে সেগুলো অবশ্যই আমদানি অব্যাহত থাকবে। আবার যদি কোনো চালানে অনুমোদিত মাত্রার বেশি রাসায়নিক পাওয়া যায়, তাহলে জনস্বার্থে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে আমদানি নিষিদ্ধ করতে হবে। খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো দেশ, কোম্পানি বা ব্যবসায়িক স্বার্থের কাছে রাষ্ট্র নতি স্বীকার করতে পারে না।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দেশীয় ফল উৎপাদনকে উৎসাহিত করা। বাংলাদেশে আম, কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারা, আনারস, জাম, তরমুজসহ অসংখ্য পুষ্টিকর ফল উৎপাদিত হয়। কৃষকদের আধুনিক প্রশিক্ষণ, নিরাপদ কৃষি প্রযুক্তি এবং বাজার সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে বিদেশি ফলের ওপর নির্ভরতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে ভোক্তারাও তুলনামূলকভাবে তাজা ও নিরাপদ ফল পেতে পারেন।

রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের মনে রাখতে হবে, জনস্বাস্থ্য কোনো সাধারণ প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তার অংশ। একটি অসুস্থ জাতি কখনোই দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ধরে রাখতে পারে না। হাসপাতাল নির্মাণের চেয়ে মানুষকে অসুস্থ হওয়া থেকে রক্ষা করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং ব্যয়সাশ্রয়ী।

আজ যখন দেশের অসংখ্য পরিবার ওষুধের পেছনে আয়ের বড় অংশ ব্যয় করছে, তখন খাদ্য নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার সময় এসেছে। বাজারে ফল থাকবে, আমদানি চলবে, ব্যবসাও হবে—কিন্তু তার আগে নিশ্চিত করতে হবে যে মানুষের খাবারের সঙ্গে যেন বিষ প্রবেশ না করে।

নেপাল ও জাপানের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। সেই সতর্কবার্তাকে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা উচিত। বাংলাদেশ সরকারকে অবিলম্বে ভারত থেকে আমদানি হওয়া ফলসহ সব আমদানিকৃত কৃষিপণ্যের ওপর কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে। প্রয়োজনে স্বাধীন বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে নিয়মিত পরীক্ষার ফলাফল জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে। কারণ একটি রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব তার নাগরিকদের জীবন ও স্বাস্থ্য রক্ষা করা। 

পরিশেষে বলে যায়,অর্থনীতি, বাণিজ্য কিংবা কূটনীতি—সবকিছুর ঊর্ধ্বে মানুষের জীবন। আর সেই জীবনকে সুরক্ষিত রাখার স্বার্থেই খাদ্যে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিকের বিরুদ্ধে এখনই কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা সময়ের দাবি। জনস্বাস্থ্যের প্রশ্নে কোনো আপস নয়—এটাই হওয়া উচিত বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ খাদ্যনীতির মূল দর্শন। পাশাপাশি ভোক্তাদের আত্ম সচেতনতাও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি মনে করি।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন। 
ই-মেইল: [email protected] 
 

সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SH.AL

SH.AL

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT